ফিরে আসা : নতুন জন্মের নতুন কবিতা
আসাদ মান্নান
আমি মরে গিয়েছিলাম কয়েক সেকেন্ডের জন্য,
ডাক্তারের মনিটরে শুধু একটা সরলরেখা নয়,
একটা দীর্ঘশ্বাস হয়ে ছিলাম।
তারপর ফিরলাম।
এই সাদা চাদর, এই স্যালাইনের ফোঁটা ফোঁটা টিকটিক,
জানালার ওপারে যে রোদটা কাঁপছে,
সবকিছুকে আজ ভীষণ নতুন লাগে।
মা’র হাতটা এতদিন ধরা হয়নি,
আজ মনে হচ্ছে এই হাতটাই আমার পৃথিবী।
যে জীবনকে এতদিন দৌড় করিয়েছি,
আজ সে-ই আমার কপালে হাত বুলিয়ে বলছে –
“আস্তে, এবার আস্তে।”
আমি নতুন করে হাঁটতে শিখব,
নতুন করে ‘ভালোবাসি’ বলতে শিখব
নতুন জন্মের নতুন কবিতা
আমার মাথার ভেতর একটা ঘড়ি ছিল,
সে ঘড়ি হঠাৎ শব্দ করে ভেঙে গেল,
আর তার কাঁটাগুলো পাখি হয়ে উড়ে গেল হাসপাতালের সিলিং-এ।
আমি দেখলাম,
আমার মস্তিষ্কের ভেতর জমে থাকা সমস্ত না-বলা চিঠি,
না-যাওয়া রাস্তা, না-করা ভুলগুলো
জলের মতো গলে যাচ্ছে।
নার্স এসে বললো, “আপনার প্রেসার…”
আমি শুনলাম, “আপনার ভেতরে একটা সমুদ্র জেগেছে…”
আমি সেই সমুদ্রে ভাসছি।
আমার এক হাতে ২০২০ সাল, অন্য হাতে আগামীকাল।
আমি মাঝখানে, একটা সাদা বিছানায় শুয়ে থাকা
একটা ছোট্ট বীজ।
আমাকে আবার মাটিতে পুঁততে হবে।
আমাকে আবার অঙ্কুর হতে হবে।
=================================
মাসুদ মুস্তাফিজ-এর দুটি কবিতা
যিনি ঈশ্বর তিনি বিভক্ত ঢেউয়ের মতোন
আমি কবিতার ডায়োজিনিজঢেউ— অন্তরের স্বর্গীয় ভাবধারা
আমি ছাড়া আর কোনো পবিত্রতা নেই
কবিতা ছাড়া আর কোনো বিশ্বাস নেই
আমি সময়ের বদ্ধাঞ্জলিতে ঈশ্বরকে লালনপালন করি
ধারণাতীত নিজেকে ছাড়িয়ে এক বুর্জোয়া আদমঈশ্বর!
শান্ত—অর্ধ-দিবালোকে পৃথিবীর সমান মানুষ
বেদান্তের পরমাত্মা— সীমার কাছে নতজানু
যে ঈশ্বর বাস্তবতা হারিয়ে ফেলে ফিলিপ লারকিন কিংবা
হুমায়ূন আজাদের সাথে তর্কাতীত হয় মানুষই সেখানে শিল্প
সমুদ্রের ঢেউয়ের সাথে বিশ্বাসঘাকতা করে— সে আমার ঈশ্বর না
যে ঈশ্বর মানুষ চেনে না— ধর্ম চেনে, সে আমার না
এই মহা অলৌকিক ঈশ্বরের আমার কোনো লোভ নেই
আমি ইন্দ্রিয়ে বাতাসের করতালি শুনতে পাই—
আমি শিল্পের উপাসক— আমার অধীনে কেউ নেই
কোনো স্বেচ্ছাচারিতাও নেই— আছে ঐকান্তিক উপলব্ধির বন্ধু নির্সগ!
কবিতাপ্রকল্প প্রাইভেট লিমিটেড
একটা পুরাতন নগরীর ছাদে আকাশ উড়ে যাচ্ছে গ্রামে
এদিকে ট্রাম্পের রাগি রগের শব্দ শাসন ভারি রবার
স্ট্যাম্পের থরথর ঈশ্বর ছাদে একা
ঘুমের ভেতর চিনি মিশিয়ে নির্ণয়াতীত—
তরুণ গোলাপ প্রকল্পে নক্ষত্রচাষ করে—
একটা প্রাচীন বিকেল অক্টোবরের বলিরেখায় লোলচর্মে
অঝরে বৃষ্টি নামাচ্ছে
জানি-ময়ূরের পাখা বাতাস করে প্রাণহীন বৃক্ষের ঠোঁট
কেটে লিখছে কবিতা
ছুরি দিয়ে এইসব কবিতা আমাদের অনুভূতি শব্দের
অতীত প্রাচীর
এখন ঘরের সব আসবাবপত্র-রান্নাঘরময়
শখের টয়লেট লজ্জিত কবিতা হয়ে উঠছে সর্বত্র!
=================================
বালুচিস্তান
রেজাউল করিম
গুমোটে গুমোটে ছেয়ে গেছে লালে লাল আসমান
হিঙ্গেল-দাশত নদীর ঢেউয়ে,মাক্রান-কির্থ-সুলতান
পর্বতমালার উষ্ণশরীরে বেজে ওঠে বিদ্রোহের হুংকার।
চাগাই-বুগতি পাহাড়ের চূড়ায় চলছে
আতসবাজির মহোৎসবের এ কী ঝংকার!
মাও,চে,ফ্রানৎস ফানোঁর,হো চি মিন
যেন ওদের মননে মুক্তির দর্শনে অমলিন।
জ্বলতে জ্বলতে ঝলসে ওঠে শোষিত বঞ্চিত
বালুচ,বালুচিস্তান পুনর্বার।
ভয়ে কাঁপে আরেকবার পাক-হানাদার
‘রাইফেল রুটি আওরাত ‘ওদের জন্য
এ শব্দত্রয় একাত্তরের পূর্ব বাংলার।
আজ কোয়েটা বিদ্রোহ বিপ্লবে দাবানলে জ্বলে
হুদ্দার বন্দিশালায় যুগপৎ যন্ত্রণা ও প্রেমে মিলে।
বুগতি-মারি-মেঙ্গল-দাস্তির নারী-শিশুরাও
থেমে নেই, বসে নেই পশতুরাও।
লাখো কণ্ঠের স্লোগানে স্লোগানে মুখর
রাজপথ, খোলা প্রান্তর।
অন্তঃউপনিবেশের যাঁতাকলে আর কতোকাল?
আর না…দুমড়ে মুচড়ে ছারখার হয়ে যাক
পাকিদের যত কারবার
সাম্য স্বাধীনতা নারীমুক্তির লড়াই চলছে দুর্বার।
খুন, ঘুম, বন্দিত্ব, লাঠি, গুলি, টিয়ারগ্যাস
হোক যতো…ওরা মুক্তির লড়াইয়ে কী অবিচল!
বলে দেয়,জানিয়ে দেয়,মনে রেখো ইসলামাবাদ,
তোমাকে এখন থেকে বৃদ্ধাঙুষ্ঠি, মুর্দাবাদ।
কী দৃঢ় উচ্চারণ
সংগ্রামের পথে ওরা যেন আজ নো-রিটার্ণ।
স্বাধীনতা এখন ওদের আর অপার্থিব স্বপ্ন নয়,
যেন এখন বশির জায়েব,ওয়াহিদ কামবার,
আল্লাহ নজরদের একমাত্র আরাধ্য,
বিএলএ বিএলএফ ওদের সাহসী ঠিকানার হাতিয়ার।
ইতিহাসে ফিরে ইতিহাসের আলপথের সারং
বাংলার মুজিবের পথে যেন
হাঁটছে কারাবন্দি স্বপ্নবাজ মুক্তিদূত মাহরাং।
হাঁটি হাঁটি পা পা করে ওরা গিরিপথে দেদীপ্যমান
মুক্তির নিশানার খোঁজে…জয় বালুচিস্তান।।
=================================
মাছের চোখে রাষ্ট্র
মুন্সী আবু বকর
হ্রদে একটি মাছ নামবে—
তাই আজ রাষ্ট্রের এত ব্যস্ততা।
মন্ত্রী এলেন, সচিব এলেন,
ক্যামেরা এল, পতাকা এল—
শুধু যে মানুষটি সারাদিন
খালি হাঁড়ির পাশে বসে থাকে,
সে এল না।
মাছটি জলে পড়তেই
ফ্ল্যাশের আলোয় ঘোষণা হলো—
উন্নয়ন সাঁতার কাটছে
কেউ জানল না,
মাছটির দাম কমাতে গিয়ে
তার স্বপ্নের মতোই
তার শরীরটাও কমে গেছে।
কৃচ্ছ্রসাধনের ভাষণ ভেসে আসে—
আর দূরে কোনো মায়ের চোখে
এক মুঠো চালের হিসাব।
হ্রদের জলে মাছ সাঁতরে যায়,
তীরে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র
নিজের প্রতিবিম্ব দেখে মুগ্ধ।
মানুষ শুধু হাসে না—
তার হাসির নিচে জমে থাকে
দীর্ঘদিনের ক্ষুধা,
অভিমান,
আর একদিন জেগে ওঠার মতো
নিঃশব্দ ঢেউ।
সেদিন হয়তো
কোনো মাছ নায়ক হবে না—
জলটাই প্রশ্ন হয়ে উঠবে।
=================================
শরতের সোনারোদ
রুহু রুহেল
গ্রামের সকাল কত মিষ্টি সোনারোদে
উদোম শরীর হেঁটে চলি শরতরোদের পথ
বসিয়া ছনের ছাউনিতে
মজার চায়ের পেয়ালায় চুমুক আর চুমুক
দেহের ভাঁজ খুললে পাবে সোঁদাগন্ধ ধুপ!
কারো চোখে সকাল হয় দুপুর
দুপুর হয় বিকেল, বিকেল ঘনায় সন্ধ্যা
সন্ধ্যার সপ্তর্ষি মাপে রকমারি জল
জলের বোতল ভরে আছে আরাধ্যের
যত গোল্ড ফিশ
ইচ্ছেরা সাজায় কিনি বিকিকিনি
খোলতাই করে শিল্পিত আঁচড়
কবিতা কুমারী আজ কার ঘরে আছে?
কোন আঁচলের ভারে ভেতরে জোয়ার আনে!
ব্যাকরণ মঞ্জরীরা খাবি খায়।
কে বুঝতে চায়?
শব্দেরা খেলছে খেলাঘরে খেলোর বিভোর ঢেউ
দুহাতে নিংড়ায় ধুরন্ধর কেউ কেউ!
আর কতকাল হবে নষ্ট! নরোম নীরব রাত,
বিরহিনীর গোপন ব্যথার মতোন!
বুকে লাগে কষ্ট আর কষ্ট!
নীলাভ রাতের ঐ শারদ-জোনাকিরা
শিরশিরে কাঁপন তুলুক জলের শরীরে
কেউ কি আছে জানবার ও জানাবার?
কেউ নেই কেউ থাকতে চায় না এমনই!
শরতের শুভ্র স্বচ্ছ কাশফুল আছে শুধু
এইটুকু সমীরণে শান্তি বিলোবার !
=================================
‘পার্থ’ মুগ্ধতার এক শহর
(পশ্চিম অস্ট্রেলিয়া’র ‘পার্থ’ সফরের আলোকে)
স্বপন বড়ুয়া
মুগ্ধতার এক শহর অজি’দের “পার্থ ”
যেখানে মেলে শান্তির নির্মল স্বাদ।
‘আপন বেগে’ ছুটে চলা নদীর মতো
দূরে কোথাও গেছে মিশে রাস্তা যতো।
সবুজ পাখা মেলে সারি সারি দাঁড়িয়ে বৃক্ষ-তরুলতা
বর্ণিল ফুলগুলোয় যেন ধ্বনিত হয় শান্তির মধুর বারতা।
শহরজুড়ে নিঃশব্দ নীরবতার কোলাকুলি
গাছে শুধু শোনা যায় পাখিদের কাকলী।
থেকে থেকে সশব্দে প্লেনগুলো জানায় বুঝি
স্বর্গ কত কাছাকাছি,
কলহ বিবাদে আমরা সতত কেবল
যেখানে সেখানে লড়ছি মিছামিছি।
এক সাথে সব প্রাণী পাশাপাশি করে বাস,
অপূর্ব অভয় নগর ছড়ায় ভালোবাসার সুবাস।
দেশটির নগর মহানগরে
অহরহ ভিড় করে প্রত্যহ বহু অভিবাসী,
মোহনীয় স্বপ্ন বুকে নিয়ে
জীবন সংগ্রামে রত ওরা দিবানিশি।
“অজি” আর নানা অভিবাসী
দেশটিতে করে বাস,
শত সংগ্রাম ভুলে তারা
বেলা শেষে ফেলে প্রশান্তির নিঃশ্বাস।
শ্বেত কিংবা কৃষ্ণ কালো, পীত বা তামাটে
ধর্ম -বর্ণ, সাধক ভিন্ন চলছে পথ একসাথে।
নেই কোথাও ডর- ভয় কোলাহল শংকা,
প্রেমিক যুগল চলেছে পথ সানন্দে একা।
বয়স করে না এখানে কখনো গ্াস বার্ধক্যের জীবন
আপন কর্মে সবাই থাকে নিমগ্ন অসাধ্য করে সাধন।
ঢেউ কোলে নদীগুলো যেন এক ছলছল আয়না,
দু ‘ হাতে আকাশ দিয়েছে জলে নীলাভ বিছানা।
শহর নিয়েছে সাজ আবার অন্য এক রূপে
পাহাড়ের পাথর ঘেরা,
কুলকুল রবে পাহাড় বেয়ে
অবিরাম ছুটে চলে জল বাঁধন ছাড়া।
পথ চলতে চলতে পথিকের মিলবে এখানে
বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ,
গরু-ঘোড়া-মেষ দল চারণ ভূমিতে
করে বিচরণ দিন -রাত।
মৌসুম ফিরে এলে চারদিকে শস্য মাঠে
গেরুয়া বসনধারী সন্ন্যাসী যেন চলে হেঁটে।
ধুলোবালি আবর্জনা বর্জ্য মেলে না চোখে কোথাও
গাড়ি ও শিল্পের কালো ধোঁয়া সে-ও বুঝি উধাও।
শান্ত ছায়া সুনিবিড় পার্থ’র
রয়েছে এক পাহাড়,
সবুজ পত্রপল্লব ঘিরে
দেহ আছে যার,
শহরের কাছাকাছি নয় বেশী দূর
যেখানে মন্দিরে ধ্বনিত হয়
ধ্যানমগ্ন বুদ্ধের অহিংস সুর।
সশব্দে সাগরের সাথে
শুভ্র বালুচর হাসে যেন মিলেমিশে
পরিবার-পরিজন সানন্দে
এখানে ছুটে আসে বেলাশেষে।
প্রশান্তির চাদর মুড়ে থাকে মোহনীয় শহর “পার্থ”
নিরিবিলি শান্ত কোলাহল মুক্ত দিন কিবা রাত।
ডেভেলস ব্রেথ
সুহিতা সুলতানা
সৌগন্ধহীন শাদা পাউডার যখন দিগন্তের পেছনে ছুটতে থাকে
তখন হাওয়ায় উড়তে থাকে শূন্যতা !
নৈঃশব্দ্যের ভেতরে মুদ্রিত হতে থাকে রঙের খেলা!
নিঃশব্দে অচেনা পথ অচেনা মানুষের অনুগত হতে হতে জীবন খেয়ে ফেলে
ডেভেলস ব্রেথ! কতটা নতজানু হলে বেমালুম সব ভুলে
গিয়ে সর্বস্বান্ত হলে মুক্ত হওয়া যায়? এই রক্তাক্ত বিকেল
বিমূঢ় অস্তিত্ব, পচে যাওয়া মগজ,পাঁজর ভাঙার শব্দ,হিংসা
ও মৃত্যুর কাছে নিয়ে যায়!গা ঘেঁষে কোন চক্র অজ্ঞানতার
গহীনে নিয়ে যাচ্ছে? স্বপ্নগুলো ফুটো করে দিচ্ছে কারা?
মহাজগৎ দেখবার মোহে আমিও একদিন দৌঁড়েছিলাম
ভূতের বাঁশির সুরের মধ্য দিয়ে…মাকড়সার জালে ঝুলছিল
হাড়ের কঙ্কাল, থেপড়ে যাওয়া নাক ও চোখের কনিকা
জীবন বড় ক্লান্ত এখন অস্পষ্ট আর লুপ্ত প্রেম যেন ভূমিহীন
মানুষের গল্প! চাঁদ ও সাপের খেলা দেখতে গিয়ে যারা
ওঝার খপ্পরে পড়েছিল তারা আর বাড়ি ফিরে আসেনি!
=================================
অস্তিত্ব এখন কবর
কামরুজ্জামান গোপন
সারাদিন যাবজ্জীবন ফাঁসির দণ্ড নিয়ে ঘুরি
মরি না—
মৃত্যু এখন পাপ অস্তিত্ব কবর সমান
ঘরের ঘৃণা নিয়ে ঘুরি ঘাটে ঘাটে
পথের অবজ্ঞা মেখে চলি প্রান্তরে প্রান্তরে
সারারাত পাখির নিহত গান লাশ হয়ে পড়ে থাকে বুকের বারান্দায়।
ফাঁসির রজ্জু
অঙ্কুরিত চাঁদ সারারাত দুধ পান করে নীলাম্বরী স্তনে
মুছে যায় নিবিড় শরীর সবুজের আর্তনাদে
সেলাইবিহীন বাতাস কাঁপে অরণ্য মর্মরে
কাজলধোয়া নদীর চোখে শৈশব কৈশোর দুলে দুলে
যৌবন বজরায় গুণমন্ত্র টানে মেঘের মাস্তুলে
বারদবিদীর্ণ জীবন উপকূলহীন সমুদ্র শঙ্কায় ফিরেছে
যখন জিঞ্জিরায় তখন ফাঁসির দণ্ড নিয়ে
রোদের রজ্জু তাকিয়ে থাকে আমার কণ্ঠে—
=================================
দীর্ঘ প্রেমের কবিতা
সোহরাব পাশা
ভ্রমণের অসমাপ্ত ছোট ছোট গল্প
লাবণ্যের ছেঁড়া পাতা–
নিরীহ ক্রন্দন
রাত্রিঢাকা ভোরের গোলাপ
দাগ ওঠে না মেঘের
সন্দেহ প্রবল ছায়াগুচ্ছ
আজন্ম অন্য তুমি ,
অদ্ভুত আদিম রূপান্তর
ত্রস্ত কলস্বর
পেছনে তুমুল না- থাকার ইতিহাস
নৈঃশব্দের প্রিয় গান ;
মুখস্থের ক্লাস —
রোদন নিষিদ্ধ নেই দীর্ঘ প্রেমের কবিতা ।
একজোড়া নবান্নশালিক
আযাদ কালাম
অদৃশ্য অনলস্পর্শের সুখে রোদে ভিজে ফেরা হলো
কই। সিগারেটে অগ্নিযোগের সুগন্ধ ছড়িয়ে দুজনে
বেশ ধকে যাওয়া যায়
তরল আগুনে ক্রমাগত নেমে যায় মাটিমুখি জেদ
সন্ধ্যা নামে ভোরের আকাশে চোখে হাসে রোদের
ঝিলিক সব জানে একজোড়া নবান্নশালিক
=================================
সমরাগ
ফরিদুল আজাদ মিলন
আমাকে ছেড়ে আমি যেতে পারিনা সম্ভব নয় কখোনই
শাস্তি গ্রহণে সমর্পিত হয়ে ছিল প্রমিথিউসবৃত্তি অবান্তরে
নিষ্ঠুর হোক যত পরাজিত ঔদ্ধত্য নটোয়াল জয়ভাণ দম্ভ
তোমাকে নিয়ে তুমি আমার হয়ে যাও আমি হই তুমিতে
বৃষ্টি মেঘ বাষ্প সমুদ্র বরফ অভিন্ন এককে এককে রয়ে যায় ভিন্ন
ব্যাকুলে কূল্তো ভাঙবেই দুমড়ে মুচড়ে বিলীন হবে হবেইতো
স্রোত কবে দিয়েছিল অধিকার বেঁধে দিতে সীমায়িত সীমানার
আন্তেগনের চোখ ঠিক জ্বলে উঠেছিল প্রেতরাতের ঘাগড়া খুলে
মানুষের স্বাদটুকু পেতে হবে মানুষেই গণ্ডির চুরমাচুরে ফিরে ফিরে
রাজব্রত ভীত হীনবল রাজদণ্ড ফুঁসে উঠুক যত তার ভীরু হুঙ্কার
পোষ্য পালিতন্যায় অবসন্ন লাশশিমুরোদ হা-হুঙ্কার সঞ্চারি
স্পর্ধার প্রসবি থুতুতে অবারিত ঘৃণার তোড়ে অহমফানুস উড়ে উড়ুক
তুমি ফিরে এসো আমিও ফিরি আমি তুমিতে একাকার হয়ে থাকি
মর্ত্যলোকের প্রেমজামা
এম এ ওয়াজেদ
হে অনন্তকালের অশুভ গতকাল-
বেদনার রঙকালিতে লিখে রাখো যৌবনের মৃত্যুদিবস
ছাদের কার্নিশে লিখে দাও ব্যঙ্গচিত্রের আনন্দমেলা
হৃদয়ের মুদ্রণশিল্পে এঁকে দাও দাসত্বের কার্নিভাল
বসন্তঋতুর বক্ষদ্বারে রেখে দাও গন্ধহীন পোস্টকার্ড
তারপর-
কেড়ে নাও সুললিতা কোকিলার কণ্ঠনালির গুঞ্জনধ্বনি
এই বিশ্বের অশোধিত চৌবাচ্চায়-
ছেড়ে দাও দাপটবাদী বুনো শুয়োরের কতিপয় বাচ্চা
অতঃপর অরক্ষিত বুক পেতে দাও বন্দুকের ট্রিগারে
যন্ত্রণার কনকরসে পুড়ে যাক বালিকাবধূর প্রেমজামা
অসভ্য খোজা প্রহরী ছিঁড়ে ফেলুক স্বর্ণচাঁপার পুষ্পগুচ্ছ
অবজ্ঞার রক্তউপাখ্যানে এঁকে দাও লাল লাল রক্তচিহ্ন
এআই কবির পদতলে সঁপে দাও তোষামোদি উষ্ণখেতাব
করতালিতে আলিঙ্গন করো বিস্ময়কর আতঙ্কবাদী মূর্খতা
চুষে খাও নক্ষত্ররমণীর লিভার ফুসফুস প্লীহা হৃৎপিণ্ড
খোলা রাখো কণ্টকময় গ্রাসনালির টসটসে জারকরস
পদচুম্বনে সিক্ত করো দৈত্যবাদী দানবিকতার রক্তবুট
জুবিলি কনভোকেশনের আগত অতিথিদের বলে যাও-
ভাইসব , মহাত্মা গান্ধী ও নেহরু বাবু একই ব্যক্তি ছিলেন
এসো আজ-
বিসর্জন দিই প্রেমসত্তার বীরত্বগাথার সালোকসংশ্লেষণ
বক্ষউদরে ভরে রাখি ধ্বংসজ্বালার কার্বন ডাই অক্সাইড
আমিষে মিশিয়ে দিই গন্দম অথবা প্রাণঘাতী হেমলক
পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে দিই নাৎসি গিলোটিন
মর্ত্যলোকের প্রেমজামা খেয়ে ফেলেছে ক্ষুধার্ত নীলতিমি
=================================
পাণ্ডুলিপি
হাসিনা আঞ্জুম মোনালিসা
প্রান্তিক কবি তার ব্যর্থ পাণ্ডুলিপি জ্বেলে
রাঁধে ভাত,
পৃথিবীর হাভাতে রা ওত পাতে হাঁড়ির ভেতর
আধপেটা কবিতার উচ্ছন্ন আকর
জড়ায়ে ধরে আগুনের আদর
উড়ে যায় পাণ্ডুলিপির স্নেহ ছাই ।
দমিত পলকের ইতিহাস
হোসেইন আজিজ
মর্ত্যের কপালে নিপীড়ক সময়ের তিলক,
আকাশ জুড়ে ঝুলে থাকে একচ্ছত্র নীরবতা।
ডিজিটাল সময়-যন্ত্রের কম্পন
প্রতিটি পলকে গুনে যায় অনুগত সময়,
যেন সংখ্যা নয়, একটি দীর্ঘ দমনের শ্বাসপ্রশ্বাস।
রাতের ভেতর গুম হয়ে যায় কিছু শব্দ,
কারা যেন নাম মুছে ফেলে নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে।
আলোও এখন শাসনের অধীন,
যতটুকু অনুমতি, ততটুকু জ্বলে।
মানুষেরা ঠিকই হেঁটে বেড়ায়,
কিন্তু তাদের ছায়া পড়ে না কোথাও।
মাটি শিখে গেছে, নীরবতাই নিরাপদ উচ্চারণ।
তবু মানুষ অলীক স্বপ্ন দেখে
নেমে আসবে নাকি সাধুসন্ত সময়!
=================================
আমি অচেনা কেউ নই
সিকানদার কবীর
চেয়ে দেখো, আমার চোখ মুখ হাত পা
আপাদমস্তক-তোমাদের অতি চেনা, জন্মভিটা,
পিতা, পিতামহ, বংশ পরিচয় তা-ও আছে জানা;
আমি নই কোনো পড়শি উড়ে এসে জুড়ে
বসা-অন্তরের ভিতরে অন্তরের বাসা;
সেই গ্রাম পোস্টাপিস, বাড়ির মেঠোপথ
খালবিল, ধানখেত, বাঁশের সাঁকো-
শতবর্ষী বৃক্ষের ছায়া আমার ঠিকানা-
আমার কোনো কিছুই নয় তোমাদের অজানা।
জীবনে মরণে আমি মায়ার শেকলে বাঁধা
তোমাদেরই লোক-মাটির মমতা হৃদয়ে; অন্তরে
বয়ে বেড়াই মানুষের দুঃখ জাগানিয়া শোক;
আমার সর্বাঙ্গে কাদামাটির ঘ্রাণ- মায়ের উঠোন
লেপা হাতের ছোঁয়া- সেই আতরের সুগন্ধি পাবে
নাকো কেউ গন্ধরাজ হাস্নাহেনায়-
চেয়ে দেখো, এখনো নদী খাল পুকুরের জলে
ভেজা আমি–সিক্ত দু’চোখের পাতা
কবেকার শেখানো মায়ের বুলি-সেই সোহাগি
শব্দে নিত্য সাজাই কবিতার খাতা।
=================================
আইনাল হক-এর চারটি কবিতা
শূন্যতায় লীন আমার কথামালা
জ্বলন্ত সিগারেটই শেষ কথা নয়;
প্রথম আলিঙ্গনের স্মৃতি কোন্ ইরেজার-এ মুছবে বলো?
অসম সময়ের পাহাড় ডিঙিয়ে যে প্রনয় বার্তা এসেছিল
তাকে কি ভুলা যায়?
পাতা ঝরা শীতে সবুজের হাতছানি বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি।
মহাকাল পিছনে পড়ে থাকে
মহাকাব্যের পাতা উল্টিতে থাকে
যোগাযোগ শূন্যতায় লীন হলে কিছু কথা থেকে যায়।
শতাব্দীর নির্বাক হালচিত্র
আমাদের নিদারুণ অজ্ঞতায়
ভীষণ কৌতূহল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বাকরুদ্ধ শতাব্দী
ম্যাজিক চেয়ারে বসে অংকের নামতা আওড়ালে
বয়স বাড়ে দক্ষিণা বাতাসের;
অবসাদ আর ক্লান্তিতে দুপুর ঘুমিয়ে গেলে
ওত পাতা নেড়ি কুকুরও দৃষ্টি ফেলে মাংসের উপর।
হরেক পরিকল্পনা বয়ঃসন্ধির সীমানায় আটকে যায়
প্রেমপত্রে লিপিবদ্ধ হয় রোমাঞ্চহীন শর্ত
নির্লিপ্ত মুখাপেক্ষিতা
বিষণ্ন আকাশের পূঞ্জীভূত মেঘ
ক্রমশ অন্ধকারের গহীনে হারিয়ে যায়
নির্লিপ্ত মুখাপেক্ষিতা হা করে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকে
কি নিদারুণ নিঃসঙ্গতা! হায় সময়! অভিমানী সময়!
ফেক আইডেন্টিটি মাথা চাঁড়া দিয়ে ওঠে
আকাশ বেমালুম ভুলে স্বরূপের কথা।
তবুও বহমান সময় নির্লজ্জের মতো বয়ে চলে
দায়িত্বের কাঁধে জমা পড়ে অতিরিক্ত দায়িত্বের ফিরিস্তি
এক ডজন রূপালী জোছনা
এক ডজন রূপালী জোছনা বুক পকেটে পুরে
বসন্তের বিকেলে চৌরাস্তায় মোড়ে দাঁড়িয়েছিলাম; দক্ষিণা হাওয়ায় হাতের সিগ্রেটে হৃদয় পুড়িয়েছি
এক আকাশের অপেক্ষায়। কথা ছিল ইজিচেয়ারে বসা যেনতেন একটা গোধূলি পেলে মুখোমুখি তাকিয়ে থাকবো,
কথা ছিল ছেঁড়াফাটা একটা বাজারের ব্যাগ পেলে বিপ্লবী স্লোগানে ভর্তি করবো।
হঠাৎ কোত্থেকে উড়াধুড়া এক আঁচলা রোদ এসে পুড়িয়ে গেল আমাদের স্যাটেলাইট চেতনা।
এখন শূন্য হাতে পৃথিবীর মুখোমুখি দাঁড়াতে ভীষণ লজ্জা পাই।
=================================
যদি মনে পড়ে
রবি বাঙালি
যদি মনে পড়ে,
চলে এসো শরৎ প্রভাতে শিউলি তলে,
সুরভিত সমীরে ধবল পাপড়ি দলে,
হে প্রিয়ো!বরিব সোহাগে,ঈক্ষণ জলে
হাত দুটি ধরে।
আজো জেগে ফেরে,
নভঃ নীলে, মেঘে মেঘে মিছে আল্পনা,
শিউলি ঝরা সুরে বুনি কত কল্পনা!
হৃদয়ের কোন গহিনে লুকানো যে প্রার্থনা—
শুনবে কি ওরে?
তুমি ফিরে এলে,
শিশির ভেজা ছায়াপথে কোনো চেনা ভোরে,
বেঁধে নেব তোমায় একরাশ মায়া ডোরে
হারানো প্রাণ ফিরে পাবে তোমারই তরে-
সব ভুল ভুলে।
ভালোবাসা নদী,
বহিয়া চলে নিরবধি মন উপকূলে,
এসো তবে থমকে থাকা এই পথভুলে;
রঙিন স্বপ্নে ভরে দাও হে, প্রীতিকুলে-
লয়ে দ্রোহ হৃদি।
=================================
ব্যবসায় আমি কোনোদিনও লস খাইনি
আবদুস সাত্তার বিশ্বাস
বাস স্টপেজে এক ঝালমুড়ি ওয়ালার কাছ থেকে এক ঠোঙা ঝালমুড়ি কিনে খাচ্ছি;
কোথা থেকে এক পাগল এসে আমার সামনে খানে দাঁড়াল,
আমার মুখের দিকে তাকাল, আমার চোখের দিকে তাকাল,
তারপর হাসল,
হাসতে হাসতে আমার ঝালমুড়ি খাওয়া দেখল,
কিন্তু তার তাকানোর মধ্যে কোনো লোভ নেই,
তবে সে যে ক্ষুধার্ত—তা প্রকাশ পেল।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম—ঝালমুড়ি খাবে?
সঙ্গে সঙ্গে সে ডানদিকে ঘাড় নাড়ল।
আমি ইচ্ছে করলে তাকে আমার খাওয়া ঝালমুড়ি দিতে পারতাম,
পাগলের আবার এঁটো! কিন্তু দিলাম না। মন সায় দিল না।
এক ঠোঙা টাটকা ঝালমুড়ি কিনে দিলাম—
পাগলটা এক ঠোঙা টাটকা ঝালমুড়ি পেয়ে কী দারুণ খুশি!
বারবার সে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল…
আমার ব্যাবসায় আমি আর কোনোদিনও লস খাইনি!
=================================
ধ্বংসস্তূপের ভেতর ইতিহাস
আলী আকবর বাবুল
৫ আগস্টের কালো দুপুর—শহরের বুকে উন্মত্ত আগুনের লেলিহান জিহ্বা
ধানমন্ডি বত্রিশ—ভাঙা ইটের নিচে বঙ্গবন্ধুর উচ্চারণ, রক্তাক্ত এক মহাকাব্য
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি—বুলডোজারের দাঁতে ছিন্নভিন্ন বাংলাদেশের মানচিত্র
ইতিহাসের চোখে ধোঁয়া, অথচ ছাইয়ের ভেতর জ্বলন্ত একাত্তরের সূর্য।
যে সিঁড়ি বেয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার বজ্রকণ্ঠ, সেখানে আজ ধ্বংসের নখর
যে দেয়ালে জাতির স্বপ্ন, সেখানে কালো কালি—সভ্যতার কপালে কলঙ্কচিহ্ন
মুছে ফেলতে চাইলেই কি মুছে যায় নদীর জলে ভাসা ত্রিশ লক্ষ প্রাণের প্রতিচ্ছবি
বাংলার মাটির প্রতিটি ধূলিকণা যেন রক্তের অক্ষরে লেখা এক অনন্ত দলিল।
বঙ্গবন্ধু কোনো ইট-পাথরের ঘর নন—তিনি বাঙালির স্বাধীনতার অন্তর্লীন ভূগোল
ধানমন্ডি বত্রিশ কোনো স্থাপনা নয়—একটি জাতির স্মৃতির ধমনী
ধ্বংসস্তূপের ওপরে দাঁড়িয়ে ইতিহাস আজ আয়নার মতো নির্মম প্রশ্ন
কার হাতে কুঠার, কার চোখে অন্ধকার, কার স্বার্থে স্মৃতির ওপর এই আক্রমণ।
তবু ইতিহাস ফিনিক্স—ছাই থেকে তার ডানা, অন্ধকার ভেদ করে তার নক্ষত্র
একাত্তর কোনো জাদুঘরের বন্দি ছবি নয়—প্রজন্মের শিরায় বহমান অগ্নিস্রোত
বুলডোজার যতই গর্জে উঠুক, সত্যের মেরুদণ্ড ততই কঠিন পাথর
বাংলাদেশের হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ—চিরজাগ্রত এক অমোচনীয় আলোকলিপি।
=================================
কীট
মাহমুদ নজির
লিখতে আমার অনেক দেরি হয়ে গেছে
ভাবতে ভাবতে মনের ভুলে
হিসেব করিনি সময়।
শহর থেকে বহু দূর নির্জন পাহাড়ি গায়ে
সবুজ ছায়ায় বেঁধেছি ঘর
বিজলিবাতিবিহীন ফুরফুরে শরত জোছনায়।
কেউ রাখেনি আমার খোঁজ
শুধু ভাবছি সুদিন এলে জানাবো তোমায়
কীভাবে কেমন কাটছে দিন।
দূরত্ব বেড়ে গেলে
কেউ কাউকে মনে রাখে না তেমন,
ভালোবাসার দাম খুব কম এখানে।
লিখতে আমার কষ্ট হচ্ছে খুব,
অনুভূতি, চেতনা, মস্তিষ্কে ক্রমে ক্রমে
ঢুকে যাচ্ছে বিষবাষ্প,ভয়ানক কীট!
দুর্ভিক্ষ
মুহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী
চিত্রশিল্পী জয়নুলের আঁকা দুর্ভিক্ষের ছবি, একাকীত্বে একটি কাক নিঃসঙ্গ, একজন অভুক্ত মানুষ।
দৈনিক ইত্তেফাকের ফটোসেশন করা একটি ছবি চিলমারীর শাপলা ফোঁটার দেশে।
মানচিত্র খেয়ে একজন কবি বেঁচে থাকতে চায় আরো কটা দিন।
শুধু খাদ্যের অভাব হলে ই দুর্ভিক্ষ হয় না, সমাজের রন্ধে রন্ধে দুর্ভিক্ষ। মাদক এবং নেশা র দুর্ভিক্ষের কবলে।
মামুনুর রশিদের চিন্তাভাবনায় দুর্ভিক্ষ অন্যরকম।
ভাষার ও দুর্ভিক্ষ হয়।
দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে সমাজ।
বেঁচে থাকার জন্য মুষ্টিবদ্ধ হাত সুকান্তের কবিতায় প্রতিটি পঙ্তিমালায় দুর্ভিক্ষের ইঙ্গিত বহন করে। অসঙ্গতিকে বিদায় জানাতে না পারা আরেকটি দুর্ভিক্ষের চিত্র ফুটে ওঠে।
দুর্নীতি যখন বিষাক্ত সাপের কামড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে দুর্ভিক্ষ তখন প্রাণ কেড়ে নেয়।
=================================
অপেক্ষার আকুলতা
আরিফ চৌধুরী
বনফুল ফুটেছে বুকের গহিনে
পৃথিবীর বুকে জাগে যে আলে
জ্বলবে অনন্তকাল
রাতের পাখি আলোর জোনাকি
মিটিমিটি আলোয়
ফুটাবে মাধুরি সৌন্দর্যের মুগ্ধতায়।
অন্তহীন যাত্রা আমার
অনন্তকাল তোমার দিকে
দিকচিহ্নহীন যেতে যেতে ফুরোবে না নীলয়।
অন্ধকারের বিভায় জমে থাকা দুঃখগুলো
স্বপ্নে ফোটে তোমার অনন্ত সত্তায়।
নারীর চোখে এক আশ্চর্য আলোয়
খুঁজে নেবো বুনো অনুশোচনা আার্তি।
এক অনিবার্য মুহূর্তে মুগ্ধতায়
তোমার ঠোঁটে অতল স্পর্শের ছোঁয়া,
নিবিড় উষ্ণতায় তৃষ্ণায় নীরবতা
মনে জমে আছে অলৌকিক তৃষিত আগুন।
আশায় স্থির হয়ে আছি
সকল প্রতিশ্রুতি গভীর মুগ্ধতার পরশে
সিক্ত কোন অমরতায় মায়াবী আহবানে।
ভাদ্রের মেঘগুলো ক্ষিপ্ত ঝরে অশান্ত বৃষ্টিতে
বুকের শোণিতে জেগে থাকা
কষ্ট মুছে দিয়ে যায়
তবু তোমার জন্য দুঃসহ প্রতীক্ষা
রাত্রিতে জেগে থাকে
অচেনা মনে হয় গহিন রাত্রিকে একা
অথই জোছনায় গভীর স্বপ্নের অনুরাগ
মন থেকে মুছে যায় অপেক্ষার অকুলতায়।
=================================
শরৎ হাসে দারুন কাশে
বিজন বেপারী
তটিনীতে কাশ ফুলেরা
ফণা তুলে চায়
শরৎ এলো নীল গগণে
শুভ্র অম্বু ধায়।
শিউলি ফুলের পাপড়ি মেলে
গন্ধে বায়ু ভরে
গাছ পাকা তাল সারি সারি
বাতাস পেলেই পড়ে।
শিশির ভেজা সকাল বেলা
উষ্ণ ভোরের রবি
কুয়াশা দেয় উঁকি ঝুঁকি
আহা দারুণ ছবি।
প্রকৃতি আজ বারেক সাজে
সাদা পোশাক পরা
শরৎ হাসে দারুন কাশে
দারুণ ধানের ছড়া।
=================================
বৈরী সময়
নিবেদিতা বড়ুয়া
এই নন্দনে আবার মেলেছে ডানা দুর্ধর্ষ পঙ্গপাল
শস্য শূন্য খামারে জড়োসড়ো কৃষক,
এখন দিন দুপুরে অদ্ভুত শেয়ালের হাঁক,
হাঁস মুরগিসহ লাল গরুটি ও নিয়ে গেছে নব্য জমিদার,
জীবিত কঙ্কালে যেন আনন্দে রোদ পোহায় এবার।
প্রগাঢ় যাতনায় ধান ঝাড়া কুলোতে কেবল পাথর নূড়ি
মলিন জন্মভিটায় রুগ্ন চৌকিতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে
নিখুঁত মুখোশধারী,
উন্মাদ নেশার কবলে আজ সাজানো গেরস্থালি।
এ বেলায় হিংস্র শঙ্খচিলের থাবায় আমরা ক’জন শুধু নিরপরাধ কয়েদি।
শুশ্রূষার এই মন্বন্তরে অপুষ্টিতে ধর্ষিত গর্ভবতী একলা নির্বাসনে,
শোক গাথা লিখে যায় পাতাল প্রবাসে নিষ্পাপ বালিকা
অভুক্তির আড়তে শুয়ে আছে জিভ কাটা ধর্ষণের গ্লানিতে।
একরোখা চক্রান্তে ঝরে পড়ে কিশোরের শখের ঘুড়ি,
ভাঙা গল্পের নাটাই ছেড়ে, পান্থশালায় আজ নাক ডেকে ঘুম পাড়ে
স্বাধীন স্বত্তায় তার চোখে ঝুলে থাকে খাপ খোলা তরবারি।
তবু ভোরের আশায় নির্ঘুম জেগে থাকে এক রাত জাগা প্রহরী।
=================================
ভঙ্গুর পথ বর্ষা রথ
সুলতানা নুরজাহান রোজী
শেওলা জমেছে ভঙ্গুর পথে
এতটুকু দেখা যায় না সে পথ
ওখানে চলে বর্ষা রথ
জীবনের খিড়কি দরজা মাকড়সার
জাল বুনা নিপুণ সুচারু কারুকাজে
চোখ দুটিই ঝলসে গেছে নিদারুণ ভাবে
ভঙ্গুর পথে কষ্টের বুনা সুতাগুলো এক
এক করে সাজানো রয়েছে সাপে কাটা
ছক্কার করিডোরে
বেসামাল সব যেন মাতাল করা সময়
বেদখল জমিতেই চাষাবাদ করে
পোকামাকড়ের নজরবন্দি রাজপথে
জীবন নকশা মাটিতে চাপা দিয়ে যায়
ভঙ্গুর ধূসর জগত।
=================================
সম্পর্কে নিখুঁত কারবালা
অপর্ণা নন্দী
সম্পর্কে আজ নিঁখুত কারবালা
রক্তের সম্পর্কে বিচ্ছেদের পত্রপাঠ
মাতৃজঠর ভুলিয়ে দেই সহোদর
পিতার ভূমে নিষিদ্ধ প্রবেশের চিৎকার।
স্বজনের দ্বারে আটকে রেখেছে সুখ
পৃথিবীর কাছে সাক্ষী খুঁজে নি কেউ
মিথ্যার কাছে নতজানু আজ মুখ
বুকের মাঝে তোলপাড় করা ঢেউ।
আপন রক্তে রদবদলের খেলা
শেষ দানেতে দাবায় বাজিমাত
অভিযোগে সহস্রাধিক ধারায়
সময় এখন চিতায় আগুন জ্বালায়।
সময় যখন স্বার্থের সাথে একমত
জঠর তখন ভ্রুণ চিন্তা ভুলে
সমাজ যখন ভুলের নির্দেশিকা
চতুর থাকে সবার উর্ধ্ব মূলে।
=================================
বিস্ফোরণ
উৎসর্গ: দীপুমনিকে
নাজমুল ইসলাম সজীব
কালো ভালো চশমার গোলক
চোখ দিয়ে দেখি,
বৈষম্যহীনতায় স্বপ্নের রেখায়
নিজের থাকে আঁখি।
ঐ দূরের সীমানায় নয়
ইতি-নেতিবাচকেই,
পরিবার থেকে রাষ্ট্রেই
সব কিছু সয়-রয়-হয়।
নেতিবাচকেই আমার প্রেম
ফুটে ওঠে দুঃসময়ে
কেবলই তাকে নিজের মনে
লালন করি ক্ষণে ক্ষণে।
সূর্যাস্তের পর দাবানল বয়ে চলে
সরু পথে প্রসারতায়
নিজেকে বিলিয়ে দিতে
জয় বাংলার খরস্রোতায়।
=================================
কস্তরী
মহসিন আলম মুহিন
আসলে যে দেয় সে নাহি তার বিন্দুমাত্র বোঝে,
আর যে নেয়, সেই হন্যে হয়ে তারেই শুধু খোঁজে।।
মূল্যবান-“কস্তরী”-পুরুষ হরিণের নাভি গ্রন্থিতে হয়,
হরিণের দশ বছর পূর্ণ হলে কস্তরী’ পূর্ণতা পায়।।
যেমন সুন্দর দেখতে, তেমন সুগন্ধি, সুন্দর যার নাম,
হরিণের “মৃগনাভি” অনেক দরকারী অনেক তার দাম।।
যে সকল পুরুষ হরিণের দুটি দাঁত গজদন্তের মত হয়,
তাদের কারো কারো নাভির মাঝে কস্তরীর জন্ম হয়।।
তৃণভূমি, পাহাড়-পর্বতমালা, শীতল জায়গায় এরা থাকে,
নিজের কাছে এতো মূল্যবান সম্পদ! খবর নাহি রাখে।।
“কস্তরীর”-সুঘ্রাণে শিকারী তারে খুঁজে খ্ুঁজে পায়,
হরিণকে জবাই করে! নাভি গ্রন্থি রৌদ্রেতে শুকায়।।
নিজে মরে গিয়ে অন্যের গোলা করে দেয় সে ভারী,
বিধাতার দান-ঔষধি উপাদান, হরিণের নাভিকস্তরী।।
তেমনি অনেক মানুষ আছে নিজেরে করে ক্ষয়,
দেশ ও দশের মঙ্গল করে দেয় নাকো পরিচয়।।
=================================
কাশের শরৎ
অপু বড়ুয়া
তুলোতুলো মেঘ উড়ো উড়ো মেঘ
মেঘের পঙ্খি ওড়ে
মেঘের পরিরা মামাবাড়ি যায়
মেঘের পালকি চড়ে।
রঙের শরৎ সোনালি রুপালি
লাল নীল সাদা কালো
সাত রং মেঘে মেঘের শরৎ
যত দেখি লাগে ভালো।
কখনো রোদের ঝিলিমিলি খেলা
কখনো মেঘলা দুপুর
কখনো হঠাৎ অঝোর ধারায়
বৃষ্টি টাপুর টুপুর।
রঙের শরৎ কাশের শরৎ
যে নামেই খুশি ডাকো
কখনো হঠাৎ আকাশ রাঙিয়ে
রংধনুকের সাঁকো।
=================================
মৃন্ময়ী মৃম- এর অনুকাব্য
১.
বিরহের বুকে চুম্বন এঁকে
বেদনাকে দেই ফাঁকি-
কে বলে তুমি নেই!
তোমাকে ভেবেই যে আমি নিয়ত
ভালোবাসার চিত্র আঁকি।
২.
যেখানেই আমি হাঁটি
সেখানেই তোমার পদচিহ্ন
যতদূরে থাকো তত কাছে আসো
হৃদয় তো এক, অভিন্ন।
৩.
আমি আছি তাই তুমিও আছো
তোমার না থাকা জুড়েই
তুমি দিব্যি আমার সাথে বাঁচো।
৪.
প্রতিদিন তোমাকে দেখি না দেখার দৃষ্টিতে
প্রতিদিন ছুঁয়ে যাও মেঘ আর বৃষ্টিতে
বয়ে যাও আমার ভেতর-বাহির
ভাবনার প্রতীচি সৃষ্টিতে।




