নির্ঝর নৈঃশব্দ্য
আকাশের ফুল
ফুল ভেঙে দেয়ার পর পৃথিবীর ওপরে আরো কয়েকটা আকাশ ফণা তুলে দাঁড়াল, যেন বা ছায়াবতী বৃক্ষের আকর। বন্যা হল, মাঠ হল, ঘাট হল, ধান আর বুদ্ধের দুয়েকটা রূপ দেয়াল হয়ে গেল।
মুখের ভেতর মেরুদণ্ড নিয়ে উত্তরমেরুর দিকে গিয়ে তুমি আদিগন্ত শাদা হয়ে গেলে। বুক-পকেটে তখনো লুকিয়ে ছিল দুটো সুগন্ধময় এলাচ। তুমি মনে মনে ভাবতে লাগলে এইখানে একফালি এলাচের বন লাগিয়ে আর তিনটা জীবন কাটিয়ে দেব, একটা নিজের, একটা তার আর একটা পতঙ্গের।
সন্ধ্যার গান
নদীর চরটা গুছিয়ে দাও। শীতের ভোরে বিলম্বিত স্রোত থেকে মুছে দাও অগভীর স্নান। যা কিছু বাগান আছে অদূরে বনের কাছে সঁপে দাও সপত্র সপুষ্প। সঁপে দাও পেয়ারা, আর সব ফলের উৎসার। গন্ধর্ব বিবাহের সিঁথি থেকে মুছে দাও রক্তের দাগ। তারপর শজারুর গায়ের কাঁটা থেকে মুছে দাও জরা। ভূতের নাভীতে ঘষে দাও অজানিত ধান।
আসো, গুছিয়ে দাও আমার হাতের পায়ের কুড়িটি আঙুলজুড়ে ফুটে থাকা সন্ধ্যার গান।
উদ্ভিদের চোখ
ভিড়ের মধ্যে ক্রমে বিস্তারিত হচ্ছে অরণ্য। শিশুটি মায়ের বুকে। কাঁধে থুতনি রেখে মায়ের পিঠে বসা প্রজাপতির দিকে তাকিয়ে আছে। প্রজাপতি নাড়ছে তার ডানা। ডানায় ছড়ানো কাঁচা রং। শিশুটির চোখে লেগে গেল লেমন ইয়েলো আর একটি নীল, ফ্রেঞ্চ আলট্রামেরিন। ভিড়ের মধ্যে বিস্তারিত অরণ্য। শিশুটি নাড়ছে হাত। সন্ধ্যা হচ্ছে ক্রমশ রাত। আর আমি ক্রমশ উদ্ভিদ। কোনো গ্রাম থেকে, কোথাও কোনো দুপুরের জলাশয় থেকে মহিষের পিঠে চড়ে এসে উদ্ভিদ হয়ে যাই।
প্রজাপতির ডানার ঘ্রাণে ঘিরে আসে ঘুম। শিশুটির মা একটি মেয়ে, পরনের শাড়ি লাল। মেয়েটির পিঠে একটি ট্যাটু, প্রজাপতির। ট্যাটুর ছয় ইঞ্চি ওপরে একটি শিশুর মুখ ঘুমিয়ে পড়েছে।
আসো
আসো, আঙুলে ঘষে মুছে দিই আকাশের তারা। এইসব অথর্ব, বোবাকালা সাক্ষি রেখে লাভ নেই। তার চেয়ে অমানিশা মিশে থাক অথৈ চোখের ভ্রমে। দেখো, ছিন্নগল্পের মাঠে ফুলও ছিন্ন হয়ে ফোটে। ফুলের বদলে তবে আসো বুনে দিই কণ্টকের বন, দুইফালি চাঁদ দুহাতে সরিয়ে দিই জরাসন্ধের নিয়তি মেনে।
আসো, ছিন্ন করে দিই দেয়াল থেকে জানালার উত্তাল শরীর, ঘর থেকে মুছে দিই দরজার মায়া, চৌকাঠ থেকে পায়ের দাগ। সন্তুরের তার থেকে আলগোছে খুলি নিই আসো তিনতাল, তিনতাল ভেঙে বাঁধি কর্কট মুদ্রা, ছিন্ন হব জেনে।
ধোঁয়ার পাশে
ধোঁয়ার পাশে সবুজবাতি পুড়ে যায় অবরোহী। কতিপয় বাতি ভস্মও হয়ে যায় অবেলায়। সেইসব অবেলার ঘুম ঠেলে আমি চিরদিন কেবল ছায়া হতে চেয়েছি, সূর্যের বিপক্ষে এক টুকরো ছায়া।
চুপচাপ জানালা দিয়ে দেখে ফেলি বৃক্ষরহিত বনে ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে গেছে। বুকের ভেতর থেকে দুহাত বাড়িয়ে সেই সন্ধ্যা জড়ানো বনকে ডাকি, আয় আয়। তুমিও আমাকে উদ্ভিদ নামে ডাক দিলে ওই বনের বুক কেটে চলে যায় অজানিত নদীর রেখা।
আমাকে ওই নদীমধ্যে নিয়ে গিয়ে একদিন তোমার ছায়া বানিয়ে দিও, সূর্যের মৃত্যুর আগে।
জিরাফ ও উট
একটা জিরাফ আর একটা উটকে মিলিয়ে দাও। তারপর দেখো কেমন সবুজ হয়ে যাচ্ছে আতপ্ত মরুভূমি। বন শেষে শুরু হয় মরুভূমি আমাদের। একটা উট তাকিয়ে থাকে বনের দিকে ধীর। জিরাফের খোঁজে কাটায় দুপুরের ছত্রহীন বেলা। দুজনের দিঘল গ্রীবায় তুমি বেঁধে দাও কালো সুতা। এরা আমাদেরই ভাই, যাচিত আত্মজ। তুমি ঘুরে ঘুরে দুজনের বুকে গুঁজে দাও আলোর পরমায়ু। অন্ধকার ছাই হলে জিরাফের গা থেকে নকশারেখা খুলে উটের গায়ে পরিয়ে দাও। তারপর দেখো কেমন শীতল হয়ে ওঠে রোদ!
তোমার ভেতর এইসব মরূদ্যানের ছক আমি দেখেছি। তুমি একটু হাত খুলে দাঁড়াও, আমার খুব রোদ লাগছে।
আমার আত্মজা
জানালার ওধারে একটা লালবাড়ি বৃষ্টিতে ভিজে যায়। আমি তাকিয়ে থাকি। কোনো লাল ভিজে হয় না শাদা। একটি হাওয়া বারংবার নিয়ে আসে আমার ঘরে বাড়িটার সিক্ত ঘ্রাণ। আমি শুনি একটি গান। মাইলের পর মাইল উড়ে যায় আকাশের মেঘ। আমার জানালার কাচে নাক ঘষে টবে লাগানো গাছপালা। আমি তাকিয়ে থাকি। গান ভেসে যায় লালবাড়ি পেরিয়ে, গান ভেসে যায়।
পৃথিবীর কোথাও আমার আত্মজা অজানিত একটি পাখির দীর্ঘশ্বাস হয়ে যায়। আমি তাকিয়ে থাকি। আমার চোখে লেগে থাকে মহাকাশ। তার কোনো আকার নেই। নিরাকার চোখে তাকিয়ে থাকি একটি গানের দিকে।
ছয় দেয়ালের যতি
ঝুলে আছে ছয়টি দেয়াল, আপাত মহাকর্ষ তারে দোলায়িত বাদামের দল, ওরা চুপিচাপ ডুবে যাচ্ছে। আকাশের ডোবায় ডুবে যাচ্ছে মহিষের ডানা, মায়ামায়া চোখ, গুটানো খুর, তার অর্ধেক হাসি।
মন কেমন করা ঘ্রাণের পাহাড় ভেঙে তোমাদের বাচাল হাওয়ার বোতাম ঘোরে। বোতামে কেমন করে ঝুলে থাকে রুদ্ধশ্বাস বাসনার সুতো! দেখে দেখে এই চোখ পচে গেলে কোনোদিন, খুলে যায় অনিঃশেষ, খুলে যায় ছয় দেয়ালের যতি, আমি দেখি না। ভাবি, ডুবে আছি, ডুবে যাই চিরদিন তোমাদের ঘরে।




