গাজী গিয়াস উদ্দিন
মানবতাবাদী লেখক মোতাহের হোসেন চৌধুরী ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যাপক। এখানে তিনি আবুল ফজলকে সহকর্মী হিসেবে পেয়েছিলেন। ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ (১৯২৬) এর সদস্য এবং শিখা গোষ্ঠীর লেখক হিসেবে তিনি ছিলেন বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা। তাঁর বড় পরিচয় মননশীল প্রাবন্ধিক এবং সাংস্কৃতিক মুক্তি আকাঙ্ক্ষা নিয়েই তাঁর লেখালেখির প্রাধান্য।
ব্যক্তি জীবনেও তিনি ছিলেন নম্র, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, নিরহংকার ও রসজ্ঞ। লেখকের জন্ম ১ এপ্রিল ১৯০৩ লক্ষ্মীপুর (সাবেক নোয়াখালী) জেলার রামগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চনপুর গ্রামে। চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যাপনাকালে তিনি ১৯৫৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। মোতাহের হোসেন চৌধুরী সম্পর্কে সমালোচক শ্রেণির ভাষ্য হচ্ছে, তিনি কোন ইজমের ধারক না হয়েই, সকল মতাদর্শকে অশ্রদ্ধা না করেও আপন বিশ্বাস ও চেতনালোক থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি। মুসলমান সমাজের কুসংস্কার, কূপমন্ডুকতা এবং সংস্কৃতি বিমুখতার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদের নিমিত্তে অবিরাম কলমযুদ্ধ চালিয়ে গেছেন। তিনি কলম ধারণ করেছেন মহৎ লক্ষ্যে এবং সমাজ পরিবর্তনের দুর্বার আকাঙ্ক্ষায়।ব্যক্তিবাদ,সৌন্দর্য বিশ্বাস ও আনন্দ চর্চার বার্তাবাহক এ লেখক অধ্যাপক আপন সাহিত্য ধ্যান সম্পর্কে বলেন, ” লেখা আমার কাছে এক প্রকারের প্রার্থনা আর প্রার্থনার উদ্দেশ্য আত্মার ঔজ্জ্বল্য সাধন, অর্থ উপার্জন নয়।” শুধু তাই নয়,পবিত্র হৃদয়ের এ মনীষী সাহিত্য চর্চায় কোনপ্রকার প্রতিযোগিতাকে পাপ বলে গণ্য করতেন।তাঁর আরাধ্য ছিল, সভ্য, যুক্তিনিষ্ঠ, প্রেমময় ও সংস্কৃতিবান মানুষের সাধনা।
মোতাহের হোসেন চৌধুরী বিশ শতকের মানবতাবাদী দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেল ও চিন্তাবিদ ক্লাইড বেল এর চিন্তাধারায় প্রভাবিত হন। রাসেল ও বেল এর মানবিক মূল্যবোধে লালিত হয়ে তিনি রচনা করেন দুটো অনুবাদ গ্রন্থ। একটি হচ্ছে, রাসেলের ‘দি কনকোয়েস্ট অব হ্যাপিনেস ‘অনুসরণে’ সুখ’। অপরটি বেল এর’ সিভিলাইজেশ্যন ‘ অবলম্বনে ‘ সভ্যতা ‘। জীবনের পরমার্থ খুঁজে পেতে হলে মোতাহের হোসেন চৌধুরীর পরামর্শ কাজে লাগবে। তিনি বলতে চেয়েছেন, আমরা বেঁচে থাকাকে বড় করে দেখি বলে অর্থ উপার্জনকে জীবনের লক্ষ্য বানিয়ে ফেলি। তাই আমাদের জীবন অর্থহীন হয়ে পড়ে। এভাবে জীবনের কৃতকার্যতা হারিয়ে আমরা হতাশা ও দুঃখে নিমজ্জিত হই।জীবনের এ দুর্দশা থেকে মুক্তি লাভের জন্যে লেখকের ভাষায় ” বাঁচার উপায়কে যখন বড় করে তুলি জীবন তখনই হয় দরিদ্র, বাঁচার উদ্দেশ্যকে বড় করে তুললেই জীবন ঐশ্বর্যশালী হয়ে ওঠে “। এ মহৎপ্রাণ লেখকের কাছে জীবন সুন্দর আনন্দলোকের, তাই তা অসংস্কৃত ও অপরিচ্ছন্ন নয়।আর তথাকথিত ধার্মিক হওয়ার চেয়ে সংস্কৃতিবান হওয়ার প্রার্থনা করেছেন।তাহলে ধর্মের সঙ্গে সংস্কৃতির কি বিরোধ আছে? আর মোতাহের চৌধুরী বা ‘ তথাকথিত ধার্মিক ‘ কেন অপছন্দ করলেন। আসলে কথা ছিল, যিনি ভালো ধার্মিক – তিনিই হবেন ভালো সংস্কৃতিবান কিন্তু ধর্মের অপব্যবহার যখন কুসংস্কারের নামান্তর হয়,তখন এ জাতীয় মন্তব্য না করে লেখকের উপায় থাকে না। মূলত ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধেই লেখকের দৃঢ় অবস্থান। সংস্কৃতির প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করে লেখক আরো বলেন, কালচারের উদ্দেশ্য সুখ সাধনা। সাহিত্য শিল্প সংগীত কালচারের উদ্দেশ্য নয়,উপায়। উদ্দেশ্য নিজের ভেতরে একটা ইশ্বর বা আল্লাহ সৃষ্টি করা।যে তা করতে পেরেছে সেই কালচার্ড। লেখক শফিউল আলম এর মতে “মনে হয় মোতাহের হোসেনই বাংলা সাহিত্যের প্রথম কন্ঠ যিনি জীবনকে, বাঁচাকে এবং শিল্পিতভাবে বাঁচাকে সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ মনে করেছেন”।
যথেষ্ট প্রতিভাবান লেখক হয়েও মোতাহের হোসেন চৌধুরী জীবদ্দশায় ছিলেন অপ্রকাশিত। তাঁর ‘ সংস্কৃতি কথা’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় তাঁর মৃত্যুর পরে। এটি প্রকাশ পেলে সুধী পাঠক সমাজ এক নতুন ও অনাবিষ্কৃত ঐশ্বর্যের সন্ধান পেয়ে যান। সমালোচকগণ বলেছেন, গোঁড়ামি পরিহার করে শক্তি ও সুন্দরের এবং সাহস ও রুচির সহঅবস্থান মোতাহের চৌধুরীর সমস্ত লেখা ও মননে প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি ছিলেন অনন্য এক উদারচেতা লেখক। কবিতা এমনকি সনেটও তাঁর সৃষ্টির ঝুলিতে শোভা পেয়েছে। বলা হয় রোমান্টিক কাব্যের চাইতে সনেট রচনাতেই তিনি মুক্তি খুঁজেছেন। একটি সনেটের শেষ দু পংক্তি :
” কাঙাল পরাণ মোর সকলের কাছে প্রাণ দাও,প্রেম দাও – এই ভিক্ষা যাচে।।” ( চতুর্দশপদী)
কবিতার উদ্ধৃতি:
“হে আল্লাহ!
বুদ্ধি দাও,শান্তি দাও,অনুভূতি দাও,কল্পনা দাও
সৃষ্টিপথের মর্মকোষের মধুপানের ক্ষমতা দাও।” ( প্রার্থনা : প্রভার্তিক)
মোতাহের হোসেন চৌধুরী প্রবন্ধ, বিশেষ করে সংস্কৃতি ও জীবনদর্শন নিয়ে লিখেছেন, যেমন তার ‘জীবন ও বৃক্ষ’ রচনাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার এই ধরনের লেখা ও চিন্তাচেতনার সাথে আবুল ফজলের লেখারও মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
তিনি বাঙালি মুসলমান সমাজের অগ্রগতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর এই আদর্শের সাথে কাজী আবদুল ওদুদের চিন্তাভাবনা এবং মুসলিম সাহিত্য সমাজের অন্যান্য সদস্যদের দৃষ্টিভঙ্গিও সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। বুদ্ধদেব বসু, প্রমথ চৌধুরী প্রমুখ মননশীল ও মুক্ত বুদ্ধির লেখকদের লেখার প্রভাব তাঁর প্রবন্ধ ও রচনারীতিতে পরিলক্ষিত হয়।
মোতাহের হোসেন চৌধুরীর মূল গ্রন্থগুলো হলো তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ সংস্কৃতি কথা (১৯৫৮) এবং অনুবাদগ্রন্থ সভ্যতা (১৯৬৫), যা ক্লাইভ বেলের ঈরারষরুধঃরড়হ গ্রন্থের অনুবাদ, ও সুখ (১৯৬৫), যা বার্ট্রান্ড রাসেলের ঈড়হয়ঁবংঃ ড়ভ ঐধঢ়ঢ়রহবংং গ্রন্থের অনুবাদ। বাংলা একাডেমি ১৯৯৫ সালে মোতাহের চৌধুরীর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত রচনাবলী সৈয়দ আবুল মকসুদ এর সম্পাদনায় প্রকাশ করে। তাছাড়া বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ১৯৯০ সালে ” মোতাহের হোসেন চৌধুরীর নির্বাচিত প্রবন্ধ ” নামে গ্রন্থ প্রকাশ করে।
৬৯ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে বাংলা গদ্য সাহিত্যের অবিস্মরণীয় লেখক মোতাহের হোসেন চৌধুরীর স্মৃতির প্রতি গভীর অফুরান শ্রদ্ধা।
গাজী গিয়াস উদ্দিন : কবি ও প্রাবন্ধিক, লক্ষ্মীপুর




