আবু মকসুদ
একজন অমানবিক নারী রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি লেপন করে, আরেকজন মানবিক মানুষ সেই কালি ধুয়ে মুছে দেন। একজনের হাতে থাকে ঘৃণা, অন্যজনের হাতে থাকে পরিচ্ছন্নতার জল। একজন অপমান করতে চায়, অন্যজন সেই অপমানের চিহ্ন মুছে দিয়ে মানুষের মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে চান। এই দুই মানুষের মধ্যেই আজ বাংলাদেশের দুটি বিপরীত মুখ দাঁড়িয়ে আছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কার পক্ষে থাকবে? যারা দুর্গন্ধ ছড়ায়, তাদের পক্ষে, নাকি যারা সেই দুর্গন্ধ দূর করতে এগিয়ে আসে, তাদের পক্ষে?
রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি লেপন করে কেউ হয়তো ভেবেছে, কয়েক ফোঁটা কালি দিয়ে একটি মহৎ সৃষ্টিকে কলঙ্কিত করা যায়। অথচ সে জানে না, কালি ছবির গায়ে লাগে, মানুষের মননে নয়। রবীন্দ্রনাথকে অপমান করার চেষ্টা আসলে অপমানকারীর নিজের রুচি, শিক্ষা ও মনুষ্যত্বকেই উন্মোচিত করে। আর যিনি সেই কালি ধুয়ে দেন, তিনি শুধু একটি ছবি পরিষ্কার করেন না, তিনি ঘৃণার বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান ঘোষণা করেন। তাঁর হাতে ধরা জলটুকু হয়ে ওঠে প্রতিবাদের ভাষা, মানবিকতার প্রতীক।
আজ বাংলাদেশের সংকট এখানেই। ক্ষমতা দুর্গন্ধের পাশে দাঁড়িয়েছে, অথচ জনতা দাঁড়িয়েছে পরিচ্ছন্নতার পক্ষে। ক্ষমতা হয়তো মনে করে, তার হাতে প্রশাসন আছে, নির্দেশ দেওয়ার শক্তি আছে, মানুষের কণ্ঠ রোধ করার সামর্থ্য আছে। তাই সে দুর্গন্ধকে সুগন্ধ বলে চালিয়ে দিতে চাইবে, অপমানকে মত প্রকাশের স্বাধীনতা বলে প্রতিষ্ঠা করতে চাইবে, আর যারা সেই দুর্গন্ধ দূর করতে চায়, তাদেরই অপরাধী বানানোর চেষ্টা করবে। এ ক্ষমতার পুরোনো স্বভাব। নিজের অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া এবং প্রতিবাদী মানুষকে অপরাধী প্রতিপন্ন করা ক্ষমতার কাছে নতুন কিছু নয়।
কিন্তু ক্ষমতা একটি বিষয় ভুলে যায়। মানুষের সহ্য করারও সীমা আছে। সামযকি ভয় দেখিয়ে মানুষকে নীরব রাখা যায়, কিন্তু তার বিবেককে চিরকাল বন্দি করে রাখা যায় না। দুর্গন্ধের মধ্যে মানুষ কিছু সময় বসবাস করতে পারে, কিন্তু একসময় জানালা খুলতে চায়, দরজা খুলতে চায়, বাতাস চলাচলের পথ তৈরি করতে চায়। তখন কোনো নির্দেশ, কোনো হুমকি, কোনো ক্ষমতার দাপটই তাকে চিরকাল আটকে রাখতে পারে না।
বাংলাদেশ কার, সেই প্রশ্নের উত্তর কোনো ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী একা নির্ধারণ করতে পারে না। বাংলাদেশ তাদেরও, যারা রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসেন, তাদেরও, যারা তাঁর সাহিত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন; কিন্তু বাংলাদেশ কখনোই ঘৃণা ছড়ানো, অপমানকে মহৎ কাজ বলে প্রতিষ্ঠা করা কিংবা মানুষের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে হেয় করার একচেটিয়া সম্পত্তি হতে পারে না। মতের বিরোধ থাকতে পারে, সমালোচনা থাকতে পারে, তর্ক হতে পারে। কিন্তু মনুষ্যত্বকে বিসর্জন দিয়ে কোনো মতাদর্শের জয় হয় না।
ক্ষমতা হয়তো দুর্গন্ধকে দীর্ঘাযতি করতে পারে, কিন্তু দুর্গন্ধকে চিরস্থায়ী করতে পারে না। কারণ ক্ষমতার মেয়াদ থাকে, মানুষের বিবেকের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ। আজ যারা কালি মাখাচ্ছে, আর যারা সেই কালি ধুয়ে দিচ্ছে, ইতিহাস একদিন দুপক্ষকেই মনে রাখবে। তবে একইভাবে নয়। একজনকে মনে রাখবে অপমানের দৃষ্টান্ত হিসেবে, অন্যজনকে মনে রাখবে অপমানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস হিসেবে।
ইতিহাসের শেষ কথা ক্ষমতার কথা নয়, মানুষের কথা। ক্ষমতা দুর্গন্ধের পক্ষে জোর করতে পারে, কিন্তু জনতা একদিন জানালা খুলবেই। আর ইতিহাস যখন সেই দিনের কথা লিখবে, তখন কে কালি মাখিয়েছিল আর কে কালি ধুয়ে দিয়েছিল, সেই পরিচয় মুছে যাবে না।
আবু মকসুদ : প্রাবন্ধিক ও গবেষক, যুক্তরাজ্য প্রবাসী লেখক




