এখন সময়:রাত ১১:৪৫- আজ: বুধবার-১২ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

এখন সময়:রাত ১১:৪৫- আজ: বুধবার
১২ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২৯শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

চক্কর – মূল : গুলাম আব্বাস

ভাষান্তর: জ্যোতির্ময় নন্দী

[ বিশিষ্ট উর্দু গল্পকার গুলাম আব্বাসের জন্ম ১৯০৯ সালে অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের অমৃতসরে। উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালেই তাঁর লেখালেখির সূত্রপাত এবং নিতান্ত অল্পবয়সেই তিনি তাঁর প্রতিভার স্বীকৃতি অর্জন করেন। ১৯২৭ থেকে ১৯৩৮ পর্যন্ত তিনি জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ শিশু সাময়িকী ‘ফুল’-এর সম্পাদক ছিলেন। সাময়িকীটাতে সুপরিচিত সাহিত্যিকদের লেখা গল্প-উপন্যাস ছাপানো হতো। অল ইন্ডিয়া রেডিও’র প্রোগ্রাম জার্নাল ‘আওয়াজ’-এর সম্পাদক হিসেবেও তিনি কাজ করেছেন। ১৯৪৭-এ ভারত ভাগের পর তিনি পাকিস্তানে চলে যান এবং সেখানে রেডিও পাকিস্তানের জার্নাল ‘আহাং’-এও প্রায় একই পদেই কাজ করেন। ১৯৫১ থেকে ১৯৫৪ পর্যন্ত তিনি বিবিসি-তেও কাজ করেছেন উর্দু অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে। আব্বাসের লেখার আসল গুণ হলো তাঁর ভানহীন, সাবলীল, সোজাসাপ্টা গদ্যশৈলী। তিনি খুব বেশি গল্প লেখেন নি (দীর্ঘ লেখক জীবনে মাত্র ঊনচল্লিশটি), কিন্তু তারপরও বহু গুরুত্বপূর্ণ ও কৌতূহলোদ্দীপক কারণে তিনি উর্দু ছোটগল্পের ধারায় একটা উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছেন। তাঁর লেখা অনেক ছোটগল্প অসামান্য পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে, বিশেষ করে তাঁর প্রথম গল্পসংগ্রহ ‘আনন্দী’-তে অন্তর্ভুক্ত একই নামের গল্পটি। সুদীর্ঘ পাঁচ দশকব্যাপী তাঁর লেখক জীবনে তিনি কমপক্ষে দুটো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাববিস্তারী সাহিত্য আন্দোলনের সংস্পর্শে এসেছেন, কিন্তু তিনি কোনোরকম আরোপিত রাজনৈতিক বা দার্শনিক মতবাদের সঙ্গে একাত্ম হতে অস্বীকার করে সবসময় নিজের মতে ও পথেই অনড় থেকেছেন। চিরদিন তিনি সাধারণ মানুষের (অনন্য)সাধারণ জীবন নিয়েই লিখেছেন বা লেখার ইচ্ছে পোষণ করে এসেছেন। উর্দু ভাষায় তাঁর লেখা ‘চক্কর’ গল্পটি বিশ্ববিশ্রুত রুশ লেখক আন্তন চেখভের একটা বিখ্যাত গল্পের কথা মনে করিয়ে দিলেও, গুলাম আব্বাসের গল্পটির শেষাংশে একটা অপ্রত্যাশিত মজার মোচড় রয়েছে, যা হলো মানবেতর প্রাণী ঘোড়া হয়ে কেরানিবাবুর পুনর্জন্মের আকাক্সক্ষা। সুলেখক গুলাম আব্বাস শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন লাহোরে ১৯৮২ সালে। ]

 

শেঠ চান্নামলের কেরানি চেলারাম সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত শেঠজির কোঠিতে হিসাবপত্র রাখা এবং অন্যান্য দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত থাকেন। ঠিক তারপর তিনি বের হন পাওনা আদায়ের কাজে। একবার জ্যৈষ্ঠ মাসের এক বিকেলে যে-কাপড়ের

 

 

থলেটায় তিনি কাগজপত্র ইত্যাদি রাখেন সেটা তুলে নিয়ে শেঠজির সামনের দিককার কামরাটার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন।

শেঠজি তখন তুলো ঠাসা কোলবালিশটায় হেলান দিয়ে লম্বা নলওয়ালা হুঁকো টানছিলেন। চেলারামকে দেখতে পেয়ে তিনি দরজায় ঝোলানো চিকের আড়াল থেকে হাঁক দিলেন, “ও কেরানিবাবু, ওয়াসায় একবার যেতে ভুলবেন না, এবং আজকে ব্যাংকে টাকা জমা করার কথাটাও মনে রাখবেন। আর ওই রেজিস্টার্ড চিঠিগুলো, ওগুলোও খুব জরুরি। আশা করি আমার ডাক্তারের প্রেসক্রিপশানটা আর বইয়ের লিস্টটাও সঙ্গে নিয়েছেন?”

 

চেলারাম সবগুলো মনে করিয়ে দেয়ার জবাবে ‘হ্যাঁ’ বলে বেরিয়ে গেলেন।

 

তাঁর বয়স পঞ্চাশ বা তার কিছু কম-বেশি, কিন্তু শরীরটা এখনো বেশ মজবুত। পরিষ্কার বোঝা যায়, যৌবনে নিশ্চয় তিনি বেশ স্বাস্থ্যবান, সুদেহী ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর পোশাক-আশাক সব ঋতুতেই একই রকম– ঘরে কাটা সুতোর কাপড় দিয়ে বানানো একটা লম্বা, ঢোলা শার্ট, একটা মোটা মলমলের ধুতি, একটা চেক-কাটা কাপড়ের কোট, কালো টুপি, এবং কিড লেদারের জুতো। যেহেতু রোজ তাঁকে প্রচুর হাঁটতে হয়, তাতে বুটজুতো বা চপ্পলের তুলনায় এ-জুতোগুলোই টেকে বেশিদিন। প্রথম প্রথম জুতোগুলো তাঁর পায়ে কামড়াতো খুব, কিন্তু ক্রমে পায়ের গাঁটে এবং আঙুলগুলোতে কালো কড়া পড়ে যাওয়ার পর থেকে আর ব্যথা লাগে না।

 

ওপরে বর্ণিত পোশাক-আশাক ছাড়া হাতির দাঁতের ফ্যাশানেবল বাঁট লাগানো একটা পুরোনো ছাতাও তাঁর নিত্যসঙ্গী। একসময় ছাতাটার মালিক ছিলো শেঠজির বড় ছেলে। কিছুদিন আগে সে ছাতাটা ফেলে দেয়। ছাতাটা তাঁদের ঘরে আর কোনো কাজে লাগবে না বুঝতে পেরে শেঠ চান্নামল এটা কেরানিবাবুকে দিয়ে দেন। কিন্তু ছাতাটার জন্যে চেলারামকে বিস্তর দাম দিতে হয়, যে-কথায় আমরা পরে আসছি। অতীতে তীব্র গরমের মাসগুলোতে কেরানিবাবুকে ঘন ঘন নানা ছুটকো কাজে দূর-দূরান্তে পাঠাতে গিয়ে শেঠজির মন খানিকটা খচখচ করতো। কিন্তু এখন, ছাতাটা দেয়ার পর থেকে তাঁর বিবেক সেই অপরাধবোধ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

 

কেরানিবাবু যখন বাইরে বেরিয়ে এলেন, সূর্য তখন পুরোপুরি মাথার ওপর। দেয়ালগুলোর ছায়া ছোট হতে হতে সামান্য রেখায় পরিণত হয়েছে, যা বার বার ভেঙে ভেঙে রাস্তার ধার বরাবর চলে গেছে মাইলের পর মাইল। রোদের তেজ এত তীব্র এবং জোরালো যে, চোখ আপনাতেই কুঁচকে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এমনকি বন্ধ চোখের পাতার নিচেও আলো চুঁইয়ে ঢুকে অন্ধকারের মধ্যে আলোর ফুলঝুরি ফুটিয়ে তোলে। চেলারাম যদিও তাঁর ছাতাটা খুললেন, জীর্ণ কাপড়ের ছাঁকনি দিয়ে রোদ গলে এসে তাঁর মুখে পড়তে লাগলো গরম জ্বরো নিঃশ্বাসের মতো।

 

চেলারাম হাঁটতে লাগলেন, জ্যৈষ্ঠের তপ্ত গরম বাতাসের জাপটার একের পর এক চপেটাঘাত থেকে নিজের মাথা আর বুকটা বাঁচাতে এক বিশেষ কৌণিকভাবে ছাতাটা ধরে। কোঠি থেকে তখন নিশ্চয় তিনি দুশ গজের মতো এগিয়ে গেছেন, এমন সময় তিনি তাঁর থলেটা ছাতার বাঁটে ঝুলিয়ে দিলেন এবং কোটের পকেট হাতড়িয়ে এক প্যাকেট বিড়ি এবং একটা

 

 

দেশলাই বের করে আনলেন। একটা বিড়ি ধরিয়ে তিনি গভীরভাবে ভাবতে লাগলেন, কীভাবে কিছুটা কম হেঁটে তাঁর ওপর ন্যস্ত বিভিন্নমুখী দায়িত্বগুলো সম্পন্ন করা যায়।

 

আজকে তাঁকে আলাদা আলাদা ছজন লোকের কাছ থেকে পাওনা আদায় করতে হবে। এদের মধ্যে দুজন কাছেই থাকে, কিন্তু বাকি চারজন থাকে শহরের ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে। এদের কাছ থেকে টাকা জোগাড় করার আগপর্যন্ত তিনি ব্যাংকে যেতে পারবেন না, এবং ব্যাংকের ক্যাশিয়ার বেলা তিনটের মধ্যে জানালা বন্ধ করে দেয়। এ ছাড়া আছে কিছ জরুরি রেজিস্টার্ড চিঠি যেগুলো সেদিনই ডাকে দিতে হবে। কোঠি থেকে বেরুনোর সময়ও শেঠজি পইপই করে ওগুলোর কথা বলে দিয়েছেন। আজকাল ডাকঘরগুলোতে লোকের এমন ভিড় যে, এ চিঠিগুলো ডাকে দিতে অন্ততপক্ষে একটি ঘন্টা সময় লেগে যাবে। তাঁকে রেল স্টেশনের গুদামে যেতে হবে, যেটাতে তাঁর সময় লাগবে কমপক্ষে এক থেকে দেড় ঘন্টা। এসবের পর তাঁকে যেতে হবে শেঠজির স্ত্রীর প্রেসক্রিপশান অনুযায়ী ওষুধ এবং তাঁদের সদ্য ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ দ্বিতীয় পুত্রের বুক লিস্ট অনুযায়ী পাঠ্যবই কিনতে।

 

তাঁর ছোটাছুটির যাবতীয় কাজ সমাধা হতে হতে সন্ধ্যে ছটা বাজলো, যার জন্যে ধন্যবাদ তাঁর কিড লেদারের জুতো, তাঁর বিড়ির প্যাকেট, এবং রাস্তার ধারে ধারে পৌর কমিটির বানানো ছাউনিতে আর সেইসাথে কিছু দয়ালু মনের ব্যবসায়ীর দোকানের সামনেও রাখা শীতল জলকে। তিনি পুরো রাজধানী এমনভাবে ঘুরলেন যেন কোনো বহুদূরের দেশ থেকে আসা এক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ পর্যটক, যে এই বিখ্যাত প্রাচীন শহরের প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি বাজার পায়ে হেঁটে ঘোরাটা বাধ্যতামূলক বলে মনে করে। তপ্ত লু হাওয়ায় যখন কষ্ট হয়, নিজেকে অন্যমনস্ক করার জন্যে তখন তিনি একটা বিড়ি ধরান। বিড়ির ধোঁয়া যখন তাঁর গলা শুকিয়ে দেয়, পথের পাশের ছাউনি থেকে ঠান্ডা জলে গলা ভিজিয়ে নেন। তাঁর জুতো দুটোর ভেতরটা যখন বালিতে ভরে যায় কিংবা এমনিতেই ভীষণ তপ্ত হয়ে উঠেছে বলে মনে হয়, তখন তিনি কোথাও ছায়ায় দাঁড়িয়ে জুতোগুলো পা থেকে খুলে ভালো করে ঝেড়ে নেন। এবং সেখানে হাতের কাছে কোথাও পৌরসভার জলের কল থাকলে তিনি তাঁর পা দুটোও ভিজিয়ে নেন, ঠিক যেভাবে ঘোড়ার গাড়িওয়ালারা তাদের গাড়ির চাকা খুব বেশি গরম হয়ে গেলে ভিজিয়ে ঠান্ডা করে নেয়।

 

যখন তিনি কোঠি থেকে রওনা হয়েছিলেন, সারা দিনের ছোটাছুটির এই কাজগুলো তাঁর কাছে মনে হয়েছিলো পাহাড়সমান। কিন্তু এখন তিনি নিজেই ভেবে অবাক হয়ে যাচ্ছিলেন যে, কত সুন্দরভাব তিনি সবগুলো কাজ সুসম্পন্ন করেছেন; যেনতেনভাবে নয়, বরং এমনভাবে যা তাঁর কর্তাকে সন্তুষ্ট করবে। দেনাদারদের মধ্যে শুধু একজনই তাঁকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রাখার পরও টাকাটা দেয় নি। প্রেসক্রিপশানের ওষুধ কিনতেও তাঁকে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে, কারণ যে-ডিসপেনসারিতে শেঠ চান্নামলের অ্যাকাউন্ট রয়েছে, সেখানকার কেমিস্ট চেলারামকে পছন্দ না-করায় তাঁকে ওষুধগুলো দিয়েছে সবার শেষে। তবে চিঠি ডাকে দেয়ার কাজে তাঁকে তেমন দাঁড়িয়ে থাকতে হয় নি, কারণ তিনি কম জনাকীর্ণ, প্রত্যন্ত এলাকার একটি ডাকঘর বেছে নিয়েছিলেন; সেখানে যে একটা ডাকঘর আছে বা থাকতে পারে সেটাই বেশির ভাগ লোকের জানা নেই। রেল স্টেশানের গুদামের কাজটায় শুধু ওখানে ঘুরে আসতেই হয়েছে, কারণ যে-মালগুলো আসার কথা এখনো আসে নি।

 

কোঠিতে যখন তিনি ফিরে এলেন, রোদের তীব্রতা তখন মরে এসেছে। রাস্তাগুলোতে জল ছিটোনোয় সেখান থেকে গরম একটা ভাপ উঠে আসছে। ঠান্ডা করার বদলে এতে বরং তৈরি হয়েছে এক দম বন্ধ করা গুমোট পরিবেশ। শেঠজির সামনের কামরা থেকে হাসি এবং কথাবার্তার আওয়াজ তাঁর কানে ভেসে এলো এবং দরজায় পৌঁছে ঝোলানো পর্দার ঠিক বাইরেটায় তিনি একটু থমকালেন। গলার স্বরগুলো তিনি খুব ভালোভাবেই চিনতে পারছেন। একটা স্বর শেঠ বঙ্কেবিহারীর, যে কিনা শেঠ চান্নামলের প্রতিবেশী এবং আবার দূরসম্পর্কের আত্মীয়ও। সেও একজন মহাজন, তবে তার ব্যবসাটা ছোট। শেঠ বঙ্কেবিহারী সাধারণত সন্ধ্যে ছটা নাগাদ দোকান বন্ধ করে শেঠ চান্নামলের সঙ্গে গল্পগুজব করতে আসে। বেশির ভাগ সময়ে বঙ্কেবিহারী তার সঙ্গে করে এক বিজনেস কন্ট্রাক্টরকেও নিয়ে আসে। এই বন্ধুটি এলিট মহলে একজন চমৎকার আলাপি লোক এবং জোকস আর চুটকি গল্পের ভা-ার হিসেবে সুপরিচিত।

 

তারপর সেখানে রয়েছে শেঠজির শালা। সে হচ্ছে একজন অকম্মার ঢেঁকি, আপাদমস্তক দেউলে একজন মানুষ। শেঠজির এঁটোকাঁটা খেয়েই বেঁচে আছে। এই শালাবাবু আবার এসব ঘরোয়া গল্পগুজবের আড্ডায় যোগ দিতে ভালোবাসে। ওদিকে শেঠজিরও এসব আড্ডা ভীষণরকমের পছন্দ, কারণ নিজের কামরায় সারাদিন একা একা শুয়ে-বসে, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে তিনি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং বাড়িতে এসব ছোট জমায়েত তাঁকে যথেষ্ট বিনোদনের যোগান দেয়।

চেলারাম দরজার মুখে দাঁড়িয়ে কয়েকবার ভদ্রভাবে খুকখুক করে কাশলেন, কিন্তু শেঠজি বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় এমন মগ্ন যে, সে-কাশি তাঁর কানে ঢুকলো না। শেঠ বঙ্কেবিহারীর ঠিকাদার বন্ধু তখন জন্মচক্র আর পুনর্জন্ম নিয়ে কথা বলছিলো। সে বলছিলো:

 

ভদ্রমহোদয়গণ, এ-ব্যাপারটা নিয়ে আমরা একটু গভীরভাবে ভাবি। এখন আমাদের মধ্যে বেশির ভাগ লোকই বিশ্বাস করে যে, এটা কলিযুগ আর তাই সারা দুনিয়া পাপে পরিপূর্ণ এবং শুধুমাত্র পাপীরাই এখানে থাকে। এ-কথা যদি সত্যি হতো তবে পৃথিবীতে জনসংখ্যা বাড়ার বদলে বরং কমে যেতো, যেহেতু একজন পাপী মরলে সে তো আর মানুষ হয়ে জন্মাতে পারবে না বরং পশুপাখি বা পোকামাকড়ের মতো কোনো নিচু প্রজাতির প্রাণী হয়েই তাকে জন্মাতে হবে। তাই এখানে থাকার কথা ছিলো জীবজন্তু আরো বেশি, মানুষ আরো কম। কিন্তু ব্যাপারটা তো তা নয়, বরং সম্পূর্ণ তার উল্টো। তাই এটা সুস্পষ্ট যে আমরা পাপ করছি না, বরং পুণ্য করছি আর তাই পুনর্জন্ম নিচ্ছি মানুষ হিসেবেই।

 

ঠিকাদার সাহেব হঠাৎ দরজার দিকে তাকালো এবং বাক্যের মাঝপথেই হঠাৎ করে কথা বন্ধ করে ফেললো। তখন বাকিরাও সবাই দরজার দিকে তাকালো। চেলারাম আর বেশিক্ষণ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে একটা মুহূর্তের ঝোঁকের ঘোরে পর্দা সরিয়ে ঘরের ভেতরে পা রাখলেন।

 

তাঁর অবস্থা তখন খুব খারাপ। পা দুটো তাঁর কাঁপছিলো এবং চেহারাটা দেখাচ্ছিলো একেবারে বিধ্বস্ত। তাঁর কাঁচাপাকা গোঁফ, ভুরু, চোখের পালক সবকিছুর ওপর ধুলোর পরত জমেছিলো। তাঁর চোখ দুটো এমন টকটকে লাল যেন এক্ষুনি ফেটে যাবে। পুরো একটা দিন গরম লু হাওয়ার ঝাপটা আর তীব্র রোদের মধ্যে মাত্রাতিরিক্ত কায়িক পরিশ্রমের ফলে তাঁর ত্বকে একটা অস্বাস্থ্যকর লালচে কালো ছাপ। তাঁর চেহারা তখন চিতায় তোলা একটা লাশের মতো, যেটাকে আগুনের জিভ চাটতে শুরু করে দিয়েছে।

 

তাঁর টুপির কানাটা ছিলো ঘামে ভিজে কালো হয়ে যাওয়া এবং তিনি তাঁর বগলে এতই বেশি ঘেমেছিলেন যে, তাঁর কোট ছিলো কনুই থেকে বুক পর্যন্ত সম্পূর্ণ ভেজা। তাঁর ধুতি ছিলো কাদার ছিটেয় ভরা এবং তাঁকে এতটাই ক্লান্ত দেখাচ্ছিলো যে, মনে হচ্ছিলো যেকোনো মুহূর্তে তিনি ঠাস করে মাটিতে পড়ে যাবেন।

 

কথাবার্তা বন্ধ হয়ে গেছে এবং সবগুলো চোখই তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে বুঝতে পেরে তিনি কিছুটা নার্ভাস হয়ে পড়লেন। কিন্তু তারপরও তিনি সামনে এগিয়ে গেলেন, ক্যাম্বিসের থলেটা মেঝেতে রাখলেন এবং সেটা থেকে বই, রসিদ, ওষুধের বোতল, প্রেসক্রিপশান ও অন্যান্য কাগজপত্র শেঠজির সামনে গুছিয়ে রাখা শুরু করে দিলেন। যে-মালগুলো এসে পৌঁছায় নি সেগুলো সম্পর্কে শেঠজিকে জানাতে গেলে তিনি তাঁকে ইশারায় থামিয়ে কিছুটা দয়ার্দ্র স্বরে বললেন, “কেরানিবাবু, আপনি এখন বাড়ি যান। আমরা এ-ব্যাপারে কাল সকালে কথা বলবো।”

 

চেলারামের বাসা তাঁর নিয়োগকর্তার কোঠি থেকে প্রায় দু মাইল দূরে। টলতে টলতে শেষপর্যন্ত তিনি যখন বাড়ি পৌঁছলেন, সন্ধ্যে তখন গড়িয়ে গেছে। ভেতরে গিয়ে তিনি ধুতি ছাড়া বাকি সব কাপড়-চোপড় খুলে ফেললেন, এবং তাঁর বাসার বাইরের খোলা জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়ালেন। তাঁর সামনের দরজার কাছে একটা বাঁশের খাটিয়া হেলান দিয়ে রাখা ছিলো। কার খাটিয়া জিজ্ঞেস করার পরোয়াও বোধ না করে তিনি ওটা বাইরে পেতে নিলেন, এবং ক্লান্তিতে অসাড় হয়ে লুটিয়ে পড়লেন ওটার ওপর।

 

তাঁর প্রৌঢ়া স্ত্রী তখন একটা কাঠের স্টোভের পাশে জড়োসড়ো হয়ে বসে রাতের খাবার পাকাচ্ছিলেন। সম্ভবত তিনি তাঁকে কিছু-একটা বললেন, কিন্তু তিনি কিছুই শুনতে পেলেন না। তাঁর ছোট মেয়ে এসে তাঁকে জড়িয়ে ধরলো, কিন্তু তিনি তাকে রূঢ়ভাবে ঠেলে সরিয়ে দিলেন অথবা হয়তো সে নিজেই তাঁর ভয়ানক অবস্থা লক্ষ্য করে তাঁকে ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়ালো অনিচ্ছাকৃতভাবে।

 

মিনিট পনেরো তিনি এভাবে অনড় পড়ে রইলেন চোখ বুঁজে। ধীরে ধীরে তাঁর চেতনা ফিরে এলো। শারীরিক সচেতনতা ফিরে আসার সঙ্গে এলো বিভিন্ন অঙ্গে, বিশেষ করে পায়ের গোড়ালিতে আর কোমরের নিম্নাংশে, একটা চাপা ব্যথা আর খিঁচুনির ভাব। তিনি মৃদু গোঙাতে লাগলেন। পা দুটোকে পুরোপুরি টান টান করে দিয়ে আবার নিজের শরীরের কাছাকাছি টেনে আনতে আনতে তিনি একবার এপাশ আবার ওপাশ করতে লাগলেন। তিনি তাঁর দু কাঁধের পাখনাকে প্রসারিত করে তাঁর মাথার পেছনে ঠেকালেন। পায়ের গোড়ালি দুটোকে পালাক্রমে উরুর ওপর তুলে নিয়ে আরাম দিলেন, হাতের পাতা ও পায়ের আঙুলগুলোকে ঢিলেঢালা করে একবার ছড়িয়ে দিতে আবার গুটিয়ে নিতে থাকলেন। এসব নড়াচড়ায় তাঁর শরীরের কোনো কোনো গাঁট মট করে ফুটলে তিনি বড় আরাম পাচ্ছিলেন। এভাবে ওঠাবসা, নড়াচড়া করতে করতে তিনি ধীরে ধীরে কিছুটা ভালো বোধ করতে লাগলেন এবং ঘুমিয়ে পড়লেন।

 

কিন্তু তিনি বেশিক্ষণ ঘুমোতে পারলেন না, খাটিয়ার পাশে একটা গোলমাল শুনে জেগে উঠলেন। ওটা ছিলো তাঁর প্রতিবেশী রোলু, লম্বা একটা দিনভর টাঙ্গা চালানোর কাজ শেষ করে যে বাসায় ফিরেছে। সে তার টাঙ্গা থেকে ঘোড়াটাকে খুলে নিলো, ঘোড়া থেকে লাগাম আর জোয়াল খুলে নিয়ে গলায় ঢিলে করে পরিয়ে দিলো একটা দড়ি যেটার প্রান্তভাগ ছিলো তার হাতে। একজন মালিশওয়ালা কাপড়ের মোটা একটা দলা দিয়ে ঘোড়াটার সামনের ও পেছনের পাগুলোকে ভালো করে মালিশ করে দিচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো, এ মালিশ জন্তুটাকে বেশ আরামই দিচ্ছে, কারণ মালিশের প্রতিটি চাপের সঙ্গে সঙ্গে সে নাক দিয়ে ঘোঁত ঘোঁত শব্দ করে উঠছিলো। রোলু নিজে আরেক টুকরো কাপড় হাতে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো ঘোড়াটার ঘাড়, গাঁট আর পেট থেকে ঘাম মুছে নেয়ার কাজে।

 

ঘোড়াটার গলায় পরানো দড়িটায় ঢোকানো হয়েছিলো অনেকগুলো পেতলের আংটা যেগুলোতে লাগানো ছিলো ছোট ছোট ঘন্টা। ঘোড়াটা কেশর ঝাঁকায়, অস্থিরভাবে মাথা নাড়া দেয়, আর প্রতিটি নড়াচড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকারে রুপোলি ঝলক তুলে ঘন্টাগুলো বেজে ওঠে। ক্ষণে ক্ষণে সে মাটিতে খুর ঠোকে; কখনো কখনো উচ্চ:স্বরে চিঁহি চিঁহি করে ডেকে ওঠে আর পেছনের পায়ে লাথি ছোঁড়ে। রোলু তখন জিভে চুকচুক শব্দ করে, মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে তাকে শান্ত করে, “মাথা ঠান্ডা র্ক দিকি, সোনা আমার, মানিক আমার, এই তো আমাদের হয়ে এসেছে।”

 

চেলারাম গভীর মনোযোগ দিয়ে ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করছিলেন। কিন্তু দেখতে দেখতে শিগগিরই তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়লেন এবং আবারও চোখ বুঁজলেন। জিনিসপত্রে ঠাসা তাঁদের ঘরটার ভেতর থেকে স্ত্রী ডাক দিলেন, “খেতে এসো।”

চেলারাম সাড়া দিলেন না, চোখ বুঁজে কাঠ হয়ে শুয়ে রইলেন। কয়েক মিনিট পর তাঁর স্ত্রী দরজায় এসে বললেন, “খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে, ভেতরে এসো-না।”

চেলারাম চুপ করে রইলেন।

কী ভাবছিলেন তিনি? তিনি কি মৃত্যু আর পুনর্জন্ম নিয়ে ভাবছিলেন? মনে মনে তিনি কি প্রার্থনা করছিলেন যে, আগামী জন্মে তিনি যেন একটি ঘোড়া হয়ে জন্ম নিতে পারেন?

 

 

 

জ্যোতির্ময় নন্দী, কবি ও অনুবাদক

বাজেটের সংস্কৃতি, সংস্কৃতির বাজেট

আলম খোরশেদ আর কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশের চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষিত হবে। আর অমনি শুরু হয়ে যাবে সবখানে বাজেট নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা। প-িতেরা, তথা অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার,

যৌক্তিক দাবি সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সসীমা ৩৫ বছর

দেশে চাকরির বাজার কত প্রকট বা দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা কত তা নিরূপণ করতে গবেষণার প্রয়োজন নেই। সরকারি চাকরি বা বিসিএস ক্যাডারে আবেদনকারীর সংখ্যা দেখলেই

সংবর্ধনার জবাবে কবি মিনার মনসুর বঙ্গবন্ধু শব্দটি যখন নিষিদ্ধ ছিল তখনই আমি বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করেছি

রুহু রুহেল সময়ের সাহসী উচ্চারণ খুব কম সংখ্যক মানুষই করতে পারেন। প্রতিবাদী মানসিকতা সবার থাকে না; থাকলেও সেখানে  সংখ্যা স্বল্পই। এই স্বল্পসংখ্যক মানুষের মাঝে  সৌম্যদীপ্র