শারমিন সুলতানা
সাহিত্যের প্রতিটি শাখাই পাঠককে বিমোহিত করে লেখকের সৃষ্টিশীলতার গভীরতায়। একজন বড় লেখক তাঁর সৃষ্টিকর্মে যত বেশি অভিনবত্ব, ভাবনার বৈচিত্র্য ও ভাষার সৌন্দর্য আনতে পারেন, ততই তিনি পাঠকের হৃদয়ের কাছে পৌঁছে যান। সমৃদ্ধ শব্দভাণ্ডার, কল্পনার বিস্তার এবং জীবনকে দেখার স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গিই একজন লেখকের প্রকৃত মুন্সিয়ানা প্রকাশ করে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটগল্প পাঠের মধ্য দিয়েই ছোটগল্পের প্রতি এক গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়েছিল। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের অনেক লেখকের গল্পগ্রন্থ পড়েছি; প্রত্যেকেই নিজস্ব এক বলয় সৃষ্টি করেছেন ছোটগল্পের ধারায়। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের দে’জ পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত জাকির তালুকদারের ‘পঞ্চাশটি সেরা গল্প’ পড়ে এক ভিন্ন ধরনের সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা লাভ করলাম। তাঁর প্রতিটি গল্পই নিজস্ব নির্মাণশৈলী ও ভাবনার বৈচিত্র্যে আলাদা। তবে বিশেষভাবে মনে দাগ কেটেছে ‘মাতৃহন্তা’ গল্পটি। জাকির তালুকদার এই গল্পে ম্যাজিক রিয়েলিজমের আশ্রয়ে যে মিথ নির্মাণ করেছেন, তা অত্যন্ত অভিনব। পরিচিত ও প্রচলিত বাস্তবতাকে তিনি শিল্পের আলোয় এমনভাবে রূপান্তর করেছেন যে গল্পটি এক ধরনের ঘোরলাগা আবেশ তৈরি করে। সমাজের অবক্ষয়, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং নারীর ওপর আরোপিত অদৃশ্য শৃঙ্খল—এসবই গল্পের গভীর উপজীব্য। গল্পে মিথ ও ইতিহাসের মিশেলে লেখক নারীর বর্তমান অবস্থান এবং সমাজ নির্মাণে নারীর অপরিহার্য ভূমিকা অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নৈপুণ্যের সঙ্গে তুলে ধরেছেন। গল্প এগিয়ে যায় তার নিজস্ব গতিতে, কিন্তু পাঠককে অপেক্ষা করতে হয় শেষ দৃশ্যের জন্য। আর তখন রবীন্দ্রনাথের সেই অমর উপলব্ধিই মনে পড়ে— “শেষ হয়েও হইল না শেষ।” পুরুষতান্ত্রিক সমাজের ভেতরে জমে থাকা অবক্ষয়কে লেখক দেখিয়েছেন এক অদৃশ্য ক্ষয়ের মতো, যা ধীরে ধীরে সমাজের ভিত দুর্বল করে দেয়। যেখানে নারীর পরিচয়কে দীর্ঘদিন ধরে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে শুধু সেবা, সংসার ও সন্তান ধারণের মধ্যে, সেখানে ‘মাতৃহন্তা’ গল্পটি নারীর অন্তর্নিহিত শক্তির এক প্রতীকী জাগরণ ঘটায়। গল্পের প্রতীকী বটবৃক্ষ এখানে শুধু একটি গাছ নয়; এটি এক গভীর রহস্য, এক নিষিদ্ধ সত্য এবং পুরুষতান্ত্রিক ক্ষমতার প্রতীক। কোনো নারী সেই বটবৃক্ষের কাছে যেতে পারবে না—এই নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে লেখক দেখিয়েছেন সমাজ কীভাবে নারীর স্বাধীনতার পথ রুদ্ধ করে রেখেছে। কিন্তু মানুষ যেমন নিষিদ্ধের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তেমনি নারীরাও একসময় সেই অদৃশ্য প্রাচীর ভাঙতে চায়। তারা জানতে চায়, কেন তাদের জন্য এই নিষেধ? কেন তাদের সামনে এত অন্ধকার? এখানেই গল্পটি শুধু একটি কাহিনি থাকে না, হয়ে ওঠে নারীর আত্মঅন্বেষণের এক প্রতীকী যাত্রা। লেখক চমৎকারভাবে দেখিয়েছেন—নারীরা আর শুধুই নীরব, সহনশীল, অবলা নয়। তাদের মধ্যেও রয়েছে প্রশ্ন করার শক্তি, সত্য অনুসন্ধানের সাহস এবং সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। বটবৃক্ষের চারা রোপণ যেন নারীর নতুন পৃথিবী নির্মাণের প্রতীক। গল্পে ইঁদুর, বেড়াল, ঘুটেবুড়ি, ব্যাঙ্গমা ও ব্যাঙ্গমীর মতো প্রতীকী চরিত্রগুলোও গভীর অর্থ বহন করে। বটবৃক্ষের শিকড়ে লুকিয়ে রাখা ইঁদুর যেন সমাজের সেই অদৃশ্য শক্তির প্রতীক, যারা পরিবর্তনের পথে বাধা সৃষ্টি করে। আর ঘুটেবুড়ির প্রজ্ঞা ও সাহস নারীদের ঐক্যের প্রতীক হয়ে ওঠে। সবশেষে যখন ব্যাঙ্গমা ও ব্যাঙ্গমীর মুখে প্রকাশ পায় হাজার বছরের এক করুণ ইতিহাস—তখন গল্পের গভীরতম সত্য উন্মোচিত হয়। পুরুষেরা উপলব্ধি করে তাদের পূর্বপুরুষের পাপ, তাদের অপরাধের ভার। “আমরা মাতৃমাংস ভক্ষক”—এই উপলব্ধি শুধু একটি বাক্য নয়; এটি মানবসভ্যতার বিবেকের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন। এক অমাবস্যার রাতে নারীরা যখন দেখে তাদের পুরুষেরা নেই, তখন তারা বুঝতে পারে—তারা গেছে প্রায়শ্চিত্তের পথে, সেই বটবৃক্ষের কাছেই। যে বটবৃক্ষ এতদিন ছিল নিষিদ্ধ, সেই বটবৃক্ষই হয়ে ওঠে সত্যের সাক্ষী। জাকির তালুকদারের ‘মাতৃহন্তা’ তাই শুধু একটি গল্প নয়; এটি মিথ, ইতিহাস, অপরাধবোধ ও মানবিক জাগরণের এক অনন্য শিল্পরূপ। রূপকের আবরণে লেখক দেখিয়েছেন—নারীকে বাদ দিয়ে কোনো সমাজের পূর্ণতা সম্ভব নয়। নারী ও পুরুষের সম্মিলিত পথচলাতেই নির্মিত হয় একটি সুন্দর, মানবিক পৃথিবী।
শারমিন সুলতানা : প্রাবন্ধিক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া




