স্বপন দত্ত
দিগন্ত ছাড়িয়ে যায় – কবি যায়। কবি চলে যায়। চুপি চুপি প্রসারিত অন্তমূখী ডানার বিস্তার। সব সম্পর্কের সুতো, বুননের টানাপোড়ন ছিঁড়ে নিয়ে যায়।
নিঃসঙ্গতার নাম এক অমিত চৌধুরী। সৈকতে বালুচরে কক্সবাজারে, কেউ কেউ তাকে ঠিকই চিনেছিলো কবিতার সার্ফার – ঢেউয়ে ঢেউয়ে মানবিক সম্পর্কের নুন খুঁজতে পেয়েছিলো দেখা, ঝিনুকের বুকের ভেতরে চিক চিক জ্বালা – রত্নময় ভ্রুণ, কবিতার জড়িবুটির ঋজু পা মূল্যায়নে সুখী, নোনাজলে ডুব দিতেও খুব দেখেছিলো – পায়ে পায়ে পা ভিজিয়ে একাকী ভ্রমণে কবিতার ক্ষুধা পরশপাথর, খুঁজেছিলো সত্তাময় জাতিসত্তা ডিম।
পায়চারী, হেঁটে হেঁটে কতো কতো দূরের আকাশ, একদিন পার হয়েছিলো। কতো কতো হৃদয়ের গাঙচিল ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখা। পরাণের মধু নিয়ে জোয়ারেরও মূল্যায়ন – কতোটুকু লবণের গভীর ভেতর থাকে কবিতার বুননের স্বাদ ও বিস্বাদ, উড়ে যাওয়া পাখিদের প্রত্যেকের ঘ্রাণ, মানুষের পরিচয় ছুঁতে ছুঁতে বিশ্বাসের দূরে সরে যাওয়া। খাঁ খাঁ চরাচর, প্রাপ্তি আর বহু অপ্রাপ্তির।
যায় বুঝি, মুছে যায় বুঝি – মানবের উড়ু উড়ু মন, সংস্কৃতি সংস্কৃতি খেলা, উল্টো পথে চলতে চলতে মানুষের অকস্মাৎ নগ্ন হয়ে যাওয়া। পথে ও প্রান্তরে হেঁটে অবশেষে হা হা করে – হা হা করে পান্থকবি আত্মভোলা স্মৃতি-বিস্মৃতির জাদুঘরে ডুবে গিয়ে ডুব সাঁতারে মানুষের ঠিকানাকে খুঁজে, হেঁটে হেঁটে পথে-পথান্তরে!
শূন্যতার দোলাচলে দুলতে দুলতে নিরন্তর বিরক্ত ঈষৎ-ক্ষিপ্ত চলে গেলো কবি। কেউ তাকে মনে রেখে এতোকাল, কেউ তাঁকে মনের কুমকুম মেখে ভেবেছিলো নাকি – আছো কবি, বেঁচে আছো, আজও তুমি বেঁচে আছো নাকি! !
এ সময়ে খুব দূর-নির্জনতার ঘেরাটোপ ভেঙে শব্দের বাদাম তুলে বিষাদিত ছড়ার-ধুনুরি এক – মাহবুবুল হাসান, মেদুর ভাষার বর্ণে স্মৃতিময়তায় সূত্র হাহাকারে ছড়াতে ছড়াতে বললেন :
“আহা রে অমিত দা, কতো যে বর্ণের স্মৃতি থির হয়ে আছে – আপনার নিরন্তর ঠুক ঠুক পথচলা নিয়ে। হারিয়ে ফেললাম আহা অমিত-সুজন, হারিয়ে ফেললাম প্রিয়, মনোরম আহা কবিজন!”
কবি যায়, অমিত-বর্তিকা নিয়ে স্মৃতিময় যাওয়া। ‘মূল্যায়ন’ লিটলম্যাগে পথহাঁটা, ভেতরে টুকরো টুকরো আলোক লণ্ঠন – নক্ষত্রের কণা। বহুকাল কাব্যময়তা, রসেবশে পান্থজন্ম। পায়চারী, পায়ে পায়ে দুধসাগরের তীরে প্রেসপাড়া, চলন্ত ট্রেডেল মেশিন, পাইকা সিসার টাইপ, কেরোসিন, প্রুফ কাটা, ছাপার কালির গন্ধ – সৌজন্য কপির ঘ্রাণতাজা গরম গরম – লেখকের হাতে দিতে ছোটা।
সত্য ছিলো, সাহিত্যের রূপময়তার পিছে হরিণের দৌড়, খুঁজে ফেরা – সংস্কৃতি মধুপানে বার বার অজগর ঘিরে ধরে কেনো?
কবিতায় মাধুকরী, রূপমুগ্ধ বাউলের মতো পথ হাঁটা, নিরন্তর পরিক্রমা পায়ে পায়ে জীবনের মধু খুঁজে একসাথে জীবনের অন্তরঙ্গ চাষাবাদ, একই সাথে দৌড়। সাগর মন্থনপ্রায় সম্পাদনা – অমৃতের নেশা। ওই সেই কলমের ঝুঁটিটাকে হাতে নিয়ে ক্ষান্তিহীন, চিরকাল দৌড়ে ছিলো – কবিতার অমিত চৌধুরী।
স্বপন দত্ত : কবি ও সাংবাদিক




