পিন্টু রহমান
কোলাহল থেমে গেলে অজ্ঞাত স্থান হতে উত্থিত হয় মিহিসুরের কান্না। কান্নার উৎসভূমি অনুসন্ধানের লক্ষ্যে সম্মুখে তাকালে প্রত্যক্ষ হয়- বাতাসের শরীরে আবিরের গুড়ো। ভাসমান গুড়োর সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়েছে বিশেষ এক আলোছায়ার কারসাজি। আর অপরূপ সাজে রঙিন কুয়াশার ভেতর থেকে ধীরপায়ে নেমে আসে অপ্সরী। নারী নিকটবর্তী হলে আবিরের মধ্যে সূচিত হয় নিত্যনতুন বিভ্রম। বিভ্রম ছড়াতে ছড়াতে নারী কিংবা অপশরী হাসি থামিয়ে জিজ্ঞেস করে- আমাকে চিনতে পারছো না, আবির!
না চেনার কথা নয়। বরং মেয়েটি তার খুব বেশি চেনা। বসন্তের আগমন সুনিশ্চিত হলে মনে হয়, গিরিবালার সাথে তার জন্ম-জন্মান্তরের সম্পর্ক। ফলে সময় এবং সম্পর্কের সূত্রানুসারে নিয়ম করে কৃষ্ণচূড়ার কোলে আশ্রয় নেয়। বাসন্তীদেবী পশ্চাৎগমন না করা পর্যন্ত ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছায় নিত্য ছুটে আসতে বাধ্য সে। অবাধ্য ছেলের মতো কতদিন ভেবেছে, অনেক হয়েছে, আর না; গিরিবালাকে নিয়ে কল্পনার ফানুস উড়াতে ঘোর আপত্তি তার। তাছাড়া একজীবনে কতোই বা উজান বাইবে! অতীত স্মৃতির মুখরতা নিয়ে অশান্ত মনে আর কতো প্রশান্তির বাঁধ নির্মাণ করবে!
মুখরতার সূচনা দ্বাদশের চৌকাঠে। আবির বাংলা ও গিরিবালা নাট্যতত্ত্বের শিক্ষার্থী। সমবয়সী দুজন নর-নারী অসম প্রেমে জড়িয়ে পড়েছিল। সমাজ এবং ধর্মীয় বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে একসূত্রে বাঁধা পড়েছিল দুটি জীবন। অথচ মেয়ে জানতো না, কী ভয়ানক পরিণতি তার জন্য অপেক্ষারত! অপেক্ষায় অপেক্ষায় ক্ষয়ে যায় আয়ু। ফুরায় লেনাদেনা। অথচ ছেলের জীবনে অকালবার্ধক্য সমাগত। গিরিবালা যেমন ছিল ঠিক তেমনি আছে- অমলিন হাসি। মায়াময় রুপ। মায়ার কাজল পরানো একজোড়া আঁখি। সময় যেনো তাকে ছুঁতে পারেনি! বিস্ময়ের ঘোর মুছে যাওয়ার আগে আবির জিজ্ঞেস করে- তুমি! এতদিন কোথায় ছিলে, তুমি!
গিরিবালা হাসে, বসন্তের ফুলের মতো উষ্ণতামাখা সে’ই হাসি- আমি এখানেই ছিলাম, বীর; ঠিক এইখানে। তুমি তো জানো না, বসন্তের দিনগুলো আমাকে বন্দি করে রাখে। কৃষ্ণচূড়ার পাষাণ বেদিতে বন্দি আমি। বসন্ত সমাগত হলে মুক্তির জন্য হাঁসফাঁস করি। কাতরচোখে তোমার অপেক্ষায় চেয়ে থাকি।
চেয়ে-থাকা নিয়ে আবিরের আপত্তি- এভাবে আর কতদিন, গিরি! কবে শেষ হবে অপেক্ষার প্রহর!
প্রহর বিষয়ে মেয়েটি নিয়তির প্রতি ইঙ্গিত করে- নিয়তিনির্ভর জীবনে সময়ই মূল ক্রীড়নক। আমি ও আমরা ইঙ্গিতের অনুসারী মাত্র। একমাত্র সময়ই জানে, এ খেলার শেষ কোথায়!
হারাধন মুখটিপে হাসে- শেষের কথা ভেবে কী প্রেম হয়! নাকি হয়েছে কখনো! প্রেম-পিরিতি বিধিনিষেধের উর্ধ্বে। গন্ধমীয় নিষেধ অমান্য করে আদিপিতা নিক্ষিপ্ত হয়েছিল স্বর্গ হতে মর্তে।
আবির ও গিরিবালা তখন মর্ত্যলোকের বাসিন্দা। ভুবনডাঙা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বসন্তবরণ উৎসবে তাদের প্রথম পরিচয়। নৃত্য-গীতে মুখর হয়ে উঠেছিল পরিচয়ের প্রথমভাগ। ভাগ্যবিধাতা হয়তো এভাবেই চিত্রনাট্য রচনা করেছিলেন। নাটকের এক অঙ্কের সাথে আরেক অঙ্কের বিস্তর অমিল। মঞ্চের অভিনয় মঞ্চে সীমাবদ্ধ থাকলে সমস্যা ছিল না; ক্যাম্পাস মাড়িয়ে পার্কের নির্জনতা ছাড়িয়ে মেঠোপথঅব্দি তাদের চৌহদ্দি বিস্তৃত হয়। ক্যাম্পাসের সবুজ জমিনে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা গাছটিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় তাদের গোপন অভিসার। রাত গভীর হলে পায়ে পায়ে কৃষ্ণচূড়ার নিচে জড়ো হতো। পাশাপাশি বসে আগামীর স্বপ্নে বিভোর হতো। খুনসুটিতে মেতে উঠতো। গাছটির প্রতি ইঙ্গিত করে গিরিবালা একদিন জানতে চেয়েছিল- আচ্ছা, আবির; এই কৃষ্ণচূড়া কী আমাদের প্রেমের সাক্ষী হবে না!
কথার পিঠে কথা লাগাতে প্রেমিক দেরি করে না, ঠাট্টার ছলে বলে- শুধু সাক্ষী! প্রেমকামী জনতা একদিন গাছের শরীরে আমাদের নামফলক ঝুলিয়ে দেবে। ঝুলে থাকবো আমরা। মুখে-মুখে রটে যাবে আবির-গিরিবালার প্রেমকাহিনি!
কাহিনি পরস্পরায় গিরিবালার মুখে চটুল হাসি। রাত্রির নির্জনতায় ওই হাসি প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে আসে পাষাণ-বেদিতে। বেদিজুড়ে ছড়ানো-ছিটানো আছে ফুলের পাঁপড়ি। অথচ মেয়ে শোনায় কুঁড়ির গল্প- শুনছো, বীর।
কী।
আমাদের দিন কী এভাবে যাবে?
মানে!
মনের কথা গুছিয়ে বলে সে- কুঁড়িকাল শেষ হলে তোমার জীবনে ফুল হয়ে ফুটবো আমি। ফুলে-ফুলে সাজিয়ে তুলবো আঙিনা। সাজানো-গোছানো ছবির মতো ছোট্ট একটি সংসার হবে আমাদের। তুমি রাজা আর আমি রানি। রাজারানির জীবনে দুঃখনামক শব্দটি হবে অবাঞ্ছিত। শত বিপদেও কেউ কারো থেকে কাছছাড়া হবো না। বিরহের তানপুরায় বাজাবো না করুণ রাগিনি।
ভুল, সবকিছু মিথ্যে; স্বপ্নবাজ মেয়েটির কল্পনা বাস্তবতা বিবর্জিত। সত্যের অপলাপ মাত্র। নিয়তির ঝড়ে যাবতীয় সম্ভাবনা ল-ভ- হয়ে গেছে। দুটি জীবন দু’প্রান্তে ছিটকে পড়েছে। আবির একা। নিসঙ্গ। তার জীবনে কালরাত্রির আবহ। গিরিবালার দেখা স্বপ্নে ভুল ছিল। ভুল শুধরাতে আবির উল্লেখ করে- রাজার ভূমিকায় ঘোর আপত্তি। আমাকে দিয়ে বাপু ওসব হবে না; বরং তোমার রাজ্যে প্রজা হিসেবে বেশ আছি, দিব্যি আছি।
নিরুপায় হয়ে গিরিবালা তখন প্রজাকেন্দ্রিক ছবি আঁকে- কুঁড়েঘর; আমাদের জন্য ছোট্ট কুঁড়েঘর নির্মাণ করবো। ঘরের সামনে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকবে একটি কৃষ্ণচূড়া গাছ। তুমি সারাদিন মালা গাঁথবে, আর আমি তন্ময় হয়ে চেয়ে রইবো।
দূরগামী স্বপ্ন নাগালের মধ্যে আনতে প্রেমিকঠাকুর বিচ্ছেদের পাঠ শোনায়- গিরি, কখনো যদি আমরা পথ হারাই! পথের মাঝে নিজেদের হারিয়ে ফেলি!
গিরিবালার স্বপ্নের উড়োজাহাজ হঠাৎই ক্রাসল্যান্ড করে। ধাতস্ত হয়ে
অস্পষ্ট স্বরে বলে- এই গাছ তখন কাঁদবে, বীর। গাছের ফুলসমূহ চোখের জল হয়ে ঝরবে। কিন্ত আমি জানি, কৃষ্ণচূড়ার ছায়া থেকে কখনো বিচ্যুত হবো না।
কিন্তু ইদানীং মনে হয়, মেয়েটি যদি ভবিষ্যতদ্রষ্টা হতো তবে তার চোখ হতে জলের পরিবর্তে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত চুঁয়ে নামতো। আহা, কী রক্তস্নাত অতীত! স্বপ্নবাজ আবিরের ক্ষতবিক্ষত হৃদয়। কাঁদতে-কাঁদতে চোখের জল ফুরিয়ে গেছে। জলশূন্য চোখে অন্ধকার আকাশের পানে তাকিয়ে থাকে। বসন্তের আগমনে অস্থিরতার মাত্রা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। রাত নামলে যেনো ঘরে থাকা দায়। নিরুপায় হয়ে স্মৃতিবিজড়িত কৃষ্ণচূড়ার পাশে ছুটে আসে। বেদির ওপর বসে গিরিবালার জন্য হা-পিত্যেশ করে। অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হয়। দগ্ধ প্রাণের জ্বালা নিবারণের জন্য মেয়েটি এক-একদিন অপ্সরা হয়ে ফিরে আসে। মুখোমুখি বসে গল্প করে। জীবনের জন্য তৈরি করে অমৃত-পা-ুলিপি। আর ব্যথাতুর নয়নে গিরিবালা লিপিবদ্ধ করে- প্রেম অপূর্ণ থাকলে সময় থমকে দাঁড়ায়; যে কারণে কৃষ্ণচূড়ার পাষাণ বেদিতে আটকে গেছি। এখানে মুক্তির আশা সুদূরপরাহত। আহত পাখির মতোন ছটফট করি আর মগ্নতায় উচ্চারণ করি তোমার নাম-নামাবলী। আমি একা না, ফুলেরাও তোমার নামে মালা গাঁথে; যে মালা উপেক্ষা করার ক্ষমতা আমাদের নেই।
পিন্টু রহমান : কথাসাহিত্যিক, সম্পাদক- জয়ত্রি, চুয়াডাঙ্গা




