জন্ম ও মৃত্যুর মাঝখানে যে জীবন তা কেমন চলছে, যাচ্ছে, বা তার ভবিতব্যই কী—এমন একটি জিজ্ঞাসার জুতসই উত্তর দেওয়াটা বড়ো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। পথ চলতে হঠাৎ পরিচিত কারো সাথে দেখা হলে জানতে চান ‘কী খবর, ভালোতো’— একগাল হেসে বলতেই হয় ‘ভালো আছি’। পরক্ষণেই মনে হয় আসলে উত্তরটা সৌজন্যবশত, তবে যথার্থ নয়। কেননা, ‘ভালো’ যে নেই, একথা অন্যকে বলে কী লাভ? কেউ তো ‘ভালো’ না থাকার কারণটা পুষিয়ে দিতে পারেন না। হ্যাঁ, এটাই বাস্তবতা এবং এই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে কষ্টকে চেপে ‘ভালো’ থাকার অভিনয়ে আমরা অনেক আগে থেকে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি।
এই যে বর্ষা শেষের প্রান্তিক শরতে একটি অস্বস্তিকর গরমে সময়টা পার হচ্ছে হাঁসফাঁস করা অবস্থায়। অথচ ঋতুর স্বাভাবিক হাবভাব এমন হবার কথা নয়। দিনে সহনীয় গরম থাকলেও রাতে শীতের আগাম আভাস থাকবে, ভোররাতে হিম হিম স্পর্শে কুয়াশার চিহ্ন থাকবে ঘাসের ডগায়। ধরে নিতে পারি আরামপ্রদ হিমেল সকাল দিয়ে শুরু দিনটা মন্দ না হবারই কথা। কিন্তু তা হচ্ছে কই? সকাল ৭টা থেকে লাগাতার লোডশেডিং বেলা ১১টায়ও শেষ হয় না। আর লাইনে গ্যাস এই আছে এই নাই অবস্থা। কবে চুলোয় রান্নাবান্না হবে তারও নিশ্চয়তা নেই। তারও পর হামের ঢালাও প্রকোপের পাশাপাশি ডেঙ্গুর বিস্তারও বেশ ছড়িয়েছে। পরিবারের শিশু থেকে বুড়ো এমন কেউ নেই এই দুটি মুসিবত থেকে রক্ষা পেতে পারে। এর বাইরে আরো হরেক রকমের অস্বস্তির মিছিল প্রতিদিন বড়ো হচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বলম্ফন গা সওয়া হয়ে গেছে। নিত্যপণ্যসহ জীবনযাপনের আবশ্যিক উপাদান জোগাড় করতে গিয়ে চোখ ছানাবড়া হলেও মনকে এই বলে প্রবোধ দিতে হয় ‘আজ দিনটাতো কোনো রকমে পার হলো, আগামীকালটা একটু ভালো হলে মন্দ হবে না।’
সকলের জীবনটা আনন্দময় হোক এমন ভরসা করা অমূলক। আনন্দ ও সুন্দর বলতে যা কিছু আছে বা একদা ছিল তা আজ তিরোহিত। সমস্ত শুভবোধ এবং চির সনাতন চিরন্তন রূপ সৌন্দর্য ও গরিমা একে একে ছিনতাই হয়ে গেলেও সমাজ ও রাষ্ট্র নির্বিকার। এমন অবস্থ্য়াও মানুষ আশাবাদী। প্রত্যেক শুভানুধ্যায়ী মানুষ একে অপরের দীর্ঘ জীবন কামনা করে। সুখ-শান্তি ও কল্যাণের জন্য দোয়া করেন। কিন্তু বাস্তবতা অন্যরকম। আমরা কেমন আছি তাও ঠিকঠাক করে বলা যায় না। ঠিকঠাক বললেই নানারকম অদৃশ্য বিপদ নেমে আসে। শুধু আফসোস হয় এই বলে— ‘ধরা যাবে না ছোঁয়া যাবে না /বলা যাবে না কথা /রক্ত দিয়ে পেলাম শালার এমন স্বাধীনতা’!
এই সম্পাদকীয় ইতি টানার আগে খবর এলো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক—নাহিদা বেগমের কিশোর ছেলে অপ্রতিম নিখোঁজ। এর একদিন পরই তার রক্তাক্ত লাশ পাওয়া গেলো পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে। আমরা এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করছি।
এতো কিছুর পরও, তবুও আমরা মানুষতো। আমরা আনন্দময় জীবনের পরমায়ুর গ্যারান্টি চাই—এটাই সময়ের প্রার্থনা।




