এখন সময়:- আজ: ---

এখন সময়:- আজ:
--

“আন্দরকিল্লা” জানুয়ারি’২৬ সংখ্যার পাঠ-প্রতিক্রিয়া

শিশির মল্লিক

কাগজটি প্রকাশনার বয়স ২৮। আর এটির প্রথম সংখ্যা আমার হাতে আসে ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে। তাও আমার একটি লেখা প্রকাশের সুবাদে। লেখাটি চেয়েছিলো অনুজপ্রতিম চিত্রশিল্পী কিংশুক দাশ চৌধুরী। আমি কাগজটি হাতে পেয়ে কভার থেকে এক এক করে পুরোটি মনোযোগ সহকারে দেখি। দেখি এ কারণে যে রাজধানীর বাইরের নাগরিক মানুষের চিন্তার বিকাশ বুঝবার আগ্রহ থেকে। কাগজটা পুরো দেখার পর সম্পাদকের নামটি পুনরায় দেখি, চেনার চেষ্টা করি। চিনতে পারিনি, হয়তো আমারই ব্যর্থতা। তবে সম্পাদক নুরুল আবসারের প্রতি কৌতূহল জেগে গেলো। কারণটা এই যে, কাগজটি আমাকে আকর্ষণ করেছে বলেই। আঙ্গিক সৌষ্ঠব তো বটেই, সেই সাথে লেখার বিষয়বস্তুকে সাজানোর মধ্যে সময়কে প্রতিনিধিত্ব করার যে দায় একজন সম্পাদকের থাকে, সেটা আমি এই “আন্দরকিল্লা” নামক কাগজের সম্পাদক নুরুল আবসারের মধ্যে পেয়েছি। তাকে অভিবাদন জানাই। এবং সম্পাদকীয়তে তিনি যে প্রত্যয়, আশাবাদ ও আহ্বান রেখেছেন তা বেশ তাৎপর্যবহ।

চট্টগ্রামের বুদ্ধিবৃত্তিক আড্ডা ও সম্মিলনের স্থান হলো মোমিন রোড ও জামালখানের সংযোগ স্থল চেরাগী পাহাড়ের মোড়।

এখানে যে মনুমেন্টটি রয়েছে তা স্থাপত্য শিল্পের এক নান্দনিক আলেখ্য বলা যায়। এবং প্রচ্ছদে সেটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে এনেছেন প্রচ্ছদ পরিকল্পক শোয়েব নাঈম। রংয়ের যে সুস্মিতি দেখি তা সত্যি প্রশংসনীয়। তবে পত্রিকার নিমোনিকটি আমার দৃষ্টিতে দুর্বল বলে মনে হয়েছে। একটি সাহিত্য পত্রিকার নিমোনিক যতোটা শৈল্পিক রূপ দেয়া যায় সেই চেষ্টা থাকা ভালো।

প্রচ্ছদ শিরোনাম, চেরাগীর শিখায় প্রত্যয়ের বছর। সম্পাদক চেরাগীর চত্বরকে কেবল স্থানিক পরিসর নয়, বুদ্ধিবৃত্তিক আলোর পরিসর বলে উল্লেখ করেছেন। যেখানে “মতভেদ যেমন সহঅবস্থান করে, তেমনি ভিন্ন মতও নির্মিত হয় … কথোপকথনের মধ্য দিয়ে এবং নাগরিক বুদ্ধিবৃত্তিকতার এক অবিরাম অনুশীলন চেরাগীর পরিসরে নিরন্তর চলতে থাকে। এভাবেই চেরাগীর এই নিরবচ্ছিন্ন আড্ডা ক্রমশ গড়ে তুলছে নাগরিক বুদ্ধির এক অবিনাশী তাত্ত্বিক গলি, যেখানে বিবিধ আলোচনা ও বিতর্ক হয়ে ওঠে নতুন বোধের অন্তত উপভোগ্য। ”

নতুন বছওে সম্পাদক আহ্বান রাখেন, “… আত্মসমালোচনার সাহস, মানবিক জাগরণের সংবেদন এবং সৃষ্টিশীল প্রত্যয়ের দৃঢ়তায় নির্মিত এক অর্থবহ সময়চেতনার।”

কামনা করেন, “এই বছরটি হোক চিন্তার পুনর্বিন্যাসের, বিবেকের পুনর্জাগরণের এবং সৃজনশীল অনুশীলনের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। যেখানে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়েই নিজ নিজ সীমা অতিক্রম করে মানবিকতার বিস্তৃত পরিসরে প্রবেশ করতে পারে।

প্রত্যাশা করেন, “প্রশ্নকে ভয় নয়, বরং এই সময় যেন এক বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করে। যেখানে মতভেদ বিভাজনের কারণ নয়, বরং মতভেদ সংলাপের সূত্র হয়ে উঠবে; এবং যেখানে সৃজনশীলতা কেবল শিল্পের ভেতর সীমাবদ্ধ না থেকে সামাজিক দায় ও নৈতিক প্রত্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অর্থবহ রূপ লাভ করবে।”

জাতি গঠনে একজন সৃজনশীল চর্চার মানুষের চাওয়া এমনটিই তো হওয়া চাই। তার প্রত্যাশা তখনই পূর্ণতার পথে এগোবে যখন দেশের মানুষ শিল্প সাহিত্য বিজ্ঞান মনস্ক সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠবে। সম্পাদক নুরুল আবসার তার কাগজের মাধ্যমে সেই কাজটি নিভৃতে করে চলেছেন।

আসি ভিতরের কনটেন্ট নিয়ে। আমি সময়োপযোগী বলেছি একারণে যে, জুলাই আন্দোলনের পর স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের যে স্তম্ভগুলোকে আমরা আমাদের অহংকার মনে করি, তার ওপর আঘাত ও ভিন্ন ন্যারিটিভ উপস্থাপনে। এটি বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আওয়ামী শাসন দেশের জন্য দুঃশাসন ছিলো না। কিন্তু সেটি একটি দলের হতে পারে। সেই দল প্রত্যাখ্যান করা আর দেশের স্বাধীনতা, ভাষা-সংস্কৃতি ঐতিহ্য কৃষ্টি ও সম্প্রদায়গত সম্প্রীতিকে অস্বীকার করা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ লক্ষ্যণীয় যে, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে সবচেয়ে সমালোচিত ও প্রত্যাখ্যাত রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী ও বিভিন্ন ধর্মীয় রাজনীতির দাবিদার দলগুলোর অতি উচ্ছ্বাস। এই উচ্ছ্বাসের তোড়ে তারা আওয়ামী লীগকে কবর দিতে যেয়ে বাংলাদেশ নামক বিগত ৫৪ বছরে যে আইডেন্টিটি তৈরি হয়েছে; বহির্বিশ্বের কাছে আমাদের জাতিগত যে পরিচয় তাই যেন অর্থহীন এবং তুচ্ছতার দিকে নিয়ে গেছে; তারা তার সাথে সাথে এটিও ভুলে গেছে যে, আমরা এখন পশ্চিম বাংলার সাথে পার্থক্য টানতে যেয়ে নিজেদের বাঙালি বলছি না বলছি বাংলাদেশি। কিন্তু জাতিসত্তা হিসেবে আমরা বাঙালিই। এই জাতিসত্তার ঐতিহাসিক সুদীর্ঘ ঐতিহ্য ও কৃষ্টি রয়েছে। যাকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। আমাদের নৃতাত্ত্বিক, ভাষা ও সংস্কৃতি আমাদের অহংকার। আমাদের নদীমাতৃক ভৌগোলিক পরিবেশ আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনকে বিনির্মাণ করেছে। আমাদের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর রয়েছে সুদীর্ঘ কৃষি ঐতিহ্য। আমাদের ভাব আবেগ অনুভূতি এই মাটি ও পরিবেশ দ্বারা সুগঠিত। যা তুর্কি, আরব, পারস্য কিংবা ইংরেজ ভাষা সংস্কৃতি কৃষ্টি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই যারা চান ধর্মের পরিচয়ে অন্য জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য চাপিয়ে দিতে সেটা ইতিহাসের আলোকে বিবেচনার দাবি রাখে। এখানে তো সবাই এসেছে, তারা আমাদেরকে তাদের করে ফেলতে পারেনি। আমরা বাঙালিই আছি। বরং তারা এসে আমাদের সাথে মিশে গেছে। আমরা তাদের হজম করে ফেলেছি।

ধর্মের ভিত্তিতে আমাদের পূর্বপুরুষরা পাকিস্তান সমর্থন করেছে। পাকিস্তান পবিত্র স্থান হয়নি, তারা আমাদেরকে হেয় ভেবেছে। আমাদের শাসন করা যায় ভেবেছে। তাদের জাত্যাভিমান একাত্তরে ধর্মের পরিচয়ে গণহত্যা চালাতে ঠেকেনি। আমাদের ভাষা সংস্কৃতি তো বটেই আমরা যেন রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্য নই। আমরা পাকিস্তান শাসন করবো এটা মানতে পারেনি। নির্বাচিত দল আওয়ামী লীগকে তাই ক্ষমতা দেয়নি। সেটা যুদ্ধ করে অর্জন করে নিতে হয়েছে।

আমার এটুক বলতে হলো এ কারণে যে, বাঙালি মুসলিম সমাজকে জাগানোর যে প্রচেষ্টা বিগত তিরিশের দশকে হয়েছে তার অন্যতম সংগঠন মুসলিম সাহিত্য সমাজের মুখপত্র ‘শিখা’ কে নিয়ে লেখক ইসরাইল খানের সুগঠিত একটি লেখা সম্পাদক শুরুতেই উপস্থাপন করেছেন। এটি চমৎকার একটি নির্যাস, যার মাধ্যমে শিখা গোষ্ঠীর সকল সৃজনশীল মানুষ ও তাদের ভাবনাকে পাঠক বুঝে নিতে পারবেন। শিখারও সূচনা হয়েছে ধর্মের বাড়াবাড়ির প্রেক্ষাপটে; বর্তমান সময়ে তার উপযোগিতা খুবই প্রাসঙ্গিক। লেখক ও সম্পাদককে এজন্য সাধুবাদ জানাই।

পরের লেখা সদ্য প্রয়াত আমাদের দেশের গুণী সাহিত্যিক সুকুমার বড়ুয়ার স্মরণে লেখক সনজীব বড়ুয়ার একটি সংক্ষিপ্ত আলেখ্য উপস্থাপনা। মাসুদুল হকের কলমে উঠে এসেছে কবি আল মাহমুদের ছোটগল্পে লোকঐতিহ্য ও লোকাচার বিষয়ক আলোচনা। প্রবীর বিকাশ সরকারের ‘দুটি রবীন্দ্র-দলিল ও শিল্পী কাম্বে তোমোকো নামক প্রবন্ধ। গৌতম কুমার রায়ের লালনের মৌল উপলব্ধির পাণ্ডুলেখ্য ‘মানুষ খুঁজে পাবি প্রভুর ঠিকানা’ এর মতো গুরুত্বপূর্ণ লেখা। সেই সাথে রয়েছে চিত্রকলা গল্প কবিতা ও অন্যান্য।

সুচিন্তিত সম্পাদনা ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিগত আটাশ বছর যাবত যে যাত্রা তা অব্যাহত থাকুক। আলো ছড়াক আমাদের জাতির মানস গঠনে। পাঠকদের বলি বই পড়া কিংবা জ্ঞান অর্জনে আপনার চারপাশের মানুষকে উজ্জীবিত করুন। বিকল্প নেই জাতি হিসেবে আমরা সুন্দর হয়ে ওঠার আর কোন পথ…। শুভকামনা আন্দরকিল্লার জন্য।

ছোটখাট কিছু ত্রুটি সংশোধনে আন্দরকিল্লা আরো যত্নশীল হবে বলে আমার বিশ্বাস। কিছু ইংরেজি শব্দ ভেঙে গেছে চোখে পড়লো।

 

শিশির মল্লিক, চারুশিল্পী, আদাবর, ঢাকা

‘কল্লোল যুগের পরে’ অগ্রগতি’র কথা

ইসরাইল খান এই রচনাটির শিরোনাম হতে পারে—‘ত্রিশের দশকের সাহিত্যান্দোলন ও সাপ্তাহিক অগ্রগতি (১৯৩৫-৩৯)’। কিন্ত তার দরকার নেই । ‘অগ্রগতির কাহিনী’ নামে গল্পটা বলি—। ঊনিশ শতকে

তরুণ লেখক আতিকুর রহমান’র আরবে মুসাফির গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান

তরুণ লেখক আতিকুর রহমান আতিক’র লেখা আরবে মুসাফির গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর পিটস্টপ হল রুমে আবির প্রকাশন-এর নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ নুরুল আবসার’র

অপূর্ণতার ভেতর পূর্ণ এক সৃজনযাত্রা : কামরুল হাসান বাদল

এজাজ ইউসুফী কোনো লেখককে মূল্যায়ন করা সহজ নয়, বিশেষত যখন তার সৃজনী কাজের বিস্তার একক কোনো সাহিত্যধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কবিতা, গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ,

উদীচী’র সুর-আলেখ্য ‘একতারা ও রবীন্দ্র – বীণা’র অনুরণন

অনিন্দিতা অনি   অন্ধকার মঞ্চ। শিল্পীবৃন্দ সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন, সঙ্গে তালবাদকেরা। হঠাৎ মঞ্চের মাঝখানে গোল হয়ে নেমে এলো এক আলোকরশ্মি। দুহাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন এক

চক্র

সৈয়দ মনজুর কবির   দরজায় অনবরত হাত চাপড়ানোর ধুপ ধুপ শব্দে সিহাবের সকালের মজার ঘুমটা যায় ভেঙে। মেজাজটা যায় বিগড়ে। এভাবে দরজায় শব্দ তো কারো