এখন সময়:- আজ: ---

এখন সময়:- আজ:
--

অচিন্ত্য আইচ-কে নিয়ে স্মৃতিগদ্য বিস্মরণের চাদরে ঢাকা সোনালী রোদ

শোয়েব নাঈম

 

অচিন্ত্য আইচ ছিলেন একাকিত্বের পূর্ণাঙ্গ মোহর, যিনি গোধূলীগামী সূর্যের সোনালি আভার মতন অনেক না-বলা কথার মোহর নিয়ে চলে গেছেন। তিনি নিঃসীম নিঃসঙ্গ একাকিত্বের মোহর নিয়েই কিংবদন্তি হয়েছিলেন। নিজের রক্তের ভেতর এতটা নিঃসীম নিঃসঙ্গতা না মেশালে এমন কিংবদন্তি হওয়া যায় না। এই কিংবদন্তির জীবন ছিল অজস্র শূন্যের মতো একা, যিনি বুক থেকে অবিস্মরণীয় সেই মৌনতার লতাতন্তু ছড়াতে ছড়াতে চলে গেছেন চিরতরে— ২০২৩ সালের শেষ তারিখে, ৩১ ডিসেম্বর জীবন আভার সব আলো নিভিয়ে, শীতের কুয়াশাঢাকা রাত্রিবেলায়, মাথা থেকে পায়ের সমান দূরত্বে শোক জমিয়ে, শূন্য থেকে শূন্যতায় বাতাসের নিরাকারে অস্ফুট নিঃশ্বাস ভাসিয়ে চিরতরে চলে গেছেন। মৃত্যুর চেয়ে আর কোনো দীর্ঘতর যবনিকা নেই। এক অর্থে জীবদ্দশায়ই তিনি বহুদিন থেকেই তিনি অন্তরালেই ছিলেন। জীবনকালে জনঅরণ্যে কোথাও তাঁর ঠাঁই হলো না, ঠাঁই হলো না প্রেমের সংসারে— ভালোবাসার স্ত্রী’র অকাল মৃত্যুতে। যেন জীবন থেমে থাকল তাঁর মধ্যপথের অজস্র শূন্যের মাঝখানে। কখনো কখনো আক্ষরিক সত্যের কাছে যুক্তিও মূর্ছা যায়। তাই স্মৃতির আকাশে তিনি ভেসে আসেন মেঘের মতো উদ্ভিন্নে, যেন মেঘের গায়ে টোকা দিলেই ঝরে পড়বে আমাদের চোখের জলে অশ্রুমোচনের মুহূর্ত। আমাদের অনেকের হারিয়ে যাওয়া এক অভিন্ন অস্তিত্ববোধের নাম— অচিন্ত্য আইচ। বুদ্বুদ দুঃখ নিয়ে অবিস্মরণীয় মৌনতায় পাড়ি দেওয়া দীর্ঘ এক পথের নাম— অচিন্ত্য আইচ। মৃত এক অতীতের নাম— অচিন্ত্য আইচ। কিছু মানুষের কিছু নিস্তব্ধ রহস্য থাকে, রহস্যরা তাকে ঘিরে জীবনতাড়িত অধিবৃত্ত রচনা করে। অচিন্ত্য আইচ অনেকের অনুভূতিতে ছিলেন— উদ্ভিন্ন মেঘে টোকা দিলেই গড়িয়ে পড়া চোখের জলের মতো, ঘনিষ্ঠদের চোখ থেকে গড়িয়ে পড়া অশান্ত সমুদ্রের লবণাক্ততার মতো। অচিন্ত্য আইচ অদ্ভুত নির্জনতার ভেতর তাঁর জীবনের শেকড় পুঁতে ছিলেন শিল্পের উৎকেন্দ্রিক ভাবনায়। যে উৎকেন্দ্রিক ভাবনার শিল্পীজীবন ছিল বিষাদাক্রান্ত মৌন নদীর মতন। কোনো এক ধ্রুপদি বিষণ্নতা এবং বেদনাহত সুপ্ত অভিমান, নদীর মতো তাঁর মনোপথকে অদৃশ্য সমুদ্রের দিকে নিয়ে গেছে। তিনি নদীর মতন সেই জীবনকে— আজীবন অন্তর্ঘাতময় অদৃশ্য কষ্টের গোপন অশ্রুবিন্দু দিয়ে সমুদ্রের কথা বলে গেছেন, হয়তো কারো কারো কাছে। জীবনের অন্য প্রকরণে তাঁর বিনম্র চামড়ার অভ্যন্তরে ছিল অজানা এক শিল্পের জন্য কান্না। জীবনের সাথে লেপ্টে থাকা সেই শিস্থিত জীবন, ব্যাধির মতন তাঁর দেহকে আর ছাড়ে নাই। অচিন্ত্য আইচের নৈঃশব্দ্যের চৌখুপি ফ্রেমে বাধা যে জীবন ছিল, তা’ থেকে গূঢ় আত্মজীবনী’র তালাশ পাওয়াটা বড় দুষ্কর। জীবনের বহির্বাস্তবার অনেক উপাদানকে পাশ কাটিয়ে মানসিক আনন্দই তার কাঙ্ক্ষিত ছিল। তিনি জীবনবোধের বিবিধ ভাবনা নিয়ে সারারাত চোখের কার্নিশে ঝুলে থাকেতেন, আর জীবনের অন্তর্নিহিত ও অদৃশ্য বাস্তবতাকে শৈল্পিক উন্মোচনে মেলে ধরতেন।

 

শিল্পের মায়াজাল নিয়ে এক মহাসৌম্যে তিনি উপনীত হলেন নিবিড়ভাবে ‘ফুলকি’র সাথে। একনিষ্ঠে ১৯৭৮ সাল থেকে ‘ফুলকি’ এর সাথে গর্বিতশিশু গড়ার মায়াময় কারিগরের মতন যুক্ত হোলেন। ‘ফুলকি’-তে শিশুদের যাবতীয় বিকাশধারাকে তিনি মুগ্ধস্তব্ধ জ্ঞানে ধ্যানের মতো প্রসারিত করেছিলেন। প্রায় ১৬ বছর!  সময়ের উদাসীন মর্যাদায় ‘ফুলকি’ ভরা স্বপ্ন নিয়ে তাঁর আত্মসংবেদী ও আত্মসন্ধানী শিল্পপ্রবণতাকে তুলে ধরেছিলেন। শিশুতোষ ভুবনের যে ভাষা, তিনি ছিলেন সেই ভাষার নির্বস্তুক ভাবের যথোচিত অভিব্যক্তি। সৃজন অনুসন্ধিৎসায় তিনি যেসব কাজগুলি করে যেতেন, এর সবই ছিল ‘ফুলকি’র স্বত্বাধিকার। নিভৃত সাধনায় ‘ফুলকি’র শিকড়ে তিনি প্রোথিত ছিলেন সেভাবে— ‘যেভাবে একটি পাখি নিমিষ নীলিমার দিকে তাকিয়ে গৌরবান্বিত করে নিজ আত্মার সকাল।’ তিনি ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, তাঁর কোমলপ্রাণ মমতায় কঠিন পাথর’ও নড়ে উঠতো। অচিন্ত্য দা’র কোনও ছাত্র ছিল না, তাঁর বোধের বন্ধনে ‘ফুলকি’র সবাই ছিল স্বাধীন নাগরিক। বয়স দিয়ে মানুষকে মাপা— এই বয়োঃবাদী সংস্কার থেকে আজীবন ছিলেন তিনি মুক্ত। এই ‘ফুলকি’ই ছিল তাঁর নিয়তি ও নিস্তার। এভাবে দিন-রাত ‘ফুলকি’ নিয়ে চিন্তাশীলতায় থাকতে থাকতে তাঁর পিঠ থেকে পিরামিড বের হয়েছিল। এই ‘ফুলকি’র প্রাঙ্গণই ছিল তাঁর ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাসে শিহরিত নির্জনতার উপচ্ছায়া। বিমূঢ় বিষাদ নিয়ে এই ‘ফুলকি’ আর নিবিড় একাকিত্ব, অচিন্ত্য দা’র জীবনে এক সুতোয় গাঁথা ছিল। সুতা জানেনা কাকে কতটুকু গেঁথে রেখেছিল দৃশ্যাতীত তুমুল যন্ত্রণায়। ‘ফুলকি’ শিশুনিকেতন পরিচালনায় ত্রিভুজের তিন বাহুর মতন তিনজন ছিলেন, ত্রিভুজের তিন শীর্ষবিন্দুর একজন ছিলেন অচিন্ত্য আইচ। সেই তিন আলোর গভীরে কোথাও ঘনীভূত হয় অন্ধকার, কোথাও হয়তো ছিল তাঁর ইচ্ছাবিভ্রমের দাগ। প্রতিষ্ঠানের অনেক নিয়মের বিরূপ ভাবনার পরিপন্থী হয়ে, ‘ফুলকি’র ট্রাস্টি বোর্ডের বোঝাপড়াগুলো থেকে সরে যেতে যেতে, অতঃপর পদত্যাগ করে, তিনি একা হতে হতে জন্ম-মৃত্যুর দুটি দাঁড়ির মাঝে একাকী থেকে  গেলেন। যেন ডিমের ভেতর থেকে চঞ্চুতে কষ্ট নিয়ে পাখি হয়ে উড়ে গেলেন। এভাবেই স্বখণ্ডন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ‘ফুলকি’র আত্মখণ্ডনের ইতিহাসটা তৈরি হয়ে গেলো। এই স্বখণ্ডনের ভাগীদার যারা, তারা সকলেই শ্রদ্ধেয়। ‘ফুলকি’তে তাঁর নিপুণ প্রবেশন এবং এখান থেকে তাঁর নিষ্ঠুর নিষ্ক্রমণ— অচিন্ত্যনীয় এক ঘটনা হয়ে রইল। আর আমরা দূর থেকে শুনতে পেলাম— ‘ফুলকি’র বাইরে লক্ষকোটি টনের নিঃশ্বাস আর ভাসমান অনেক গোঙানি। যেন মার্বেলের মতন গড়িয়ে গেছে তাঁর চোখগুলি, যা আমাদের সত্তার দেয়ালে ঠোকর খায়। যে চোখগুলির গর্ভে লুকিয়ে ছিল অব্যক্ত জীবনের খনিজ বেদনা। অচিন্ত্য দা’ যখন ‘ফুলকি’ ছেড়ে চলে যান, তখন অনেকেই দীর্ঘনিঃশ্বাসের মতন জানতে চেয়েছিলেন, ফুল না শেকড়— কে অধিক গুরুত্বপূর্ণ? তিনি ‘ফুলকি’র শিকড়ে যেমন প্রোথিত ছিলেন, জোড়া ফুল থেকে বিচ্ছেদের অন্য নামেও তিনি ছিলেন। বিচ্ছেদ যন্ত্রণা নিয়ে ‘ফুলকি’র প্রবেশপথ ছেড়ে যখন বেরিয়ে এলেন শেষবারের মতো, যে ফটকে ছিল নিজের রক্তছায়া, অবাধ ভালোবাসার প্রশ্রয়, সেখানে নিজের মতো করে আর কিছু রইল না। এরপর তিনি হয়ে গেলেন কর্মহীনের চেয়েও অনুদ্যোগী, নীরক্ত হয়ে বসে ছিলেন। আস্তে আস্তে সবার থেকে অনেক দূরে সরে গেলেন। নীরবে-নীরবে দুঃখ সয়েছেন অনেক, দুঃখই তাঁকে করে দিয়েছে দূরে সরে যাওয়ার পথ। এরপর বিস্মরণের চাদরের মতন নিজেকে চিরতরে ঢেকে ফেললেন। তাঁর মৃত্যুতে ‘ফুলকি’র ফুলগুলি এখন সেই সব সময়কে স্মরণ করে-করে এক অদৃশ্যের বেদনাকে অনুভব করে। তাঁর রোপণ থেকে বেড়ে ওঠা গাছেরা গড়ে তোলে শোকস্তব্ধতায় মানসিক আঘাতের উপনিবেশ।

 

অচিন্ত্য দা’র একাকী জীবনের বিপ্রতীপ কোণে  ছিল অনন্ত শিল্পবোধ। অচিন্ত্য দা’-কে ‘ফুলকি’তে আমি পেয়েছিলাম অভাবিত প্রাপ্তির এক মহিমার মতন, যিনি চারুকলা বিষয়ক আমার অনুভূতির উপর শিল্পের এক ঐশ্বর্যময় স্পর্শ বুলিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর সংবেদনশীলতার বিনীত মুখটি দিয়ে চারুকলার থুতনি  ওপরে ধরে তুলেছিলেন। যিনি সম্পর্কের অধিকারে  বিম্বিত করে গেছেন হৃদয়ের প্রশস্ততাকে। যেভাবে গতি দিলেন আমাদের যৌথ সম্পর্কের মাত্রাতে, সেখানে আমার ভিতর আগুন ধরিয়ে দিলেন শ্রদ্ধায় তাঁকে ভালোবাসতে। ‘অচিন্ত্য দা’— এই সম্বোধনে তিনি তখন ‘ফুলকি’র সবার মুখে মুখে। এই ডাকের নেপথ্যে ছিল না কখনো ছন্দের চারমাত্রার প্রভাব, অথবা ‘অচিন্ত্য দা’ তিন-এক অক্ষরে ভাগ হয়ে যাওয়া মাত্রায় শ্রবণজনিত কোনো সুবিধার কারণেই প্রিয় ছিলেন না। ওই চারমাত্রার কারণেই যাদের নাম তিন অক্ষরের, তাদের নামের পরে ‘দা’ যোগ হলে মানুষের কান অনেক স্বস্তি পায়— এমন কারণে অচিন্ত্য দা কখনোই সবার প্রিয় হয়ে উঠেননি। তখন ‘ফুলকি’ ছিল শিশুতোষ প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি চট্টগ্রামের শিল্প-সাহিত্যের ধ্বনিময় এক প্রাঙ্গণ, আর ছিল আড্ডা আধিক্যের মহাপ্রকৃতি। এই প্রাঙ্গণের প্রেরণা এবং এর পারিপার্শ্বিকতা অনেককেই সৃজনশীলতায় বিস্মিতভাবে গড়ে তুলেছিল। এখানে এসে আবিষ্কার করলাম আমার অজ্ঞতার গভীরতা। অন্তহীন সম্মোহনের মতো এই ‘ফুলকি’ প্রাঙ্গণ তখন আমাকে ধীরে-ধীরে তুলিয়ে নিয়ে যেতে লাগলো। যখনি ‘ফুলকি’তে আসতাম, সবসময় অচিন্ত্য দা’-কে দেখতাম, অনন্ত গভীরতায় সৃজনভারে তিনি চিন্তাগ্রস্ত এবং বিচিত্রবিন্যাস মনোভারে ইনসমনিয়ায় আক্রান্ত। তাঁর চোখের দিকে তাকালেই বুঝতাম—  অচিন্ত্য দা’র প্রায় প্রতিটি সকালই আসলে ক্লান্ত রাত্তির’ই উচ্ছিষ্ট ফলাফল এবং আগের রাত্তির প্রসারিত বেদনাবোধ।ব্যথা নিয়ে জেগে থাকা রাত উপশম দিবে বলে, মনে হয় তাঁর ভোর ফুটতো উন্মীলিত চোখ ছিঁড়ে। যতবার এখানে আসতাম, দেখা হলেই ‘ফুলকি’-তে তাঁর হাসির সম্ভাষণে আমাকে সম্বোধন করতেন। কিন্তু তাঁর এমন হাসিমুখ ছিল আত্মরক্ষাহীন জীবনের পলাতক হাসি। এমন হাসিমুখ দিয়েই আমার উপস্থিতিকে এক সংবেদে পরিচ্ছিন্ন করতেন। প্রতিপক্ষহীন মন্থরতায় ৭১ বছর আয়ুর সমান তাঁর এই জীবন ছিল— আয়ুর অস্পষ্ট কালহীনতার বিস্তার। যে অস্পষ্টতার কালহীনতায় ভেঙেছে আর গড়েছে রক্তের আর্তনাদ। আয়ুর সেই বছরগুলি তো জীবনসকালেই পান করে বসেছিল—  শিল্পবোধের হলুদ পাতার হেমলক, যে শিল্পবোধ এখন উজ্জ্বল করে রেখেছে তাঁর মৃত্যুর এপিটাফ। আত্মবিস্তারের রহস্যে মোড়ানো ছিল তাঁর বাস্তব, যিনি জানতেন উদ্ভাসনের ভিন্নতর দ্যােতনা এবং উপলব্ধির নির্জন সংকেত।

অচিন্তা আইচের দিকচিহ্নহীন জীবনের কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করলে বলতে হয়, অচিন্তা আইচ সম্পর্কে যারা ওয়াকিবহাল তারা জানতেন যে, অচিন্ত্য দা ছিলেন ক্রিকেটের তথ্য-মাতাল এক এলাহি ভক্ত। তাঁর প্রিয় ছিল ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ, যা তিনি রেডিওতে বিরতিহীনভাবে রানিং কমেন্ট্রিতে শুনতেন। প্রতি ওভারের বল-টু-বল উত্তেজনার ধারাবিবরণী টান টান উপভোগ করতেন। আমরা অনেকই সেই কমেন্ট্রির পাশে দাঁড়িয়ে তাঁর মানবিক সারল্যে ম্যাচ অনুভূতির প্রতিক্রিয়া শুনতাম, ‘ফুলকি’তে। রেডিওতে রানিং কমেন্ট্রি শুনতে-শুনতে ওঁনার বোধে অনেক শান্তি আসতো, তবে সেই বোধ কখনো জীবনানন্দীয় বোধ ছিল না। আত্মপ্রতিরূপের ন্যায় তাঁর ক্রিকেটবিলাসী এমন কাতরতা অনেকবার প্রত্যক্ষ করেছিলাম।

নৈঃশব্দ্যদূরত্বশাসিত একজন শিল্পী যেভাবে তাঁর কিংবদন্তিকে উদযাপন করে, অচিন্ত্য দা তেমনি করে তাঁর কিংবদন্তি সৃজন করতেন। কখনো কখনো সমবেত মৌনতা দিয়ে তিনি জাপানি প্রথায় ফুল দিয়ে ‘ইকেবানা’ শিল্পের সংমিশ্রণ ঘটাতেন। ফুলের অন্তহীনভাষ্যের মতন শিল্পেরজিজ্ঞসা করে তিনি ‘ফুলকি’ আয়োজিত কোনো অনুষ্ঠানে সাজিয়ে দিতেন। ফলত আমন্ত্রিত অতিথিদের অনুভবে এই শিল্প তখন বোধের অবিরাম মুহূর্ত গড়ে তুলতো। কখনো কখনো সৌন্দর্য-চেতনা, কখনো বা শৈলীর চমৎকারিত্ব, কখনো বা উপলব্ধির শিল্পরূপে মুগ্ধ হয়ে তিনি ‘ইকেবানা’ শিল্পের চর্চা করতেন। তিনি ফুলের এমন শিল্পবোধ দিয়ে ধারণাতীত শিল্পের অনন্ত প্রবাহকে প্রলুব্ধ করতেন। তিনি আত্মীকৃত করেছেন ‘ফুলকি’ প্রাঙ্গণে নানা জাতের ফুলের বাগানের বিস্তার করে। বিভিন্ন ফুলের বাগানচর্চা ছিল তাঁর নিজেরই অপর আদল, যা তিনি নিয়মিত করতেন নিজেরই আত্মার বিক্ষিপ্ততা কুড়িয়ে এনে পূর্ণাঙ্গতা নিশ্চিত করতে। নিজেকে ফুলের মধ্যে গুজিয়ে দিয়ে সরাসরি নিজের বোধের সৌরভ ছড়াতেন।

উনি আমাকে সবসময় ‘নইম’ বলেই সম্বোধন করতেন।সেখানে বয়সের কোনও সীমারেখা ছিল না,  সেখানে ছিল তাঁর মুক্তমনের চির তারুণ্যবোধ। ‘ফুলকি’র দোচালা টিনের নিচে, শাদা খদ্দের পাঞ্জাবি আর ঢোলা পাজামায় তিনি ক্লাসটেবিলের উপর বসে থাকতেন। সামনে এসে দাঁড়ালেই ফেসফেসে কন্ঠস্বরে বলতেন, ‘কেমন আছো নইম….. বোসো….’। প্রায় সময়ে ঠোঁটের কোণে তর্জনী ঠেকিয়ে কথা বলতেন । প্রায় দেখতাম আয়ু থেকে তাঁর সময় বের করে নিয়মিত ‘দেশ’ পত্রিকা পড়তেন। ‘দেশ’ পত্রিকা নিয়মিত পাঠে ও উপভোগে অনেক বেশি প্রসারিত ছিলেন। সেই ‘দেশ’ থেকে সুনীলের ‘পূর্ব-পশ্চিম’ এবং সমরেশ বসুর ‘দেখি নাই ফিরে’ ধারাবাহিক উপন্যাস নিয়মিত পাঠ করতেন।

এই ধারাবাহিক উপন্যাস দুইটি ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের হওয়া সত্ত্বেও, এই দুটির অব্যাহত পাঠের প্রতিক্রিয়ায় অচিন্ত্য আইচের চেতনের পরিমণ্ডলে তা সাহিত্যের একগুচ্ছ সংকেত হয়ে উঠেছিল। পাশাপাশি তাঁর অন্তর্গত প্রেরণায় সাহিত্যের অন্যান্য বই পাঠেও প্রলুব্ধ ছিলেন।

পোশাকের অনেক বিবর্তন দেখেছি, কিন্তু অচিন্ত্য দা’র গায়ে সবসময় থাকতো ঢিলেঢালা খদ্দের পাঞ্জাবি আর পাজামা। ফ্যাশনবোধের সঙ্গে শৈলীর পরাগায়নের কারুকার্যে পাজামা-পাঞ্জাবি পরিধান ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের স্মারকচিত্র। এই খাদিকে তিনি পোশাকের উদ্দিষ্ট শিল্পে রূপান্তরিত করে নিয়মিত তাঁর কিংবদন্তিকে উদযাপন করতেন। খদ্দরের অনভ্যস্ততার দূরত্বকে তিনি পুষিয়ে দিয়েছিলেন ফ্যাশনের নিপুণ অর্থময়তার বিনিময়ে। এমন অভ্যস্ততায় তিনি আজীবন খদ্দের পাঞ্জাবির পরিপূর্ণ নিটোল বলয় তৈরি করেছিলেন। এই শৃঙ্খলিত খাদির পোশাকই ছিল তাঁর ফ্যাশনসত্তার স্বাধীন সম্প্রসারণ। খদ্দের পাঞ্জাবি আর পাজামাকে নিছক পোশাক হিসেবে নয়, বরং তাঁর ফ্যাশনসত্তার স্বাধীন সম্প্রসারণ হিসেবে দেখলেই অচিন্ত্য আইচের সৃজনশীলতার পরিপূর্ণ আদলটি অনুধাবন করা যায়। এমন পোশাকের সারাৎসারে তিনি ছিলেন শৃঙ্খলমুক্ত কল্পনা ও অবচেতনের উৎসার। তাঁকে খাদি পোশাকের এমন পরিধানকে আমি নিখাদ নবরূপকারের যাপিত জীবনেরই উদ্ভাসনই মনে করি। খদ্দরের পাঞ্জাবিতে আপনাকেই মানায়— অচিন্ত্য দা-কে আমার এই কথাটা কোনোদিন বলা হয়নি। স্বপ্নসম্ভাবনার উচ্চাশী এই পৃথিবীতে অচিন্তা আইচ আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না।

‘ফুলকি’র শিক্ষাবিষয়ক কার্যক্রম, চারুকলা বিষয়ক তাঁর অবসেশান, বিভিন্ন মেলায় কারুকার্যময় স্টল নির্মাণ, ফ্যাশনমুখী দেশীয় কাপড়ের বুটিক শিল্প— এসব শাখায় ভাবুকতায় এবং সৃজনের মৌলিক দীপ্তিতে অচিন্ত্য আইচ আজীবন গুরুত্ববহ ছিলেন। শুধু ছিলেন না, তিনি শিল্পের আদর্শতম জায়গায় অবস্থান করছিলেন। মেলার স্টল স্থাপনায় তিনি ছিলেন কারুকার্যের জৌলুস। প্রচলপিষ্ট পৌনঃপুনিক কাজের ধারা এড়িয়ে তাঁর নতুন সংবেদনকে যথাযথভাবে প্রকাশের অনুকূল হয়ে উঠেছিলেন— গতশতকের শেষদশকে চট্টগ্রাম চেম্বার আয়োজিত ‘সি আই টি এফ’ এর শিল্পমেলায়। বিশাল টিম নিয়ে এই মেলাকে তাঁর সৃজনী ব্যক্তিত্বের স্বাতন্ত্র্য ও তীব্রতায় অনেক বেশি অর্থময় করে তুলেছিলেন। তাঁর টিমের আন্তরিক ইচ্ছাবিকাশের ভ্রুণে ‘সি আই টি এফ’ এর এই মেলা আন্তর্জাতিক বিন্যাস হয়ে উঠেছিল চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামে এই মেলা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল অভীক ওসমান, খালিদ আহসান এবং অচিন্ত্য আইচ— এই তিনেরই সংক্রমণে, তাঁদের মিতাচারী স্বভাবে, মিতব্যয়িতার প্রস্বরে এবং মহাইচ্ছার প্রলুব্ধে।

এরকম একজন মানুষ যখন চলে যান অনন্তের পথে, তখন পেছনে রেখে যান তাঁর উজ্জ্বল দীর্ঘ ছায়া। যিনি মানুষেরই ভূমধ্য তিমিরে লুকোতে চেয়েছিলেন বলে আরও দীপ্যমান হয়ে উঠেছিলেন। উজ্জ্বলতায় প্রখর অচিন্ত্য দা’র সেই ছায়া এখনও মানুষের মধ্যে আলো দেয়, ভাষা দেয়, অধিকন্তু তাঁকে ফিরে পাবার স্বপ্ন দেয় ঘোর। কেননা তাঁর মৃত্যু জীবনকে সমাপ্তি টেনেছে মাত্র, অস্তিত্বকে অস্তিত্বহীন করতে পারেনি এখনও। তিনি অস্তিত্বের পাশেই অনস্তিত্ব এক দৃশ্যমান মানবিক স্বরূপ উন্মোচন রেখে গেছেন পৃথিবীতে।

এমন অভিব্যক্তিতে অনুগত হয়ে এখন আমরা অনস্তিত্বের এক দৃশ্যমান মানবিক স্বরূপে তাঁর সাথে অন্তরঙ্গতা অনুভব করি। কিন্তু অচিন্ত্য আইচের নিঃসঙ্গতার সেই দিনগুলি নিয়ে আমাদের আর কোনোদিন জানা হবে না, তাঁর স্বপ্নগুলোর গভীরে কী ছিল তাঁর অনুভূতির দেওয়াললিখন। যে জীবনের গভীরে তাঁর স্বপ্নগুলি ভেসে গেছে মহিমাময় একাকিত্বে। শুধু আমরা অনুভূতির উদারায় আর মুদারায় মনোযোগী হয়ে বুঝতে পারি— অচিন্ত্য আইচ, নৈঃশব্দ্য আর মৌনতাকে পরিপক্ব করে তাঁর আত্মজীবনে লেপে দিয়েছিলেন বেদনার এক অভিরূপ। আর যিনি মৃত্যুর আগে সমস্ত লৌকিকতার উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করে গেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর এখনও আমরা বহন করে চলেছি তাঁর সমাপ্তির ভার।

 

শোয়েব নাঈম, সাহিত্যকর্মী, চট্টগ্রাম

‘কল্লোল যুগের পরে’ অগ্রগতি’র কথা

ইসরাইল খান এই রচনাটির শিরোনাম হতে পারে—‘ত্রিশের দশকের সাহিত্যান্দোলন ও সাপ্তাহিক অগ্রগতি (১৯৩৫-৩৯)’। কিন্ত তার দরকার নেই । ‘অগ্রগতির কাহিনী’ নামে গল্পটা বলি—। ঊনিশ শতকে

তরুণ লেখক আতিকুর রহমান’র আরবে মুসাফির গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান

তরুণ লেখক আতিকুর রহমান আতিক’র লেখা আরবে মুসাফির গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর পিটস্টপ হল রুমে আবির প্রকাশন-এর নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ নুরুল আবসার’র

অপূর্ণতার ভেতর পূর্ণ এক সৃজনযাত্রা : কামরুল হাসান বাদল

এজাজ ইউসুফী কোনো লেখককে মূল্যায়ন করা সহজ নয়, বিশেষত যখন তার সৃজনী কাজের বিস্তার একক কোনো সাহিত্যধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কবিতা, গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ,

উদীচী’র সুর-আলেখ্য ‘একতারা ও রবীন্দ্র – বীণা’র অনুরণন

অনিন্দিতা অনি   অন্ধকার মঞ্চ। শিল্পীবৃন্দ সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন, সঙ্গে তালবাদকেরা। হঠাৎ মঞ্চের মাঝখানে গোল হয়ে নেমে এলো এক আলোকরশ্মি। দুহাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন এক

চক্র

সৈয়দ মনজুর কবির   দরজায় অনবরত হাত চাপড়ানোর ধুপ ধুপ শব্দে সিহাবের সকালের মজার ঘুমটা যায় ভেঙে। মেজাজটা যায় বিগড়ে। এভাবে দরজায় শব্দ তো কারো