এখন সময়:- আজ: ---

এখন সময়:- আজ:
--

আহমদ শরীফের দর্শনচিন্তা :  মননের দীপ্তি ও যুক্তির অন্বেষা

ড. জান্নাতুল যূথী

 

দর্শন মূলত মানুষের অস্তিত্ব, জগৎ, জ্ঞান, সত্য, নৈতিকতা ও জীবনসম্পর্কিত মৌলিক প্রশ্নের যুক্তিনিষ্ঠ অনুসন্ধান। মানুষ যখন তার চারপাশের জগৎ, নিজের অস্তিত্ব এবং সমাজ-জীবনের অর্থ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শুরু করে, তখনই দর্শনের সূচনা ঘটে।  বাঙালির মনন-ইতিহাসেও দর্শনচর্চার একটি দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক ধারা বিদ্যমান। এই ধারাকে আধুনিক যুক্তিবাদ, বিজ্ঞানমনস্কতা ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সংযুক্ত করে যাঁরা নতুনভাবে ভাবার অবকাশ সৃষ্টি করেছেন, আহমদ শরীফ তাঁদের অন্যতম। আহমদ শরীফের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয় মূলত একজন গবেষক ও মননশীল প্রাবন্ধিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলেও তাঁর চিন্তার পরিসর কোনো একটি জ্ঞানশাখায় সীমাবদ্ধ ছিল না। বাংলা সাহিত্য ও মধ্যযুগের ইতিহাস তাঁর গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র হলেও ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনীতি, দর্শন ও মানুষের জীবনসম্পর্কিত নানা প্রশ্ন তাঁর মননকে সমৃদ্ধ করেছে।

আহমদ শরীফের দর্শনচিন্তার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো যুক্তি ও বিজ্ঞানমনস্কতার প্রতি গভীর আস্থা। প্রচলিত বিশ্বাস, সংস্কার ও অনুশাসনকে তিনি চূড়ান্ত সত্য হিসেবে গ্রহণ করেননি; বরং যুক্তি, অভিজ্ঞতা ও বৈজ্ঞানিক বিচারবোধের আলোকে সেগুলোকে পর্যালোচনা করেছেন। তাঁর ‘দর্শনচিন্তা’ গ্রন্থে সংকলিত মোট সাতাত্তরটি প্রবন্ধে জীবন ও জগৎকে তিনি বহুমাত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নের মাধ্যমে নিজস্ব দর্শনচেতনার প্রকাশ ঘটিয়েছেন।

‘দর্শনচিন্তা’ গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধ ‘জীবন’। এ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক মানবজীবনের সারবত্তা, তাৎপর্য ও অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য অন্বেষণের প্রয়াস করেছেন। জীবন সম্পর্কে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি মূলত যুক্তিবাদী ও মানবকেন্দ্রিক। জীবনের অপরাজেয় প্রবাহ ও তার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম রাজনীতিসচেতন কবি বেনজীর আহমদের কবিতার পংক্তি—‘আমি আছি, বিশ্ব আছে। রক্তে রক্তে জীবন নাচে। মৃত্যু কোথা বল?’—উদ্ধৃত করেছেন। এই পংক্তির মধ্য দিয়ে তিনি জীবনের অস্তিত্বময়তা, প্রাণস্পন্দন ও মৃত্যুকে অতিক্রম করার প্রত্যয়কে তুলে ধরেছেন। তাঁর আলোচনায় জীবন নিছক জৈব অস্তিত্ব নয়; বরং সচেতনতা, কর্ম, সৃজনশীলতা ও মানবকল্যাণের মধ্য দিয়ে জীবনের সার্থকতা অর্জিত হয়। আহমদ শরীফ বলেছেন, ‘জীবনকে শিল্পের রসের মতো, শিল্পের রূপের মতো, শিল্পের অনুভব-উপলব্ধির মতো ভোগ, উপভোগ ও সম্ভোগ করতে হয়, জানতে হয়। জীবনও অনুশীলন সাপেক্ষ অনায়াস লভ্য ও লব্ধ নয়।’ আহমদ শরীফ দেখিয়েছেন, মানবজীবন অন্য প্রাণীর মতো স্বার্থে ব্যয় করা চলে না। মানবজীবনের সারমর্ম বুঝে তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করাই মানবসমাজের উদ্দেশ্য।

‘জীবনতত্ত্ব’ প্রবন্ধে তিনি জীবনকে আরও সূক্ষ্মভাবে পাঠক মহলে উপস্থাপন করেছেন। মানুষের কিছু না কিছুর প্রতি আসক্তি-আকর্ষণ-অনুরাগ-লোভ বা মোহ আছে বলেই সে বাঁচতে চেষ্টা করে। কিন্তু পৃথিবী কখনো একটানা বা লাগাতার সুখেরও নয় আবার দুঃখেরও নয়। তাই প্রিয়জনের বিশ্বাসভঙ্গের কারণে পৃথিবীর জীবনযন্ত্রণা থেকে মুক্তি খোঁজার কোনো কারণ নেই বরং আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে সম্মুখ সমরে এগিয়ে যেতে হবে। জীবন থাকলে দুঃখ-কষ্ট-বেদনা-কামনা-বাসনা-সংগ্রাম-সংঘর্ষ থাকবেই। এজন্যই জীবনের মাহাত্ম্যও এত বেশি। ‘জীবনতত্ত্বে’ যে জীবন পাঠকের কাছে তুলে ধরতে সচেষ্ট হয়েছেন সেই জীবনই আবার কী এবং কেন এ প্রশ্নেরও ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। জীবনে সচেতন অনুভূতি ও উপলব্ধি ছাড়া মনোজগতের বিকাশ বা বিস্তার সম্ভব নয়। জীবনকে সুন্দর-সফল-সার্থক করে তুলতে হলে, জীবনরূপ বৃক্ষের পরিচর্যা করতে হবে। বৃক্ষকে যেমন পরিচর্যা করেই সেখান থেকে ফুল-ফল পাওয়া যায় জীবনও তদ্রূপ। জীবনের প্রতি সচেতন নাহলে জীবনসংগ্রামে পশ্চাৎগামী হতেই হবে! এ প্রসঙ্গে আহমদ শরীফ বলেছেন,  ‘আত্মপ্রসার করতে চাইলেই নিশ্চিত ও নিশ্চিন্ত জীবনে স্বেচ্ছায় বরণ করতে হয় দ্বন্দ্ব ও সংঘাতকে; নিতে হয় বাঁচা-মরার ঝুঁকি।’ পুরোনো দিনের অবসানে নতুন সূর্যের উদয়কে বরণ করে নিতে হবে। তবেই জয় সুনিশ্চিত করা যাবে। পৃথিবী সুন্দর ও সুখের কারণ এখানে মানুষের আসক্তির, অনুরগের, মোহের ও কাঙ্ক্ষিত ভোগ-উপভোগের বস্তু রয়েছে। জীবনের অর্থই ভাঙা-গড়া। তবে সুখ মানুষ দীর্ঘক্ষণ যাপন করতে পারে না। বেদনা-হতাশা-যন্ত্রণাই মানুষকে বেশি পোড়ায়। যে ব্যক্তি গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে জীবনকে উপলব্ধি করতে চেষ্টা করেছেন, একমাত্র তারাই সাফল্যের মুখ দেখতে সচেষ্ট হয়েছেন।

‘গতিই জীবন, স্থিতিই জরা-জড়তা ও জীর্ণতা’ প্রবন্ধেও আহমদ শরীফ তাঁর দর্শনচিন্তা-চেতনার প্রসার ঘটিয়েছেন। তিনি যুক্তি-তর্ক-বুদ্ধি-বিজ্ঞানের মাধ্যমে শাস্ত্রের রহস্যতত্ত্ব উন্মোচন করেছেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘ শাস্ত্রমাত্রই প্রবল শ্রেণির তৈরি।’  অন্যদিকে ‘জীবনের নিয়ামক’ প্রবন্ধে ধর্মতত্ত্বকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করে তাঁর যুক্তিবাদী মত উপাস্থাপন করেছেন। ‘হৃতজীবনের কান্না’ প্রবন্ধে ধূলিধূসর পৃথিবীতে জীবনকে সুন্দর-সমধুর-সুখকর করে তোলার পথ দেখিয়েছেন। এ জীবন অতুল্য ঐশ্বর্য তাই পৃথিবীর রূপ-রসের আকর্ষণেই মানুষ অবিনশ্বর-চিরন্তন জীবন কামনা করে! কিন্তু সংগ্রাম-সংঘর্ষের মুখোমুখি হলেই পৃথিবীর অযোগ্যও করে তোলে নিজেকে! কিন্তু আহমদ শরীফ বলেন, ‘মুক্ত মন, মুক্ত মত, মুক্ত বুদ্ধি, মুক্ত যুক্তি, মুক্ত সিদ্ধান্তই হবে পুঁজি ও পাথেয়।’ অর্থাৎ জীবনকে পরিচালনা করতে বিজ্ঞানুরাগ, যুক্তির অনুগামিতা যথাকালে যথাস্থানে আবশ্যিক ও অপরিহার্য।

‘জীবনের প্রান্তপর্বের ভাবনা’ প্রবন্ধে তিনি জীবনের নানা পর্ব বিভাজন করেছেন- শৈশব, বাল্য, কৈশোর, যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব, বার্ধক্য। জীবনের প্রতিটি পর্বে মানুষকে অনেক দায়িত্ব-কতর্ব্যের মধ্যে দিয়ে পরিভ্রমণ করতে হয়। তবে প্রান্তজীবনে নর বা নারীর জীবনের মূল উদ্দেশ্য থাকে জমাজমির বিলি ব্যবস্থা, সন্তানাদির বিয়ে অবধি সবকিছু। ‘মর্ত্যজীবনের দায়িত্ব পালন ও কর্তব্য করণ সুসম্পন্ন করে তৃপ্ত ও তুষ্ট মনে মৃত্যুবরণ করা গেলে ব্যক্তির বাস্তব জীবনে সুসমাপ্তি ঘটে।’ ক্ষণস্থায়ী জীবনে মানুষের চাহিদার অন্ত নেই! একটি পেলে আরেকটি পাওয়ার বাসনায় ছুটতে ছুটতে জীবন ফুরিয়ে যেতে থাকলেও শেষাবধি সে উত্তরাধিকারের চিন্তায় বিভোর থাকে। এই অন্তহীন পথচলায় মানুষ তার সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়। কিন্তু দার্শনিক আহমদ শরীফ জীবনের এই বাস্তবসত্য তুলে ধরে মানব জীবনের প্রকৃতসত্যের প্রতি দিকপাত করেছেন।

আহমদ শরীফের ‘দর্শনচিন্তা’ গ্রন্থে জীবনভাবনা নিছক তাত্ত্বিক কিংবা বিমূর্ত দর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং তা বাস্তব জীবন, মানবিক দায়িত্ব, কর্ম, সংগ্রাম ও মুক্তচিন্তার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তিনি জীবনের দুঃখ-বেদনা, আনন্দ-বিষাদ, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও পরিবর্তনকে জীবনের স্বাভাবিক অনুষঙ্গ হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর দৃষ্টিতে জীবনকে অর্থবহ করে তুলতে হলে স্থবিরতা ও অন্ধবিশ্বাস পরিহার করে যুক্তি, বিজ্ঞান, মুক্তবুদ্ধি ও আত্মসচেতনতার পথে অগ্রসর হতে হবে। একইসঙ্গে ব্যক্তি-জীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য যথাযথভাবে পালন করে মানবকল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করাই জীবনের প্রকৃত সার্থকতা। ফলে আহমদ শরীফের জীবনদর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে গতি, সচেতনতা, যুক্তিবাদ, সংগ্রামী মনোভাব ও মানবিক দায়িত্ববোধ। তাঁর এই জীবনভাবনা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়কেই অন্ধ অনুশাসন ও স্থবিরতার বাইরে এনে প্রগতিশীল, মানবিক ও মুক্তচিন্তার পথে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়।

প্রকৃতার্থে বাংলা মননজগতে আহমদ শরীফ এমন এক চিন্তাবিদ, যাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান একই সঙ্গে যুক্তিনিষ্ঠ, অনুসন্ধিৎসু ও প্রশ্নমুখর। সাহিত্য, ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি ও দর্শন—জ্ঞানচর্চার বহুবিধ ক্ষেত্রে তাঁর বিচরণ থাকলেও তাঁর সমগ্র মননজগতের অন্তঃপ্রবাহে সক্রিয় ছিল মানুষ, সমাজ ও জীবনকে যুক্তির আলোকে বিচার করার প্রবণতা। প্রচলিত বিশ্বাস, ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক সংস্কার কিংবা প্রতিষ্ঠিত মূল্যবোধকে তিনি নিছক উত্তরাধিকারসূত্রে গ্রহণ করেননি; বরং সেগুলোর অন্তর্নিহিত যুক্তি, সামাজিক তাৎপর্য ও মানবিক ফলাফল সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে আহমদ শরীফের দর্শনচিন্তা কেবল কোনো নির্দিষ্ট দার্শনিক মতবাদের অনুগমন নয়, তা হয়ে উঠেছে স্বাধীন বুদ্ধিবৃত্তি ও মুক্তচিন্তার এক স্বতন্ত্র প্রকাশ।

 

ড. জান্নাতুল যূথী, প্রাবন্ধিক ও গবেষক

অ্যান কারসন : পুরাণ পেরিয়ে মানুষের কাছে

শাহেদ কায়েস ২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসন। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য নিয়ে তাঁর দীর্ঘ অধ্যয়ন ও শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা

 ‘সাড়ে ৭ বছরে ১৪ হাজারের অধিক বই উপহার দিয়েছে চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি’

আন্দরকিল্লা ডেক্স : গত সাড়ে ৭ বছরে সারাদেশে ১৪ হাজারের অধিক বই উপহার দিয়েছে চাঁদপুরের সুপরিচিত প্রতিষ্ঠিত সংগঠন চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি। বিগত পুরো অক্টোবর মাস

কবীর-লালন ভাবসঙ্গীত উৎসবে ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন : ভাঙা ডালের কোষ থেকে জেগে ওঠে সবুজ-সজিব পত্র-পল্লব

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বলেছেন, তুমুল ঝড়-ঝঞ্ঝায় সবুজ প্রান্তরে সকল বৃক্ষরাজি ধ্বংস হলেও কয়েকটি ডালপালা পড়ে থাকে। ঐ ডালপালাগুলোর মধ্য

যোগেন চৌধুরী : শূন্যতার মর্মবেদ

মইনুদ্দীন খালেদ দুঃসহ অভিজ্ঞতায় অস্তিত্বের প্রদাহে বদলে যায় মানুষের নিত্য-চেনা অবয়ব। ক্ষুরধার একটা অপয়া মুহূর্তের রিরংসায় মানুষ কি অতর্কিতে হয়ে যায় তার আপনজনের হন্তারক! পচনশীল

চক্র

সৈয়দ মনজুর কবির (পূর্ব প্রকাশিতের পর) মামা, আমরাতো তিন দিন আগের থেকেই ওরে খুঁজতেছিলাম। পুলিশ আধা ঘন্টা হইলো ওর লাশ দিয়া গেছে। কইলো পরশুদিন রাইতে