এখন সময়:- আজ: ---

এখন সময়:- আজ:
--

নিত্যনৈমিত্তিক

রেজাউল করিম খোকন

 

হানিফ সহযোগীদের নিয়ে প্রায় সন্ধ্যায় এসে চড়াও হচ্ছে তার ওপর। মেয়েটা বাড়িতে থাকলে তাদের অসুবিধা হয়। মেয়েটাকে নানার বাড়িতে পাঠানোর আগে পর পর কয়েকদিন বিকেলে পাশের বাড়ির ময়না ভাবির কাছে রেখে এসেছিল আমিরন। ব্যাপারটা নিয়ে প্রথমে কিছু না বললেও পর পর বেশ কয়েকদিন এভাবে যাওয়ার পর ময়না ভাবি কৌতূহলী হয়ে জানতে চেয়েছিল, ‘কী ব্যাপার, মজিরুলের বউ, তুমি সন্ধ্যার আগে তোমার মাইয়াডারে আমার কাছে রাইখ্যা যাও। কয়েক ঘণ্টা পর আবার নিয়ে যাও। ঘটনাটা কী আসলে? আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না।’ তার কথায় ভেতরে ভেতরে চমকে উঠলেও নিজেকে সামলে নিয়ে আমিরন ময়নার কৌতূহল মেটাতে শুধু বলেছে, ‘কী আর হইব? কিছুই হয় নাই। মেয়েটা সন্ধ্যার সময় কেবলই কান্দে। ঘরের বাইরে যাইতে চায় শুধু। এই সন্ধ্যাকালে আমি তারে নিয়ে কোথায় যে যাই, বলো। ঘরে আমার কামকাজ আছে না? তাই তো আমি তোমার কাছে দিয়া যাই মেয়েটারে। তোমার ছেলেমেয়েদের সাথে খেলাধুলা করে সময়টা তার ভালো কাটবে, তেমন চিন্তা কইরা। এর বাইরে কোনো ঘটনা নাই।’

‘দেখিস, বাড়িতে তোর সোয়ামি নাই। তুই একলা বাড়িতে থাকস। আবার গ্রামের কোনো ব্যাডা মানুষের সাথে ফষ্টিনষ্টি শুরু করে দিছস কি না কে জানে? সাবধান কইরা দিতাছি।’ হাসতে হাসতে ময়না ভাবি কথাগুলো বলেছে। আমিরন তাতে অনেকটা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে যেন।কিন্তু এভাবে আর কতদিন?

মেয়েটা একটানা তাকে ছাড়া থাকতে থাকতে কেমন অসুস্থ, রোগা হয়ে গেছে। নানার বাড়িতে এখানকার চেয়ে তুলনামূলক ভালো আছে নাজু। ভালো-মন্দ অনেক কিছু খাচ্ছে। অনেক মানুষজনের মধ্যে থাকছে। তার তো সেখানে ভালো থাকারই কথা। মেয়েটার কথা মনে হলেই আমিরনের বুকের ভেতরটাতে হু হু করে ওঠে। তীব্র এক হাহাকার জাগে। মা হয়ে এটা সহ্য করা কঠিন। আমিরন এখন অন্য এক পৃথিবীর বাসিন্দা হয়ে গেছে যেন। তার চারপাশে পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন অনেকে থাকলেও তাদের সবার কাছ থেকে আলাদা করে ফেলেছে যেন নিজেকে। সবার সাথে হয়তো দেখা হচ্ছে, কথাবার্তা হচ্ছে। কিন্তু সবকিছুর পরও একটা অদৃশ্য দেয়াল গড়ে উঠেছে গত দুই মাসে। এক জঘন্য কুৎসিত, অসভ্য পৃথিবীতে যেন তার বিচরণ এবং জীবনযাপন। যেখানে তার নিজের ইচ্ছা-অনিচ্ছার কোনো মূল্য নেই। তার কোনো স্বাধীনতা নেই।  স্বামী মজিরুলের ধার করা বিশ হাজার টাকা পরিশোধ করতে না পারার কারণে নিজের মতো করে বাঁচার অধিকারও হারিয়ে ফেলেছে। এতগুলো টাকা সহসা পরিশোধ করার ব্যবস্থা নেই, আগামীতে কতদিনে তা সম্ভব হবে—সেটাও জানে না আমিরন। তাহলে কি সব অধিকার হারানো একজন ক্রীতদাসীর মতো বাকি জীবনটা কাটাতে হবে তাকে? হানিফ কসাইয়ের জান্তব লালসার কাছে বারবার বলি দিতে হবে!

 

দুই মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, মজিরুল জামালপুর থেকে ঢাকা শহরে এসেছে। গ্রামে একলা বাড়িতে বউ আর মেয়েটাকে রেখে এসেছে। তারা কেমন আছে, কী করছে, তাদের কোনো সমস্যা কিংবা অসুবিধা হচ্ছে কি না, সে জানে না। বেশ কিছুদিন ধরে বাড়িতে টাকাও পাঠায়নি। ফোনে কথাও বলতে পারছে না।

ঢাকার মাদারটেক বস্তিতে যে ঘরে থাকত সে, সেখানে একই ঘরে তার সঙ্গে থাকা আরেক রিকশাচালক কদম আলির মোবাইলে কথা বলত আমিরনের সাথে। পাশের বাড়ির ময়না ভাবির মোবাইলে ফোন করলে সে ডেকে নিত আমিরনকে। কদম আলি রিকশা চালানোর সময় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল। হাসপাতালে ভর্তি হয়ে বেশ কিছুদিন সেখানে ছিল। এরপর কিছুটা সুস্থবোধ করলে বরিশালে তার গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে লোকটা। তার মোবাইলে ময়না ভাবির নম্বরটা সেভ করা ছিল। এ ছাড়া একটা কাগজেও লেখা ছিল নম্বরটা। কিন্তু সেই কাগজটাও হারিয়ে ফেলেছে মজিরুল। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পায়নি। যে কারণে প্রচণ্ড ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও গ্রাম থেকে রাজধানী ঢাকা শহরে আসা এক সাধারণ সহজ সরল মানুষ মজিরুল বাড়িতে তার স্ত্রী-কন্যার সঙ্গে কথা বলতে কিংবা তাদের খোঁজখবর জানতে পারছে না।

গত কয়েক মাসে ঢাকা শহরে রিকশা নিয়ে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটোছুটি করতে করতে কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে জামালপুর জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রাম থেকে জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় আসা মানুষটি। এই ঢাকা শহরটা কত বড়—এখনও ঠিকঠাকমতো ঠাহর করে উঠতে পারেনি সে। অনেক জায়গা এখনও ঠিকঠাকমতো চেনে না। কোথায়, কোনদিক দিয়ে যেতে হয়—না জানায় যাত্রীরাও উঠতে চায় না তার রিকশায়। অচেনা রিকশাঅলার গাড়িতে চড়লে নানা সমস্যা। পথ-ঘাট চিনে চিনে যেতে অনেক সময় লাগে। এই ব্যস্ত শহরে কেউ অযথা রাস্তায় অচেনা রিকশাচালকের অজ্ঞতার শিকার হয়ে তার মূল্যবান সময় নষ্ট করতে চায় না। আবার কিছু যাত্রী রয়েছে তারা কিছুটা মানবিক। বেচারা রিকশাচালক তার গাড়িটা নিয়ে জীবিকার জন্য রাস্তায় নেমেছে। এখন যদি সেই লোকটি অজ্ঞতার কারণে গন্তব্যস্থানটা না চেনে, তাহলে তো তার সারা দিন বসে বসে কাটাতে হবে। দিনশেষে খাবারদাবারের টাকাটাও জুটবে না। আবার রিকশামালিকের দৈনিক টাকাটাও দেবে কীভাবে? তেমন চিন্তাভাবনা থেকে কেউ কেউ দয়া করে মজিরুলের রিকশার যাত্রী হয়। সেই সব যাত্রী পথ-ঘাট চিনিয়ে নিয়ে যায় যার যার গন্তব্যে।

এভাবে গত কয়েক মাসে ঢাকা শহরের অনেক জায়গায় গেছে রিকশাযাত্রী নিয়ে। ফলে কিছু কিছু জায়গা বেশ চেনা হয়ে গেছে। এই শহরে সব রাস্তায় রিকশা চলে না। তখন নানাভাবে ঘুরপথে গন্তব্যে পৌঁছতে হয়। অনেক সময় দামি দামি গাড়ির সঙ্গে রিকশার ধাক্কা লেগে যায়। সেই গাড়ির চালক কিংবা যাত্রী রেগেমেগে অস্থির হয়ে নেমে এসে অনেক সময় দু-চারটা চড়-থাপ্পড় লাগিয়ে বসে। আর মা-বাপ তুলে অকথ্য গালিগালাজ তো আছেই। তাদের চোখের সামনে মূল্যবান লক্ষ লক্ষ টাকার দামি গাড়িতে আঁচড় লাগায় কিংবা কোনো অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ক্ষোভে ফেটে পড়ে। অনেক সময় ক্ষতিপূরণও দাবি করে বসে কেউ কেউ।

‘আমি গরিব মানুষ। মানছি, আপনাগো গাড়ির ক্ষতি হইছে। কিন্তু এই ক্ষতিপূরণের টাকা দেওয়ার ক্ষমতা নাই আমার। আমাকে বিক্রি করলেও সেই টাকা পরিশোধ করতে পারব না’—কাঁদো কাঁদো গলায় কথাগুলো বলে কোনোভাবে সহানুভূতি লাভের চেষ্টা করেছে। কেউ কেউ গরিব রিকশাচালকের ভুলটা ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখলেও কেউ কেউ আবার হিংস্র বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে নিজেদের ক্ষোভ মিটিয়েছে। নিজের ভুলের মাশুল দিতে গিয়ে প্রায় সময়ই রক্তাক্ত, ক্ষতবিক্ষত হতে হয়েছে মজিরুলকে। এই পৃথিবীতে গরিব মানুষের কোনো সম্মান-মর্যাদা লাভের অধিকার নেই। কুকুর-বেড়ালের মতো লাঞ্ছনা অপমান গঞ্জনা সহ্য করে অসহায় পশুর মতো বাঁচতে হয় তাদের।

 

২.

টানা দুই মাস সতের দিন পর মজিরুল তার নিঝুমপুর গ্রামে ফিরে আসে। দীর্ঘদিন ধরে বউ আর মেয়ের খোঁজখবর জানতে না পারায় তার মনটা কেমন অস্থির হয়ে উঠেছিল। আমিরন আর নাজুর মুখ কেবলই মনের পর্দায় ভেসে উঠেছিল। ওরা কেমন আছে? ঠিকঠাকমতো আছে তো! নাকি কোনো সমস্যায় পড়েছে! ইত্যকার চিন্তাগুলো তাকে তাড়িয়ে ফিরছিল বারবার।  রিকশা নিয়ে বেরোলেও মন দিয়ে চালাতে পারছিল না। যাত্রী নিয়ে কোথাও যেতে যেতে কিছুক্ষণ পর পর অমনোযোগী হয়ে পড়ছিল। বেশ কয়েকবার নিশ্চিত বড় ধরনের দুর্ঘটনার কবল থেকে সৌভাগ্যক্রমে যাত্রীসহ রক্ষা পেয়েছে। এজন্য যাত্রীর গালিগালাজ শুনতে হয়েছে তাকে। ‘এই সব আলাভোলা মফিজ কেন যে ঢাকা শহরে রিকশা চালাতে আসে, এই শহরে রিকশা চালাতে হলেও অনেক কৌশল জানতে হবে, সতর্ক ও সাবধান থাকতে হবে। এই সব রিকশাঅলার গাড়িতে চড়ে বেঘোরে জানটা দিতে হবে। এই শালাদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করা দরকার। এদের হাতে কোনো মালিক যেন রিকশা না দেয়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। নিরাপদ রিকশা চলাচলের জন্য অভিজ্ঞ চালক প্রয়োজন।’ মরতে মরতে বেঁচে যাওয়া যাত্রীরা এভাবে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। মজিরুল নিজেও উপলব্ধি করেছে—বাড়িতে ফেলে আসা বউ আর মেয়ের কথা ভাবতে গিয়ে সে বারবার অমনোযোগী, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হচ্ছে। এভাবে তো ঢাকার ব্যস্ত জনবহুল রাস্তায় রিকশা নিয়ে বেরোনোটা মোটেও নিরাপদ নয়। কখন কোন অঘটন ঘটে যায়, তখন নিজের জীবন বিপন্ন হবে। সাথে রিকশার যাত্রীরও ভয়ানক ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। সে নিজে এটা কোনোভাবেই চায় না।

ঢাকা শহরে এখন রিকশার সংখ্যা কত? সঠিকভাবে কেউ বলতে পারে না। কেউ বলেন ১২ লাখ। আবার কেউ বলেন আরও অনেক বেশি। সরকারি হিসাবে মাত্র ৯০ হাজারের বাইরে অসংখ্য অবৈধ রিকশা রাস্তায় চলাচল করে। আজকাল আবার ব্যাটারিচালিত রিকশা নেমেছে রাস্তায়। এর আগে ঢাকা শহরের অলি-গলিতে, পাড়া-মহল্লার ভেতরে ব্যাটারির রিকশাগুলো দাপট নিয়ে চলত। এখন সেগুলো বড় রাস্তায়ও চলাচল করছে। বাস, ট্রাক, কার, মাইক্রোবাস বড় বড় গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিতে চাইছে এগুলো। এটা মারাত্মক বিপদ ডেকে আনছে নগরবাসীর জন্য। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। তা ছাড়া আগে থেকে যারা প্যাডেলচালিত রিকশা নিয়ে রয়েছে তাদের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠেছে ব্যাটারির রিকশাগুলো। তুলনামূলক কম ভাড়ায় তারা রিকশায় যাত্রী বহন করছে। কারণ রিকশা চালাতে চালকের তেমন কষ্ট করতে হচ্ছে না। প্যাডেল মেরে শরীরের ঘাম ঝরিয়ে রিকশা চালানো লাগে না তাদের। রিকশার হ্যান্ডেল ধরে বসে থাকলেই ছুটছে রাস্তায় অন্যান্য যানবাহনের মতো। ব্যাটারিচালিত রিকশার উপদ্রবে অন্য অনেক সাধারণ চালকের মতো মজিরুলও বেশ ক্ষতিগ্রস্ত ও বিরক্ত। আজকাল তুলনামূলক কম ভাড়ায় ব্যাটারি রিকশার চালক অনেক বেশি খেপ মারতে পারছে। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্যাডেলের রিকশাগুলো পেরে উঠছে না। অনেক পরিশ্রম করলেও আয়-রোজগার প্রত্যাশা অনুযায়ী হচ্ছিল না মজিরুলের।

ঢাকা থেকে কয়েক মাস পর বাড়ি ফিরে মজিরুল ভেবেছিল, দুঃখকষ্ট, অভাবের সংসারে হয়তো নতুন করে সুখ-স্বচ্ছন্দ আনতে না পারলেও স্ত্রী-কন্যার সান্নিধ্য তাকে কিছুটা হলেও স্বস্তি দেবে। কিন্তু অনেকটা সময় বাড়ির বাইরে কাটিয়ে ফিরে আসার পর তার জন্য এমন কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত, অপ্রত্যাশিত ব্যাপার অপেক্ষা করছিল, যা যেকোনো সুস্থ, স্বাভাবিক, রক্তমাংসে গড়া মানুষের পক্ষে সহজভাবে মেনে নেওয়া কিংবা নীরবে মুখ বুজে সহ্য করার মতো নয় মোটেও। সভ্য সমাজে কেউ তা মেনে নিতে পারবে না কোনোভাবেই।

 

বাড়ি ফিরে আমিরনকে দেখে প্রথম দর্শনেই চমকে উঠেছিল মজিরুল। এ কী হাল হয়েছে তার!  তাকে দেখে চেনাই যায় না। কচি ঢলঢলে নিষ্পাপ চেহারার সুন্দরী বউটিকে নিয়ে দরিদ্র নিরীহ স্বভাবের মজিরুলের মনে এক ধরনের আত্মতুষ্টি ছিল। ধনে-মানে-প্রাচুর্যে নিঃস্ব গরিব অসহায় হলেও চমৎকার মিষ্টি চেহারার সুন্দরী একটা বউ জুটেছে তার কপালে। অনেক অভাব, দুঃখ-দারিদ্র্য প্রতিনিয়ত আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করলেও আমিরনের সুন্দর কচি ঢলঢলে মুখের দিকে তাকিয়ে সব কষ্ট ভুলে যেত সে। টাকা-পয়সা, ধন সম্পদ, বিত্তবৈভব কিছুই দেয়নি স্রষ্টা তাকে। এ জন্য মনে মনে আক্ষেপ, হতাশা, বেদনার পাহাড় জমলেও আমিরনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার অপার আনন্দ, সুখ, পরিতৃপ্তি তার বিত্তবৈভব না পাওয়ার সব দুঃখ-বেদনা, হতাশাগুলোকে ভুলিয়ে দিত।

 

একটি কন্যা সন্তানের মা হলেও আমিরনের শরীরের গঠন আগের মতো অটুট রয়েছে। বিয়ের সময় যেমন ছিল, কয়েক বছরের ঘর-সংসারের পরও তেমন আছে। বাড়িতে এমন সুন্দরী বউটিকে একাকী ফেলে কাজের সন্ধানে অনেক দূরে ঢাকা শহরে যাওয়ার সময় মনের কোণে নানা সংশয়, শঙ্কা দানা বেঁধে উঠলেও জীবন ও জীবিকার তাগিদে সেদিন তাকে গ্রাম ছাড়তে হয়েছিল একান্ত বাধ্য হয়েই। রিকশা চালানোর জন্য ঢাকা শহরে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না তার। কিন্তু গত কয়েক মাসে তার অনুপস্থিতিতে কী এমন ঘটেছে যে আমিরন এতটা বদলে গেছে? তার ঢলঢলে, সুন্দর মিষ্টি মুখটা আর আগের মতো নেই। শরীরটা কেমন যেন ভেঙে পড়েছে। তাকে দেখলে মনে হয়, কঠিন কোনো অসুখ বাসা বেঁধেছে শরীরে। চোখের কোণে কালি জমেছে। ফর্সা হলুদাভ গায়ের রঙটা হারিয়ে কেমন ফ্যাকাশে, রক্তশূন্য হয়ে গেছে। চেহারায় আগের ঝলমলে, হাসিখুশি, প্রাণবন্ত ভাবটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

অনেকদিন পর স্বামী বাড়ি ফিরেছে। তাকে কাছে পেয়ে খুশি হলেও আমিরনের মধ্যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস, আনন্দ যেন নেই। কেমন যেন  একটা অস্বস্তি, অশান্তি যেন তাকে কেবলই তাড়া করে ফিরছে। মন খুলে আগের মতো স্বামীর বাহুডোরে নিজেকে সমর্পণ করতে গিয়ে কেবলই থমকে যাচ্ছে। আড়ষ্টতা যেন তাকে জড়িয়ে ধরছে। ব্যাপারটা মজিরুল লক্ষ করেছে। যা তাকে চিন্তিত করে তুলেছে। একটা ভয়, আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা যেন আমিরনের অস্তিত্বে ঠাঁই করে নিয়েছে। অল্প কিছুতেই সে কেমন চমকে উঠছে। তার কাজকর্মে, আচরণে এক ধরনের অস্থিরতা ফুটে উঠছে।  তার অনুপস্থিতিতে এমন কিছু কি ঘটেছে আমিরনের সাথে? নিজেকে অনেকবার প্রশ্ন করেছে মজিরুল।  তার শরীরে যদি কোনো অসুখ বাসা বেঁধে থাকে, তাহলে তো সেটা জানাত। চিকিৎসার জন্য বলত। আবার তার সাথে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত অপ্রত্যাশিত কিছু যদি ঘটে থাকে, তাহলে সেটাও তো স্বামীর কাছে মুখ ফুটে বলত। যদি আমিরনের তা বলতে কিংবা জানাতে সংকোচ অথবা দ্বিধা হয়, তাহলে পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজন, পাড়ার মুরব্বিরা তেমন কোনো ঘটনার কথা তাকে জানাত।

কিন্তু গত কয়েক দিনে তেমন কিছুই তো ঘটেনি।

 

৩.

নাজু আজ অনেকদিন ধরে নানাবাড়িতে রয়েছে। আমিরন নিজেই গিয়ে বাপের বাড়িতে মেয়েটাকে রেখে এসেছিল। হানিফ কসাই মেয়েটাকে সহ্য করতে পারছিল না। সে থাকলে তার সমস্যা হয়।   আমিরনকে পরিপূর্ণভাবে ভোগ করার কাজটা নির্বিঘ্নে করতে পারেনা। অবুঝ নিষ্পাপ ছোট মেয়েটিকে চোখের আড়াল করার কথা কখনও ভাবতে না পারলেও হানিফ ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা জোর করে তাকে বাধ্য করেছিল। শুরুতে কয়েকদিন সন্ধ্যার পর তাদের আসার সময় হলে নাজুকে পাশের বাড়ির ময়না ভাবির কাছে রেখে এলেও পরে একসময় ব্যাপারটি নিয়ে আমিরনকে কৌতূহলী হয়ে নানা প্রশ্ন করায় অনেকটা অনিচ্ছায় বাপের বাড়িতে মায়ের কাছে রেখে এসেছিল নাজুকে। প্রথমদিকে এত্তটুকুন মেয়েটা মাকে ছাড়া থাকতে গিয়ে বেশ কান্নাকাটি করত। কিছুতেই থাকতে রাজি হচ্ছিল না। পরে অনেক বুঝিয়ে তাকে মানাতে হয়েছে। তবে একটানা বেশ কিছুদিন সেখানে থাকতে গিয়ে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে সে। আজকাল নাকি আর মায়ের জন্য কান্নাকাটি করে না নাজু।

মেয়েটির কথা সারাক্ষণ মনে পড়ে। কিন্তু কিছুই করার নেই। মেয়েটি ঘরে থাকলে হানিফ কসাই তাকে মেরে ফেলবে, হুমকি দেওয়ার পর থেকে আমিরন অনেক ভয় পেয়েছে। এই সীমার, পাষাণ মানুষগুলোর মনে দয়ামায়া বলতে কিছুই নেই। যখন যা খুশি করে ফেলতে পারে। তাদেরকে কোনোভাবেই বিশ্বাস করা যায় না।

ঢাকা থেকে মজিরুল বাড়ি ফেরার পরপরই নাজুর ব্যাপারে প্রশ্ন করেছে। মেয়েটা নানাবাড়ি বেড়াতে গেছে কিছুদিন হলো। তাকে আনতে যেতে হবে। আমিরন তার স্বামীর কৌতূহল নিবৃত্ত করতে বলেছে। তবে এ বিষয়ে আর বেশি কিছু জানতে চায়নি।

পরদিন সকালে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে মেয়েকে নিয়ে আসবে ভেবেছিল মজিরুল। কিন্তু তার আগেই পুরো দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। আমিরনের মুখে তার জীবনে ঘটে যাওয়া ভয়ঙ্কর ঘটনাগুলোর বিবরণ শুনে মজিরুলের সামনের পৃথিবীটা ওলটপালট, তছনছ হয়ে গেছে। তার মাথায় যা চিন্তাভাবনা ছিল, তার সবকিছুই নিমিষে উবে গেছে। এখন পুরোপুরি ফাঁকা, শূন্য মনে হয় সবকিছু। নাজুকে অনেকদিন ধরে দেখা হয় না। মেয়েটির জন্য আমিরনের বুকের ভেতরটাতে শুধুই হাহাকার। তাকে কি আর জীবনে কখনও দেখতে পাবে না, সে কি হারিয়ে গেছে তার জীবন থেকে—কেন জানি মনে হয়। মজিরুলের মনেও নাজুর জন্য কেমন শূন্যতা বাসা বেঁধেছে। বাড়িতে থাকলে কত কিছুর জন্য আবদার করত মেয়েটা। বাজার থেকে লজেন্স, চিপসের প্যাকেট, মুড়ি-মুড়কি, মুড়ালি, আচার—কত কী আনার জন্য বায়না ধরত মেয়েটা। সব সময় তার কথামতো এনে দেওয়া সম্ভব না হলেও প্রতিদিন কিছু না কিছু একটা হাতে করে নিয়ে বাড়ি ফিরত মজিরুল। একজন দরিদ্র, অক্ষম পিতা হলেও কন্যা সন্তানের আবদার, চাহিদা রক্ষা করার জন্য মনটা অস্থির থাকত। কিন্তু আর্থিক অসচ্ছলতা তাকে মেয়ের কাছে কুণ্ঠিত করে রাখত। কেন তার চাহিদা অনুযায়ী সবকিছু আনতে পারে না সে? একজন ব্যর্থ পিতা হয়ে জবাব দিতে গিয়ে নানা ছলচাতুরীর আশ্রয় নিতে হতো। মিথ্যে বাহানা দিয়ে কন্যাকে বুঝ দিতে দিতে বুক ফেটে কান্না আসত কেবলই। একজন দরিদ্র অসহায় ব্যর্থ পিতা অনেক কষ্টে সেই কান্না দমন করত।  পৃথিবীতে এর চেয়ে দুঃখ কষ্ট বেদনার আর কী হতে পারে? গত কয়েক দিনের অস্থিরতা, নানা ঝামেলার কারণে নাজুর কথা মাথা থেকে প্রায় উবে গেলেও আবার কেন জানি তার মুখটা বারবার মনে পড়ছে। আহা, মেয়েটাকে যদি একটিবার দেখতে পাইতাম—বুকের গভীর থেকে দীর্ঘশ্বাসের সাথে বেরিয়ে আসে কথাটা। এমন কেন লাগছে মেয়েটার জন্য!

 

৪.

সদরুল কাকা মজিরুলকে নিয়ে চেয়ারম্যানের অফিসে গিয়েছিলেন। সেখানে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এরপর হাল ছেড়ে না দিয়ে স্ত্রীর ওপর বীভৎস নির্যাতনের বিচার চাইতে এখানে-ওখানে নানা জায়গায় গেছে মজিরুল। কিন্তু কোথাও কোনো ন্যায়বিচার পায়নি তারা। বরং পরিস্থিতি তাদের প্রতিকূলে চলে গেছে। হানিফ ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা টাকা-পয়সা ছিটিয়ে, প্রভাব বিস্তার করে নিজেদের কৃত অপরাধ আড়ালে নিয়ে যেতে অনেকটাই সক্ষম হয়েছে। আজকাল গ্রামের সাধারণ মানুষ আমিরনকেই চরিত্রহীনা, ব্যাভিচারী মেয়েমানুষ হিসেবে চিহ্নিত করছে। কয়েকটা লম্পট পশু দিনের পর দিন তার ওপর অমানুষিক পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে—এ সত্যটা প্রমাণ করতে পারেনি আমিরন।  এই গ্রামে এত বড় একটি অন্যায় সংঘটিত হয়েছে। এরপরও নির্যাতনের শিকার হওয়া মেয়েটি ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। বরং লাঞ্ছনা, নিগ্রহ, বদনাম, নিন্দা, সমালোচনার বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে। কেউ কিছু করতে পারছে না, ন্যায়বিচারের পক্ষে লড়াই করতে মাঠে নামছে না কেউই। এটা আরও বড় অন্যায় হচ্ছে। এত বড় অন্যায় কীভাবে সহ্য করছেন মহান সৃষ্টিকর্তা?

সদরুল কাকা ধার্মিক মানুষ। তিনি উপলব্ধি করছেন ব্যাপারটা। অন্যায় করাটা যেমন পাপ, তেমনিভাবে চোখের সামনে অন্যায়টা মেনে নেওয়াও বড় পাপ। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার জন্য বারবার বলা হয়েছে ইসলাম ধর্মে। একজন মুসলমান হয়ে এভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না জানিয়ে, কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে চুপচাপ থাকায় এক ধরনের অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হচ্ছেন তিনি। রাতে ঘুমোতে গেলে বারবার নির্যাতিত আমিরনের বেদনার্ত অসহায় মুখটা ভেসে উঠছে মনে। মেয়েটার জন্য একটা কিছু করা দরকার। ভেতর থেকে কেমন তাগিদ অনুভব করছেন বয়োবৃদ্ধ মানুষটি। গত কয়েক রাত ধরে ঘুমোতে পারছেন না তিনি। কাল সকালে মজিরুলের বাড়িতে নিজেই যাবেন, খোঁজখবর নেবেন। সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

মসজিদ থেকে ফজরের নামাজ শেষে আরও দুজন মুসল্লিকে সঙ্গে নিয়ে মজিরুলের বাড়ির দিকে রওনা দেন সদরুল কাকা। একলা বাড়িটিতে একটাই ঘর। সদরুল কাকা অনেকদিন ধরে আসেননি এ বাড়িতে। সুনসান নীরবতা বিরাজ করছে গোটা বাড়িতে। কোনো সাড়াশব্দ নেই কারও। বাড়িতে কি কেউ নেই? বউকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যেতে হানিফের ভাড়া করা গুণ্ডা-পাণ্ডা-ষণ্ডারা মজিরুলকে হুমকি দিয়েছে। এই গ্রামে দুশ্চরিত্রের বউকে নিয়ে থাকা যাবে না—তারা সাফ জানিয়ে দিয়েছে।

তাদের প্রত্যেকের অন্যায়, অপরাধ, অপকর্মের শেষ নেই। অথচ এখন তারাই মজিরুলকে নানাভাবে নসিহত করছে। ভালো মানুষ সেজে নীতিকথা শুনিয়ে যাচ্ছে। সদরুল কাকা এ সবই জানেন। কিন্তু এসবের বিরুদ্ধে তার একার পক্ষে কিছুই করার নেই। এই বয়সে তাদের বিরুদ্ধে লড়তে গেলে ভয়ানক বিপদে পড়ে যাবেন। তখন আপন ছেলে-মেয়েদের কাছে উল্টো বকুনি শুনতে হবে। লাঞ্ছনা-গঞ্জনার শিকার হতে হবে। কিন্তু এতকিছুর পরও তিনি এসেছেন মজিরুল ও আমিরনের খোঁজ-খবর নিতে। সুনসান নীরবতা বিরাজ করলেও বাড়িতে তারা থাকতে পারে। হয়তো অপমান, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা, নিন্দা, সমালোচনার কারণে বাড়িতে ঘরের দরজা-জানালা সব বন্ধ করে বসে আছে। হয়তো গ্রামের লোকজনের কাছ থেকে নিজেদের আড়াল করতে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে ভেতরে রয়েছে তারা।

মজিরুল, ও বাবা মজিরুল, তোমরা বাড়িতে আছ তো! নাকি এখনও ঘুমাইতেছ? বেলা তো বাড়ছে। এখনও কি ঘুমাইতেছ? তোমাদের খোঁজ-খবর নিতে আইলাম, কী অবস্থায় আছ তোমরা? ঘরের দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে সদরুল কাকা ভেতরে থাকা মজিরুল ও আমিরনকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। কিন্তু ভেতর থেকে কেউ তো সাড়া দিচ্ছে না!বেশ কিছুক্ষণ এভাবে ধাক্কাধাক্কির পরও ভেতর থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায় না।

সদরুল কাকা বয়স্ক মানুষ। তারপরও তিনি চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। তার সঙ্গে আসা অন্য দুজন গ্রামবাসীও তাদের মতো করে চেষ্টা চালায়। কিন্তু ভেতর থেকে কারও সাড়াশব্দ পাওয়া যায় না। আসলেই কি ভেতরে কেউ নেই?

এভাবে লোকনিন্দা আর সমালোচনা সইতে না পেরে মজিরুল অসুস্থ নির্যাতিত বউটাকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে নীরবে নিভৃতে চলে গেল কোথাও? প্রশ্ন জাগে তাদের মনে। সদরুল কাকার সঙ্গীদের একজন একটু বেশি অনুসন্ধিৎসু হয়ে ঘরের একটি জানালায় ধাক্কা দিতেই সেটা খুলে যায়। তেমন শক্তভাবে সেটা বন্ধ করা হয়নি।

জানালা খুলতেই ঘরের ভেতরে আবছা আলো-আঁধারিতে বিছানায় মজিরুল এবং তার বউ আমিরনকে অস্বাভাবিকভাবে পড়ে থাকতে দেখা যায়। তাদের পড়ে থাকার ভঙ্গি দেখে অনুমান করা যায়, তারা ঘুমোচ্ছে না। তারা হয়তো অসুস্থ কিংবা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে বিছানায়। সেটা কোনোভাবেই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।

তাহলে কিছু একটা ঘটেছে তাদের—এ ব্যাপারে অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে গেছেন সদরুল কাকা এবং তার সঙ্গে আসা দুজন গ্রামবাসী। তারা ব্যস্ত হয়ে ওঠেন ঘটনার আকস্মিকতায়। দ্রুত ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকেন তারা তিনজন।  বিছানার পাশে ধানক্ষেতের পোকা মারার ওষুধের বোতল পড়ে থাকতে দেখা যায়। মজিরুল ও আমিরনের মুখ দিয়ে ফেনা বেরোচ্ছে। খুব বেশি সময় আগে তারা ধানক্ষেতের পোকা মারার বিষ খায়নি, দেখেই অনুমান করতে পারছেন সদরুল কাকা। তবে শরীরে বিষক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। যে কারণে তারা দুজনই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। এখন দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে উপযুক্ত চিকিৎসা করাতে পারলে হয়তো বিপদ কেটে যাবে। এ যাত্রায় বেঁচে যাবে। কিন্তু এখন এক মুহূর্ত বিলম্ব করার সুযোগ নেই। দ্রুত তাদের হাসপাতালে নিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে হবে। সাথে সাথে আশপাশের পাড়া-প্রতিবেশীদের খবর দেওয়া হয়।

দ্রুত গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে মজিরুল ও আমিরনের বিষ খাওয়ার খবরটা।

কীভাবে যে খবর পেয়ে যায় গ্রামের ভ্যানচালক মিন্টু। সে তার ভ্যানগাড়িটা নিয়ে বেরিয়েছিল সকালবেলা। খবর শুনে সাথে সাথে ছুটে আসে সে তার ভ্যানগাড়িটা নিয়ে।সবাই ধরাধরি করে অচেতন হয়ে পড়া মজিরুল ও আমিরনকে ভ্যানগাড়িতে তোলে। দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। দুজন ডাক্তার ছিলেন সেখানে। তারা যতটা সম্ভব চেষ্টা চালান। ধানক্ষেতের পোকা মারার ওষুধটা মেয়াদোত্তীর্ণ হলে না হয় একটা কথা ছিল। কিন্তু এটা অল্প কিছুদিন আগে মাত্র প্যাকেটজাত করা হয়েছে। যে কারণে বিপদটা খুব বেশি।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দুজন ডাক্তার অসুস্থ মজিরুল ও তার বউ আমিরনকে জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন। উপজেলা পর্যায়ে তেমন উন্নত প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার মতো ব্যবস্থা নেই। সাধারণ অসুখ-বিসুখ হলে তার চিকিৎসা দেওয়া হয় কোনোভাবে। জটিল রোগের কিংবা জটিলভাবে অসুস্থতার কোনো চিকিৎসাব্যবস্থা নেই এখানে।  গ্রামের কয়েকজন মানুষ একটা সিএনজি গাড়ি ভাড়া করে সেখান থেকে জামালপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করে তাদের। এর মধ্যে চিকিৎসার কারণে মজিরুল কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলেও আমিরনের শারীরিক অবস্থার তেমন উন্নতি দেখা যায় না। সে আগে থেকেই বেশ দুর্বল ও অসুস্থ ছিল। রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত ছিল। তেমন দুর্বল শরীরে বিষ খাওয়ায় তার অবস্থার দ্রুত অবনতি হয়েছে।

 

৫.

জামালপুর মেডিক্যাল কলেজের চিকিৎসকরা আমিরনের সুস্থ হয়ে ওঠার ব্যাপারে অনেকটা সংশয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছেন।

 

তারা নিজেরা কোনো ঝুঁকি নিতে চাইছেন না। এর চাইতে আরও উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। জামালপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিজস্ব উদ্যোগে সরকারি অ্যাম্বুলেন্সে করে আমিরনকে ময়মনসিংহ হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। বড় বড় হাসপাতালের ব্যবস্থাই আলাদা। এখানে উন্নতমানের চিকিৎসার সুযোগ ও ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সব চিকিৎসা বিনামূল্যে পাওয়া সম্ভব নয়। জটিল রোগীদের চিকিৎসা বেশ ব্যয়বহুল। এখানে প্রয়োজনীয়, উন্নত চিকিৎসা পেলে আমিরন ঠিকই সুস্থ হয়ে যেত। প্রথম দিনে তার শারীরিক অবস্থা কিছুটা ভালোর দিকে গেলেও ডাক্তাররা বেশ কিছু ওষুধ বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনে আনতে পরামর্শ দেয় মজিরুলকে। কিন্তু এসব ওষুধপত্র ও পথ্য কেনার মতো একটি টাকাও নেই তার কাছে। এখানে অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য ওষুধপত্র কিনতে কার কাছে টাকা চাইবে সে?

তার বাড়ি  জামালপুর জেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামে। সেই নিঝুমপুর থেকে গত কয়েক দিনে কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে এখন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এসে ঠেকেছে তারা। এই শহরের কিছুই চেনে না মজিরুল। এখানে তার কোনো আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব কেউ নেই। এখানে আগে কখনও আসা হয়নি তার।

আমিরনের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র কিনতে না পেরে আর্তনাদ করে কাঁদতে থাকে সে। কেউ কেউ তার দুঃখকষ্টের কথা শুনে সমবেদনা জানায়। পাঁচ, দশ, বিশ টাকা সাহায্য করে। কিন্তু এ টাকা দিয়ে তো দামি ওষুধপত্র কিছুই কেনা সম্ভব হয় না।

ডাক্তারদের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধপত্র কিনে খাওয়াতে না পারায় আমিরনের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। চোখের সামনে বউটা নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। সে কিছুই করতে পারছে না। নিজেকে পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী, অসহায় মানুষ মনে হয় মজিরুলের। তার অসহায় অবস্থা কি সৃষ্টিকর্তা দেখছেন না—প্রশ্ন করে সে নিজেকে। এই ভয়াবহ, অসহায় অবস্থা সব দেখেও তিনি কীভাবে নিশ্চুপ, নির্বিকার থাকেন? আমিরনের চিকিৎসা চালাতে না পারায় হাসপাতালের অনেকে তাকে এখানে অযথা সময় নষ্ট না করে নিজের গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে বুদ্ধি-পরামর্শ দেয়।  গ্রামে ফিরে গেলে আমিরনকে আর বাঁচানো সম্ভব হবে না—এটা বুঝে নিয়েছে মজিরুল। প্রথমদিকে কোনোভাবেই হাসপাতাল ছেড়ে যাবে না সে, কপালে যা-ই থাকুক আমিরনকে নিয়ে থাকবে, শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাবে, ভেবেছিল সে। কিন্তু একটা পর্যায়ে নিয়তির কাছে পরাজয় স্বীকার করে নেয় সে।

 

৬.

মুমূর্ষু আমিরনকে নিয়ে ময়মনসিংহ থেকে নিঝুমপুর গ্রামে ফিরে আসে মজিরুল।

এতটা পথ পাড়ি দিয়ে নিজেদের গ্রামে ফিরতে ফিরতে আমিরনের অবস্থা আরও বেশি শোচনীয় হয়ে পড়ে।

বাড়ি ফিরে আসার এক ঘণ্টার মধ্যে আমিরনের শরীরটা পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এতক্ষণ শরীরটা কিছুটা গরম থাকলেও ধীরে ধীরে তা ঠান্ডা হয়ে আসে। একটা সময়ে এসে তার শরীরটা পুরোপুরি নিথর হয়ে যায়। মজিরুল তাকে ডাকে, ‘ও আমিরন, তুমি কিছু একটা কথা কও। কিছু একটা কইয়া যাও। তুমি তো তোমার মাইয়াডারে একনজর দেখতে চাইছিলা। তাকে নিয়া আসার ব্যবস্থা করি। নাজুরে একটা নজরও কি দেখবা না? তুমি চুপ কইরা থাইকো না। কিছু একটা কও—’

স্বামীর ডাকে আর সাড়া দেয় না আমিরন। পরপারের ডাকে সে আরও আগেই পৃথিবী ছেড়ে অনন্তলোকে যাত্রা করেছে। সেখান থেকে ফিরে আসার আর কোনো উপায় নেই। কেউ সেখান থেকে ফিরতে পারে না। আমিরনও পারে না। মজিরুলের আর্তনাদে গ্রামের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। পাড়াপ্রতিবেশীদের কানেও যায় স্ত্রীহারা এক স্বামীর আর্তনাদ, কান্না। ধীরে ধীরে বাড়ির সামনে নারীপুরুষদের ভিড় বাড়তে শুরু করে। এতদিন যারা নানা দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, সংকোচ, ভয়ে মজিরুল কিংবা আমিরনের কাছে আসেনি, তাদের সঙ্গে কথা বলেনি, এখন তারাও আসতে শুরু করে মজিরুলের একলা বাড়িটিতে। আমিরনের মৃত্যু সংবাদটা পাওয়ার পর স্তম্ভিত হয়ে গেছেন সদরুল কাকা। তার ধারণা ছিল, বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর মেয়েটি হয়তো বেঁচে যাবে। ধানক্ষেতের পোকার ওষুধের বিষে শেষ পর্যন্ত মরবে না হয়তো।

আমিরনের মৃত্যুর ঘটনাটি গ্রামজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। এতদিন বিষয়টি নিয়ে যারা তেমন কৌতূহলী হয়নি, তারাও খোঁজখবর নিতে শুরু করেছে। মজিরুল আমিরনের সঙ্গে ধানক্ষেতের পোকা মারার ওষুধ খেলেও তাকে তেমনভাবে কাবু করতে পারেনি। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাওয়ার পর প্রাপ্ত চিকিৎসায় সে সেরে উঠেছে।  এখন প্রতিদিন কত মানুষ আসছে তার কাছে। নানা ধরনের প্রশ্নের জবাব দিতে হচ্ছে তাকে। এর মধ্যে পুলিশ, গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন যেমন রয়েছে, তেমনিভাবে পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের নারী-পুরুষও রয়েছে।  সবার নানামুখী প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে মজিরুল ক্লান্ত, বিরক্ত হয়ে পড়েছে। অথচ কয়েক দিন আগেও ন্যায়বিচারের আশায় সে কতজনকে বীভৎস সেই ঘটনার কথা সবিস্তারে খুলে বলতে চেয়েছে। কতজন তাকে এড়িয়ে গেছে সরাসরি, কিছুই শুনতে আগ্রহ দেখায়নি।

 

 

 

৭.

এই পৃথিবীটা আসলেই বিচিত্র। এখন মজিরুলকে গুরুত্ব দিয়ে নানাজনে কত কী জানতে চাইছে, কত কী ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দিচ্ছে তাকে। কিন্তু তাতে কি আমিরনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া সেই ভয়ঙ্কর অপরাধের বিচার সুনিশ্চিত হবে? মজিরুল কি ন্যায়বিচার পাবে? আমিরনের আত্মা কি শান্তি পাবে তাতে? কিছুই জানে না সে।

এ ঘটনার পর অভিযুক্ত হানিফ কসাই, মন্তাজ বাবুর্চি এবং খবির শেখ গা ঢাকা দিয়েছে। তাদের বাড়িতে কিংবা মাংসের দোকানে গিয়ে তাদের কাউকে পাওয়া যায় না। অনেক পত্রিকার লোকজন তাদের মোবাইল ফোন নম্বর জোগাড় করে কল দিলেও সেগুলো বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।  অভিযুক্ত তিনজনের সাথে গ্রামের চেয়ারম্যানের ভালো সম্পর্ক রয়েছে, বজলু চেয়ারম্যানের মদদ পেয়ে তারা বেপরোয়া হয়েছে দিনে দিনে। এর আগে আরও বেশ কিছু নারী কেলেঙ্কারির ঘটনায় তাদের সরাসরি যুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলেও ক্ষমতার দাপটে তারা পার পেয়ে গেছে। এবারও অভিযুক্ত তিন অপরাধীর কিছু হবে না, তারা নানা ব্যবস্থা করে ঠিকই পার পেয়ে যাবে, গ্রামের লোকজন এর মধ্যেই বলাবলি করতে শুরু করেছে।

এ ঘটনায় বজলু চেয়ারম্যান শুরুতে কিছুটা বেকায়দায় পড়ে যাচ্ছিল। তার বিরোধীপক্ষের লোকজন হানিফ কসাই, মন্তাজ বাবুর্চি ও খবির শেখকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পুলিশকে চাপ দিলেও চেয়ারম্যান সুকৌশলে পুরো ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে।তিন অভিযুক্তকে পুলিশ গ্রেফতারের জন্য দৌড়-ঝাঁপ করলেও সেগুলো ছিল স্রেফ লোক দেখানো ব্যাপার।  বজলু চেয়ারম্যান তিনজনকেই বেশ কিছুদিন দূরে কোথাও আত্মগোপনে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। পরিস্থিতি ক্রমেই শান্ত হয়ে গেলেই তখন তাদের ফিরে এলে চলবে। তাদের তখন কেউ কিছু করতে পারবে না আর। ততদিনে থানা পুলিশ সবকিছুই ম্যানেজ হয়ে যাবে।

‘এই রকম কত কেইস ম্যানেজ কইরা ফেলছি, আমার সঙ্গে পলিটিক্যাল লিডারদের যে সম্পর্ক, আমি আলাপ করছি। তারা কয়েকটা দিন ওদের আত্মগোপনে থাকতে কইছে। এরপর আর কেউ তাদের কিচ্ছু করতে পারব না। আমি সরকারি দলের রাজনীতি করা মানুষ। এই রকম কেইস যদি ম্যানেজ করতে না পারি, তা হইলে চেয়ারম্যান হইয়া আর কী করলাম’—অনেকটা দাম্ভিকতা ঝরে পড়ে বজলু চেয়ারম্যানের কণ্ঠে।  এটা যেন তার জন্য নিত্যনৈমিত্তিক, মামুলি ব্যাপার। আকছার এমন কত ঘটনা গ্রামে ঘটছে। শত অন্যায়, অবিচার করেও অপরাধীরা তার অনুগ্রহ, আশীর্বাদে পার পেয়ে যাচ্ছে। এভাবে আর কতদিন চলবে?  যুগের পর যুগ, বছরের পর বছর ধরে কি এভাবেই অন্যায়, অবিচার চলতে থাকবে এই গ্রামবাংলায়? অপরাধীরা অপরাধ করেও নির্বিঘ্নে, নিশ্চিন্তে বুক ফুলিয়ে সমাজে বসবাস করবে?

 

রেজাউল করিম খোকন, গল্পকার ও প্রাবন্ধিক, ঢাকা

‘কল্লোল যুগের পরে’ অগ্রগতি’র কথা

ইসরাইল খান এই রচনাটির শিরোনাম হতে পারে—‘ত্রিশের দশকের সাহিত্যান্দোলন ও সাপ্তাহিক অগ্রগতি (১৯৩৫-৩৯)’। কিন্ত তার দরকার নেই । ‘অগ্রগতির কাহিনী’ নামে গল্পটা বলি—। ঊনিশ শতকে

তরুণ লেখক আতিকুর রহমান’র আরবে মুসাফির গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান

তরুণ লেখক আতিকুর রহমান আতিক’র লেখা আরবে মুসাফির গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর পিটস্টপ হল রুমে আবির প্রকাশন-এর নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ নুরুল আবসার’র

অপূর্ণতার ভেতর পূর্ণ এক সৃজনযাত্রা : কামরুল হাসান বাদল

এজাজ ইউসুফী কোনো লেখককে মূল্যায়ন করা সহজ নয়, বিশেষত যখন তার সৃজনী কাজের বিস্তার একক কোনো সাহিত্যধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কবিতা, গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ,

উদীচী’র সুর-আলেখ্য ‘একতারা ও রবীন্দ্র – বীণা’র অনুরণন

অনিন্দিতা অনি   অন্ধকার মঞ্চ। শিল্পীবৃন্দ সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন, সঙ্গে তালবাদকেরা। হঠাৎ মঞ্চের মাঝখানে গোল হয়ে নেমে এলো এক আলোকরশ্মি। দুহাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন এক

চক্র

সৈয়দ মনজুর কবির   দরজায় অনবরত হাত চাপড়ানোর ধুপ ধুপ শব্দে সিহাবের সকালের মজার ঘুমটা যায় ভেঙে। মেজাজটা যায় বিগড়ে। এভাবে দরজায় শব্দ তো কারো