চৌধুরী রওশন ইসলাম
“নাহ্ ! এভাবে সবকিছু এমনি এমনি দেওয়া ঠিক হবে না। সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে আগে নিশ্চিৎ হতে হবে। তারপর যার যা প্রাপ্য, তাকে তাই দেওয়া হবে।” কথাগুলো বললেন স্বয়ং দেবরাজ জিউস।
দেব-দেবীদের সবারই আলাদা আলাদা তদবির ছিল। তারা মনে করেছিলেন, নিজেরা নিজেরা বসে একটা কোনো তালিকা করে দেবরাজ জিউসের সম্মতি নিয়ে নেবেন। দেবরাজ জিউস সারাদিনই কাজ আর কাম নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করেন। এইসব তালিকা করার মতো এত সময় তিনি আসলেই পান না। যখন একাধিক ব্যক্তিকে বর দেওয়ার প্রয়োজন বলে দেবরাজ মনস্থির করেন, তখন তিনি তার খেয়াল-খুশি অনুযায়ী কোনো একজন জ্যেষ্ঠ দেবতাকে দায়িত্ব দেন। সেই দায়িত্বপ্রাপ্ত দেবতা একটা কোনো তালিকা তৈরি করে দেবরাজের কাছে নিয়ে গেলে, দেবরাজ শুধু একবার সেই দেবতার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করেন, “সব কিছু ঠিক মতো দেখে-শুনে করেছ তো ?”
উত্তরে সেই দেবতা একগাল হেসে বলেন, “জ্বি, দেবরাজ। আপনার আজ্ঞামতেই এই তালিকা তৈরি হয়েছে। আপনি দয়া করে যদি নিজে একবার দেখে দিতেন, বড় কৃতার্থ হতাম।” এ কথা বলেই সেই দেবতা মনে মনে তীব্রভাবে চাইতে থাকে, যেন দেবরাজ সেই তালিকায় একবারও নজর না দেন।
দেবরাজ জিউসও এসব কাজকে খানিকটা ঝামেলাই মনে করেন। তিনি তখন ঝামেলা মনে করার ব্যাপারটা বেমালুম চেপে গিয়ে, সেই দেবতাকে সন্তুষ্ট করার অভিপ্রায়ে বলেন, “আরে না, তুমি যখন তৈরি করেছ, আমার আর দেখার কী আছে ?”
ব্যস, দুইয়ে দুইয়ে চার মিলে যায়। দেবরাজ জিউস হন ঝামেলামুক্ত; আর দায়িত্বপ্রাপ্ত দেবতা নিজের ইচ্ছে মতো যাকে-তাকে তালিকায় ঢুকিয়ে বরপ্রাপ্তি নিশ্চিত করেন। বিনিময়ে দেবরাজ জিউস পান সেই দায়িত্বপ্রাপ্ত দেবতার অকুণ্ঠ আনুগত্য; আর সেই দেবতা পান বরপ্রাপ্তগণের অনন্ত বন্দনা।
কিন্তু এইবার বহুকাল ধরে বঞ্চিত বর-প্রার্থীরা রীতিমতো আন্দোলন- বিক্ষোভ করে বর দাবী করতে শুরু করল। কারও কোনো যোগ্যতা থাকুক আর নাই থাকুক, তাদের সকলেরই বর চায়। জিউস খুবই বিরক্ত হলেন। কাজ কিংবা কামের সময় এইসব আন্দোলন-বিক্ষোভ কাজ-কামের আনন্দটাই মাটি করে ফেলে। ফলে দেবরাজ জিউস সিদ্ধান্ত নিলেন, কেবল দেবতা-বন্দনা শুনেই এখন আর কাউকে বর দেওয়া হবে না। কার কী যোগ্যতা আছে, তাও একটু যাচাই করে দেখতে হবে। তারপরই তিনি বার্তাবাহক হার্মিসকে ডেকে বললেন, “নাহ্ ! এভাবে সবকিছু এমনি এমনি দেওয়া ঠিক হবে না। সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে আগে নিশ্চিৎ হতে হবে। তারপর যার যা প্রাপ্য, তাকে তাই দেওয়া হবে।”
হার্মিস দেবরাজ জিউসের এই বার্তা সমস্ত দেবলোকজুড়ে প্রচার করে দিলেন। তদবির-বাজ দেবতাদের মুখ শুকিয়ে গেল। যদি এইসব যোগ্যতা যাচাই-বাছাই করেই বর-প্রদান অনুষ্ঠিত হয়, তবে বর-প্রার্থীরা আর দেবতাদের গোনায় ধরবে কেন ? কনিষ্ঠ দেবতারা বর-প্রার্থীদের রাশি রাশি বন্দনার বিনিময়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ দেবতার দরবারে তদবির নিয়ে হাজির হতেন। সেইসব ছোট ছোট দেবতাদের বন্দনায় দায়িত্বপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ দেবতার কক্ষ পূর্ণ হয়ে উঠত। কিন্তু এখন যে প্রক্রিয়া দেবরাজ শুরু করতে যাচ্ছেন, এতে তো সবই ভেস্তে যাবে। দেবলোকে এ এক বড় রকমের ধাক্কাই বটে!
কিন্তু দেবরাজের ইচ্ছে বলে কথা ! মুখ কালো হলেও কেউ আর এ নিয়ে কোনো ঝামেলা পাঁকানোর সাহস দেখাল না। দেবতারা নিজ নিজ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতেই ব্যস্ত; পাছে দেবরাজের সাথে তর্কে জড়িয়ে নিজের সামান্য ক্ষমতাটুকুও হারাতে হয়। তার চেয়ে দেবরাজ যা বলছেন, তাই হোক। বেশি পাওয়ার লোভে পড়ে, অল্পটুকুও হারানোর কোনো মানেই হয় না।
দেবরাজের ইচ্ছায় শেষ পর্যন্ত দেব-দেবীরা সকল আয়োজন সম্পন্ন করলেন। নির্ধারিত দিনে যথাসময়ে সাক্ষাৎকার-পর্ব শুরু হলো। সেখানে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং দেবরাজ জিউস, রূপ-সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতি, ধন-সম্পদের দেবতা প্লুটাস, জ্ঞান ও যৌক্তিক-যুদ্ধের দেবী অ্যাথিনা, সুর-সঙ্গীত ও সূর্যদেবতা অ্যাপোলো, অন্ধকারের দেবী নিক্স, পাতাল দেবতা হেডিস, সমুদ্র দেবতা পোসাইডনসহ আরও অনেকে। এমনকি স্বাস্থ্য-দেবতা এসক্লেপিয়াস কিংবা অযৌক্তিক যুদ্ধ-ঝগড়ার দেবতা অ্যারেসও বাদ নেই। সে এক বিরাট ভাইভা বোর্ড-ই বটে !
যে কক্ষে বর-প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে, সেই কক্ষের দরোজার সামনে একজন খর্বকায় দেবতা দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু তিনি যতটা খর্বকায়, তার হাব-ভাব ততটাই প্রচণ্ড। বর-প্রার্থীরা সেই খর্বাকৃতি দেবতার ভাব-ভঙ্গিতেই তটস্থ হয়ে থাকছে। কোনো কোনো বর-প্রার্থী সাক্ষাৎকার কক্ষের বাইরে দাঁড়িয়ে সেই খর্বাকৃতি দেবতার ক্ষমতা দেখেই ভাবছে, যে-দেবতার নাম দেব-দেবীদের তালিকায়ও খুঁজে পাওয়া দুস্কর, যার নাম তালিকার এত নিচে পড়ে থাকে যে সহজে চোখেই পড়ে না, সেই দেবতারই যদি এত ক্ষমতা হয়, তাহলে সাক্ষাৎকার বোর্ডের দেবতারা না জানি কী মহাশক্তিধর হবেন। এসব ভেবে ভেবেই অনেক প্রার্থী ভয়ে চুপসে আছে।
বর-প্রার্থীরা একজন একজন করে বোর্ডে ঢুকছে আর বের হচ্ছে। কেউ বের হওয়ার সাথেই অপেক্ষমান বর-প্রার্থীরা তাকে জেঁকে ধরছে, দেব-দেবীরা কী কী জিজ্ঞাসা করছেন তা জানার তীব্র বাসনা নিয়ে। এই বোর্ডেই এক বর-প্রার্থী বর-লাভের আশায় চুপচাপ বসে আছে। শান্ত-সুবোধ চেহারা। কারও সাথে কোনো কথা বলছে না। চুপচাপ বসে বসে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছে আর অপেক্ষা করছে, কখন তার ডাক পড়ে।
কলিং বেল বেজে উঠল। খর্বকায় দেবতা নেক্স্ট প্রার্থীকে ভেতরে পাঠালেন। এই নেক্স্ট প্রার্থীই সেই শান্ত-সুবোধ চেহারার প্রার্থী। তার মুখ দেখলেই কেমন একটা মায়া জন্মে যায়। এই প্রার্থী তার ছাত্র-জীবনে সাক্ষাৎকার-পর্ব নিয়ে যতটা না নিজে লেখাপড়া করেছে, তার চেয়ে বেশি সে বিভিন্ন কোচিংয়ে গিয়ে অন্য সবাইকে পড়িয়েছে। বলা যায়, সাক্ষাৎকার বিষয়ে সে সেই অল্প বয়সেই পেঁকে ফেটে পড়ার উপক্রম হয়ে গিয়েছিল। ফলে বোর্ডে ঢুকে অন্যদের মনে যে ভয় আর আতঙ্ক চেপে ধরেছিল, তা এই প্রার্থীর মধ্যে আদৌ ছিল না। বোর্ডের দেবতারা ব্যাপারটা শুরুতেই খেয়াল করলেন। বর-প্রার্থীর এমন স্মার্টনেস দেখে কোনো কোনো দেবতা শুরুতেই কনভিন্সড হয়ে গেলেন।
সাক্ষাৎকার বোর্ডের রীতি অনুযায়ী তাকেও কিছু প্রশ্ন করা হলো। প্রথম প্রশ্ন করলেন অ্যারেস, “আচ্ছা, বলো তো, তোমার জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী ?”
“স্যার, নিরঙ্কুশ সুখি হওয়া।”
এমন অভাবনীয় উত্তরে কয়েকজন দেব-দেবী নড়ে-চড়ে বসলেন। ছেলেটাকে আসলেই যোগ্য মনে হচ্ছে।
পোসাইডন জানতে চাইলেন, “আচ্ছা, ‘নিরঙ্কুশ সুখি’ বলতে ঠিক কী বোঝাচ্ছ ?”
“এক কথায় বলতে গেলে, আমার সুখে কারও ভাগ দিতে চাই না। মানে, আমি একাই সুখি হতে চাই।”
“কিন্তু কেন ?”
“আমার অভিজ্ঞতায়, ভাগাভাগি করতে গেলে, তা সে যে জিনিসই হোক, কোনো-না-কোনো একটা ঝামেলা লেগেই যায়।”
“ভেরি গুড, ভেরি গুড।”
দেবতারা প্রায় সকলেই কনভিন্সড বলে মনে হলো। এবার অ্যাথিনা জিজ্ঞাসা করলেন, “সুখি হওয়ার তো অনেকগুলো মাধ্যম আছে। এরকম কয়েকটা মাধ্যমের নাম বলতে পারবে ?”
“জ্বি, অবশ্যই ম্যাম। যেমন ধরুন, গ্রেনেড-মিসাইল, স্বর্ণ-রৌপ্য, দেহ-সৌন্দর্য, ইত্যাদি।”
অ্যাথিনা মুখ ফসকে বলে উঠলেন, “ও মাই গড !”
জিউস আড়-চোখে অ্যাথিনার দিকে তাকালেন। অ্যাথিনার কাছে নিচু গলায় জানতে চাইলেন, “তুমি কি আমাকে কিছু বললে ?”
অ্যাথিনা বিব্রতভাবে জানালেন, “না, না। এটা আসলে আমার মুদ্রা-দোষ।”
বেশ কিছুদিন আগে একটা আপেলের মালিকানা নিয়ে অ্যাথিনা এবং হেরার সাথে আফ্রোদিতির একটু ঝামেলা বেধেছিল। সে ঝামেলায় ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত আফ্রোদিতিই সেই আপেলের দখল নিয়েছিল। আপেলের মালিকানা লাভের পর থেকেই আফ্রোদিতির মধ্যে এক ধরনের সুপিরিয়োরিটি-কমপ্লেক্স কাজ করে। অ্যাথিনা যেহেতু সাক্ষাৎকার-বোর্ডে সেই বর-প্রার্থীকে প্রশ্ন করেছে, সেহেতু কোনো প্রশ্ন করার প্রয়োজন না থাকলেও আফ্রোদিতি তাকে কিছু-না-কিছু জিজ্ঞাসা করে নিজের গুরুত্ব বোঝাতে চাইবেই। দেবী আফ্রোদিতি তাকে প্রশ্ন করলেন, “তোমার কি মনে হয় না, এসবের মধ্যে দেহ-সৌন্দর্যটাই আসলে সবচেয়ে ভালো মাধ্যম?”
বর-প্রার্থী পড়ালেখা করা ভালো ছেলে। সে দেবীত্রয়ীর আপেল নিয়ে দেব-আদালতের চলমান সেই মামলার ব্যাপারে দৈনিক পত্রিকায় যেসব খবর আসত, তা নিয়মিতই পড়ত। ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে প্যারিসের প্রাপ্ত দেহ-সৌন্দর্য নিয়ে শেষ পর্যন্ত ট্রয়ের কী হাল হয়েছিল, তাও এই প্রার্থীর জানা। সে তাই চট করেই উত্তরে জানাল, “জ্বী না, ম্যাম। প্যারিস একবার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে মহাবিপদে পড়েছিল।”
আফ্রোদিতির মেজাজ তাৎক্ষণিক বিগড়ে গিয়েছিল। নেহাৎ ঘাড়-ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার রেওয়াজ নেই, তদুপরি বোর্ডের চেয়ারম্যানও তিনি নন। তাই বাধ্য হয়েই দাঁত চেপে আফ্রোদিতি উত্তরটা হজম করার চেষ্টা করে গেলেন। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবেই তিনি এই প্রার্থীকে জিরো মার্ক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। প্রার্থীকে দ্বিতীয় প্রশ্ন করার মেজাজটুকুও হারিয়ে ফেললেন।
এদিকে উত্তর শুনে অ্যাথিনা মুখ-টিপে মুচকি মুচকি হাসতে থাকলেন।
বর-প্রার্থীর এমন উত্তরে আপেল-মামলার মূল মাস্টার-মাইন্ড অ্যারেসও তখন প্রার্থীর ব্যাপারে কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। প্রার্থীকে বললেন, “বাহ্, তুমি দেখছি ইতিহাস নিয়েও বেশ পড়াশোনা করেছ ! তো এখন বল দেখি, তুমি কোন্ মাধ্যমটাকে শ্রেষ্ঠ মনে কর ?”
প্রার্থী উত্তর করল, “স্যার, এটা নিঃসন্দেহে স্বর্ণ-রৌপ্য।”
প্লুটাস এবার নিরবতা ভাঙলেন, “বুদ্ধিমান। সত্যিই বুদ্ধিমান।”
এত বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর ভাইভা নেওয়া কি চাট্টিখানি কথা! জিউসের আর ধৈর্যে কুলাচ্ছিল না। তিনি প্রার্থীকে ফলাফলের জন্য বাইরে অপেক্ষা করতে বললেন।
ভাইভা-বোর্ডের ধৈর্যের বরাদ্দ অনেক আগেই ফুরিয়ে গেছে। তবু নিয়ম রক্ষার্থে কষ্টে-সৃষ্টে ভাইভা-পর্ব শেষ হলো। সবার কাছ থেকে প্রাপ্ত নম্বর যোগ করে দেখা গেল, আফ্রোদিতি জিরো দেওয়া সত্ত্বেও, সেই শান্ত-সুবোধ ছেলেটি স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে দেব-দেবীদেরকেও চমকে দিয়েছে। আর তখনই দেবতারাও বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় বসলেন।
জিউস তো বলেই ফেললেন, “এমন মেধাবী একটি ছেলে স্বর্ণ-রৌপ্যকেই কেন শ্রেষ্ঠ মাধ্যম বিবেচনা করল ?”
অ্যাপোলো এবং অ্যাথিনাও একই প্রশ্ন তুলল, “বই, সঙ্গীত, ভ্রমণ, এগুলোর কোনোটাই তার মাথাতে এলো না !”
প্রযুক্তির দেবতা হেফাস্টাস বললেন, “বই, সঙ্গীত এসব বাদই দিলাম, এমনকি হাতে গ্রেনেড-মিসাইল থাকলেও সেটা দিয়ে কাউকে ভয় দেখিয়ে স্বর্ণ-রৌপ্য অর্জন করা যায়। কিন্তু স্বর্ণ-রৌপ্য থাকলেই সব সময় গ্রেনেড-মিসাইল পাবে, তা তো আর নয়। এত ইতিহাস-জানা বুদ্ধিমান স্মার্ট একটা প্রার্থী স্বর্ণ-রৌপ্যকেই প্রাধান্য দিল ! তাও ভালো, দেহ-সৌন্দর্যকে ডিনাই করেছে।”
হেফাস্টাসের মন্তব্য শুনে আফ্রোদিতি সেই বোর্ডের মধ্যেই হেফাস্টাসকে বললেন, “তুমি একটু বেশিই কথা বল। আজকে ঘরে চল; মজা টের পাবা।”
দেবরাজ জিউস আফ্রোদিতিকে স্মরণ করিয়ে দিলেন, “দেখ, আফ্রু, এটা একটা ভাইভা-বোর্ড। তোমাদের স্বামী-স্ত্রীর আচরণ এখানে একদমই চলবে না। এখানে তোমরা প্রত্যেকেই আলাদা-আলাদা বোর্ড-মেম্বার। মাইন্ড ইট।”
তারপর বোর্ডের সবার উদ্দেশ্যে দেবরাজ বললেন, “যাই হোক। যেহেতু সে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়েছে, এবং যেহেতু স্বর্ণ-রৌপ্যকেই সুখি হওয়ার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম মনে করে, সেহেতু প্লুটাস, তাকে প্রচুর স্বর্ণ-রৌপ্য দাও। তার আগে তুমি তার ডিএনএ চেক করে দেখ, অন্য কোনো গ্যাঞ্জাম আছে কি না।”
প্লুটাস বললেন, “যথা আজ্ঞা, দেবরাজ।”
এদিকে অ্যারেস জিউসের এমন ব্যাখ্যায় বেশ অসন্তুষ্ট হলেন। অনেকটা ঝগড়ার সুরেই বললেন, “আপনাকে শ্রদ্ধা করি। তাই বলে আপনি এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড পরিচালনায় স্বর্ণ-রৌপ্যের গুরুত্বকে ছোট করে দেখতে পারেন না।”
এরপর হেফাস্টাসের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আবার আপনি ইঙ্গিতে গ্রেনেড-মিসাইলকেও খাটো করার চেষ্টা করেছেন। আমি খেয়াল করেছি, আপনি সব সময় নিজেকে বিরাট বিজ্ঞানী ভাবেন।”
অ্যারেসের এমন ঝগড়াটে আচরণে জিউস কিছুটা রুষ্ট-চিত্তে বললেন, “দেখ অ্যারেস, অকারণে ঝগড়া করা ছেড়ে দাও। আমি স্বর্ণ-রৌপ্যের গুরুত্বকে অস্বীকার করিনি। আর গ্রেনেড-মিসাইল নিয়ে কিছু বললেই তোমার বিপক্ষে যায়, এটা তোমার এক ধরনের কল্পনা; মানসিক-বিকার। তোমার উচিৎ এসক্লেপিয়াসের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা।”
প্লুটাস এ পর্যায়ে হেডিসের কাছ থেকে পাতালের চাবি নিয়ে স্বর্ণ-রৌপ্যের খনিতে প্রবেশ করলেন এবং ফিরে এসে বাইরে অপেক্ষমাণ সেই মেধাবী ছেলেটিকে তার চাহিদার চেয়েও বেশি পরিমাণে স্বর্ণ-রৌপ্য দান করলেন। জগতে খুব কম প্রার্থীই দেব-দেবীদের কাছ থেকে চাহিদার চেয়েও বেশি পায়। আগেই বলেছি, ছেলেটার চেহারা ভারি মায়াবী।
দুই.
প্রচুর স্বর্ণ-রৌপ্য পেয়ে ছেলেটির খুশিতে আত্মাহারা হওয়ার দশা। সে বড় বড় কয়েকটা থলে-ভর্তি স্বর্ণ-রৌপ্যের বোঝা মাথায় করে বাড়ির পথে রওনা হলো। কিন্তু কপাল খারাপ। কিছুদূর যাওয়ার পরেই একদল ডাকাত তাকে ঘিরে ধরল। বলল, “থলিগুলো এখানে রাখ্। কোনো কথা না বলে, কোনো চিৎকার-চেচামেচি না করে সোজা এখান থেকে চলে যা।”
ছেলেটি ভাবল, ‘এত দীর্ঘ সময় ভাইভা দিয়ে তারপরে এই স্বর্ণ-রৌপ্য পাওয়া; এখন এই ডাকাত-দলের এক ধমকেই সব হাতছাড়া করে ফেলব ?’ সে তার থলি কিছুতেই দেবে না। ফলে ডাকাতের দল থলিগুলো কেড়ে নেওয়ার সময় বেশ এক চোট উত্তম-মধ্যম দিয়ে ছেলেটিকে রাস্তার উপরেই টানটান করে ফেলে দিল।
ছেলেটির সম্পদ রক্ষার চেষ্টা সব ব্যর্থ হলো। শেষ পর্যন্ত স্বর্ণ-রৌপ্য যা পেয়েছিল, তা ডাকাতি হয়েই গেল। উপরন্তু ডাকাত-দলের এমন নির্মম পিটুনিতে সে পানি-পানি বলে কাতরাচ্ছিল।
ঐ পথ দিয়ে কিছুক্ষণ বাদেই প্লুটাস যাচ্ছিলেন। তিনি ছেলেটিকে দেখেই অবাক হলেন। সে এখানে এভাবে কাতরাচ্ছে কেন ? আর তাছাড়া তার সঙ্গে-থাকা স্বর্ণ-রৌপ্যের থলিগুলো কোথায় !
প্লুটাস তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার কী হয়েছে ? তুমি এভাবে কাতরাচ্ছ কেন ?”
ছেলেটি কাতরানো ছেড়ে এবারে ডুকরে কেঁদে উঠল, “স্বর্ণ-রৌপ্য সব ডাকাতি হয়ে গেছে। আমার সব শেষ; আমি কিছুই রাখতে পারলাম না।”
“সেকি ! তুমি ওদের থামাতে পারলে না ? ওদের দিকে গ্রেনেড ছুড়ে মারলে না কেন ?”
“গ্রেনেড তো আমার কাছে নেই।”
“গ্রেনেড যখন নেই, তখন এই পথ দিয়ে আসতে গেলে কেন ? একটু বুদ্ধি করে অন্য পথ দিয়ে যেতে পারতে। অথবা একা না-এসে সাথে আরও কয়েকজনকে নিয়ে আসতে।”
ছেলেটি কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমি কি আর জানতাম, এই পথে ডাকাতে ধরবে ?”
“কেন ? তুমি জানতে না, এই পথের ইতিহাস ? এটা তো সবাই-ই জানে। এ পথ তো বরাবরই খারাপ; তুমি এত পড়েছ, আর এটা পড়নি ?”
ছেলেটি কী উত্তর দেবে, বুঝে উঠতে পারছে না। এরপর অসহায়ভাবে কাঁদ-কাঁদ হয়ে বলল, “আসলে স্বর্ণ-রৌপ্যের চিন্তায় ইদানীং পড়াশোনাটা প্রায় ছেড়েই দিয়েছি। আর এই পথেরও যে একটা ইতিহাস থাকতে পারে, সেটা তো আগে বুঝি নাই।”
“তুমি এমন একটা বোকামি করে ফেললে !”
“কিন্তু আপনি তো আমাকে ভাইভা বোর্ডে বসে ‘বুদ্ধিমান’ বলেছিলেন।”
“হ্যাঁ, মনে আছে, বলেছিলাম। তবে সেটা প্যারিসের চেয়ে। সবার চেয়ে নয়।”
“এখন আমি কী করব ?”
“আপাতত অ্যাপোলোর কাছে গিয়ে ভালো দেখে কিছু গানের সিডি নিয়ে আসো। সঙ্গীত তোমার মন ভালো করে দেবে। আর আমরা ততক্ষণে সত্যিই ডাকাতি হয়েছে কিনা, সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য একটি কমিটি করব।”
“তারপর কি আমি আমার স্বর্ণ-রৌপ্যের থলিগুলো ফেরত পাব ?”
“সেই কমিটির রিপোর্টের পর যদি দেখা যায়, সত্যিই ডাকাতি হয়েছে, তবে আরেকটি কমিটি হবে। সেই দ্বিতীয় নতুন কমিটি তদন্ত করে দেখবে, কিভাবে ডাকাতি হয়েছে।”
“তারপর কি আমি আমার স্বর্ণ-রৌপ্যের থলিগুলো ফেরত পাব ?”
“কিভাবে ডাকাতি হয়েছে জানার পরে, ডাকাত অনুসন্ধান কমিটি হবে।”
“তারপর কি আমি আমার স্বর্ণ-রৌপ্যের থলিগুলো ফেরত পাব ?”
“অনুসন্ধান কমিটি সফল হলে, ডাকাত ধরার পরিকল্পনা কমিটি গঠন করা হবে।”
“তারপরে নিশ্চয় আমি আমার স্বর্ণ-রৌপ্যের থলিগুলো ফেরত পাব।”
“পরিকল্পনা কমিটির কাজ শেষ হলে, ডাকাত আটক কমিটি গঠন করা হবে।”
“আহ ! এইবার নিশ্চয়ই আমি আমার স্বর্ণ-রৌপ্যের থলিগুলো ফেরত পাব।”
“না, পাবে না। ডাকাত আটক হলে আরেকটি কমিটি হবে। সেই কমিটি রিপোর্ট দেবে, ডাকাতেরা আদৌ স্বর্ণ-রৌপ্য নিয়েছে কিনা। যদি সত্যিই নিয়ে থাকে, তখন আরেকটি কমিটি হবে, সেই স্বর্ণ-রৌপ্য তোমারই ছিল কিনা তা যাচাইয়ের জন্য।”
“তখন নিশ্চয়ই আমি আমার স্বর্ণ-রৌপ্যের থলিগুলো ফেরত পাব ?”
“তারপরেও আরও এগারোটি কমিটি আছে। তোমার ডিএনএ-কার্ড দেখে জেনেছি, অতদূর পর্যন্ত চিন্তা-ভাবনা করার মতো বুদ্ধি দেবতারা তোমাকে দেননি।”
“কিন্তু আমি তো কোচিং ক্লাসে সবাইকে প্রচুর বুদ্ধি দিয়ে থাকি !”
“ভাইভা-বোর্ডে আমরা তোমার ডিএনএ-কার্ড যাচাই করে দেখেছিলাম। তোমার সমস্ত বুদ্ধি কেবল স্বর্ণ-রৌপ্য ঘিরেই আবর্তিত। স্বর্ণ-রৌপ্যের বাইরে কোনো বুদ্ধিই তোমার ঘটে নেই।”
শান্ত-সুবোধ মায়াবী চেহারার ছেলেটি, এতকাল ধরে কোচিংয়ে-কোচিংয়ে বুদ্ধি-দানকারী ছেলেটি, দেব-দেবীদের ভাইভা-বোর্ডে প্রথম হওয়া বুদ্ধিমান ছেলেটি, প্লুটাসের কথায় কোনো রকম লজ্জিত নয়; সে কেবল ডাকাতের হাতে স্বর্ণ-রৌপ্য খোয়ানোর হতাশায় আচ্ছন্ন। এ জগৎ-সংসারে তার কেবল একটাই জিজ্ঞাসা, “আমি কি আমার স্বর্ণ-রৌপ্যের থলিগুলো ফেরত পাব ?”
চৌধুরী রওশন ইসলাম : কবি ও কথাসাহিত্যিক, নড়াইল




