কহন কুদ্দুস
পৃথিবীতে নানান সময় নানা ধরনের সভ্যতা গড়ে উঠেছে ও আবার অনেক সভ্যতা বিলীনও হয়েও গেছে। প্রাচীন সভ্যতা মানবজাতির ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মিশর, মেসোপটেমিয়া, হিব্রু, রোমান, গ্রিস, চায়নিজ, পারস্য, লিডিয়া, হিট্রাইট, ফিনিসিয়া, ভারতীয় সিন্ধু ও মহোনঞ্জাদারে ও চায়নিজ সভ্যতা ছিল পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য প্রাচীন সভ্যতা। এসব সভ্যতায মানুষ তখন দলবদ্ধভাবে বসবাস শুরু করে, কৃষিকাজ, নগর নির্মাণ, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে উন্নত জীবন গড়ে তুলতে থাকে, একারণেই পৃথিবীতে সভ্যতার বিকাশ ঘটে। মিশরীয়, মেসোপটেমীয়, সিন্ধু ও মহোনঞ্জাদারে ও চায়নিজ সভ্যতা পৃথিবীর প্রাচীনতম উল্লেখযোগ্য সভ্যতাগুলোর মধ্যে অন্যতম।
নীল নদের তীরে গড়ে ওঠা মিশরীয় সভ্যতা পিরামিড, মমি ও চিত্রলিপির জন্য বিখ্যাত। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে গড়ে ওঠে মেসোপটেমীয় সভ্যতা। এখানেই কিউনিফর্ম লিপি, আইন ও নগররাষ্ট্রের বিকাশ ঘটে। ভারতীয় উপমহাদেশের সিন্ধু সভ্যতার হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো নগর পরিকল্পনা, পাকা রাস্তা ও উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার জন্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। চায়নিজ সভ্যতাও কৃষি, দর্শন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে।
প্রাচীন সভ্যতার মানুষ শুধু স্থাপত্য ও নগরজীবনেও উন্নতি করেনি; তারা গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা, সাহিত্য ও দর্শনেরও ভিত্তি স্থাপন করেছিল। তাদের আবিষ্কার ও চিন্তাধারা পরবর্তী মানবসভ্যতার অগ্রগতিতে গভীর ভাবে প্রভাব ফেলেছে সমাজে।
অতএব, প্রাচীন সভ্যতা আমাদের ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়। অতীতের সাফল্য ও ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে আরও সুন্দর করা সম্ভব। পৃথিবীতে প্রাচীন কাল থেকে আজ আধুনিক সময় পর্যন্ত সেসব সভ্যতা কালের গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে ও যেসব সভ্যতা আজও টিকে আছে। সেই সব সভ্যতা নিয়ে আলোচনা করা হল:
প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতা ও তার পরিচয়:-
প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার সূচনা হয়েছিল প্রায় ৬০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নীল নদ উপত্যকায় মানব বসতি স্থাপনের মাধ্যমে। প্রাগৈতিহাসিক কাল হতে লাখ লাখ বছর আগে আদি মানবের জন্ম হয়েছিল এই পৃথিবীতে। আর প্রাচীন মিসরে মানুষেরা প্রথম জায়গা করে নেয় প্রায় ২৫ থেকে ৪০ হাজার বছর আগে। মানুষ আদিতে ঘরবাড়ি বানাতে জানতনা। নিজের খাদ্য উৎপাদন করতেও পারতো না। বনে বনে ঘুরে গাছের ফল দিয়ে ক্ষুধা মেটাত। প্রথমে মানুষ ছিল একা, পরে দুই-পাঁচ-দশজন করে দলবদ্ধ হতে থাকে। এভাবে মানুষ এগোতে থাকে সভ্যতার দিকে। এক সময় মানুষ পাথর ঘষে ঘষে আগুন জ্বালাতে শেখে। তারপর শিখে যায় কৃষি কাজও। এবং মানুষ মাটি দিয়ে নানান রকমের পাত্র বানিয়ে জীবনের নিত্য প্রয়োজন মেটাতে থাকে। প্রথমে মানুষ কৃষি কাজ করে। কৃষি কাজ শেখার পর, কৃষি জমির পাশেই মানুষ বসতি গড়ে তোলে। মানুষের এ অবস্থাকেই সভ্যতা বলা হয়।
মধ্য আফ্রিকার পাহাড়ে জন্ম নিয়েছিল নীলনদ। এরপর এঁকেবেঁকে জলপ্রবাহ নেমে গেছে ভূমধ্যসাগরে। নীলনদের উৎসভূমি দক্ষিণ মিসরকে বলা হয় উচ্চ মিসর। আর ভূমধ্যসাগরে মিশে যাওয়া আগে উত্তরে যেখানটাতে সৃষ্টি হয়েছে উর্বর বদ্বীপ, তাকে বলা হয় নিম্ন মিসর। এখানে সবচেয়ে প্রাচীন কৃষিজীবী সমাজ গড়ে উঠেছিল নিম্ন মিসরে। মেরিমদ নামের অঞ্চলে পাথর যুগের এই কৃষিজীবী মানুষ বসতি স্থাপন করেছিল।
প্রাচীন মিসরের রাজাদের বলা হতো ফারাও দেশের জনগণ ফারাওদের খুব শ্রদ্ধা করত। মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল, ফারাও এখন যেমন তার রাজা; মৃত্যুর পর যে আরেকটি জীবন আছে, সে জীবনেও রাজা হবেন তিনি। মিসরীয়রা সূর্যকে সবচেয়ে বড় দেবতা মনে করতেন। ফারাওরা নিজেদের মনে করতেন সূর্যদেবতার বংশধর। ফারাও পদটি ছিল বংশানুক্রমিক। ফারাও মারা গেলে তাঁর ছেলে হতেন নতুন ফারাও। ফারাওদের সময় মিসর খুব ধনী দেশে পরিণত হয়েছিল। মিসরের বিখ্যাত ফারাও হলেন খুফু, তুতেনখামেন, রামেসেস প্রমুখ। কয়েকজন রানিও ফারাও হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে একজন হলেন নেফারতিতি।
মিসরীয় সভ্যতার কথা মনে পড়লেই, মনে পড়ে যায় পিরামিডের ছবি। মরুভূমির উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে ত্রিকোণাকৃতির বিশাল সৌধ। সমতল থেকে ধীরে ধীরে সরু হয়ে আকাশের দিকে উঠে গেছে পিরামিড। মৃত্যুর পর ফারাওদের দেহ যেন পচে না যায়। সেজন্য মিসরের বিজ্ঞানীরা মানব দেহকে মমি বানিয়ে ফেলে। মমিকে নিরাপদে রাখার জন্য মিসরীয়রা বিশাল সৌধ নির্মাণের চিন্তা করে। এভাবেই তৈরি করা হয় পিরামিড। এখানে বিশালাকৃতির ৭০টি পিরামিড আজও টিকে আছে। শুধু পিরামিড গড়ার কৃতিত্বই নয়। প্রাচীন কালে মিসরীয়রা চমৎকার সব মূর্তি তৈরি করতে পারতেন।
প্রাচীন হিব্রু সভ্যতা ও তার পরিচয়:
হিব্রু সভ্যতার সূচনা হয় প্রধানত খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দের মধ্যে প্রাগৈতিহাসিক কালে মেসোপোটেমিয় অঞ্চলে ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর যুগে আরেকটি জাতির উত্থান ঘটে। সভ্যতার ইতিহাসে এদের হিব্রু বলা হয়। পৃথিবীতে ইসরায়েলি বা ইহুদি নামেও এরা পরিচিত। সভ্যতার ইতিহাসে বিভিন্ন জাতি পৃথিবীতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। যেমন মিশরীয়রা পিরামিড নির্মাণে বা মমি তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন, ব্যাবিলনে হাম্মুরাবি লিখিত আইন জারি করেছিলেন, সিন্ধু সভ্যতায় তৈরি হয়েছিল পরিকল্পিত নগর। তেমনি হিব্রুরা সভ্যতায় বিশেষ ভূমিকা রেখেছে ধর্মীয় ক্ষেত্রে। হিব্রুধর্ম পরবর্তী সময়ে জন্ম নেওয়া খ্রিষ্টধর্মের ভিত্তি রচনা করেছিল। ধর্মগ্রন্থ বাইবেলের বেশির ভাগ জায়গা জুড়েই রয়েছে হিব্রুধর্মের সৃষ্টি ও বর্ণনার কাহিনি। হিব্রুদের মতোই ঈশ্বর সম্পর্কে ধারণা রয়েছে খ্রিষ্টধর্মেও। শুধু তাই নয়, হিব্রুদের রাজনৈতিক ধারণাও আধুনিক রাষ্ট্রগুলোকে প্রভাবিত করেছিল। প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর সংস্কৃতি হিব্রু সভ্যতাকেও প্রভাবিত করেছে। হিব্রু আইন ব্যাবিলনীয় আইনের মতোই। তারপরও বলা যায়,সভ্যতার ইতিহাসে হিব্রুরা একটি ভিন্ন ধারা তৈরি করতে পেরেছিল। আসলে হিব্রু কোনো জাতির নাম নয়। হিব্রু একটি সেমেটিক ভাষার নাম। এই ভাষায় কথা বলা মানুষরাই হিব্রু নামে পরিচিত।
প্রাচীন রোমান সভ্যতা ও তার পরিচয়:-
ঐতিহাসিক প্রথা ও জনশ্রুতি অনুযায়ী, প্রাচীন রোমান সভ্যতা শুরু হয়েছিল ৭৫৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।
পৃথিবীতে তখনো গ্রিস সভ্যতার গৌরব একেবারে ম্লান হয়ে যায়নি। এসময় ইউরোপের মাটিতে আরেকটি সভ্যতা গড়ে ওঠার প্রস্তুতি চলতে থাকে। এই নতুন সভ্যতার যাত্রা শুরু হয় টাইবার নদীর তীর থেকে। এই সভ্যতাটি রোমান সভ্যতা নামে পরিচিতি লাভ করে। গ্রিসের সভ্যতার স্বর্ণযুগ চলছিল, তখনই যাত্রা শুরু হয় রোমান সভ্যতার। পরবর্তীতে প্রায় ছয়শত বছর পৃথিবীতে এই সভ্যতা নিজের গৌরব নিয়ে টিকে থেকেছেন।
পৃথিবীতে সকল সভ্যতাই গড়ে ওঠার পেছনে সেই অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিবেশের ভূমিকা থাকে। রোমান সভ্যতার জন্ম নেওয়ার পেছনে একইভাবে রোমের ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশের ভূমিকায় প্রধান। ইতালির অঞ্চলটির দক্ষিণে ভূমধ্যসাগরের তীর থেকে শুরু করে বিস্তৃত ছিল উত্তরে আল্পস পর্বত প্রর্যন্ত। পূর্বদিকে ভূমধ্যসাগরের থেকে একটি বাহুর মতো বেরিয়েছে এড্রিয়াটিক সাগর। এই সাগর ইতালি ও পশ্চিম যুগোস্লাভিয়ার মধ্যে একটি সংযোগ তৈরি করেছে। এড্রিয়াটিক সাগরতীরে উত্তর-পূর্ব অংশে ছিল প্রাচীন সমুদ্রবন্দর এড্রিয়া। ইতালির পশ্চিমেও ছিল ভূমধ্যসাগরের জলভাগ।প্রাচীনকালে সাগরের এই অঞ্চলটির নাম ছিল ইটুস্কান সাগর। এব্যাপারে সকল ঐতিহাসিকই একমত পোষন করেন। এখানে হাজার হাজার বছর ধরে সভ্যতা বিকশিত হয়েছে।
প্রাচীর ভারত ও সভ্যতার পরিচয়:-
ভারতীয় উপমহাদেশের তথা ভারতের জ্ঞাত ইতিহাসের সূচনা হয় আনুমানিক ৩৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে সিন্ধু সভ্যতার উন্মেষের মাধ্যমে।
প্রাচীন মিসর ও মেসোপোটেমিয়ার মতো ভারতেও প্রাচীনকালে নগর সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। প্রত্নতত্ত্ববিদেরা মাটি খনন করে সিন্ধু নদের তীর প্রথম খুঁজে পেয়েছিলেন চমৎকার নগর সভ্যতা। ধীরে ধীরে আরও অনেক দূরেও নগরের বিস্তার দেখা যায়। সিন্ধু নদের তীরে প্রথম সভ্যতাটি আবিষ্কার করা হয়েছিল বলে প্রাচীন ভারতের এই সভ্যতা সিন্ধু সভ্যতা নামে পরিচিত পায়।
পৃথিবীতে প্রাকৃতিক অবস্থানের দিক থেকে ভারত বিচিত্র এক দেশ। সাগর, পর্বত, বন, সমভুমি, মরুভূমি সবকিছুই আছে ভারতে। ভারতের অবস্থান এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণে। ৫১৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে পারস্যের সম্রাট দারিয়ুস ভারতের পাঞ্জাব দখল করে নিয়েছিলেন। এই সূত্রে অনেক পার্সীয় ভারতে প্রবেশ করে। পার্সীয়রা সিন্ধু নদকে ঠিকমতো উচ্চারণ করতে না পেরে বলত ‘হিন্দু’ অথবা ‘ইন্দু’। তাই ভারতের মানুষদেরও বলত ‘হিন্দু’। প্রাচীনকালে গ্রিক ও পার্সীয়দের কাছ থেকে শুনে ‘ইন্দু’ নদকে উচ্চারণ করেছে ‘ইন্ডাস’। ইন্ডাস নদ বলত গিয়ে একসময় দেশটির নাম দিয়ে ফেলে ‘ইন্ডিয়া’।
পৃথিবীর প্রাচীন সভ্যতাগুলোর বেশির ভাগই নদীতীরে গড়ে উঠেছিল। সিন্ধু নদের তীরে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো এলাকায় এভাবেই গড়ে ওঠে নগর সভ্যতা। খুব সাজানো গোছানো নগর ছিল এখানে। নগরের পরিকল্পনা দেখে বোঝা যায়। কত বুদ্ধিমান ছিল সে যুগের মানুষ। আজ আধুনিক যুগেও ভারত পৃথিবীতে অনন্যতার দাবিদার।
মেসোপোটেমিয়া সভ্যতা ও তার নাম পরিচয়:-
মেসোপটেমিয়া সভ্যতা আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ থেকে ৪০০০ অব্দের দিকে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর উপত্যকায় শুরু হয়েছিল। প্রচীন নগর রাষ্ট্র মিসর নামের দেশটিতে সভ্যতা গড়ে উঠেছিল, তাই মেসোপোটেমিয়া সভ্যতা নামে পরিচিত হয়ে আছে। মেসোপোটেমিয়া নামের সভ্যতাটি কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট দেশে গড়ে ওঠেনি। মেসোপোটেমিয় নামে কোনো দেশও নেই। পাশাপাশি অবস্থিত কয়েকটি দেশজুড়ে বিকাশ ঘটেছিল এই সভ্যতা। তাহলে অমন নাম হলো কেন? প্রাচীনকালে গ্রিস দেশের ইতিহাসবিদেরা সবার আগে এই অঞ্চলের ইতিহাস লিখেছিলেন। আর লিখতে গিয়ে তারা অমন নামটি দিয়ে ফেলেছেন। এই ইতিহাস পড়তে গিয়ে সবার কাছে পরিচিত হয়ে গেছে মেসোপোটেমিয়া নামটি। কেন তারা অমনটি করলেন? করলেন, সভ্যতা গড়ে ওঠার অঞ্চলগুলোর অবস্থা দেখে। মিসরের মতো নদীতীরে গড় উঠেছিল এই সভ্যতাও। নদীর নানা সুবিধা পেয়েছিল বলে এ অঞ্চলের মানুষ সভ্যতা গড়তে পেরেছিল।
মেসোপোটেমিয় শব্দটি কীভাবে সৃষ্টি হয়েছে, দেখলেই আসল রহস্য বেরিয়ে পড়বে। ‘মসস’ আর ‘পটেমাস’ এই দুইটি গ্রিক শব্দ মিলে মেসোপোটেমিয়া। যার অর্থ হচ্ছে ‘দুই নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চল’। তাহলে বোঝা যাচ্ছে, একটি নয়; দুটি নদীর ভূমিকা ছিল মেসোপোটেমিয়া সভ্যতা গড়ে তুলতে। হ্যাঁ, এই দুই নদীর একটা হচ্ছ দজলা এবং অন্যটি ফোরাত। ইংরেজিতে বলে টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস। কালের প্রবাহে এই দুই নদীর পলি জমে এখানে প্রাচীন কালে একটি উর্বর ভূখন্ড গড়ে উঠেছিল। দেখতে অনেকটা বাকা চাঁদের মতো। ইংরেজিতে অমন চাঁদকে বলে ক্রিসেন্টে। এ কারণে অনেক ইতিহাসবিদ মেসোপোটেমিয়া সভ্যতা গড়ে তোলা ভূখন্ডকে বলেন ‘ফারটাইল ক্রিসেন্ট’ বাংলায় উর্বর বাঁকা চাঁদ। কালের পরম্পরায় আজও সভ্যতার বাঁকবদন টিকে আছে আপন মহিমায়।
প্রাচীন গ্রিসের সভ্যতা ও পরিচয়:-
প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার সূচনা হয়েছিল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দে এজিয়ান সাগরের সাইক্লেডিক ও মিনোয়ান সভ্যতার হাত ধরে।
প্রাচীন মাইসেনীয় সভ্যতার পতনের পর কিন্তু সময় গ্রিস ভূখণ্ডে নেমে আসে সাময়িক অন্ধকার। যেন থেমে গেছে সভ্যতার গতি। তবে এই অন্ধকারের ভেতর থেকেই নতুন এক সভ্যতা জেগে ওঠার প্রস্তুতি চলতে থাকে। ৬০০ খৃষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে গ্রিস রাজনৈতিকভাবে বেশ শক্তির হয়ে ওঠে। গ্রিসে মূল সভ্যতা হেলেনীয় সভ্যতা নামে পরিচিত। প্রাচীন গ্রিকরা মনে করত দেবতা ডিয়কেলিয়নের পুত্র হেলেনের বংশধর। তাই তারা হেলেনীয় বলত। একারণে তাদের গড়া সভ্যতা হেলেনীয় সভ্যতা নামেও পরিচিত হয়। এক সময় গ্রিসের মূল ভূখণ্ড ছাড়াও অনেক অঞ্চল গ্রিকরা দখল করে নেয়। তাই গ্রিকদের প্রভাবে থাকা অঞ্চলগুলোকে একত্রে বলা হতো হেলেনীয় বিশ্ব।
হেলেনীয় বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল ইজিয়ান অঞ্চলসমূহ, আয়োনীয় সাগরতীরের অবস্থিত। সেই দ্বীপমালা, এশিয়া মাইনরের বেশ কয়েকটি গ্রিক উপনিবেশ ও গ্রিক উপদ্বীপ ছিল। গ্রিসের উল্লেখ করার মতো নদী না থাকায় সভ্যতা গড়তে বড় ভূমিকা পালন করেছে সমুদ্র। তাই গ্রিসে কৃষির বদলে বাণিজ্যনির্ভর সভ্যতার জন্ম হয়েছিল। গ্রিসের মূল ভূমিতে ছিল খাড়া খাড়া বড় পাহাড়। ফলে এক অংশের সঙ্গে অন্য অংশের যোগাযোগ করা কঠিন ছিল। এ কারণে গ্রিসে একক কোন রাজ্য গড়ে উঠতে পারেনি। পাহাড়ে ঘেরা প্রতিটি শহরই এক একটি রাজ্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তাই গ্রিসের এই রাজ্যগুলোকে বলা হতো নগররাষ্ট্র। এই নগররাষ্ট্রগুলোর মধ্যে স্পার্টা আর এথেন্স ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য।
প্রাচীন চায়নিজ সভ্যতা ও পরিচয় :-
ঐতিহ্যবাহী ধারণা অনুযায়ী চীনা সভ্যতার ইতিহাস প্রায় ৫,০০০ বছরের পুরনো বা খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ২৭০০ অব্দ থেকে এর সূচনা ধরা হয় মিসর, মেসোপোটেমিয়া ও সিন্ধু-সভ্যতার পরই প্রাচীন পৃথিবীতে উজ্জ্বল সভ্যতা হিসেবে চীনের সভ্যতাকে মনে করা হয়। অবশ্য তার প্রায় পাঁচ লাখ বছর আগেই চীনে আদি মানুষের বসবাস ছিল বলে জানা যায়। এদিক থেকে চীন ছিল প্রাচীন মানবের অন্যতম বসতিস্থল। চীনে নগর-সভ্যতা গড়ে ওঠার পর দীর্ঘদিন এই সভ্যতা টিকে ছিল। এর পেছনে চীনের ভৌগোলিক অবস্থার অনেকটা প্রভাব ছিল। এখানে মালভূমি, মরুভূমি, পাহাড় আর সমুদ্র চীনকে ঘিরে রেখেছিল। এ কারণে বিদেশি আক্রমণকারীরা সহজে আক্রমণ করতে পারেনি এই সভ্যতায়।
চীনের মানুষও ছিল শান্তিপ্রিয়। তারা তাদের দেশের সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশ আক্রমণ করায় আগ্রহী ছিল না। চীনারা অন্য সব জাতির চেয়ে নিজেদের বড় বা উঁচু শ্রেণির মনে করতেন। মিসর ও মেসোপোটেমিয়ার মতো চীনেও নদী তীরে গড়ে উঠেছিল নগর সভ্যতা। হোয়াং হো আর ইয়াং জে কিয়াং নদীর তীরে উর্বর মাটিতে এই সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। তাই চীনের সভ্যতাও প্রধান ছিল কৃষিভিত্তিক। পাশাপাশি চমৎকার সব মাটির পাত্র থেকে শুরু করে ব্রোঞ্জের নজরকাড়া দ্রব্যসামগ্রী তৈরিতে দক্ষ ছিল প্রাচীন চীনারা। সাধারণ ঘরবাড়ি, প্রাসাদ আর মন্দির গড়ার অভিজ্ঞতা ছিল চীনাদের। আর স্থাপত্য নির্মাণে এই দক্ষতা থেকে একসময় চীনারা বিশ্ববাসীকে অবাক করে দিয়ে নির্মাণ করতে পেরেছিল মহাপ্রাচীর। তায় চীনারা আজও পৃথিবীতে এক মহাবিস্ময়।
প্রাচীন পারস্য সভ্যতা ও তার পরিচয়:
পারস্য সভ্যতা বা পারসিক সাম্রাজ্যের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ অব্দে, যখন মহান সাইরাস বা সাইরাস দ্য গ্রেট (ঈুৎঁং ঃযব এৎবধঃ) আচেমেনিড রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। আজকের ইরান দেশটিকেই প্রাচীনকালে পারসিয়া বা পারস্য বলা হতো। পারস্যে একটি ভিন্ন ধারার সভ্যতা গড়ে উঠতে থাকে ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে। মেসোপোটেমিয়ায় সঙ্গে যোগাযোগ থাকলেও এখানে গড়ে ওঠা সভ্যতায় মেসোপোটেমিয়া সভ্যতার প্রভাব খুব একটা পড়েনি। পারসীয়রা মেসোপোটেমিয়ায় প্রবেশ করেছিল ৫৩৯ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে। তারা ক্যালডীয় সভ্যতার ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। পারসীয়রা ক্যালডীদের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছিল। তারা নতুন নতুন সভ্যতা থেক যা শিখেছে, তার সঙ্গে নিজেদের চিন্তা যো করে নতুন একটি সংস্কৃতির বিকাশ ঘটিয়েছে।
পারসীয়দের ধর্মচিন্তা ছিল আলাদা ধরনের। অন্য সব সভ্যতাগুলোর সঙ্গে ঠিক মেলে না। পারস্য সভ্যতায় চমৎকার একটি চিত্রকলার জন্ম হয়েছিল। প্রতিবেশী নানা সভ্যতার চিত্রকলার ধারণা থেকে পারস্যের শিল্পীরা নতুন ধারার ছবি এঁকেছিলেন। বিজ্ঞান ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে তেমন একটি ভূমিকা রাখেনি পারসূয়রা। পারস্য রাজ্য ক্রমে সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। পারসীরা গ্রিস থেকে ভারত পর্যন্ত নান অঞ্চলে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে সভ্যতার ইতিহাসে পারসীয়দের সবচেয়ে বড় অবদান হলো ধর্মীয় ক্ষেত্রে নতুন ধারণা প্রতিষ্ঠা এবং একটি দক্ষ প্রশাসন গড়ে তুলেছিলেন।
প্রাচীন লিডিয়া সভ্যতা ও তার পরিচয়:-
প্রাচীন লিডিয়া সভ্যতা বা লিডিয়া রাজ্যের শুরু আনুমানিক ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকদের দ্বারা ধারণা করা হয়। তবে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী রাজ্য হিসেবে এর প্রকৃত রাজনৈতিক উত্থান ও স্বর্ণযুগ শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব ৭ম শতাব্দীতে (আনুমানিক ৬৮০-৬৮৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে) রাজা জাইজিস -এর মাধ্যমে মারমনাদ রাজবংশ প্রতিষ্ঠার পর থেকে।
হিট্রাইট সাম্রাজ্যের পতনের পর এশিয়া মাইনরে অনেক ছোট ছোট রাজ্যের উত্থান ঘটে। এর মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল লিডিয়া। বর্তমান তুরস্কের আনাতোলিয়া অঞ্চলে ছিল এই লিডিয়া রাজ্য। লিডিয়রা ছিল ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর মানুষ। লিডিয়া বাসীর এক অংশ ছিল এশিয়া মাইনরের অধিবাসী, আর অন্য অংশ ছিল পূর্ব ইউরোপ থেকে আসা মানুষ। লিডিয়া ক্রমে এশিয়া মাইনরের সমুদ্রতীরের গ্রিকদের অধিকারে থাকা নগরগুলোর ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। হালিশ নদীর পশ্চিমের মালভূমি দখল করে নেয় লিডিয়ানরা। কিন্তু দীর্ঘদিন নিজেদের শক্তি ধরে রাখতে পারেনি লিডিয়নরা। তাদের সবচেয়ে খ্যাতিমান রাজা ছিলেন ক্রসাস। তিনি হালিস নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত মেডেস রাজ্য আক্রমণ করেন। এর পরই পারস্য সঙ্গে যুদ্ধ বেধে যায় লিডিয়ার। একপর্যায়ে ক্রাসস সেনা সংগ্রহের জন্য রাজধানী সার্দিসে ফিরে আসেন। পারস্যের সম্রাট কাইরাস এই সুযোগ লুফে নেন। পরবর্তীতে তিনি অতর্কিত আক্রমণ করে পরো সার্দিস শহরটি জ্বালিয়ে দেয়। লিডিয়রা এই ক্ষতি আর কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তারপর এক সময় লিডিয়া পারস্যের চলে যায়।
প্রাচীন হিট্রাইট সাম্রাজ্যের সভ্যতা ও তার পরিচয়:-
হিট্টাইট সভ্যতা আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৭৫০ থেকে ১৬৫০ অব্দের দিকে আনাতোলিয়ায় (বর্তমান তুরস্ক) তার প্রাথমিক রূপ লাভ করে এবং এর মূল সাম্রাজ্য যাত্রা শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব ১৬৫০ সালের দিকে।
হিট্রাইট জাতির কথা মানুষ জেনেছে অনেক পরে। ২০শতকের দিয়ে। অবশ্য বাইবেলে এই জাতির কথা লেখা ছিল। প্রত্নতত্ত্ববিদগণ নতুন সভ্যতা খুঁজেতে গিয়ে ১৯০৬ সালে তুরস্কের বোঘাজকুই নামের একটি জায়গায় খনন করছিলেন। ধীরে ধীরে মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসে একটি প্রাচীন শহরের ধ্বংসাবশেষ। শহরের নিদর্শনগুলোর মধ্যে পাওয়া গেছে উঁচু দেয়াল, মন্দির, প্রসাদ আর কিউনিফর্ম লিপিতে লেখা প্রায় ১০ হাজার মাটির চাকতি। এই নগরের অধিবাসীদের বলা হতো হিট্রাইট। হিট্রাইটরা প্রথমে লিখতে জানত না। পরে মেসোপোটেমিয় সভ্যতার প্রভাবে কিউনিফর্ম লেখা শিখে ফেলে। ধারণা করা হয়, হিট্রাইটদের আদি বাস ছিল ইউরোপে, ককেশীয় পাহাড়ি এলাকায়। ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এরা এশিয়া মাইনরে এসে বসবাস শুরু করে।
হিট্রাইট রাজ্য শীতকালে তীব্র ঠান্ডা পড়ত,আর তেমনি গরম পড়ত গ্রীষ্মকালে। তখন পুরো দেশটি ঘেরা ছিল পাহাড়ে। অবশ্য কাছাকাছি সমুদ্র থাকায় তারা বিভিন্ন দেশের সাথে যোগাযোগ করতে পারত। দেশের ভেতরে বয়ে চলা প্রধান নদীর নাম হালিস। নদীটির গতিময় স্রোত গিয়ে মিসেছে কৃষ্ণসাগরে। এই নদী তীরের উর্বর ভূমিতে হিট্রাইটরা তাদের প্রধান শহর গড়ে তুলেছিলেন।
প্রচীন ফিনিশিয়া সভ্যতা ও তার পরিচয়:-
ফিনিসীয় সভ্যতার (চযড়বহরপরধহ পরারষরুধঃরড়হ) শুরু আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ থেকে ৩০০০ অব্দে ভূমধ্যসাগরের পূর্ব উপকূলে (বর্তমান লেবানন, সিরিয়া ও উত্তর ইসরায়েল অঞ্চল)। তবে একটি প্রধান সামুদ্রিক ও বাণিজ্যিক শক্তি হিসেবে এই সভ্যতার চরম বিকাশ বা স্বর্ণযুগ শুরু হয় আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দ থেকে।
মেসোপোটেমিয়ার পশ্চিম তীরে ৩০০০ খ্রিস্টপূবার্ব্দে ফিনিশিয় নামে এক জাতি তাদের বসতি গড়ে তুলেছিল। ধীরে ধীরে এরা আধিপত্য বিস্তার করে লেবানন পর্বত ও ভূমধ্যসাগরের মাঝামাঝি ভূ-ভাগে। ফিনিশিয়দের দেশটি কৃষির উপযোগী ছিল। যার ফলে জীবিকার জন্য তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের দিকে ঝুঁকতে হয়। এ কারণে ফিনিশিয়রা সাগরতীরে তাদের ঘরবাড়ি বানিয়েছিল। তাদের বসতির একদিকে ছিল সমুদ্র, অন্যদিকে ছিল পাহাড় দিয়ে ঘেরা। তাই বাইরের কোনো শত্রুর আক্রমণের সুযোগ তেমন ছিল না। ফিনিশিয়দের প্রতি শহর ছিল এক একটি সমুদ্রবন্দর। এগুলোর মধ্যে বিখ্যাত ছিল টায়ার ও সিডন। লেবাননে ছিল অনেক সিডান গাছের বন। এসব গাছের কাঠ দিয়ে চমৎকার সব জাহাজ বানানো হতো। টায়ার ও সিডন থেকে ফিনিশিয় নাবিকেরা তাদের জাহাজ নিয়ে ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগর পাড়ি দিতেন।
ফিনিশিয়রা যোদ্ধা জাতি নয়, তাই সাম্রাজ্য গড়ায় তাদের মনোযোগ ছিল না। বণিক জাতি হিসেবে শান্তিপূর্ণ জীবন যাপনই তাদের একমাত্র ভাবনা ছিল। ৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের পর বাইরের শক্তির আক্রমণের মুখোমুখি হয় ফিনিশিয়রা। তাদের প্রথম আঘাত করে ক্যালডিয়রা। পারে পারসীয়দের আক্রমণের মুখোমুখি হয়। ৩৩২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আবারো টায়ার আক্রমণ করেন গ্রিক বীর আলেকজান্ডার। সাত মাস অবরোধের পর তিনি টায়ার ধ্বংস করে দেয়। পৃথিবীতে সভ্যতার এভাবেই উত্থান পতন চলে আসছে।
কহন কুদ্দুস : কবি ও প্রাবন্ধিক, চুয়াডাঙ্গা




