আমাদের শান্তিকুঞ্জ
আসাদ মান্নান
তেত্রিশ বছর ধরে স্বপ্নে প্রাপ্ত এই কবিতাটি
আমি লিখছি এক অদৃশ্য আলোর পথে ছুটতে ছুটতে
শূন্যতার দাবানলে পুড়তে পুড়তে আমি লিখে যাচ্ছি
মানব বিনাশী এক দানবিক রাহুর বিরুদ্ধে ;
আপনি মানুষ হলে কবিতাটি একবার পড়ুন।
বিশ্বাস করুন, এটা কোনো গল্প কিংবা কল্পকথা নয়–
আমার আত্মার মর্মে ধর্মমূলে অবিরাম চলা
লেলিহান আগুনের এক অন্তহীন সত্য রূপ:
একই পাতিলে রান্না করা ভাত-মাছ- মাংস খেয়ে
ওরা তিনজন এক খাটে এক বিছানায় শুয়ে
কী বন্ধনে পরস্পর জড়িয়ে ধরেছে! অপরূপ
চিত্রকল্পে কী সুন্দর মধুরতা! ওরা তিন শিল্পী
ঘুমের ভেতরে এক হয়ে অভিন্ন স্বপ্নের জন্য
কাল থেকে মহাকালে অবিচল গভীর প্রত্যয়ে
ঘুমিয়ে ভেতরে ওরা ধর্মকুঞ্জে গুঞ্জরিয়া গায়
সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই —
মানুষ যদিও মরে মানবতা কখনো মরে না।
বাইরে তখন বজ্রধ্বনি – – তুমুল বৃষ্টির মধ্যে
মুহুর্মুহু মেঘের গর্জনে কেঁপে ওঠে বাড়ি-ঘর ;
বিপন্ন সুন্দর যেন ভয়ংকর ধ্বংসের সম্মুখে ;
ঘুম ভেঙে গেলে পর আসন্ন মৃত্যুর কথা ভেবে
আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে ওরা পরস্পর আঁকড়ে থাকে–
ওরা তিনজন : ডান পাশে শ্রীবুদ্ধের অনুসারী,
বাম পাশে শ্রীকৃষ্ণের সনাতনী একান্ত প্রেমিক,
আর মাঝখানে? — চির শান্তিপ্রেমী দ্বীনের ফকির।
তখনো গভীর ঘুমে তিনজন ঘুমিয়ে রয়েছে ;
সুবেহ-সাদিকে আস্তে আস্তে বৃষ্টি ঝড় থেমে আসে;
হঠাৎ রুটিন মেনে পাশের মসজিদ থেকে
মুয়াজ্জিন আজান ফুকারে; দুজনকে দু’ পাশে
আলতো করে সরিয়ে মাঝের বেনামাজি মুসলিম
অন্ধকারে একা নীরবে বিছানা ছেড়ে উঠে এসে
নামাজে দাঁড়ায়; যথাযথ নিয়মে নামাজ শেষে
আবার নিঃশব্দে এসে শুয়ে পড়ে স্নিগ্ধ বিছানায় ।
ওরা তিনজন তিন পথে এক স্বর্গ খুঁজতে খুঁজতে
অতঃপর তৈরি করে একটা শ্বাশত শান্তিকুঞ্জ।
==============================
ছক
সুহিতা সুলতানা
চক্রের ঘেরাটোপে যে ডোবে সে ডুবতে
ডুবতে ভাসিয়ে দেয় চারদিক। ডানাহীন
উড়াউড়িতে যে ওড়ে সে নিজেই জালের
গ্রন্থির সাথে ক্ষত বিক্ষত হতে থাকে। এ
নির্ঘাত ছকহীন ঘুমের যাতনা।যাকে তুমি
বিশ্বাস করে ভালোবেসে সংজ্ঞায়িত করে
কাছে বসালে সেখানেও প্রশ্ন ছোবল তুলে
ফণা হয়ে তোমার নাকের ডগায় দুলতে
দুলতে এক হাত দেখিয়ে ছাড়ে!বোঝো
এবার ভুবনডাঙা কতদূর!পথে প্রান্তরে
দৃষ্টিও ছুটে চলে নিজস্ব নিয়মে। ঠোঁটের
কিনারে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে যে রুচির গল্প
সাজাতে চায় সে নগরের কতটুকু বোঝে?
যেরকম দুনিয়া ভাবো সেরকম নন্দিনী
কোথায় পাবে তুমি? নাগরিক জীবন মানে
ছকযুক্ত সব সবকিছু।একদা বেহিসেবী
জীবনে কবিও ট্রামের আলতো ছোঁয়ায়
জীবন বোঝেনি!অভাবিত ভাবেই মায়া
মরীচিকা হয়ে দুরাচারী হয়ে যায়। মধ্য
প্রহরে মন জ্বলে ধিকি ধিকি ক্রন্দনের
জলে ভেসে যায় অতিবৃষ্টির দহন। তৃষ্ণা
ও ক্ষমতার মগ্নতা মৎস শিকারীর স্বপ্নের
ভেতরে বিদ্যুৎ খেলে যায়।যথারীতি সময়
ও মুহূর্তসমূহ ছুটে চলে গন্তব্যহীন …
==============================
আমি তখনও ছিলাম
হিলারী হিটলার আভী
ঈশ্বর তখনও নিঃসঙ্গ ছিল না
কিন্তু – মনন-একা ছিল,
জলীয়বাষ্প নদী কিংবা পাহাড় হবে
মেঘ কিংবা বৃষ্টি হবে
পলিমাটি কিংবা ধূসর বালি হবে
পাহাড় কিংবা জীবন হবে
ইত্যাদি ভাবনায় ঈশ্বরের মৃদু হাসি,
কিন্তু – আমি তখনও ছিলাম
নয়ত আমি এতদিন কোথায় ছিলাম?
ঘরভেদী আততায়ী
গোলাম কিবরিয়া পিনু
একটি বাণিজ্যচুক্তি—
কীভাবে বশ্যতার শৃঙ্খল হয়ে উঠতে পারে?
অনুভব করো!
একটি বাণিজ্যচুক্তি—
কীভাবে দাসত্বের শৃঙ্খল হয়ে উঠতে পারে?
অনুভব করো!
মগের মুলুক ও তুঘলকি রাজত্বে
রাজমুকুট পরার পর,
আত্মরক্ষা না করে আত্মবিক্রি করে
আত্মসিদ্ধি লাভ করার জন্য—
বাণিজ্যচুক্তির নামে হাড়মাসকালিকরার অভিসন্ধিতে
শৃঙ্খল পরিয়ে দিয়ে গেল!
সে-এক ইতিহাসখ্যাত ঘরভেদী আততায়ী!
ছল ও চাতুরি দিয়ে
বশ্যতা ও আনুগত্য দিয়ে,
জাঁহাপনা জাঁহাপনা করতে করতে
এতবড়ো জাঁহাবাজ হয়ে উঠল,
যাতে আমাদের ঠিকানা ও ঠিকুজি না থাকে!
এতটা কদর্যতা নিয়ে বিশ্বাসঘাতক হয়ে উঠল সে,
যেন আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌম
আংটা ও আঁকড়া দিয়ে
টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে যেতে পারে ওরা,
যেখানে-সেখানে!
রাজবেশ নিয়ে—
ঠমক দেখিয়ে ঠুনকো করে ফেলল সবকিছু!
পিছু পিছু আসছে পরাজয়!
বহু বছরের রক্ষাকবচ রক্ষা করা যাচ্ছে না!
দাসখত দিয়ে রাজভৃত্য হয়ে থাকবো আমরা?
আমাদের টনক এখনো নড়ছে না?
==============================
এখন ভস্ম হতে শুধু বাকি আমি
তাপস চক্রবর্তী
ত্রিশ বছরের গান বাঁধি
এখনো
এই পড়ন্ত সন্ধ্যায়…
কেমন আছো?
কেমন ছিলাম এতদিন!
কোন গহ্বরে সাপ হয়ে জোঁক হয়ে থেকেছি
কেউ তো কখনো জিজ্ঞেস করেনি!
কখনো না।
জানো
তবুও আমি কাটিয়েছি বেলা
অবেলা
তানপুরায় ভাসিয়েছি ঝরা ফুলের তান…
এই যে সন্ধ্যা
সন্ধ্যার মতো কতো যে কথা লুকিয়েছি বুকে
এই যে কথা
কবিতার মতো কতো যে ব্যথা ভুলেছি
নানান দুঃখে।
তখন কতো বয়েস আমার!
তোমারওবা কতো!
আবেগে
তোমার জন্য বর্ষায় কদম কুড়িয়ে পড়েছি খোঁপায়
তোমার জন্য পিঠের বেনুনি রাঙিয়েছে জবায়
অথচ
এখন তারারা ঝরে পড়ে কর্দমাক্ত জ্যোৎস্নায়।
এখন কেউ তো বলে না; আরেকবার…
যদি আরেকবার নেমে আসতো তোমার চাঁদ অধর..
তবে ভর দুপুরে ছুটে যেতাম ক্ষেতের আল ধরে
হাত ধরে
তোমার চোখের পলকে অলক হয়ে…
দেখো এই যে নদী
শঙ্খনদী কতো যে পা ডুবিয়েছি জলে
দেখো এই যে ফুল
কতো যে পাপড়ি ছড়িয়ে দিয়েছি দুহাতে
অথচ তুমিও বৃষ্টির মতো ভুলে গেছ সেসব দিন…
যেমন করে মুছে দিয়েছে উনিশের স্মৃতি
যেমন করে বাড়িয়ে দিয়েছো তোমার দেয়াল….
জানি
তবুও খেয়ালে গিয়েছে দিন ফাগুনে আগুন হয়ে।
জেনো এখন ভস্ম হতে শুধু বাকি আমি।
==============================
যদি আবার আসি জননী ছায়ায় নিরবে
সু শা ন্ত হা ল দা র
আমাকে মেরে ফেলার পর
তোমার আর জানা হবে না
কতটা যন্ত্রণা নিয়ে ফুটেছিলো বকুল শামসুর রাহমান কবরে,
তোমাকে তো বলেছিলাম
ঝরে যাওয়া মুকুল হয়ত একদিন আসবে ফিরে
লাল নীল বার্তা নিয়ে শিশিরসিক্ত জলাভূমে
সেদিন দেখে নিও
সব গোলাপ হেসে উঠবে প্রয়াত পিতার কবর জিয়ারত করে
এমনই দিনে যদি আবার আসি জননী ছায়ায় নিরবে
যদি চিনে নাও ডাহুকের ডাক সকালের নিদ্রালুপ্ত ভোরে
তবে ভুলে যেও সব ক্ষত যন্ত্রণা ক্রুশবাহী যিশুর একনিষ্ঠ ভ্রমণে
আমি কি ছিলাম নাকি আছি?
এই প্রশ্ন যখন করেছিলাম আজাদী তীব্র স্বরে
তখনই বুঝেছিলাম
আগুনের ঝাপটায় বেসামাল কাণ্ড ঘটেছে ছয় দফার ছেষট্টি মিছিলে!
==============================
একা আমি একা
মোহাম্মদ জাফর সাদেক
একা আমি একা, জীবনের পথে, স্বপ্নের স্রোতে ভাসি একা চুপচাপ রােেত
নক্ষত্রের আলোর নিচে, নির্জনতার বুকে, মনের অন্ধকারে, খুঁজে ফিরি সুখের দয়িতা,
কোটি কোটি মানুষের ভিড়ে,একাকী দাঁড়িয়ে আমি,
নীরবতা গায় আমার সঙ্গীত, আলোর মাঝেও আঁধারে নামি।
চেনা মুখের জোয়ার আসে,নিরবচ্ছিন্ন কথার স্রোতে,
আমার অন্তরে বাজে, একাকীত্বের বেদনাময় গীত,
হাসির রোশনাই, আলো ঝলমলে, তবুও মনে হয় সব ঝাপসা,
কত জনের মাঝে, কত প্রিয় মুখ, তবু কেন আমি, একা আলাদা।
আকাশের তারা গোনা শেষে,বৃথা খুঁজে ফিরি, চেনা মুখ
অজানা পথের সন্ধানে, আমার হৃদযের বিমর্ষ আর্তনাদ,
নিস্তব্ধ রাতের নীরবতা,প্রেমহীন পাণ্ডুলিপির অনাগোনা,
মনের গভীরে জমে থাকা বিস্মৃতির আখ্যান ভেসে উঠা,
স্বপ্ন ভাঙ্গে, বাস্তবতা জাগে, তবুও আমি একা,
একা নিঃসঙ্গতার দাগে।
==============================
ঈর্ষা
শামসুল বারী উৎপল
তুমি জ্যোৎস্নার জলে শরীর ভিজিয়ে এঁকে দাও
অকৃত্রিম স্নিগ্ধতার সান্ধ্য সুবাস,
চোখে জ্বলে প্লাবিত বন্যার নিপাট প্রহর,
অমিয়াকুমে পা ডুবিয়ে সেচে নাও মুক্তোর পাহাড়
রোদ-চিকচিক সাগরের জল তোমাকে ছোঁয়
তোমার বুকে আলতো করে স্পর্শ করে জানান দেয়
স্রষ্টার কী অসম্ভব বিন্যাস তুমি।
স্বর্গছোঁয়া হাঁসির প্রলম্বিত তোমার ঝঞ্ঝায়
পূর্ণতা পায় পর্বত পেরোনো মিষ্টি প্রপাত।
ঐ যে বৃদ্ধ পাহাড়টা স্থবির-অটল অথচ
এলোমেলো ঢাল বেয়ে উঠে যাও সর্বোচ্চ চূড়ায়,
আনন্দধ্বনি সংগীত হয়ে ঝরে
স্পর্শবিহীন নীলাভ ঠোঁটে।
তোমার হৃৎস্পন্দনে ধারণ করা গল্পগুলো
শত বছরের চেষ্টায়ও জানতে পারিনি কখনো
অথচ বৃষ্টি কী নির্দ্বিধায় স্পর্শ করে তোমার হৃৎপিণ্ডের
সুদীর্ঘ উপন্যাস, আনন্দ ও রক্ত-গাঁথা।
আর আমি ঈর্ষায় জ্বলে মরি প্রতিদিন প্রতিক্ষণ
আমি ঈর্ষা করি কুৎসিত জ্যোৎস্নাকে
ঈর্ষা করি ঐ খাটাস পাহাড়টাকে, চরিত্রহীন ঝর্ণাকে,
হিংস্র সমুদ্রকে, লজ্জাহীন বৃষ্টিকে
কতটা আনন্দ দেয় ওরা তোমাকে
অথচ আমিই পারি না। আর নির্দ্বিধায়
তুমি সমর্পন করো নিজেকে
অসম্ভব তোমার সে ভালোলাগা আমার
একান্ত ঈর্ষার কারণ,
কী নির্বিঘ্নে ওরা ছোঁয় তোমার শরীরের ভাঁজে
যত্নে রাখা আনন্দ-প্রহর,
বুকের ভেতর রাখা নীল সমুদ্রকে ওরা স্পর্শ করে
অথচ, লক্ষ বছরের উন্মুখ প্রতীক্ষা আর তপস্যার
ফলাফল শূন্য করে দিয়ে,
আমি একাকী বসে থাকি আঁধার গহবরে,
ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত ঋষি এক, বহুবিধ অপেক্ষায়।
================================
মৃত নক্ষত্রের ভাষা
ইব্রাহিম আজাদ
অদৃশ্য নৈঃশব্দ্যের গর্ভে আমি এক প্রাগৈতিহাসিক অনুপস্থিতির শিষ্য,
সময়ের অস্থিমজ্জায় লুকানো মৃত নক্ষত্রের ভাষা পাঠ করি নৈঃসত্তার উপবাসে।
চেতনার কূপে যে জলের শব্দ, তা আসলে পতিত ঈশ্বরের ক্ষয়িষ্ণু প্রতিধ্বনি,
আর মানুষনিজেরই ছায়াকে উপাসনা করা এক অনির্ণেয় জৈব রূপক।
দুঃখ এখানে কোনো অনুভূতি নয়; বরং মহাশূন্যের অন্তর্লিখিত ব্যাকরণ,
যেখানে প্রতিটি জন্ম বিস্মৃতির বিরুদ্ধে এক অসমাপ্ত অন্ত্যেষ্টি মাত্র।
আমি দেখেছি, আত্মা তারই দিকে ফিরে যায় যাকে সে কখনো চিনতেই পারেনি,
যেমন অন্ধ নদী মৃত সমুদ্রের দিকে বহন করে বিলুপ্ত সভ্যতার লবণ।
তবু শূন্যতারও এক গুপ্ত অহংকার আছেসে সব আলোকে গ্রাস করে না,
কিছু আলোকে রেখে দেয়, যেন অন্ধকার নিজের অস্তিত্ব
প্রমাণ করতে পারে।
==============================
সাদা বরফ টুকরো
শারমিন নাহার ঝর্ণা
জীবনটা যেন সাদা বরফ টুকরো
আস্তে আস্তে গলতে থাকে,
শৈশব গলে যায় খুব দ্রুত গতিতে,
ভেসে যায় যৌবন খসে খসে পড়ে
আধমরা কত অলীক স্বপ্ন।
সুখ আর দুঃখ দুটোই এক সময়
পালিয়ে যায় বরফের স্রোতে।
নিথর শরীরটা ছটফট করে
উজ্জ্বল নক্ষত্রের সাথী হওয়ার আশায়,
জীবন বাঁধা অনিশ্চিত মৃত্যু নকশায়।
==============================
অগ্নিকন্যা প্রীতিলতা
রবি বাঙালি
চট্টগ্রামের মাটির মেয়ে
নামটি প্রীতিলতা,
বুকের ভেতর আগুন নিয়ে
লিখলো বীরের কথা।
পাহাড়তলীর ইউরোপিয়ান ক্লাব
“কুকুর-ভারতীয় মানা”,
অপমানের সেই সাইনবোর্ড
ভাঙতে দিলো হানা।
পরনের তাহার খদ্দর শাড়ি।
চুলে বেণী বাঁধা,
হাতে পিস্তল, বুকে বারুদ
মুখে বিজয়-রাধা।
মাস্টারদাদা সূর্য সেনের
যোগ্য সে সেনানী,
নারী বলে নয়রে পিছে
দেখায় বীরাঙ্গনী।
১৯৩২ সাল, ২৩ সেপ্টেম্বর
রাতের আঁধার কালে,
পাঁচজন সাথী নিয়ে দিদি
ক্লাবে আগুন জ্বালে।
বোমা-গুলির-হুঙ্কারেতে
কাঁপলো ইংরেজ দল,
ক্লাবের ভেতর ত্রাস নামালো
বাংলার বীরের বল।
গুলির আঘাত রক্ত রাঙায়
যায়নি তবু দমে
শত্রুর হাতে ধরার আগেই
মরণ শপথ মনে।
পটাসিয়াম সায়ানাইড
মুখে নিলো তুলে,
“বন্দে মাতরম” বলে দিদি
মৃত্যুর কোলে ঢুলে।
মাত্র ২১ বছর বয়সে
শহীদ হলো রানী,
নারীর শক্তি তেজস্বিনী
দেখে বিশ্বখানি।
আজও চট্টগ্রাম ডাকে
“প্রীতি” নামটি ধরে,
শ্রদ্ধায় ভরে নত শিরে
সবাই স্মরণ করে।
অগ্নিকন্যা ঘুমাও তুমি
ইতিহাসের পাতায়,
তোমার ত্যাগের দ্বীপ শিখা
অযুত বোনের মাথায়।
====================
বৃষ্টি
আলী তারেক পারভেজ
দিঘির মতো কাজল কালো
তোমার নীরব চোখ গড়িয়ে
বৃষ্টি নামে ঝড়ের রাতে
শব্দহীন কষ গড়ানো
বৃষ্টি নামে মূষল ধারে
বন বাদাড়ে নদীর বুকে
সবুজ ঘাসে পাতার কোলে
ছনের ছাদে পাখীর নীড়ে
ভিজিয়ে দিয়ে হৃদয় উঠোন
জড়িয়ে পড়ি কাদার রোষে
ফুড়িয়ে যায় পথের আলো
চোখের পাতায় মেঘের কণা
তোমার নীরব চোখ গড়িয়ে
বৃষ্টি নামে শান্ত গতির
অনেকদিনের পুষে রাখা
জমাট বাঁধা মেঘের উদর
ক্রমাগত ঝড়ে পড়া
বৃষ্টি তোমার ঝলসে ওঠা
অনুযোগের স্বারকলিপি
========================
কালো মেঘের ফাঁদ
শবনম ফেরদৌসী
আকাশে নেই আজ বাঁকা চাঁদ
গগনে কালো মেঘের ফাঁদ,
ঝরছে অজর ধারায় বৃষ্টি
স্রোতে ভেঙেছে বাঁধ।
কেউ কেউ বর্ষাকে উপভোগ করে
ভাবে বর্ষাই বসন্ত,
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মূগ্ধ হয়ে
ভেসে বেড়ায় দিগন্ত।
বর্ষার জলে ভাসে নিন্মাঞ্চল
ঘর করে ছলছল,
এতটুকু খাবার নেই ঘরে
চারদিকে নোংরা জল।
=====================
ছায়াখেলা
সৈয়দা সামিরা আহমেদ
ঘুম আয়,পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চড়ে আয় না,
দুধ-মাখা ভাত দেব,চাই কি জাদুর আয়না?
ঘুমপাড়ানি মাসি-পিসি বাড়ি খুঁজে পায় না
ঝিকিমিকি তারাগুলো বুঝি হয়ে গেছে হায়না।
খোকা ঘুমালো,পাড়া জুড়ালো,নেই কোন বায়না,
বর্গির ভয় তবু কেন মন থেকে যায় না?
চাঁদমামা রোজ টিপ দিয়ে চলে যায় চায়না,
ভোর হলো,তবু খুকুমণি চোখ মেলে চায় না।
==============================
ফুল-পাখিদের আসর
জাহেদুল ইসলাম বাঁধন
বাজাছে সুরের বীণা,
খেলছে আরু- আদু এবং
ছোট্ট সোনা মিনা।
দোর খোলে দৌঁড় যে-ই দিয়েছে
যে-ই পেরুলো ঘর,
সবুজ ঘাসের ওড়না ঢাকা
কাঁপছে পুরো চর।
আকাশ খসে পড়ছে ধারা
সূর্য্যালোকের আলো,
তাদের গলায় গয়না পরা-ও
লাগবে দারুণ ভালো।
কলসি বাজাও বাজনা এটাই
নাচুক ময়না টিয়ে,
ফুল-পাখিদের আসর ডাকে
কোকিলটাকে দিয়ে।
==============================
খসে পড়া মেঘ
মহ:মহসিন হাবিব
চিন্তার উন্নয়ন শেষ
কেন্দ্রীভূত ভাবনা তীরের ফলায়
খিদের গন্ধ নেই…
ড্রেনের জমানো কষ্টগুলো
মুড়িয়ে খাচ্ছে হালবলদ!
অভিনন্দন দুঃখ।
শুভেচ্ছা পরাক্রমশালী।
নদীপথ গলিপথ চেতনার রেলগাড়ী।
তাজের তেজ পতপত।
মেরুখেলাতে মরু হাসে।
অত্যাচার গাছ।রাঙ্গা আগুন একদলীয় জোটে।
খসে পড়া মেঘ
বৃষ্টি ভেজা রাতে
গভীর সমুদ্রে ভেসে যায়।
==============================
গরমকাল
মহসিন আলম মুহিন
ষড়ঋতুর দেশে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ দু’মাস হলো গরমকাল,
গরমকালের তাপদাহে প্রাণ ওষ্ঠাগত দেহঘড়ি বিকল।।
মাঠ-ঘাট চৌচির, জীবন অস্থির, কৃষকের হা-হুতাশ,
লাঙল চলে না আকাশ পানে চেয়ে কাটায় অবকাশ।।
শিশু-আবাল-বৃদ্ধ ভনিতা সকলকেই ভয়ে রাখে,
গরমের কারণে হিটস্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে।।
গরমকালে নিতে হয় শরীর, মুখ ও ত্বকের সুন্দর যত্ন,
এই কালের ফল ফলাদিও সুস্বাদু শরীরের জন্য রত্ন।।
এই কালেই মধুমাস-আম, কাঁঠাল সাথে পাবে পেয়ারা,
পেঁপে, কলা, লিচু, আতাফল আরও আনারস ও জাম্বুরা।।
ফুল বাগানে নানান ফুলের ঘ্রাণযুক্ত অপরূপ শোভা,
জ্ুঁই, সূর্যমুখী, গাঁদা, কামিনী, মাধবীলতা সহ হরেক ফুল মনোলোভা।।
গরমকালের প্রকৃতি বিরূপ হলেই মানুষের যত ভয়,
ঝড়-ঝঞ্ঝা দাবদাহ বাড়লে নানা রকম হয় সংশয়।।
আল্লাহ তুমি মেহেরবান রেখো শান্তির পরিবেশ,
তব দয়া, তব কৃপায় সুন্দর রবে ষড়ঋতুর দেশ।।
==============================
বাঁধন
নয়ন আহমেদ
লোহা ও কাঠ পরস্পর মিলে থাকে
যুগল বন্ধনে।
নৌকা তৈরি হয়।
কাঁঠালের কোষগুলো প্রস্তুত রাখে কিছু একত্বের রীতি।
সংঘবদ্ধ বাস্তুতন্ত্রের দীক্ষা শেখে।
গাছের পাতারা জানে প্রাচীন জ্ঞানের শিল্পকলা।
অক্সিজেন কারাখানায় তারা চাকরি করে।
কী আনন্দ জগৎ সংসারে!
ও মানুষ, আসো হাতে হাত রাখি।
চোখে চোখ।
জিহ্বার চর্যাপদ লিখি।
এইভাবে, আমাদের শিল্পায়ন হোক।
==============================
সমুদ্রের প্রতি অভিশাপ
মোল্লা সালেহ
কেন জোয়ার হয়, কেন ভাটা হয়?
কেনই বা সাগরের ঢেউগুলো আছড়ে পড়ে
সাগরের কিনারায়?
হে সমুদ্র, কেন তুমি স্থির থাকোনি?
সাতটি বছরই তো মাত্র!
তোমার যে জলরাশি
আমার প্রিয়তমা স্পর্শ করেছিলো
সে জলরাশি কোথায়?
আমাকে ফেরত দাও
সে জলরাশিকে স্পর্শ করে আমি শান্ত করবো
আগ্নেয়গিরির মতো জ্বলতে থাকা
আমার বিরহিত হৃদয়।
আমি জানি
আমার প্রিয়তমার স্পর্শ করা সে জলরাশি
তুমি হারিয়ে ফেলেছো
উপসাগর থেকে সাগরে
তারপর মহাসমুদ্রে…..
হে সমুদ্র,
আজ তোমাকে অভিশাপ দেই
তুমি যেন হয়ে যাও সাহারার মতো বালুময়।
==============================
লড়াকু
নিবেদিতা বড়ুয়া
আমার কবিতা —
অন্যের বাড়িতে রোজ ঝি এর কাজ শেষে
ঝড়া পাতা কুড়াতে গিয়ে গুনগুনিয়ে গানের সুরে স্বপ্ন আঁকে
আমার কবিতা ধনীর রাজ কন্যা নয়
গরীবের ঝি ,কলসি কাঁখে জল আনে
তন্বী নদীটির মতো নিজেকে ভাঙে আর গড়ে
ফাগুন বাতাসে গতর ছুঁয়ে বসন্ত তুলে রাখে যত্নে
ক্ষুধার চেয়েও বেশী বহন করে অপমান
অভিমান জমিয়ে রাখে খুব গোপনে দীর্ঘশ্বাসে
কখনো সখনো পতঙ্গের মতো নিজেকে পোড়ায়
প্রতিবাদের ঝড়ে ভাঙনকে ঢেকে রাখে
আমার কবিতা অন্তরমুখী সহস্র সমীকরণে কাঁদায় আর ভাবায়
থৈ থৈ জলে বন্ধ ঘরে নিজেকে টিকে থাকার লড়াই
তবু যাপনের রোজনামচায় উঁকি দেয় উষ্ণ তাপ নরম ঘোণায়
আমার কবিতা খাঁটি সাতারু .
এটা কোন বিলাসিতা নয় —
বরং শিরদাঁড়া বাজিমাত লড়াকু ।
==============================
কল্পালোকে বৃষ্টি
মারজিয়া খানম সিদ্দিকা
উড়ছে পাখা মেলছে ডানা হাওয়ার পিঠে চড়ে,
সজনে ডগার সবুজ পাতায় টিয়ে ফিরে ঘরে।
মেঘ-বালিকার কালো চুলে মুখ ডুবিয়ে নাচে,
শহর বন্দর পার হয়ে যায় বৃষ্টি গাছে গাছে।
আমার সাথে বৃষ্টি তোমার লুকোচুরি খেলা,
ঝুমঝুমিয়ে নামছো তুমি চড়ে মেঘের ভেলা।
আকাশ গাঙে ভেসে চলি যাবো মেঘের বাড়ি
কৃষ্ণচূড়া পথ সাজিয়ে রাঙায় তাড়াতাড়ি।
ঝিরিঝিরি বৃষ্টির গতিক তুমি আমার সাথে
যাবে কিনা যাবে বলো ভেবে অস্থির তাতে।
সোনালু ফুল ছন্দে গেয়ে উঠলো শখের টানে
আমি কী তার সাথে মিলাই কণ্ঠ সাধের গানে!
বৃষ্টি-পাখি, ফুল আর গানে মাতোয়ারা জীবন
কেউ তো কারে নাহি ছাড়ে সুবিমল খুব আপন।
যদি হতাম মেঘ বালিকা উড়ে যেতাম সেথা,
বিরাজ করে আমার ঘরে কল্পালোকে যেথা।




