এখন সময়:- আজ: ---

এখন সময়:- আজ:
--

অ্যান কারসন : পুরাণ পেরিয়ে মানুষের কাছে

শাহেদ কায়েস

২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসন। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য নিয়ে তাঁর দীর্ঘ অধ্যয়ন ও শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা লেখালেখির সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। কবিতা, প্রবন্ধ, স্মৃতি ও অনুবাদ তাঁর রচনায় পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায়।

কারসনের লেখা পড়তে পড়তে কোনো একটি বাক্যে থেমে যেতে হয়। তার অর্থ পুরোপুরি স্পষ্ট হওয়ার আগেই প্রেম, প্রত্যাখ্যান, শোকের পরিচিত অনুভূতি পাঠককে ছুঁয়ে যায়। তাঁর সাহিত্য পড়ার জন্য প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের সব নাম জানা জরুরি মনে হয় না। প্রেমে পড়া, প্রত্যাখ্যাত হওয়া, মৃত স্বজনকে মনে করতে গিয়ে ভাষা হারিয়ে ফেলার অভিজ্ঞতা পাঠককে তাঁর লেখার কাছে নিয়ে আসে। পড়তে পড়তে প্রাচীন কাহিনি ও মানুষের বর্তমান অভিজ্ঞতার সম্পর্কও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়।কবিতার মধ্যে গবেষণা, প্রবন্ধের মধ্যে স্মৃতি, অনুবাদের মধ্যে ব্যক্তিগত অস্বস্তি নিয়ে কারসনের লেখালেখি। মানুষ নিজের অভিজ্ঞতা কতখানি ভাষায় প্রকাশ করতে পারে, অনুভূতির কতটুকু অনুচ্চারিত থেকে যায়, তাঁর বই পড়তে পড়তে এসব নিয়ে ভাবতে হয়। সাহিত্যিক আঙ্গিকের পরিবর্তনে একই অভিজ্ঞতা পড়ার ধরনও বদলে যায়।

কারসনের অসমাপ্ত চিন্তার জগৎ

অ্যান কারসনের জন্ম ১৯৫০ সালের ২১ জুন, কানাডার টরন্টোতে। তাঁর পড়াশোনার কেন্দ্রে ছিল ক্লাসিক্স, অর্থাৎ প্রাচীন গ্রিক ও রোমান ভাষা, সাহিত্য এবং সংস্কৃতির অধ্যয়ন। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৮১ সালে তাঁর ডক্টরাল গবেষণা সম্পন্ন হয়। অভিসন্দর্ভের নাম ঙফর বঃ অসড় ঊৎমড় ঝঁস। বাংলায় কথাটির অর্থ দাঁড়ায়, আমি ঘৃণা করি এবং ভালোবাসি, তাই আমি আছি। পরস্পরবিরোধী দুই অনুভূতির মধ্যে নিজের অস্তিত্ব খোঁজার এই উচ্চারণ তাঁর পরবর্তী লেখালেখির সঙ্গে বেশ মানানসই। একজন মানুষ একই সম্পর্কের মধ্যে আকর্ষণ ও ক্ষোভ অনুভব করতে পারেন। যুক্তি দিয়ে সেই অনুভূতি বুঝতে চাইলেও শরীরের আকর্ষণ সহজে কাটে না। তাঁর শিক্ষাজীবন ও লেখকজীবনকে আলাদা করে বিবেচনা করলে তাঁর চিন্তা ও লেখার পারস্পরিক সম্পর্ক পুরোপুরি বোঝা যায় না। দীর্ঘদিন ক্লাসিক্স পড়ানোর অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যিক মনোযোগের অংশ। প্রাচীন ভাষার একটি শব্দের পাশে বসে থাকা, ভিন্ন অনুবাদের ফারাক বোঝা, হারিয়ে যাওয়া পংক্তির চারপাশের শূন্যতা চিনে নেওয়া, এসব অভ্যাস তাঁর কবিতায় কাজ করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠকক্ষ থেকে যে মনোযোগ শুরু হয়, ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিবরণেও তার উপস্থিতি টের পাই।

তবু তাঁর লেখা পড়লে ক্রমাগত অধ্যাপকের বক্তৃতা শোনার অনুভূতি হয় না। কোথাও একটি ধারণা ব্যাখ্যা করতে করতে তিনি থামেন। হঠাৎ এমন একটি বাক্য আসে, যার ভেতর পড়াশোনার দূরত্ব ঘুচে একজন মানুষের অস্বস্তি স্পষ্ট হয়। ভাষার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের এই দিক আমাকে টানে। জ্ঞান অর্জনের পরেও মানুষের অসহায়তা থেকে যায়। অনেক পড়েছেন বলেই কেউ নিজের বিচ্ছেদের ব্যথা যথাযথভাবে বলতে পারবেন, এমন নিশ্চয়তা কোথায়? কারসনের জীবন নিয়ে লেখার সময় ব্যক্তিগত তথ্য সতর্কভাবে ব্যবহার করা দরকার। তাঁর কবিতায় ‘আমি’ বলে বলা সব কথাকে তাঁর জীবনের ঘটনা ধরে নিলে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও কল্পনার পার্থক্য বোঝা কঠিন হবে।

‘দ্য গাস এসেই’ নিয়ে ২০০৪ সালের দ্য প্যারিস রিভিউ সাক্ষাৎকারে তিনি অনুভূতির বিবরণ ধরে রাখার ক্ষমতা এবং জীবনকে বুঝে ওঠার ক্ষমতার ফারাক নিয়ে কথা বলেছেন। নিজের লেখাকে তিনি তখনও অসমাপ্ত চিন্তার জায়গা থেকে পড়ছিলেন। এমন আত্মসংশয় একজন খ্যাতিমান লেখকের মুখে শুনলে স্বস্তি লাগে। লেখা শেষ হয়েছে, ভাবনা শেষ হয়নি। আমি তাঁর সাহিত্যিক যাত্রাকে সাফল্যের একমুখী গল্প হিসেবে পড়তে চাই না। সেখানে পড়াশোনা আছে, দীর্ঘ অনুশীলন আছে, নিজের কাজ নিয়ে অস্বস্তিও আছে। প্রাচীন ভাষার কাছে ফিরে যাওয়ার মধ্যে একজন আধুনিক মানুষের নির্জনতাও থাকে। বহু শতাব্দী আগের কোনো কবি একটি অনুভূতির নাম দিয়েছিলেন। আজকের লেখক সেই নাম উচ্চারণ করেন। অনুভূতি তবু পুরো ধরা পড়ে না। এই সামান্য অপূর্ণতার মধ্যেই কারসনের কাজ এগোয়।

আকাঙ্ক্ষার আনন্দ ও অনিশ্চয়তা

ডক্টরাল গবেষণার সঙ্গে সম্পর্কিত ভাবনাগুলো কারসন পরে ‘ইরোস দ্য বিটারসুইট’ গ্রন্থে বিস্তৃত করেন। বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে। প্রাচীন গ্রিক কবিতা ও দর্শনে প্রেমের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তাঁর আলোচনা শুরু হয় সাফোর ব্যবহৃত মিষ্টতা ও তিক্ততার যুগপৎ অনুভূতি থেকে। প্রেমের সুখ এবং ব্যথাকে এখানে পরপর আসা দুটি অধ্যায় হিসেবে ভাবলে ভুল হবে। আকাঙ্ক্ষার মুহূর্তে আনন্দ ও আশঙ্কা একসঙ্গে জন্মাতে পারে। যাকে চাই, তার কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা আনন্দ দেয়, আবার তাকে না পাওয়ার আশঙ্কাও থাকে। এমন অনুভূতি পরিচিত হলেও নিজের জীবনে তা স্পষ্ট করে প্রকাশ করা কঠিন। কারসনের এই আলোচনা আমার ভালো লাগে, কারণ তিনি প্রেমের প্রশংসাতেই থেমে থাকেন না; প্রেমের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা দ্বিধা ও অনিশ্চয়তার কথাও বলেন। তিনি অনুভূতির ভেতরের ব্যবধান নিয়ে ভাবেন। একজন মানুষ আরেকজনকে চান। সেই চাওয়ার মধ্যে অপরজনের দূরত্ব কাজ করে। দূরত্ব কখনো চোখের সামনে, কখনো একই ঘরে বসেও টের পাওয়া যায়। একই কথা শুনে দুজন ভিন্ন অর্থ বোঝেন। একই স্পর্শের স্মৃতি দুজনের কাছে ভিন্নভাবে থেকে যায়। আকাঙ্ক্ষার ব্যাখ্যা তখন সম্পর্কের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার কাছাকাছি আসে।
এই পাঠ থেকে আমার মনে হয়, প্রেমের ভাষায় অনুপস্থিতিরও সক্রিয় ভূমিকা আছে। প্রিয় মানুষ সামনে থাকলেও তাকে সম্পূর্ণ জানা যায় না। তার চিন্তার একটি অংশ নিজের নাগালের বাইরে থাকে। মানুষ সেই অংশের দিকে কৌতূহল নিয়ে এগোয়, কখনো আতঙ্ক নিয়ে। কারসনের পরবর্তী বইগুলোর প্রেমিকদের পড়ার সময় এমন অনুভূতি কাজে লাগে। তাঁদের আবেগ তীব্র। অপরজন সম্পর্কে তাঁদের জ্ঞান অসম্পূর্ণ। সেই ফারাক থেকেই অনেক ভুল জন্মায়। এখানে গ্রিক সাহিত্য পড়ার সুবিধা আসে সময়ের দূরত্ব থেকে। নিজের কষ্ট নিয়ে সরাসরি কথা বলতে গেলে আমরা কখনো দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাই। অন্য কারও লেখা থেকে একই ধরনের কষ্টের কথা জানলে নিজের অনুভূতি নিয়ে ভাবার সময় পাই। অনুভূতিকে দূর থেকে স্পর্শ করা যায়। সাফোর একটি শব্দ আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার পাশে এসে দাঁড়ায়। কারসনের চিন্তার চলন আমাকে সেই সুযোগের কথা মনে করায়। গবেষণা ও ব্যক্তিগত অনুভব একই টেবিলে বসতে পারে। কেউ কাউকে সরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

তাঁর কাছে আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লেখা মানে সুখের সংজ্ঞা তৈরি করা, এমন পাঠ আমার কাছে অসম্পূর্ণ লাগে। আকাঙ্ক্ষা মনোযোগ বদলে দেয়। আগে যে শব্দ শুনিনি, হঠাৎ শুনি; অপেক্ষার সময় ঘড়ির কাঁটা অন্যভাবে চলে; কারও অনুপস্থিতিতে একটি পরিচিত ঘর অচেনা লাগে। প্রেমের অভিজ্ঞতা আমাদের পড়ার ধরনেও ঢুকে পড়ে। একদিন যে কবিতাকে অতিরঞ্জিত মনে হয়েছিল, পরে তার একটি পঙ্ক্তি একেবারে স্বাভাবিক লাগে। এই বদলে যাওয়া পাঠককে মনে রেখেই কারসনের প্রেমের আলোচনা পড়তে চাই। বইয়ের ধারণা জীবনের সঙ্গে মেলে, কখনো মেলে না। অমিলটুকুও দরকার।

গেরিয়নের লাল ডানা ও নিজের কণ্ঠ

অনেক পাঠক কারসনের লেখার সঙ্গে প্রথম পরিচিত হন তাঁর ‘অটোবায়োগ্রাফি অফ রেড: এ নভেল ইন ভার্স’ বইয়ের মাধ্যমে। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত বইটির পেছনে রয়েছে প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকোরাসের খণ্ডিত কাব্য গেরিওনিস। পুরাণের গেরিয়ন হেরাক্লিসের হাতে নিহত হয়। কারসনের কাহিনিতে সে লাল ডানার এক কিশোর, যে হেরাক্লিসের প্রেমে পড়ে। পুরোনো বীরত্বের কাহিনি পড়ার সময় যাকে দানব বলে দ্রুত অতিক্রম করা যেত, তাকে নিয়ে এখানে দীর্ঘ সময় কাটাতে হয়। গেরিয়ন শৈশবে নির্যাতনের শিকার হয়; নিজের পরিবারেও সে নিরাপদ বোধ করে না। বড় হতে হতে সে ক্যামেরার কাছে আশ্রয় খোঁজে। হেরাক্লিসের সঙ্গে সম্পর্ক তাকে আনন্দ দেয়, বিচ্ছেদ তাকে আঘাত করে। কাহিনির এই সংক্ষিপ্ত বিবরণ থেকে বইটির পূর্ণ স্বাদ পাওয়া কঠিন। গেরিয়নের জীবনে কোনো ঘটনা শেষ হয়ে গেলেও তার অনুভূতি ও চিন্তায় সেই ঘটনার রেশ থেকে যায়।

আমার কাছে লাল ডানার উপস্থিতি বিশেষভাবে অর্থবহ। ডানা নিয়ে গেরিয়নকে পড়লে শরীরের এমন একটি দিক সামনে আসে, যা অন্যদের চোখে তাকে আলাদা করে। মানুষ নিজের শরীরের যে অংশ লুকিয়ে রাখতে চায়, সেই অংশ কখনো তার আত্মপরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। গেরিয়নের ডানাকে একটি নির্দিষ্ট অর্থে আটকে দিতে ইচ্ছা হয় না। তার সমকামী প্রেম, নিজের প্রতি সংকোচ, শিল্পের দিকে ঝোঁক, সবকিছুর মধ্যে ডানা ভিন্নভাবে কাজ করে। পাঠক সেই ভিন্নতার সঙ্গে সময় কাটান। বইটিতে ফটোগ্রাফির ব্যবহার আমাকে ভাবায়, নিজের জীবনের কথা আলোকচিত্রের মাধ্যমেও বলা যায়। নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে মানুষ সব সময় নিজের মুখের ছবি তোলে না। কখনো কোনো স্থান, আলো, অন্য কারও শরীরের একটি অংশকে বেছে নেয়। কীভাবে সে এসবকে ক্যামেরায় ধরে, তার মধ্যেও নিজের মনের কথা প্রকাশ পায়। গেরিয়নের অভিজ্ঞতা পড়ে মনে হয়, মানুষ কখনো অন্য কিছুর বর্ণনার মধ্য দিয়ে নিজের জীবনের কথা বলে। যে কথা সরাসরি বলতে পারছে না, তার জন্য সে অন্য দৃশ্য খুঁজছে। লেখা ও ফটোগ্রাফির মধ্যে সেই চলাচল বইয়ের আত্মজীবনী ধারণাকে বিস্তৃত করে।
কারসন পুরাণের কাহিনি বদলেছেন বললে তাঁর কাজ পুরোপুরি বোঝা যায় না। তিনি গেরিয়নকে কাহিনির কেন্দ্রে এনেছেন। ফলে পাঠকের মনোযোগ হেরাক্লিসের কাজ থেকে গেরিয়নের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার দিকে সরে যায়। পুরোনো নামের মধ্যে নতুন অনুভূতি এসে পড়ে। তাতে প্রাচীন কাহিনির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয়, নতুন ঘনিষ্ঠতাও জন্মায়। গেরিয়নের প্রতি মমতা জন্মালে তাকে শুধু আহত কিশোর হিসেবে পড়ার ঝুঁকি থাকে। তার শিল্পীসত্তা, কৌতূহল, নিজের অভিজ্ঞতাকে সাজানোর চেষ্টা মনে রাখা দরকার। সে ভালোবাসে, ভুলও করে। নিজের কষ্টের মধ্যে থেকেও বাইরের জগতের দিকে তাকায়। আমার কাছে তার এই মনোযোগ বইটির সবচেয়ে কোমল দিক। প্রত্যাখ্যানের পরে মানুষ নিজের দিকে ফিরে আসে, তারপর ধীরে ধীরে অন্য কিছুর দিকে। গেরিয়নের কাহিনিতে সেই ধীরতা আছে। লাল রঙের তীব্রতার মধ্যে একটি নীরব জীবন।

কবিতা ও প্রবন্ধের মাঝখানে চলাফেরা

কারসনের ‘প্লেইনওয়াটার: এসেইজ অ্যান্ড পোয়েট্রি’ প্রকাশিত হয় ১৯৯৫ সালে। নামের মধ্যেই দুটি সাহিত্যিক রীতির উপস্থিতি। বইয়ে প্রাচীন কবিকে নিয়ে কল্পিত সাক্ষাৎকার আছে, ছোট বক্তৃতা আছে, যাত্রা ও জল নিয়ে লেখা আছে। আলোচনার বিষয় বদলানোর সঙ্গে ভাষার চলনও বদলায়। দীর্ঘ ব্যাখ্যার প্রত্যাশা নিয়ে পড়তে শুরু করলে কখনো কয়েকটি বাক্যের মধ্যে থামতে হয়। সংক্ষিপ্ত লেখার প্রত্যাশা নিয়ে এগোলে চিন্তার ভেতরে আরও দূর যেতে হয়। আমাদের পরিচিত প্রবন্ধ সাধারণত বিষয় ঘোষণা করে, ব্যাখ্যা সাজায়, শেষে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। সেই রীতির সঙ্গে কারসনের লেখাকে মেলাতে গেলে অস্বস্তি হতে পারে। তিনি কখনো দুটি বিষয় পাশাপাশি রাখেন, তবে তাদের মধ্যে সম্পর্ক কী, তা সব সময় স্পষ্ট করে বলেন না। পাঠককে সেই ব্যবধান পেরোতে হয়। পেরোনোর সময় নিজের স্মৃতি ও পড়াশোনা কাজে লাগে। ফলে একই লেখা ভিন্ন পাঠকের কাছে ভিন্ন ঘনিষ্ঠতা তৈরি করতে পারে।

সংক্ষিপ্ত বক্তৃতার ভঙ্গিতে লেখা অংশগুলো পড়তে আমার বিশেষ ভালো লাগে। কোনো বিষয় নিয়ে সামান্য কথা বলা মানেই চিন্তা সামান্য, এমন ধারণা সেখানে টেকে না। একটি শব্দের পাশে আরেকটি শব্দ রাখার জন্যও দীর্ঘ মনোযোগ দরকার হতে পারে। ছোট পরিসরের মধ্যে লেখক কী বাদ দিলেন, সেই অনুচ্চারিত অংশ পাঠের অনুভূতিকে প্রভাবিত করে। অনেক সময় বিস্তারিত ব্যাখ্যার চেয়ে একটি অসমাপ্ত ইঙ্গিত বেশি সময় মনে থাকে। কারণ পাঠক তার বাকি অংশ নিজের মধ্যে বহন করেন। ২০০০ সালে প্রকাশিত ‘মেন ইন দ্য অফ আওয়ার্স’ গ্রন্থে কারসন ভিন্ন সময়ের লেখক, চিন্তাবিদ ও শিল্পীদের ভাবনা পাশাপাশি রাখেন। ভার্জিনিয়া উলফ, থুকিদিদিস, এডওয়ার্ড হপার ও অগাস্টিনের কাজের মধ্যে তিনি নতুন যোগসূত্র খোঁজেন। বইয়ের শেষের প্রবন্ধে মায়ের মৃত্যুর প্রসঙ্গ আসে। এই বিন্যাস পড়লে মনে হয়, জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্র পেরিয়েও লেখককে একসময় নিজের ঘরের কাছে ফিরতে হয়। বাইরের পৃথিবীর বিশাল পাঠ ব্যক্তিগত অনুপস্থিতিকে পুরো পূরণ করতে পারে না। তাঁর লেখায় চিন্তা ও অনুভূতির মিশ্রণ আমাকে বিশেষভাবে স্পর্শ করে, যখন কোনো ধারণা পড়তে পড়তে বুঝি, তার সঙ্গে মানুষের কতটা কষ্ট জড়িয়ে আছে।

সময় নিয়ে আলোচনা পড়তে পড়তে মনে হয়, মৃত মানুষের জীবনে আর নতুন কোনো দিন আসবে না। স্মৃতি নিয়ে ভাবতে গিয়ে মনে পড়ে, আমিও অনেক কিছু ভুলে গেছি। এভাবে প্রবন্ধ পাঠককে নতুনভাবে ভাবতে সাহায্য করে, আর কবিতা সেই ভাবনাকে অনুভূতির কাছাকাছি নিয়ে আসে। তবে প্রতিটি অপ্রত্যাশিত সংযোগ আমার কাছে সমান কার্যকর মনে হয় না। কিছু অংশ পড়তে গিয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলি, কোথাও বোঝার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য না পেয়ে বিরক্ত হই। কারসনের লেখা নিয়ে নিজের অনুভূতি জানাতে গেলে সেই বিরক্তির কথাও বলতে হয়। যে অংশ বুঝতে পারিনি, তা আপাতত রেখে দিতে পারি। অন্য বই পড়ে ফিরে এলে তার কিছুটা স্পষ্ট হতে পারে, কিছুটা তখনও অস্পষ্ট থাকে। সব অংশ সমানভাবে বুঝতে না পারলেও তাঁর লেখা পড়ে যাওয়া যায়।

সৌন্দর্যের টানে আটকে থাকা দাম্পত্য

‘দ্য বিউটি অফ দ্য হাজব্যান্ড: এ ফিকশনাল এসেই ইন টোয়েন্টি নাইন ট্যাঙ্গোস’ প্রকাশিত হয় ২০০১ সালে। দীর্ঘ প্রেম ও ভেঙে পড়া দাম্পত্যের কাহিনি এখানে ঊনত্রিশটি ট্যাঙ্গোর বিন্যাসে লেখা। কথক কখনো প্রথম পুরুষে কথা বলেন, কখনো স্ত্রী হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে ভাবেন। সম্পর্কে কষ্ট পেলেও স্বামীর সৌন্দর্যের প্রতি তাঁর আকর্ষণ কমে না। কিটসের কবিতা এই বয়ানের চিন্তার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। একটি সম্পর্ক ক্ষতি করছে জেনেও তার প্রতি টান থাকা অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা। বাইরের মানুষ দ্রুত সিদ্ধান্ত দেন। ভেতরের মানুষ সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সময় নেন, কখনো পৌঁছেও ফিরে আসেন। কারসনের বইটি পড়তে গিয়ে এই ফিরে আসার লজ্জা ও আকর্ষণ নিয়ে ভাবি। কথক একই স্মৃতিকে কখনো ভিন্নভাবে মনে করেন, কখনো নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন। যে মানুষ তাঁকে আঘাত করেছে, তার সৌন্দর্য মনে পড়ে। রাগের মধ্যে আকাঙ্ক্ষা ফিরে আসে। সেই অংশ বুঝতে পাঠককে সময় নিয়ে ধৈর্য ধরে পড়তে হয়।

ট্যাঙ্গোর বিন্যাস আমার কাছে দাম্পত্যের দেহগত স্মৃতির কথা মনে করায়। কাছে আসা, সরে যাওয়া, কারও পদক্ষেপের সঙ্গে নিজের পদক্ষেপ মেলানো, আকস্মিক টান, সব মিলিয়ে সম্পর্কের একটি ছন্দ তৈরি হয়। সেই ছন্দ ভেঙে গেলে দু’জন সমানভাবে ভারসাম্য হারান, এমন নিশ্চিত করে বলা যায় না। একজন এগিয়ে চলে। আরেকজন পুরোনো চলনের মধ্যে আটকে থাকেন। বইটির অংশগুলো পড়তে পড়তে সেই অসম সময় অনুভব করি। সৌন্দর্য নিয়ে প্রচলিত উচ্ছ্বাসের মধ্যে মানুষকে ভালো লাগার কারণ এবং মানুষের আচরণের মূল্যায়ন একসঙ্গে মিশে যায়। কারসনের দাম্পত্যকাহিনি আমাকে দুটির দূরত্ব মনে রাখতে সাহায্য করে। কারও মুখ মনে পড়লে মমতা জাগে। তার একটি কাজ মনে পড়লে ক্ষোভ জন্মায়। একই মানুষ সম্পর্কে দুটো অনুভূতিই সত্য হতে পারে। স্মৃতি কোনো সহজ সিদ্ধান্তের সুবিধার জন্য নিজেকে সংশোধন করে না। মানুষ সেই অসুবিধা নিয়েই বেঁচে থাকে।

এখানে নারীকথকের কণ্ঠ নিয়ে মনোযোগী হওয়া দরকার। তাঁকে কেবল প্রতারিত স্ত্রী হিসেবে চিহ্নিত করলে তাঁর চিন্তার স্বাধীনতা কমে যায়। তিনি নিজের আকর্ষণ নিয়ে ভাবছেন, নিজের ভুলের কাছেও ফিরছেন, সম্পর্কের ভাষা নতুনভাবে সাজাচ্ছেন। দাম্পত্যের ঘটনাপ্রবাহে তাঁর ইচ্ছা কতটা কার্যকর, কোথায় অন্যের সিদ্ধান্ত তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করছে, পাঠের সময় সেসব খেয়াল করি। সৌন্দর্যের টান তাঁর অনুভূতির অংশ। সেই টান তাঁর সমস্ত জীবনকে ব্যাখ্যা করে ফেলতে পারে না। বইটির উপশিরোনামে প্রবন্ধের উল্লেখ আমাকে আরও একটি বিষয়ে ভাবায়। অভিজ্ঞতা নিয়ে চিন্তা করতে গদ্যের নির্দিষ্ট আকৃতি কতখানি জরুরি? কবিতার মধ্যে একটি ধারণা পরীক্ষা করা যায়। কাহিনির মধ্যে একটি যুক্তি বিপাকে পড়তে পারে। কারসনের কথক নিজের জীবন বলতে বলতে নিজের ব্যাখ্যাকেও সন্দেহ করেন। পাঠক সেই সন্দেহের সঙ্গে হাঁটেন। সিদ্ধান্ত একটু পিছিয়ে যায়। আহত মানুষটির কথা আরও কিছুক্ষণ শোনা হয়।

অনুবাদের শূন্যস্থান, শোকের অসম্পূর্ণ ভাষা

কারসনের অনুবাদ নিয়ে আলোচনা করতে সাফোর কাছে ফিরতে হয়। ২০০২ সালে প্রকাশিত ‘ইফ নট, উইন্টার: ফ্র্যাগমেন্টস অফ সাফো’ গ্রন্থে তিনি প্রাচীন কবির টিকে থাকা খণ্ডাংশ ইংরেজিতে আনেন। হারিয়ে যাওয়া অংশের উপস্থিতি পাঠের মধ্যে অনুভব করার সুযোগ থাকে। একটি পংক্তি এসেছে। তার পরের শব্দ নেই। পাঠক থামেন। এই থামার সঙ্গে সম্পূর্ণ কবিতা পড়ার অভ্যাসের ফারাক অনেক। আমার কাছে খণ্ডিত পাঠের সবচেয়ে তীব্র অনুভূতি আসে যখন বুঝি, অনুপস্থিত অংশ সম্পর্কে কৌতূহল কখনো পূরণ হবে না। সেখানে কী লেখা ছিল, কেউ নিশ্চিত বলতে পারবেন না। তবু অবশিষ্ট শব্দগুলো পড়া যায়। তাদের প্রতি মনোযোগ দেওয়া যায়। কারসনের অনুবাদকে এই দিক থেকে পড়লে ভাষার কাজ সম্পর্কে সংযম জন্মায়। অনুবাদক সব শূন্যস্থান পূরণ করবেন, এমন প্রত্যাশা কমে। যা হাতে আছে, তার যত্ন নেওয়ার কাজ সামনে আসে। এই প্রসঙ্গে অ্যান কারসনের ‘নক্স’ (ঘড়ী) বইটির কথা মনে পড়ে। লাতিন শব্দটির অর্থ ‘রাত্রি’। ভাই মাইকেলের মৃত্যুর পর কারসন তাঁকে নিয়ে একটি ব্যক্তিগত স্মৃতিবই তৈরি করেন। সেই স্মৃতিবইয়ের প্রতিরূপ হিসেবে প্রকাশিত গ্রন্থে চিঠি, পারিবারিক আলোকচিত্র, কোলাজ, আঁকা, স্মৃতিচারণ ও কবিতার অনুবাদ একসঙ্গে সাজানো হয়েছে। কাছের মানুষকেও কতটুকু জানতে পারি, তাঁর মৃত্যুর পর কত কথা অজানা থেকে যায়, সেই বেদনা বইজুড়ে ছড়িয়ে আছে। লাতিন কবি ক্যাটুলাসের মৃত ভাইকে নিয়ে লেখা ১০১ নম্বর কবিতার অনুবাদ তার একটি প্রধান সূত্র। ভাঁজ খুলে পড়ার জন্য তৈরি বইটির আকৃতিও শোকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সম্পর্কিত।

মৃত একজন মানুষের কথা ভাবতে ভাবতে কখনো নিজের মনের এমন কিছু দিক চিনতে পারি, যা আগে আমার অজানা ছিল। তাঁর জীবনে সব সময় আমরা পাশে ছিলাম না। কোনো চিঠির একটি বাক্য বোঝার জন্য যে ঘটনার কথা জানা দরকার, সেই ঘটনা হারিয়ে গেছে। একটি মুখ চিনি। সেই মুখের সেদিনের অনুভূতি জানি না। ‘নক্স’ নিয়ে ভাবতে গেলে প্রথমেই মনে হয়, কাছের মানুষকেও কত কম জানি, আর সেই না জানার কষ্ট কতটা। ভালোবাসার স্মৃতির মধ্যেও অপূর্ণতা থাকে। শোকের লেখায় সান্ত্বনা দেওয়ার তাড়া প্রায়ই অনুভূতিকে মসৃণ করে ফেলে। মানুষ বেদনাকে সহনীয় ভাষায় সাজায়, পাঠককে একটি শান্ত সমাপ্তি দিতে চায়। কারসনের বইয়ের বিভিন্ন উপকরণকে পাশাপাশি রেখে পড়লে অন্য অভিজ্ঞতা হয়। চিঠির পাশে শব্দার্থ, শব্দার্থের পাশে মুখ, মুখের পাশে ফাঁকা জায়গা। তাদের মধ্যে একটি সম্পূর্ণ জীবন গুছিয়ে ওঠে না। পাঠকের হাতে থেকে যায় কিছু অংশ। মৃত মানুষের অনুপস্থিতি সেই অংশগুলোর মধ্যেও কাজ করে।

এখানে অনুবাদ ও শোকের একটি মিল আমার মনে আসে। দুটো কাজেই অন্য কারও কাছে পৌঁছানোর ইচ্ছা থাকে। পৌঁছানোর পথ অসম্পূর্ণ। প্রাচীন কবির ভাষা নিজের ভাষায় আনতে গিয়ে কিছু হারায়; মৃত স্বজনের জীবন মনে করতে গিয়েও অনেক কিছু নাগালের বাইরে থাকে। এই মিল থেকে দুটিকে অভিন্ন ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। তবু দুটিকে পাশাপাশি পড়লে একটির দুর্বোধ্য অংশ অন্যটির অনুভূতি বুঝতে সাহায্য করে। কারসনের সাহিত্য এমন পাশাপাশি থাকার জায়গা তৈরি করে। তাঁর শোকের লেখা পড়তে গিয়ে আমি প্রতিটি ব্যক্তিগত তথ্যের ব্যাখ্যা খুঁজতে চাই না। কিছু স্মৃতি লেখকের নিজের কাছে থাকুক। পাঠকের মমতার সঙ্গে কৌতূহলের সীমাও দরকার। সবকিছু জানতে না পারার পরেও কারও কষ্টের কাছে থাকা সম্ভব।

বইয়ের ভাঁজ থেকে পাঠকের অনিশ্চয়তা

২০১৬ সালে প্রকাশিত ‘ফ্লোট’ বাইশটি ছোট পুস্তিকা নিয়ে তৈরি। পাঠক নিজের পছন্দমতো ক্রমে সেগুলো পড়তে পারেন। ফলে প্রথম পৃষ্ঠা থেকে শুরু করে শেষ পৃষ্ঠায় পৌঁছানোর পরিচিত অভ্যাস বদলে যায়। কোন অংশের পরে কোন অংশ পড়ছেন, তার ওপর অংশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক বোঝার ধরনও বদলায়। পাঠক একটি পুস্তিকা তুলে নেন, পড়ে রেখে দেন, অন্যটি পড়েন, পরে আগেরটিতে ফিরে আসেন। পড়ার এই ক্রম ও ফিরে আসার মধ্য দিয়েও বইয়ের অর্থ তৈরি হয়। বিন্যাসের এই স্বাধীনতা নিয়ে ভাবলে আমার নিজের পড়ার অভ্যাস মনে পড়ে। সব বই শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই মনোযোগে পড়া হয় না। পড়তে গিয়ে কোনো অংশে দাগ দিই, কিছু পৃষ্ঠা বাদ দিয়ে এগিয়ে যাই, কয়েক মাস পর আগের কোনো অংশে ফিরে আসি। বইয়ের পৃষ্ঠাগুলো নির্দিষ্ট ক্রমে সাজানো থাকলেও পাঠক নিজের সময় ও আগ্রহ অনুযায়ী পড়েন। কখনো থামেন, কখনো আগের অংশে ফিরে যান। ‘ফ্লোট’-এর আলাদা পুস্তিকাগুলো পাঠককে এভাবে পড়ার সুযোগ দেয়। থেমে থেমে পড়া ও ক্রম বদলে নেওয়ার সুযোগ বইয়ের বিন্যাসেই রাখা আছে।

২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘রং নর্মা’ গ্রন্থে পঁচিশটি গদ্যধর্মী লেখা ও কারসনের আঁকা চিত্র রয়েছে। কনরাড, ফ্লবের, গুয়ানতানামো, তুষার, দারিদ্র্য ও নিজের বাবার প্রসঙ্গ এসেছে লেখাগুলোতে। এসব বিষয়ের মধ্যে স্পষ্ট যোগসূত্র খুঁজে পাওয়ার নিশ্চয়তা পাঠককে দেন না কারসন। মানুষের চিন্তাও প্রায়ই এভাবে এক প্রসঙ্গ থেকে অন্য প্রসঙ্গে চলে যায়। দিনের সংবাদ পড়তে পড়তে পুরোনো স্মৃতি মনে আসে। কারও মুখ মনে করতে গিয়ে কোনো শব্দের অর্থ নিয়ে ভাবি। সেখান থেকে মন চলে যায় অন্য প্রসঙ্গে। চিন্তা কোনটির পর কোনটি আসবে, তা আগে থেকে ঠিক করা থাকে না। বিচ্ছিন্ন বিষয় একসঙ্গে রাখলেই পাঠে আনন্দ আসবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রতিটি অংশের ভাষা, অনুভূতির তীব্রতা ও বিরতি পাঠকের অভিজ্ঞতাকে প্রভাবিত করে। কারসনের লেখা নিয়ে আলোচনায় সেদিকেও মনোযোগ দেওয়া দরকার। তাঁর বইয়ের অভিনব বিন্যাস বর্ণনা করা সহজ। কিন্তু একটি বাক্য কেন পাঠককে টানে, তা ব্যাখ্যা করা কঠিন। তাঁর লেখার কিছু অংশ আমাকে টানে, কিছু অংশের সঙ্গে সংযোগ খুঁজে পাই না। পড়তে গিয়ে এই টান ও দূরত্ব দুটোই অনুভব করি।

২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর কারসনের লেখার প্রতি নতুন পাঠকের আগ্রহ বেড়েছে। এই সময়ে তাঁর বই নিয়ে প্রশংসার কথাই বেশি শোনা যেতে পারে। প্রথমবার বই খুলে পাঠক পাবেন লাল ডানার গেরিয়নকে, স্বামীর প্রতি স্ত্রীর অসহায় আকর্ষণকে, ভাইয়ের স্মৃতির অজানা অংশগুলোকে। পুরস্কারের খ্যাতি পেরিয়ে তাঁদের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার কাছে পৌঁছাতে হবে প্রত্যেক পাঠককে নিজের মতো করে। বাংলায় কারসনকে পড়তে গিয়ে অনুবাদের একটি অসুবিধা আমার মনে হয়। তাঁর ছোট বাক্য বাংলায় একইভাবে রাখলে কখনো রুক্ষ শোনাতে পারে। আবার ব্যাখ্যা যোগ করলে মূল লেখার বিরতি ও গতি বদলে যায়। অপরিচিত গ্রিক নাম বুঝিয়ে দিতে অতিরিক্ত তথ্য যোগ করলে কবিতা পড়ার প্রবাহে বাধা আসে। তথ্য কম রাখলে কিছু ইঙ্গিত পাঠকের কাছে অস্পষ্ট থেকে যায়। এই দ্বিধার সহজ সমাধান আমার

 

 

জানা নেই। আলাদা টীকা পাঠককে সাহায্য করতে পারে। সেই সঙ্গে মূল কবিতার ভাষা, গতি ও বিরতি ধরে রাখার কাজও অনুবাদককে করতে হয়।

কারসনকে পড়ার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে তথ্য জানার পাশাপাশি নিজের পড়ার ধরনেও মন দিতে হয়। কোথায় দ্রুত পড়ছি, কোথায় থামছি, কোথায় নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে চরিত্রের অনুভূতি বুঝতে গিয়ে তার আলাদা অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করছি, তা খেয়াল করা দরকার। গেরিয়নের কষ্ট পরিচিত মনে হলেও তার জীবন আমার জীবনের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায় না। স্ত্রীর আকর্ষণ বুঝতে পারলেও তাঁর প্রতিটি সিদ্ধান্তের কারণ বুঝে উঠতে পারি না। অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনের মিল খুঁজি, পার্থক্যটুকুও মনে রাখি। সেই পার্থক্য মেনে নিয়েও তাঁর প্রতি মমতা অনুভব করতে পারি।

কারসনের লেখা পড়ে আমার মনে সবচেয়ে বেশি থেকে যায় মানুষের অনুভূতি ও সম্পর্কের অসমাপ্ত থাকার কথা। প্রেম শেষ হলেও তাকে ঘিরে কথা ফুরায় না। মানুষ মারা গেলেও তাঁর স্মৃতির সঙ্গে মনে মনে কথা বলা চলতে থাকে। প্রাচীন কবিতার অল্প কিছু অংশ আজও টিকে আছে, কেউ সময় নিয়ে তা পড়ছেন। সেই পাঠে যুক্ত হচ্ছে তাঁর নিজের অভিজ্ঞতাও। বই বন্ধ করার পর শেষ কথাটি মনে থাকে। পরদিন তার অর্থ অন্যরকম মনে হতে পারে। এই বদলে যাওয়া অর্থের টানেই কারসনের লেখায় ফিরতে চাই। নিজের চেনা অনুভূতিকে নতুন করে বুঝতে চাই।

শাহেদ কায়েস : কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক, নারায়ণগঞ্জ

 

অ্যান কারসন : পুরাণ পেরিয়ে মানুষের কাছে

শাহেদ কায়েস ২০২৬ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কানাডীয় কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসন। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য নিয়ে তাঁর দীর্ঘ অধ্যয়ন ও শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা

 ‘সাড়ে ৭ বছরে ১৪ হাজারের অধিক বই উপহার দিয়েছে চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি’

আন্দরকিল্লা ডেক্স : গত সাড়ে ৭ বছরে সারাদেশে ১৪ হাজারের অধিক বই উপহার দিয়েছে চাঁদপুরের সুপরিচিত প্রতিষ্ঠিত সংগঠন চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি। বিগত পুরো অক্টোবর মাস

কবীর-লালন ভাবসঙ্গীত উৎসবে ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন : ভাঙা ডালের কোষ থেকে জেগে ওঠে সবুজ-সজিব পত্র-পল্লব

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও অতিরিক্ত সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন বলেছেন, তুমুল ঝড়-ঝঞ্ঝায় সবুজ প্রান্তরে সকল বৃক্ষরাজি ধ্বংস হলেও কয়েকটি ডালপালা পড়ে থাকে। ঐ ডালপালাগুলোর মধ্য

যোগেন চৌধুরী : শূন্যতার মর্মবেদ

মইনুদ্দীন খালেদ দুঃসহ অভিজ্ঞতায় অস্তিত্বের প্রদাহে বদলে যায় মানুষের নিত্য-চেনা অবয়ব। ক্ষুরধার একটা অপয়া মুহূর্তের রিরংসায় মানুষ কি অতর্কিতে হয়ে যায় তার আপনজনের হন্তারক! পচনশীল

চক্র

সৈয়দ মনজুর কবির (পূর্ব প্রকাশিতের পর) মামা, আমরাতো তিন দিন আগের থেকেই ওরে খুঁজতেছিলাম। পুলিশ আধা ঘন্টা হইলো ওর লাশ দিয়া গেছে। কইলো পরশুদিন রাইতে