অভব্য দিনের গোধূলি
অদ্বৈত মারুত
ভেঁপু-কান্নায় ভেসে যাচ্ছে এই দুপুর-বিকাল;
রাত একা হয়ে চুপচাপ-দগ্ধ মুকুট, পালঙ্ক
পড়ে আছে ভাগাড়ে-পাখিগোষ্ঠী নাকাল
তবু অন্ধকারে আড়ালে বাজায় পাখিরা শঙ্খ।
ঘোর কাটে, ভোর এসে জাগিয়ে তোলে নদী
এ-মনে ও-মনে যদি পৃথিবীর কুম্ভঘুম ভাঙে
নাঙে-ভাতারে সখ্যে অলক্ষ্যে সন্ধি হয়ে গদি
পায়, তার হাতে সবুজেরা সজিবতায় রাঙে
দোয়েল শিষ দেয়, কবুতর ডানা তুলে নাচে
জীবনের আনাচে-কানাচে না-হসপিটাল ঘুমায়
এমন অভব্য দিনে এমন বাসনা কেনবা আসে!
কেন যাপনায় মায়ায় লেপ্টে থাকা দগ্ধ চুমায়
না-জানা আমারে-বিচিত্রারে টোয়াইলাইট করে
ঘুমের ঘুঙুর পরে কেউ বন্দরঠোঁটে চুমু খায়;
সেইসব স্মৃতি আবারও ফিরে এসে হৃদয় নাড়ায়।
==========================
বুকে বহে বসন্ত বাতাস
আকতার হোসাইন
প্রিয়জন হেরে গেলে নিজেকেই পরাজিত ভাবি
নিজেকে হারিয়ে দিয়ে তার সুখে সুখনিদ্রা যাই
আমাদের আজকাল মনোময় হারজিত খেলা
জেনে-বুঝে ভেসে যায় জীবনের নিরুদ্দেশ ভেলা।
বাসা বোনা শেষ হলে
খাবারের খোঁজে যায় পরিশ্রান্ত পাখি- দম্পতি
বৃক্ষেরও খুশিভাব, কতোদিন একা থাকা যায়
পাতা- সংসারে!!
পাতানো খেলায় মেতে দিনকাল মোটামুটি কাটে
উনুনের আঁচে সে-ও দিনদিন রাঙা হয়ে ওঠে
বয়স কমে না বাড়ে আয়নায় ঘুরেফিরে দেখে
মন্দ কী, ভালো বাসা, গামলায় নিশিপদ্ম
নিরাপদ ভালোবাসা খেলা।
ছেঁড়া চিঠি গিলে খায় আগুনের উলসিত শিখা
আইফোন হাতে এলে পুরনো সেটের সাথে
ভেঙে পড়ে চুম্বনের শিহরিত দিন
ঝরাপাতা, মরাফুল, উদ্দাম দেহবাস- স্মৃতি
ঈষৎ শ্বেতাভ চুল, ঢেকে যায় গার্নিয়ার রঙে।
মুখে হাসি, সুখিভাব, জমা হয় সংসারখেলা
বিগত রঙের কাল দিনশেষে সঙ মনে হয়
কখন উড়াল দেবে, পাখি ভাবে সজীব পাতায়
বুনবে নতুন বাসা, বুকে বহে বসন্ত বাতাস।
==========================
একাকিত্বের মেলা
জিন্নাহ চৌধুরী
ফাঁকা ঘর থমকে রয় ফিরে আসে না সে
চোখের ভেতর জমে থাকে নীরব অভিমান,
ললাট লিখন ভেবে হারাই প্রতিক্ষণে
তোমারই স্মৃতিতে জ্বলে অনামা শ্মশান।
সোহাগের দিনগুলি আজ ছাই হয়ে যায়
বিরহের নদীতে ডুবে কাঁদে মনখানি,
প্রিয় মুখ ভেসে ওঠে স্বপ্নেরই ছায়ায়
অশ্রুর ভাষাতে লিখি অব্যক্ত বাণী।
হাতের রেখায় মিশে তোমারই নাম
কে আজ আপন তবে, কে-বা পর হলো!
হৃদয়ের উঠোনে নোনা নিঃশব্দ ঘাম
তবু ভালোবাসা কেন ফুরোয় না বলো?
বেজে যায় স্মৃতি আর নীল বিষণ্ন বেলা
শহরের কোণে জমে একাকিত্বের মেলা।
==========================
ধূর্ত সময়
সাব্বির রেজা
সময় একটা ধূর্ত শয়তান
বদমাস সময়ের বৈরীতায় ফুরিয়ে যায়- যাচ্ছে, আস্ত জীবন!
জীবনের মোড়ে মোড়ে রক্তাক্ত দু’চোখ জ্বেলে তাকিয়ে আছে কুৎসিত ধূর্ত সময়!
ছেঁড়াশার্ট গায়ে ধূসর রঙের জীবন হেঁটে – যাচ্ছে
এ্যাঁদো গলির এবড়ো খেবড়ো খানা খন্দ চড়াই উৎরাই পেরিয়ে!
আলুনা ধূসর জীবন নিয়ে,
নষ্ট সময়ের কেনো যে এতো আগ্রহ!
ভাঙাচোরা জীবনের সারাগায় ধূসর ছাই রঙের মাখামাখি!
না’শাদা না কালো ধূসর! ধূসর! ধূসর!
জীবনের মোড়ে মোড়ে দু’চোখ জ্বেলে, অতন্দ্র প্রহরায়
দাঁড়িয়ে আছে রেড সিগনাল!
যাপিত জীবনের বাঁকে বাঁকে বহুবিধ রঙের আভরণ
সামনেই বিপদজনক বাঁক! হলুূদ রঙের বিপদ চিহ্ন
জীবন এক আস্ত ভোদাই!
বদমাশ সময়ের ক্রীড়নক! শাদা কালোর অশুভ রঙে মাখা আপাদমস্তক
ওহে, নির্বোধ ধূসর জীবন
তোমার অপেক্ষায় কোথাও কেউ দাঁড়িয়ে নেই
শান্তির শ্বেত পতাকা হাতে?
জীবনের অশুভ বক্র বাঁকে বাঁকে
লাল কার্ড হাতে,
আড়ালে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে কুৎসিত ধূর্ত সময়!
==========================
মেয়েটি
শামীম নওরোজ
মেয়েটি বৃষ্টির গতিতে অ আ ক খ মুখস্থ করে
মেয়েটি ঝড়ের গতিতে আলিফ বা তা মুখস্থ করে
মেয়েটি পাঠশালায় যায় ; ধীরে-ধীরে বড়ো হয়
মেয়েটি আমপারা পড়তে যায় ; ধীরে-ধীরে বড়ো হয়
মেয়েটি নিজের অজান্তেই কবে যেন নারী হয়ে ওঠে
মা সেদিন হাসতে-হাসতে অনেক কথা বুঝিয়েছিলেন
চপলা, দেখতে বেশ সুন্দরী
মেয়েটি একদিন রাজনৈতিক ধর্ষণের শিকার হয়
মেয়েটি একদিন সামাজিক ধর্ষণের শিকার হয়
মেয়েটি এখন ক্ষতিগ্রস্ত লাউডগা
কেউ কিছুই বলে না ; না-সমাজ, না-রাষ্ট্র
মেয়েটি এক রাতে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে পড়ে
সবাই বললো, ” আত্মহত্যা মহাপাপ। ”
মেয়েটি চিরকুটে লিখে গিয়েছিলো-
” এই সমাজ ও রাষ্ট্রের চেয়ে পতিতালয় অনেক নিরাপদ। ”
==========================
ইশতেহার
আসিফ নূর
পাথরের মূর্তি যে ভাঙলে একের পর এক,
বেশ; এবার কোটি হৃদয়েরগুলো ভাঙো তো দেখি।
রড-সিমেন্ট, চুন-সুরকির স্মারক গুঁড়িয়ে দেয়া যায়;
হৃদয়ের পবিত্র ফলক টলানো যাবে না একটুও।
কেননা হাতুড়ি ও বুলডোজার পৌঁছে না সেখানে,
এবং হৃদয় নিজেই এক স্বয়ংক্রিয় আদি মারণাস্ত্র।
দেশপ্রেমিকের গলায় হেসে পরাও জুতার মালা-
সহজেই বুঝতে পারি, জঘন্য ঘৃণ্য রাষ্ট্রদ্রোহী তুমি;
শত্রুদেশের ইশারায় রক্তে রাঙাও আমার সবুজ।
==========================
জীবনের স্বাদ
নাজমুল হুদা
মিসিসিপি-মিশৌরির পদপ্রান্তে দাঁড়িয়ে দরদি হ্লাদিনী, মধুসুরের নহরপত্র
পাঠিয়ে বলেছে, ‘উচ্চকন্ঠ দরদিয়া বিলীন সুর,
জীবনের আস্বাদ অবগাহনে-আমি আসছি আবেশি রোদ্দুর’।
আমার দেহে লাশপোড়া উৎকট গন্ধ
মৃত্যুর নগ্ন-উৎসবে গুলিঝরা বৃষ্টির ছন্দ,
পেরেকের পর পেরেক আঁটা হচ্ছে খন্ডিত-বিগলিত লাশের কফিনে
জীবনযুদ্ধের জোয়ারে, মানুষাকৃতির- এরা কারা?
কফিনে পিঁপড়া বসে, রক্ত পঁচা গন্ধে মাটি খসে;
ধুঁকছে মানুষের মুমূর্ষু পৃথিবী, শেষবার দেখেছিলাম-
দু’চোখের অপসৃয়মান আলোক-রশ্মি যখন হচ্ছিল বিলীন।
মিথ্যে-প্রতিশ্রুতি পোষা ধূর্ত জননেতার মুখভরা এত গন্ধ!
ইচ্ছে করে- ময়লার গাড়ি উল্টে দেই!
চঞ্চল প্রাণ দেহের মালিকানায় কী এক আবেশে,
ঠোঁট দু’টি কাত্যায়নী’র সুধাদীপ্ত আকাঙ্ক্ষার প্রাণবন্ত ছোঁয়ায়
স্বর্গ ডেকে এনেছিল দু’টি প্রাণের মাঝে,
পৃথিবীর আলো বাতাসে তাই এতোটা মায়া। বিষাক্ত
খরায় ছাপ্পান্ন হাজার সবুজ বর্গমাইল পুড়ছে অনিমিষ,
ইচ্ছে হয়-গর্ভবর্তী পদ্মার সবটুকু জারক রসে উন্মাদনা নেভাই!
অবশ্য এখন আমি মৃত…
অনিকেত আত্মা লাশের উৎকট গন্ধের কাছে ফিরে যায়
স্বপ্নাহত দেবীর মত চিৎকার করে, ‘হায়!
ঘুমাও কী সুখে নিমলীন পৃথিবীর আলো লীন হলো বলে;
রক্ত-অপনিদ্ধ বাউরি পৃথিবী হবে কাদম্বের নিরাপদ নিলয়’।
প্রভাতের অরুণ যাবে অস্তাচলে, বেলা কী ফুরালো অবেলায়!
বিষাদ আর্তনাদে পালায় হিমাংশু নিদ্রাতংক…. । তুমি এলে,
লাশপোড়া বিভীষিকা নয়, জীবনে পরিপূর্ণ স্বাদ চাই!
সজীব নিঃশ্বাসে দৃপ্ত প্রত্যয়ে বদ্ধভূমির আঁধার পেরোই
এইতো- জীবন ভরা এত ভোর! এত আলো!
==========================
স্বপ্ন জাগরণে
কহন কুদ্দুস
তোমার ঐ চোখের তারাই হারিয়ে যায়,
আর প্রতিদিন পূজা দিই তোমার মন মন্দিরে।
নীরব রাতের প্রতিটি ক্ষণে তোমাকেই অনুভব করি,
ভালোবাসার গভীর সাগরে শুধু তোমাতেই ডুবি।
তুমি কাছে এলে হৃদয় জুড়ে বসন্ত নামে
তোমার ছোঁয়ায় সব কষ্ট নীরবে হারিয়ে যায় বাতাসে।
ভালোবাসা মানে শুধু তোমারই নাম,
আমার প্রতিটি স্বপ্ন জাগরণে ,
শুধু তুমি আমার প্রাণ তুমি।
====================
রক্তের ছলনা
নিলয় রফিক
ষাটের জলোচ্ছ্বাস শেষে দু’ই
ভাইয়ের একবাড়ি গোদাম-পাড়ায়
ফুলের ঘ্রাণে শেকড় মুখরিত ঘর
সোনালি ধানেরগোলা,পুকুরে মাছের নৃত্য
এক ডেকচিতে মুখ আনন্দের সংসার
সহসা জানালার কোণে মেঘের আভাস
পৈতৃক নুনখোলার জমিনে আগুন
রক্তজবা পথে-পথে হাঁটুভাঙা জেঠার শরীর
মুখ ফিরিয়ে কেঁপেছে আমার পিতা,কাগজ বিক্রি-
আড়ালে অঝোর কান্না,সম্মুখে গোলাপ
শব্দগেঁথে রৌদ্রস্নানে প্রচুর খাটুনি
ঘুমহীন ডানামেলে কাজের সন্ধানে
পাখিদের স্বপ্নরোদ প্রশান্তি জীবন
জেঠার ছেলে সামনে অন্ধকারাচ্ছন্ন
জেগে উঠো স্বপ্নরথে আলোর মিছিলে
চারিদিকে প্রজ্জ্বলিত মনুষ্যত্বে আলো
বিশ্বাসের প্রতিদানে শেকড়ের তীর
গোপনে নিজের নামে বন্দোবস্তি লিপি
হৈচৈ সুধীমহলের অসভ্য নরক
দেখলেই থুথু ফেলে পথের সড়কে
মু-হীন পথে ঘোরে পরিবেশ বর্জ্য
লজ্জায় ঢেকেছে দীপ কাঠমিস্ত্রীবাড়ি
জন্মভিটা অগ্নিশিখা রক্তের ছলনা
ঘুম আসেনা আমার, সুখের ঠিকানা
===============================
মহড়াবিহীন নাটক
রফিকুল ইসলাম আধার
সবকিছুতেই একটা প্রস্তুতির সুযোগ থাকে
ভুল হলে মুছে ফেলার কালো বোর্ড,
কিংবা দৃশ্যপট বদলানোর দীর্ঘ মহড়া।
কুশীলবেরা বারবার শুধরে নেয় তাদের বাচনভঙ্গি,
হাততালি পাওয়ার লোভে চলে অন্তহীন রিহার্সাল।
অথচ, জীবন এক অদ্ভুত খামখেয়ালি স্টেজ;
এখানে কোনো প্রম্পটার নেই,
নেই কোনো ‘স্টার্ট-আপ’ হুইসেল।
পর্দা ওঠার আগেই আমরা মাঝপথে দাঁড়িয়ে পড়ি
কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই।
এখানে ভুলগুলোই চূড়ান্ত সংলাপ,
আর প্রতিটি বিচ্যুতিই এক একটি অমোঘ পরিণতি।
যাপিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই আসলে
একবারই অভিনীত হয়ে যাওয়া
এক অনিবার্য প্রিমিয়ার শো।
বুড়ো বটগাছ
অপু বড়–য়া
হাটখোলা পার হয়ে পথ গেছে ঠেকে
মাঝপথে বুড়ো বট কাছে নেয় ডেকে।
গ্রীষ্মের খরতাপে চলা বড় দায়-
ঘামে ভেজা পথিকের হাঁপসিয়ে যায়।
একটুকু ছায়া পেলে পরান জুড়ায়
ভাবতেই বুড়ো বট ডাকে আয় আয়।
ছায়া দিয়ে মায়া দিয়ে জুড়াই পরান
বোঝানো যাবে না বলে তার অবদান।
===============================
নষ্টতার প্রজননশাস্ত্র
এম এ ওয়াজেদ
পৃথিবীর দূষিত শব্দগুলো নতজানু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে
শ্রদ্ধাবোধের রাজদরবার ঘিরে রেখেছে –
কম্পিত মাধ্যাকর্ষণ শক্তির অস্বাদু ভৌগলিক রাজনীতি
বার্ধক্যের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রোগজীবাণু খেয়ে ফেলেছে
আত্মগত ভূস্তরের ব্যঞ্জনাময় পুষ্পবাগান গুল্মলতা
স্মৃতিকথার ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে থাকে নিষ্পাপ যীশুর লাশ
গর্ভবতী অসুস্থতায় ধুঁকতে থাকে বিষণ্ণতার উদ্যানতরু
মুখগহ্বরের লালা দিয়ে ঝরে পড়ে উন্মাদনার পঙ্ক্তিমালা
হে বিশ্বের পোশাকহীন রক্তপ্রান্তর-
ঢলে পড়েছে সৌন্দর্যদায়িনী গৃহশিক্ষিকার ক্রুব্ধ স্তনযুগল
বরফে জমে আছে অস্নিগ্ধ বনভূমির হলুদাভ পাতাগুলো
সমুদ্রের পানিগুলো নিঃসরণ করেনা স্নেহবারির বৃষ্টিকণা
লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্কবাদী দৃষ্টিহীন লৌহমানব
এই পৃথিবীর অন্তর্সত্তা চেপে ধরেছে জায়নবাদী দাজ্জাল
ধ্বংসবিন্দুর রাজ ডানায় ভর করেছে ইয়াজূজ-মাজূজ
অর্থদানব কারুন ছিঁড়ে ফেলেছে অভ্যর্থিত হলোগ্াফ
ভয়ঙ্কর রাশিচক্রের রক্তস্নাত অন্তঃস্রাবী গ্ন্থি থেকে-
বেরিয়ে আসে নৈরাজ্যের আশাহীন কার্বন ডাই অক্সাইড
হে রোগার্ত মোহাচ্ছন্নতার নিরক্ষর হাইফেন-
যন্ত্রণার আঁতুরঘরে ছটপট করে মানবতার রুগ্ন দুগ্ধশিশু
আমাদের আহারগুলো কেড়ে নিয়েছে সাম্রাজ্যবাদী কাক
বুকের হাড়গুলো চিবিয়ে চিবিয়ে খায় সশস্ত্র গন্ধদানব
বোমার স্প্রিন্টারে আমাদের চোখগুলো আজ দৃষ্টিহীন
প্রার্থনার জায়নামাজে জমে আছে থোক থোক রক্তকণা
বেদনার বহুত্ববাদী উপসম্পাদকীয় পাতায়-
আজো প্রতিদিন পাঠ করি পৈশাচিক নষ্টতার প্রজননশাস্ত্র
===============================
ভালোবাসা
ইলিয়াস পাটোয়ারী
কাগজপত্রে চুক্তি মানে
ভালোবাসা নয়,
চুক্তি বিহীন ভালোবাসাই
ভালোবাসা হয়।
চুক্তিতে হয় লেনাদেনা
কিংবা কিছু বেচাকেনা
লাভ ও ক্ষতির হিসাব যেথায়
কড়ায়গ-ায় রয়-
ভালোবাসা ভালো চাওয়ার
মাঝেই বেঁচে রয়।
===============================
এই পদ্মপুকুর, এই বিমর্ষতা
চন্দনকৃষ্ণ পাল
পদ্মপাতার শরীর দেখে চমকে উঠি
ঢলঢলে সেই সবুজ পাতার চিহ্নও নেই
তার বদলে পোকায় খাওয়া কালচে রঙের
শিরা এবং উপশিরার কাঠামো এক
স্থবির হয়ে বসে আছে
দাঁড়িয়ে থাকা পত্রদ-ের মাথার কাছে,
অপেক্ষাতে –
শ্যাওলা ভরা জলের গায়ে ঢলে পড়ার।
শৈশব আমার চোখের পাতায়, নষ্টালজিক
কচি থেকে গাঢ় সবুজ পাতা গুলির ঘাড় দোলানো
বাতাস থেকে ফুলের গন্ধ, জলের গন্ধ টেনে নেওয়া, বুকটি ভরে-
চোখের কাছে লাল নীল আর শ্বেত পদ্মের
তাকিয়ে থাকা, কী অভিজাত চাহনী তার
সেই ফুলেরাও বিমর্ষ আজ,
দুই একজন ফুটে আছেন ঝরে পড়ার অপেক্ষাতে…
আমার দেশটি এই পুকুরের
জলের গায়ে ধ্বংস প্রাপ্ত পদ্মপাতার মতোই তো আজ
বড় ধূসর, বিমর্ষতায় চুপচাপ তাঁর দাঁড়িয়ে থাকা।
===============================
বাংলা অর্থনীতি
আমেনা বেগম
বঙ্গ থেকে বাংলা নামের উৎপত্তি
কেউ বলে বঙ্গকামরূপি
এই বাংলার অর্থনীতি প্রাচীন,
মধ্যযুগ আর আধুনিকের মিশালে মিলেমিশ
চর্যাপদের যুগ থেকে মধ্যযুগের যে পরিবর্তন
আধুনিকের ছোঁয়ায় সেটা এখনো বহমান।
টালত মোর ঘর নাহি পড়বেশি হাঁড়িতে ভাত নাই নিতি আবেশি
সেখান থেকে এসে মধ্যযুগের কবি বলে আমার সন্তান যেন থাকে দুধে -ভাতে
তাই এলো ধান,গম,বার্লি,তুলা,রেশম,আখ,পাট,নীল,লাক্ষা,
মসলা কিংবা ফল-ফলাদি আর শাক-সবজির উৎপাদন।
ভূমি রাজস্ব আর জমিদার প্রথা উচ্ছেদ হয়ে
আধুনিক যুগে এলো অর্থনীতির নতুন চাকা
কলে-কারখানা আর রেললাইনের চাকায় গড়গড়িয়ে যায় শহর,
নগর তথা বাংলার গ্রাম।
অর্থনীতি এখন বিংশ শতাব্দীতে এসে হলো ভিন্ন একরূপ
যেরূপের বর্ণনা দিতে লাগে বিস্ময়ের চোখ।
বৈদেশিক রেমিট্যান্স আর পোশাকশিল্পের,
চামড়াশিল্পের, কাগজশিল্পের যে রমরমা ব্যবসা
সেখানে এসে যোগ হলো অনলাইন ক্রিয়েটর
যার নাম কনটেন্ট ক্রিয়েটর।
প্রযুক্তির এই দুনিয়ায় রোবটিক্স আর এআই এনে দিল এমন এক অর্থনীতি
যা দেখে হতভম্ব বিশ্বরাজনীতি আর মিশ্র অর্থনীতি।
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং আর হাইব্রিড ফসলের উন্নত বাংলার অর্থনীতি
ফেসবুক, টিকটিক, ইনস্ট্রাগ্রাম,
সবকিছু এখন আয়ের উৎস খাটাও শুধু মেধা আর মগজ।
বাংলার অর্থনীতি এখন বিশাল এক সম্ভার।
পর্যটন খাত, সেবাখাত তারই জলন্ত প্রমাণ।
আরো আছো টুকটাক নাই বলে বলি এখন।
বিশ্বঅর্থনীতির বাজার হোক বাংলার অর্থনীতি
ফুড ব্লগার এক অন্য নামের অর্থনীতি
যা ছড়িয়ে আছে বিশ্ববাণিজ্য,
বাংলার অর্থনীতি তার ব্যতিক্রম নয় কোন দিকেই।
বাংলার অর্থনীতিতে টাকার নানারূপ পরিবর্তন
কখনো ৫০০ কখনো হাজারি,কখনো বা এক কিংবা পাঁচ টাকার নোট।
এভাবে চলছে একবিংশ শতাব্দীর বাংলার অর্থনীতি
হয়তো নতুন আরো কিছু দেখবো যতদিন বাঁচি
এই বুলগাকপুরী কিংবা হুমায়ুনের জান্নাতাবাদে।
===============================
কৃষক
রবি বাঙালি
ঊষা হতে সন্ধ্যাবোধি
নিত্য তারা খাটে,
বৃষ্টি ভিজে রোদে পুড়ে
শস্য ফলায় মাঠে।
শ্রমের ঘামে সিক্ত ফসল
মূল্য পায় না মোটে,
মজুদদার আর মধ্যসত্ত্বী
অধিক প্রফিট লুটে।
কৃষক বলে তোমরা যাদের
নিত্য দাও যে গালি,
তারাই তোমার আহার যোগায়
হৃদয়খানা ঢালি।
সত্যিকারের দেশের সেবক
শোনো দেশোবাসী,
বুকের মাঝে কষ্ট পুষে
মুখ ভরে দেয় হাসি।
অর্থনীতির মূল চালিকায়
তাদের কেউ নয় তুল্য,
হেলা ভুলে বুকে তুলে
দিয়ো তাদের মূল্য।
===============================
আনফ্রেন্ড পরবর্তী
আয়াজ আহমদ বাঙালি
কেউ কাউকে ব্লক না করেও যোগাযোগহীন।
হোয়াটসঅ্যাপের চ্যাটবক্স শান্ত!
শেষ মেসেজের তারিখ স্মৃতিস্তম্ভের মতো দাঁড়িয়ে…!
মাঝে মধ্যে মিউচুয়াল ফ্রেন্ডদের পোস্টে তোমার হাসিমুখের ছবি ভেসে ওঠে!
আমি লাইক বোতামে আঙুল ছোঁয়াই না!
ডিজিটাল দুনিয়ায় একে অপরকে হারিয়েছি।
তবে মনের কোনও এক ব্যাকআপ ফাইলে তুমি ঠিকই রয়ে গেছো।
বড্ড অদ্ভুত লাগে ভাবলে-
যার সাথে গল্প করেই সকাল হতো;
আজ তার প্রোফাইলে ঢুকতে গেলেও দ্বিধা হয়।
আমরা ইচ্ছেকৃত মানচিত্র এঁকেছি?
===============================
নিভৃতে বহে শ্রাবণের ধারা
সিকানদার কবীর
বারো মাসই আমার শ্রাবণ মাস- আমার কোন পৌষ মাঘ নেই,
নেই ফাগুন চৈত্র – শীত কী বসন্ত
আমি নিজেই শ্রাবণের অমর পঙক্তিমালা- শিরোনাম, সিকানদার কবীর
সারা বছর আমার অন্তরে বহে শ্রাবণের ধারা…
আমি মিশে থাকি পানি ও কাদায়;
আমি চাষ করি দুঃখের জমিন- শোকের ফসল
অন্তরের গহিন গোলায় জমিয়ে রাখি জীবনের যতো চিটা ধান আমার
আমার বিশ্বাস শুধু জীবনানন্দই নয় সব কবিরই
থাকে এ রকম ছোট বড়ো খামার –
আমি আগুনে পুড়ি, আমি নদীতে ডুবি,আমি সাগরে ভাসি,
বারো মাস আমি শ্রাবণের কান্না হয়ে ঝরি
আমি শ্রাবণের কবিতা লিখতে গিয়ে নিজেকে নিজে পড়ি।
আমার আলাদা কোন কবিতা লেখা হয় না শ্রাবণ নিয়ে শ্রাবণ ছাড়া
শ্রাবণ আমার নামের সর্বনাম- আমার দুঃখ ধানের ছড়া
বারো মাস আমার অন্তরে বহে এই শ্রাবণের ধারা।
===============================
পৃথিবীর বসবাস মানুষের হৃদয়ে
টিপলু বড়–য়া
কারো কাছে পৃথিবীটা যেন –
কাদা মাটির পাহাড়,
সে গড়ে নেয় নিজের মতো আকার।
আবার, কারো কাছে পৃথিবী যেন – ফাটল ধরা মাটি
যেখানে লুকিয়ে থাকে শূন্যতা-হাহাকার।
কারো কাছে- জীবনের স্বপ্ন মানে নতুন পথে চলা।
আবার, কারো কাছে- নতুন পথে চলা মানে-
কাঁটার মিছিলে হেঁটে রক্তাক্ত পায়ের গল্প বলা।
কারো হাতে ‘সময়’ আসে- নরম মাটির মতো,
ভবিষ্যৎ গড়ে নেয় নিজের মতো করে।
আবার, কারো হাতে ‘সময়’ আসে- ধারালো কাঁচের মতো-
চূর্ণ-বিচূর্ণ হৃদয়ে- জীবনের গল্প আসে উপসংহারে।
একই পৃথিবী, একই চাঁদ, একই রাতে-
কারো ঘুম আসে গভীর আত্মবিশ্বাসে।
আবার, কারো নির্ঘুম রাত কাটে- অজানা ভয়ে ভয়ে।
কারণ- পৃথিবীর বসবাস প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে।




