এখন সময়:রাত ১০:৪০- আজ: রবিবার-১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ১০:৪০- আজ: রবিবার
১৬ই জুন, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ-২রা আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

মুল্লুক খাওয়া

কাজী লাবণ্য

নন্দীবাড়ি গ্রামের রাস্তাটা পেরুলেই গোহাট। সেখানে গোবর, খড়, বিচালি, ঘাস পড়ে আছে। গতরাতে এখানে গরুর হাট বসেছিল। সামনে বড় ঈদ। মোছলমানদের বাড়িতে অসংখ্য গরু খাসি জবাই হবে। উৎসব হবে। তুমুল খানাখাদ্যের আয়োজন হবে। এই গোহাট পেরুলেই পাশে মা কালীর এক পুরনো মন্দির। মা জিব কেটে দাঁড়িয়ে আছে, হাতে মুন্ডুমালা, জিহ্বার ছাল বাকল নেই। গলায় ময়লা, বিবর্ণ, ছিন্ন শোলার মালা। পায়ের নিচে ভাঙাচোরা শিব ঠাকুর। জায়গাটা আগাছা, জঙ্গল, গরু ছাগলের বর্জ্যে ভরা। এ মন্দির আর মন্দির নেই, এখানে পুজো হয় না। কেবল ভাঙাচোরা, পরিত্যক্ত মূর্তিই আছে। মন্দিরের বিশাল চাতালটাই বর্তমানে বাজারের দখলে যেখানে সপ্তাহে দু’দিন নিয়মিত হাট বসে আর বছর বছর বকরা ঈদে গরু ছাগলের হাট বসে।

জন্মপরিচয়হীন মেথরপল্লীর কিশোর ‘মুল্লুকখাওয়া’ প্রতি হাটবারের দিন এই হাটে আসে, হাটে মানুষের কেনাকাটা দেখতে ওর খুব ভালো লাগে। আবার এর মধ্যে কেউ কিছু খুচরো কাজের কথা বললে সে আগ্রহ নিয়ে করে। করলেই পেটভরা খাবার পাওয়া যায়। কেউ কেউ অবশ্য মাগনা করিয়ে নেওয়ার ধান্দায় থাকে। সে মাগনায় করে দেয়। মনে মনে বলে, ‘যাহ শালা দুইটা টাকাও দিলি না, না দিলি তা নাই’।

আবার পরদিন ভোরবেলা সে হাটে আসে। এতো ভোরে ওর উঠতে ইচ্ছে করে না কিন্তু না এসেও পারে না। এলেই কিছু না কিছু জুটে যায়। মা-কালী মাঝে মাঝেই ওকে নিজের মায়ের মতো দয়া করে, যদিও ও জানে না নিজের মায়ের আদর কেমন। ওর যে বাবা-মা নেই, ও যে গোত্র পরিচয়হীন ঝোপের মাঝে কুড়িয়ে পাওয়া এক শিশু তা অনেকের মুখে সেই ছোটবেলা থেকেই শুনে শুনে বড় হয়েছে। এসব বৃত্তান্ত শুনতে কখনই ওর ভালো লাগে না, কিন্তু যারা বলে তারা কারো ভালো লাগা না লাগার তোয়াক্কা না করে বলেই চলে ক্লান্তিহীন। সে কানেও তোলে না, সেসবের উত্তরে কিছু বলতেও যায় না।

সবজি বাজারের দিকে গেলে পরিত্যক্ত কিছু আলু, পটল, বেগুন, পেঁয়াজ, রসুন, ডাটা কুড়িয়ে পাওয়া যায়। মেথরপল্লীর কাকিকে দিলে খুশি হয়। দুপুরে খেতে ডাকে। আবার এদিকে গৌরি মসিকে দিলেও মসি খেতে ডাকে। সে একদিন মসিকে আরেকদিন কাকিকে দেয়।

ভোরের নির্জন হাটে খুব নজর করে, পায়ে পায়ে হাঁটলে খুচরো টাকা পয়সাও পাওয়া যায়। এখানে সে একবার ছোট পুটলি করা একটা পাঁচশ টাকার চকচকে নোট পেয়েছিল। পেয়ে সে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। মা-কালীর এতো দয়া ওর ওপর! টাকাটা হাতের মুঠোয় নিয়ে মায়ের পায়ের কাছে চুপ করে বসেছিল। সে ধ্যান জানে না, পুজো জানে না, কিছু প্রার্থনাও জানে না কেবল নিজের মা বাবা নিজের পরিবারের অভাবটা মাঝে মাঝে বড় শূন্যতা তৈরি করে। মায়ের কথা মনে পড়ে ক্ষুধা লাগলে আর রাতে ঘুমাতে গেলে মায়ের শূন্যতা বড্ড বেশি চেপে ধরে। মা নেই বলেই কি মা কালী ওকে এতো ভালোবাসে!

হ্যাঁ, সত্যিই এই দেবীর, ওর প্রতি ভালোবাসা আছে, মায়া আছে এটা মুল্লুকখাওয়া নির্ঘাত টের পায়। আর সে এলে মা খুশি হয়, তার চোখ কেমন যেন চকচক করে ওঠে। সেদিন টাকা পেয়ে সে নতুন একটি তাজা ফুলের মালা কিনে মায়ের গলায় পরিয়ে দিয়েছিল।

একবার সে দু’দিন ধরে কিছু খায়নি। ক্ষুধায় একেবারে কাতর। যেখানেই যায় মানুষ দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। কী করবে তার যে খালি ক্ষুধা পায়। সে প্রত্যুষে উঠে ধীরে ধীরে হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছে। ভেবেছে দোয়েল মার্কা দুই টাকার একটা নোটও কি পাবে না? পেলে দু’মুঠো মুড়ি কিনে খাবে।

প্রথমে সে মন্দিরে যায়, মায়ের দিকে তাকায়, মনে হয় মা ওকে ইশারা করেন, প্রথমে বুঝতে পারে না। পরে ইশারা অনুযায়ী সে তাকিয়ে দেখে শিবের পায়ের ফোকরে একটা ঠোঙা। সে চিন্তায় পড়ে যায়, নেবে কি নেবে না। আবার মায়ের দিকে তাকায় মা এবার পষ্ট ইশারা করলে, হাতে নিয়ে দেখে, ঠোঙায় বেশ কিছু রুটি মিষ্টি আর বড় একটা আম, খাবারের ঠোঙা হাতে নিয়ে সে চারপাশে তাকায় নাহ কেউ কোথাও নেই। সে মায়ের চোখের দিকে তাকায় মনে হয় যেন মা ওকে খেতে বলছে। সে মায়ের পায়ের কাছে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। মা ঠিক বুঝেছে ও ক্ষুধায় একেবারে কাহিল হয়ে পড়েছে। ধীরে ধীরে সে খাবারটুকু শেষ করে, কলতলায় গিয়ে পেট পুরে জল খেয়ে নেয়। আমটা হাতে নেয়, মেথরপল্লীতে কাকির একটা পুঁচকে নাতি আছে, সেসহ একসাথে খাবে। ছেলেটা এখন তা তা করে হাঁটে, হু হা কথা বলে। ওকে দেখলেই ওর কাঁধে চড়তে চায়। ওকে ‘কা’ ‘কা’ বলে ডাকার চেষ্টা করে, ওর কথা ভাবলে বড় ভালো লাগে মুল্লুকখাওয়ার।

এরপর থেকে সে জানে ওর মা এই মা-কালীর ভেতরে থাকে। কাজেই এখন হাটে আসতে ওর কোনো আলসেমি লাগে না বরং খুব আগ্রহ নিয়ে আসে।

এই হাটের এক কোণায় ঝুপড়িতে থাকে ‘লালবুড়ি’। গৌরবর্ণের কারণে এমন নাম কি না কেউ জানে না। তবে লালবুড়ি সত্যিই লাল। তাকে সবাই একটা ছড়া কেটে ক্ষেপায় আর সেও ক্ষেপে একেবারে তুলকালাম গালাগালির ফোয়ারা ছোটায়। মুল্লুকখাওয়াও তার ঝুপড়ির কাছে গিয়ে ছড়া কাটে,

 

‘মাছের মধ্যে রুই, শাকের মধ্যে পুই

নারীর মধ্যে নালবুড়ি পুরুষের মধ্যে মুই’

 

আর যায় কোথায়! হাতের লাঠি ছুড়ে মারে বুড়ি, সাথে মুখের বুলি,

-ঐ কোন মাগির জারুয়া রে! মুখ টিপলে দুধ বেড়ায়, আর মোর পাছত নাগিস?  শোহোরের বাচ্চারা, মারি ফেলাইম…

ছড়াকার ততক্ষণে হাওয়া। একদমে বাজারে পৌঁছে যায়।

 

বাজারের কাচঘেরা দোকানগুলাতে কত যে খাবার! বড় বড় রসগোল্লা! চমচম! জিলাপি। নিমকি, শিঙাড়া! আর সেগুলা ভাজার কী সুঘ্রাণ! ভাতের হোটেলের আশপাশে পোলাও, মাংসের ঘ্রাণ শুঁকলে ওর কান্না পায়। এতো এতো খাবার! আর ওর পেটে খালি ক্ষুধা আর ক্ষুধা।

মনে মনে ভাবে ওকে যদি হোটেলে কামে নিত, ও সবরকম কাম মন দিয়ে করত, ইচ্ছে না করলেও করত, বিনিময়ে ওরা ওকে পেট ভরে খাবার দিত। নাহয় হাঁড়ির তলানিটাই দিত।

 

রেললাইন ধরে হাঁটতে হাঁটতে সে অনেক দূরে চলে যায়। মাঝে মাঝে চলে যায় গ্রামের দিকে, বিশেষত যখন ধান ওঠে তখন সে অজানা, অচেনা, অবস্থাপন্ন কারো বাড়ির খলানে দাঁড়িয়ে দূর থেকে ধান মাড়াই দেখে। ধান নিয়ে সকলের ব্যস্ততা দেখতে ভালো লাগে। আর ভেজা ভেজা ধানের ঘ্রাণ! আহা!

 

রেললাইনের দুপাশে খালি ধানক্ষেত আর ধানক্ষেত। বাতাস ওই ক্ষেতের ওপর কেমন খলবল ঢেউ খেলে যায়। ধানের শিষ হাওয়ায় দোল দেয়, এতো সুন্দর। এই ধান পেকে হলুদ হলেই কাটা হবে, মাড়াই হবে, চাল হবে তারপর হবে ভাত। এতো ধানের এতো চাউল কার ঘরে যায়! এতো ভাত কারা খায়! আহারে ধোঁয়া ওঠা গরমাগরম ভাত!

ভাতের কষ্ট বড়ো কষ্ট। ওর কাজ করতে ভালো লাগে না। খালি ভাতের কথা মনে হয়, ভাত খেতে মন চায়।

 

 

দূরে ট্রেনের হুইসেল শোনা যায়। একটু পরেই দেখা যায় ট্রেনের মাথা, এরপর পেছনে বগিগুলা হুহু করে কাছে এগিয়ে আসতে থাকে সাপের মতো। সে ভাবে, ‘কতোবড় আজদাহা টেড়েন, পেটে পোকার মতো কতো মানুষ! শালা চুতমারানী, এই মানুষগুলাই দুনিয়ার সব ভাত খায়া ফ্যালে। লাইনের ধার থেকে পাথরের টুকরো নিয়ে সে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে ট্রেনের দিকে ছুড়তে থাকে।

-মর, মর, শালারা মরি যা। চাউল বাঁচুক, ভাত বাঁচুক।

 

কাজী লাবন্য, কথাসাহিত্যিক

চট্টগ্রামী প্রবাদের প্রথম গ্রন্থ : রচয়িতা জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন

মহীবুল আজিজ জেমস ড্রমন্ড এন্ডার্সন (১৮৫২-১৯২০), সংক্ষেপে জে ডি এন্ডার্সন আজ থেকে একশ’ সাতাশ বছর আগে চট্টগ্রামী প্রবাদের সর্বপ্রাথমিক গ্রন্থটি রচনা-সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছিলেন। চট্টগ্রামী

দেশ ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার জন্য বৃক্ষরোপণের বিকল্প নেই (সম্পাদকীয়- জুন ২০২৪ সংখ্যা)

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সম্প্রতি আমাদের দেশসহ উপমহাদেশে যে তাপদাহ শুরু হয়েছে তা থেকে রক্ষা পেতে হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় বৃক্ষরোপণ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই