সৈয়দ মনজুর কবির
ব্যাপারটা কেমন যেন। মিশু চুপচাপ, পলকহীন তাকিয়ে আছে সামনের অপরূপ চোখের কুকুরটার দিকে। কুকুরটা এক আজব হাস্যকর ভাবে বসে আছে নাকি শুয়ে আছে ঠিক আইডিয়া করতে পারছে না মিশু। মাথাটা মিশুর চোখ বরাবর না রেখে রেখেছে নব্বই ডিগ্রি কোণে বড় হিজল গাছটার দিকে। অথচ মায়াবী চোখের মনিকে তীর্যকভাবে ঘুরিয়ে এনেছে পাঁচ ডিগ্রিতে মিশুর ওপরই। মানে জনম ট্যারা করে রেখেছে। সারা চোখে শুধু মায়া আর মায়া। সাথে কিছু একটা চোরামী চোরামী ভাবও। হঠাৎ মিশুর মনে হলো এই কুকুরটা ওর মতলব বুঝতে পারলো নাতো। সে আসলে কে – ওকি বুঝে গেছে!
অনেক দিন ধরে মিশু ইউটিউব দেখে একটা জিনিসের প্রতি আগ্রহী হয়েছে। তারও ইচ্ছা গরীব সেজে একজন প্রকৃত গরীবকে সাহায্য করবে। অবশ্যই ওর সাধ্যের মধ্যেই। গত সপ্তাহে ওর ছাব্বিশতম জন্মদিনে ওর বিশাল শিল্পপতি বাবা, মায়ের কাছ থেকে উপহার পেয়েছে প্রায় ত্রিশ লক্ষ টাকা ক্যাশ আর আমেরিকায় পনেরো দিন ঘুরে আশার প্যাকেজ। ওর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কত কোটি টাকা জমা সে নিজেও জানে না। ছোটবেলা থেকে মিশুর নিজের ইচ্ছাকেই বাবা, মা দু’জনেই প্রাধান্য দিয়ে এসেছে।
তাইতো মিশু বাংলা মিডিয়ামে স্কুল আর কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে বুয়েট থেকে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে পরে টানা মাস্টার্সও শেষ বলা যায়। কারণ গত কালই মাস্টার্স পরীক্ষা সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়াদি শেষ হয়ে গেছে। আপাতত পড়ালেখার পাট এতটুকুই ভাবছে মিশু। গত রাতেই মাথায় এই অদ্ভুত এক্সপেরিমেন্টটা করবে ঠিক করতেই আজ পার্কে এসে হাজির। বিশেষ করে এত বড় শহরের একেবারে দক্ষিণ প্রান্তের পার্কটায়। বহু বছরের এক লুকানো ইচ্ছায়ও পূর্ণ করতে চায়। তৈরি হয়েই এসেছে – খুবই সাধারণ পরিবারের এক বেকার ছেলে যেমনটি হয়। এই যেমন খুবই সাধারণ পকেটওয়ালা হাফ হাতা গেঞ্জি, হাঁটুতে রঙ জ্বলে যাওয়া জিন্সের প্যান্ট আর বাটার পুরনো স্যান্ডেল। তবে অভ্যাস বসত আন্ডার ওয়্যার আর স্যান্ডো গেঞ্জিটা ঠিকই বিদেশি দামি ব্র্যান্ডেরই পরেছে। আন্ডারওয়্যারে একটা ছোট্ট পকেট এমন জায়গায় সেট করেছে যে কোনো ছিনতাইকারী কেনো পুলিশেরাও গা তল্লাশি করে বুঝতে পারবে না তার হদিস। ওখানেই পঁচিশটা এক হাজার টাকার নোট আর এন, আই, ডি কার্ডের কাগজের ফটোকপি লুকিয়েছে। আর প্যান্টের তিনটা পকেটে চার হাজার টাকা করে রেখেছে। সর্বশেষ পাঁচটা একশো টাকার নোট গেঞ্জির বুক পকেটে রেখে বাড়ি থেকে সকালে বের হয়েছে। বাবা মাকে বলেছে – চার পাঁচ দিনের জন্য ঢাকার বাইরে ঘুরতে যাচ্ছে। যোগাযোগ এর জন্য পুরোনো আমলের নকিয়ার ছোট্ট বাটন মোবাইল সেটটাই ভরসা। নিজেকে কেমন যেনো নাটকের কিংবা সিনেমার কোনো বিশেষ চরিত্রের মতোই মনে হচ্ছিল মিশুর। এই যে সকালে শহরের খানিকটা ঘুরে টুরে পার্কটার নির্জনে পেতে রাখা বেঞ্চটায় বসতেই কোথা থেকে ওই বিশেষ কুকুরটাও এসে হাজির। এমন ভাব যেনো ডাকলেই সাড়া দিবে। তাই সতর্ক ট্যারা চোখের কোনো পরিবর্তনও করছে না। মিশুর মনে অজানা আনন্দে ভরে উঠে। সত্যি কথা বলতে কি মিশু ওর জীবনে আজকের মতো মনটাকে আগে এতো মেলতে দেয় নি। ওর কুকুরটাকে ভীষণ পছন্দ হয়ে যায়।
মন থেকেই বলে, কি হলো তোর? এসে বসেছিস তো আমার সামনেই, কিন্তু ওই ভাবে লুকিয়ে ট্যারা চোখে তাকানোর মানে কি? সামনা সামনি তাকাতে কি আমি বারণ করেছি?
মিশুর কথা কুকুরটা কি বুঝলো তা সৃষ্টিকর্তাই জানেন। মিশুকে অবাক করে সে তার মাথা ঘুরিয়ে নেয়, আর তাকায় সোজা চোখে মিশুর চোখ বরাবর।
এমন অভাবনীয় দৃশ্যে মিশুতো অবাক। কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে চেয়ে রয় ওর মায়াবী চোখ দুটোর দিকে। এদিকে তখনো সকালের নাস্তা না করায় খিদেটা জেগে উঠে মিশুর। কিছু খাওয়া দরকার। বাধ্য হয়েই ওই মায়াবী চোখ থেকে নিজের চোখ সরিয়ে এদিক ওদিক তাকায়। অনেক দূরে বাজারের বড় ব্যাগ হাতে একজনকে দেখতে পেয়ে জোড়ে ডাক দেয়, এই যে ভাই, এদিকে একটু শুনবেন? বলেই মিশু নিজেই ভাবে, এভাবে কাওকে ডাকা কি উচিত। আর ডাকলেই ওই ব্যক্তি আসবেই বা কেনো? মনে তো হয় উনি ওর কথা শুনতেই পারলো না।
কিন্তু না, মিশুকে অবাক করে লোকটা কাছে এসে বললো, ভাইজান আমারে ডাকছেন? আমার কাছে শুধু কফি আছে। চা কিন্তু নাইক্কা।
মিশু ভাবে এ তো মেঘ না চাইতেই জল। বলে, ভালো, ভালো। কফিই চলবে। কিন্তু আপনার ফ্লাস্ক কই?
এই যে চটের ব্যাগের মইধ্যে। লুকায়ে আনতে হয়। পার্কে এহন বহুত কড়াকড়ি।
তা বেশ, বেশ। আমার যে খিদাও পেয়েছে। অন্য কিছু খাবার পাওয়া যাবে না?
কেন যাবে না। লোকটার গর্ব ভরা কন্ঠস্বর। এই যে মোরোব্বা দেয়া বনরুটিও আছে। বলে ব্যাগের ভিতর থেকে দুইটা বনরুটির প্যাকেট বের করে আনে।
মিশুর চোখ আনন্দে চকচক করে উঠে। একই সাথে আরেক জনেরও চোখ চকচক করে উঠে। সে তা বুঝিয়েও দিলো একবার মৃদু ঘেউ শব্দ করে।
মিশু তাকায় ওর দিকে, কিরে তোরও কি খিদে পেয়েছে?
কুকুরটা বোধহয় মিশুর সব কথাই বুঝতে পারছে। ও দু’বার ঘেউ ঘেই আর মাথা নাড়িয়ে বোঝালো, ঠিক ধরেছে মিশু।
মিশু লোকটার দিকে তাকিয়ে বললো, আপনার কাছে কয় প্যাকেট রুটি আছে?
এই সাতটা। সকাল থেইকা এই পর্যন্ত পাঁচটা বেঁচছি।
এক কাজ করেন আমাকে সাতটাই দেন। কুকুরটা বোধহয় কফি পছন্দ করবে না। আমাকে তাহলে এক কাপ কফিও দিয়েন।
লোকটাতো মহা আনন্দে সবকটা বনরুটি বের করে বেঞ্চের উপর রাখলো। ফ্লাস্ক বের না করেই ওয়ান টাইম কাগজের কাপে কফি ঢেলে সেটাও বেঞ্চের ওপর রাখলো। তারপর বেশ তাড়াহুড়ো করেই টাকাটা নিয়ে আবার সাধারণ পথচারীর মতোই চলে গেলো।
মিশু অনেকটা ব্যস্তই ছিল এসব নেয়া আর টাকা দেয়ার ক্ষেত্রে। তাই কুকুরের দিকে খেয়াল ছিলো না। যখন তাকালো তখনতো মিশুর আক্কেল গুড়ুম। আরে, একি! এত্তোগুলা কুকুর কোথা থেকে এলো? ছয়টাতো হবেই। এর ভিতর তিনটা ছোট বাচ্চা। এরা কোথায় লুকিয়ে ছিলো? যে এতো দ্রুত নিঃশব্দে চলে এসেছে। নিঃসন্দেহে এই মায়াবী চোখের কুকুরটার কারসাজি।
মিশু বেশ জোরেই হেসে উঠে। হঠাৎ হাসি শুনে চলে যেতে থাকা লোকটি থেমে পিছনে তাকায়। দেখে আবার হাঁটতে থাকে সামনের দিকে।
এদিকে কুকুরের দলগুলো সুসজ্জিত ভাবে মিশুর সামনে অর্ধ বৃত্তাকারে ঘিরে বসে। সবার চোখেই সেই মায়াবী চাহনী।
মিশু একটি একটি করে প্যাকেট ছিঁড়ে বনরুটিগুলো অর্ধেক করে। মাঝে দেয়া ছোট্ট মোরোব্বাটাও অর্ধেক করে। তারপর এক এক ভাগ সামনের অতিথিদের দিতে থাকে। সবাইক দেয়া শেষ ঠিক এমন সময় মিশুর পাশ থেকে একটা আকুতি মাখা কন্ঠ বলে উঠে, সবগুলোই কি কুকুরদের দিয়ে দিবেন? নিজে কিছুই খাবেন না?
মিশু চমকে পিছনে তাকায়। দেখে একটা সুদর্শন যুবক দাঁড়িয়ে। বয়স ঠিক বোঝা যাচ্ছে না – সতেরো কি আঠারো। হাতে একটা বাজারের ব্যাগ, মুখে হাসি। মিশু একটু সহজ হয়ে বলে, বাপরে, ভয় পাইয়ে দিয়েছো। তো, আমারও খেতে হবে তা তুমি জানলে কেমন করে?
ওই যে, ওই গাছটার ওপাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন আপনি কফিওয়ালাকে যে বললেন।
ওওও, আচ্ছা, আচ্ছা। এখন সব ক্লিয়ার। হা, ঠিকই বলেছো। পেটে তো প্রচণ্ড খিদে। আসলে ওদের খাবার খাওয়ার আনন্দগুলো দেখতে দেখতে নিজের খিদেই ভুলে গেছিলাম। এই যে, হাতে দু’টুকরো তো আছে। এটাই খেয়ে ফেলি কি বলো?
হাঁ, তাই ভালো। এই পার্কে ওই লোকটা ছাড়া আর কেউ এগুলো বিক্রি করতে পারে না।
তুমি জানলে কিভাবে, যে উনিই একক বিক্রেতা?
আমাদের বাসা পার্কটার ওই দক্ষিণে একটু দূরেই মাতবর আলি লেনে। কাজের সুবিধার্থে উত্তরের রাস্তার ওপাশে বড় বড় ইঞ্জিনিয়ারিং দোকানে যেতে হয় প্রায়। তাই পার্কের ভেতর দিয়ে শর্টকাট নেই।
ইঞ্জিনিয়ারিং এর দোকানের কথাটা শুনতেই মিশু নড়েচড়ে উঠে। ব্যাপারটা কেমন যেন বেশি কাকতালীয় মনে হচ্ছে ওর কাছে। আগ্রহ নিয়ে বলল, ইঞ্জিনিয়ারিং এর দোকানে যাও কেনো?
আমাদের দাদার আমলের একটা মোটর গ্যারেজ আছে। আমাদের বাড়ির সামনেই। অনেক অনেক পার্টস আমরা ঠিক করতে না পারলে কিনতে হয়।
তো, আজও কি ওদিকেই যাচ্ছো? ব্যাগের ভেতর কি কোনো পার্টস আছে নাকি?
হাঁ, আছেই তো। এটার মতোই আরেকটা আনতে হবে না।
মিশুর আগ্রহ আরেকটু বেড়ে যায় ছেলেটার কথাটা শুনে। বলে, তুমি কি ওটা আমাকে দেখাতে পারো?
আপনি মনে হয় গাড়ির যন্ত্রপাতি সম্মন্ধে কিছু জানেন?
এমন প্রশ্নে মিশু কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে বলে, হাঁ, এ ব্যাপারে আমার কিছুটা অভিজ্ঞতা আছে। এতটুকুই বললো। বিশদ কিছু বললো না, ইচ্ছে করেই চেপে গেলো।
ছেলেটা মিশুর কথাটা বেশ আগ্রহ নিয়ে শুনে একটা মৃদু হাসি উপহার দেয়। তারপর, তাড়াতাড়ি ব্যাগ থেকে পার্টসটা বের আনে। এদিকে লোহা লক্কড় বের করা দেখে সামনের খাওয়া দাওয়া শেষ করা অতিথিরা ভড়কে যায়। হঠাৎই নিরবে সেখান থেকে সরে পড়তে শুরু করে। যাবার কালে প্রথম মায়াবী কুকুরটা মিশুর চোখের দিকে আর ওর হাতে রাখা বাকি বনরুটিটার দিকে তাকিয়ে কি কারণে যেনো একবার ঘেউ করে উঠে। ও মনে হয় বলতে চাচ্ছে, আর দেরি করো না, খেয়ে নাও।
মিশু হাতের রুটির দিকে আবার একই সাথে ছেলেটার বের করা পার্টসটাকেও দেখছে। ভাবে কুকুরটার অদৃশ্য ইচ্ছাটাকে প্রাধান্য দেয়া যাক। ছেলেটিকে বলে, ওটা দেখার আগে চলো আমরা দু’জনে এটাকে খেয়ে নেই। দু’টো টুকরাই আছে, কি বলো?
ছেলেটি কোনো আপত্তি না করেই পার্টসটা বেঞ্চের উপর রেখে হাতটা প্যান্টের কাপড়ে মুছে হাত বাড়ায়।
এতো সাবলীলভাবে ছেলেটার প্রতিক্রিয়ায় মিশু মনে মনে অবাক হয় কিন্তু বাইরে প্রকাশ না করে অর্ধেক টুকরাটা ওর হাতে তুলে দেয়।
তার পর মিনিট দেড়েক কারো মুখে কথা নেই। মিশুর কাছে মনে হলো কতোদিন পর যেন অমৃত খাচ্ছে। বনরুটি খাওয়ার পর ওরা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া কফিও শেয়ার করে। ছেলেটার অনুরোধে মিশুই প্রথমে নিজের মুখে সরাসরি ঠান্ডা কফির আধা অংশ ঢেলে নিয়ে ছেলেটার হাতে দেয়। বাকিটুকু কফি ছেলেটা ছোট ছোট চুমুকের পর চুমুক দিলো এমন ভাবে যেন গরম কফিই পান করছে।
এমন তৃপ্তির খাওয়া শেষে মিশু পার্টসটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতে থাকে। এক পর্যায়ে ও পার্টসটার এক জায়গায় তর্জনীর নোখ দিয়ে আঁচড় কেটে কিছু অনুভব করার চেষ্টা করে। তারপর আবার পার্টসটাকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বলে, আচ্ছা তোমাদের গ্যারেজে কি লেদ মেশিন আছে?
হাঁ, আছে। আগ্রহ নিয়ে দেখতে থাকা ছেলেটা উত্তর দেয়। কেনো, কি করবেন?
এই যে, দেখো? আসলে এই যন্ত্রটা খুবই সেনসেটিভ। জয়েন্টে সামান্য স্ক্রাচেই এটার ফাংশন ঠিকমতো হবে না। এডজাস্টমেন্ট একদম একশতে একশ হতে হবে। কারও জানা না থাকলে এটার ত্রুটি ধরা অসম্ভব। অভিজ্ঞ লেদ অপারেটর দিয়ে এটা ঠিক করা সম্ভব। নতুন কিনতে হবে না।
মিশুর কথা শুনে ছেলেটার চোখ আনন্দে জ্বলজ্বল করে ওঠে। বলে, বলেন কি? তাহলে তো পাক্কা সতেরো হাজার টাকা বেঁচে যাবে হাকিম চাচার! আপনি কি এটার ত্রুটি সারাতে পারবেন?
ঠিক বলতে পারছি না। তবে চেষ্টা করে দেখতে পারি। সবাই বলে আমার ল্যাব ওয়ার্ক এক্সেলেন্ট।
মিশুর মুখ ফসকে শেষ কথাটাটা বেড় হতেই ছেলেটিও ধরে ফেলে। বলে, কি বললেন? ল্যাব ওয়ার্ক? মানে ল্যাবরেটরিতে ইঞ্জিনের কাজ? কোথায় হয়?
মিশু বুঝতে পারে, সে হয়তো ধরা পড়তে যাচ্ছে। তাই তাড়াতাড়ি বললো, ও ওটা ল্যাব ওয়ার্ক না আসলে বলছিলাম লেদ ওয়ার্ক। ওটা লেদ ওয়ার্ক, বুঝছো।
ছেলেটার হাবভাব দেখে বোঝাই যাচ্ছে মিশুর কথাটা সে স্বাভাবিক ভাবে নিলো না। মনের মাঝে একটু সন্দেহ নিয়েই যেনো মেনে নিলো ওর কথাটা। বলল, বুঝতে পারলাম। তা আপনি কি আমার সাথে আমাদের গ্যারেজে যাবেন। আমি তাহলে দোকানে আর যাচ্ছি না।
মিশুতো নিজেকে লুকাতেই আজ বেড়িয়েছে। ভাবলো নতুন কোনো অভিজ্ঞতা হবে ওর সাথে গেলে। সব ভেবে আসা ভিডিও কন্টেন্ট
এর মতই হতে হবে নাকি। ও রাজি হয়ে গেলো। তাহলে চলো যাওয়া যাক, বলে মিশু উঠে দাঁড়ায়।
ছেলেটিও তাড়াতাড়ি পার্টসটা পুনরায় ব্যাগে ভরে ওকে নিয়ে পার্কের দক্ষিণ দিকের পথ ধরে।
পনেরো ষোলো মিনিটের হাঁটা পথ পেড়িয়ে ওরা প্রায় নীরব একটা মহল্লায় এসে পড়ে। রাস্তা ঘেঁষে উঁচু প্রাচীর ঘেরা একটা প্লট। প্লটটার দুপাশেই সুন্দর সুন্দর দালান। শুধু এই প্লটটার উপরে কিছু চোখে পড়ছে না। মাঝামাঝি বড় ঠেলা গেট দিয়ে ঢুকে মিশু দেখে লম্বা টিনের সেডের সামনে কয়েকটা গাড়ি সুন্দর ভাবে লাইনে দাঁড় করানো। দু তিনটা মোটর সাইকেল আর একেবারে শেষ কোণায় একটা ছোট ট্রাকও। শেডের ভেতরে দুটো ঘোলা কাচে ঘেরা রুম। ভেতরে কি আছে তা বাইর থেকে বোঝা যাচ্ছে না। রুমের পাশে খোলা জায়গায় তাক তাক করা স্টিল ফ্রেমে নতুন, পুরনো টায়ার আর গাড়ির যন্ত্রপাতি সুন্দর করে সাজানো। এরই মাঝে গোটা পাঁচেক পুরুষ কাজ করছে। অন্যান্য গ্যারেজ কর্মীদের মতো কালো তেলে জড়ানো পোশাকে নয়। মোটামুটি পরিপাটি পোশাকে। মিশু অবাক হয়ে দেখে এত সুন্দর সাজানো গ্যারেজটাকে। স্বীকার করে এদের রুচি আছে। মনে হচ্ছে খানদানী গ্যারেজওয়ালা। সেডের একপাশের দেয়াল ঘেঁষে কংক্রিটের পায়ে চলা একটা পথ শেডের পিছনের দিকে চলে গেছে। বোঝাই যাচ্ছে, শেডের পেছনে আরো কিছু আছে। মিশু যখন এসব দেখায় ব্যস্ত তখন ছেলেটা কথা বলে ওঠে, এই তো আমাদের দাদার আমলের গ্যারেজ। আর ওই যে ওই ঘরটায় আছে লেদ মেশিন। আঙুল তুলে দুটো কাচের রুমের সামনেরটা দেখায়।
বাহ! কি সুন্দর সাজানো তোমাদের গ্যারেজ, বলে মিশু।
হাঁ, দাদার গড়া। বাবা বেঁচে থাকা অবধি তিনিও এভাবেই রেখেছেন। লেদ মেশিনের সংযোজন তিনিই করেছেন। গত সাড়ে তিনটা বছর আমার বড় বোনই এটার দেখা শোনা করছে। আচ্ছা, এতক্ষণ ধরে আমরা একসাথে, অথচ আমরা কেউই আমাদের নাম জানালাম না। আমিই আগে বলি, আমি সাদি। আর আপনি?
হা হা হা! মিশু বেশ জোরে হেসে ওঠে। ঠিকই বলেছো, সাদি। আমি মিশু, বলে সৌজন্য স্বরূপ ডান হাত বাড়িয়ে দেয়। সাদিও তাড়াতাড়ি হাত মিলায়। ভীষণ সুন্দর নাম। নামের সাথে আপনার স্বভাবেরও সুন্দর মিল। সবার সাথে কেমন সুন্দর কর মিশে যান, বলে মিষ্টি এক হাসি উপহার দেয় সাদি।
কি যে বল না। আমি আবার মিশুক? আনসোশ্যাল নামে আমার একটা বদনাম আছে। তবে আমি এমনটা ছিলাম না। সেই যে ক্লাস সিক্স এ পড়াকালীন একটা ঘটনার পর থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেই। তবে পশু পাখিদের সাথে এই বদনাম আমার নেই।
তা তো আমি পার্কে নিজেই দেখলাম। আমিও তো কতদিন ওই বেঞ্চটাতে বসেছি। কই একটা কুকুরের ছায়াও তো আমার কাছে আসে নি। আর আপনি কত সহজভাবেই আমাকে আপনার ভক্ত বানিয়ে ফেলেছেন তা আপনি নিজেও বুঝতে পারেন নি। আপনার মাঝে অবশ্যই কিছু না কিছু লুকানো আছে।
সাদির মুখে লুকানো কথাটা শুনে মিশু একটু আঁতকে উঠে। আচ্ছা, হয়েছে হয়েছে। আর কিছু বলতে হবে না। এখন চলো ওই লেদ মেশিন রুমে যাওয়া যাক।
হাঁ, হাঁ, চলেন, বলে আগে গিয়ে রুমটার দরজা খুলে দেয়।
রুমের ভিতরে ঢুকেই মিশুর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। কারণ একটাই ও মেশিনটাকে চিনতে পারে। আসলে বুয়েটের টেকনিক্যাল ল্যাবে যে মেশিনে কাজ করেছে, সেই মেশিন আর সাদিদের এই মেশিন একই ব্যান্ডের। মিশু আর দেরি না করে সাদির হাত থেকে পার্টসটা নিয়ে কাজে লেগে যায়।
সাদিও মন্ত্রমুগ্ধের মতো এক ধ্যানে একটু দূরে দাঁড়িয়ে মিশুর সাবলীল কাজ করাকে উপভোগ করতে থাকে।
দশ মিনিটও লাগলো না। মিশু শেষ আরেক বার চেক করে হাসি মুখে সাদিকে বললো, এই নাও তোমার পার্টস। মনে হচ্ছে শতভাগ কাজ করবে। যাও গাড়িতে লাগিয়ে টেস্ট করে দেখো।
মিশুর শেষ কথায় সাদির ধ্যান ভাঙে। ও দ্রুত পার্টসটা নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এসে একটু জোরেই বলে, সাত্তার ভাই, কুইক। হাকিম চাচার গাড়িতে এটা ফিট করে ফেলেন।
গ্যারেজে কাজ করারত একজন এসে পার্টসটা হাতে নেয়। চোখে অবিশ্বাসের আভাস। বলে, ভাইজান, এইটার ফল্ট খুইজা পাইছেন। আমরাতো এইটার কিছুই ফল্ট দেখি নাই। এইটা ঠিক হইছে তো?
সাত্তার ভাই, এখন কোনো কথা হবে না। শুধু কাজ হবে, কাজ। যান তাড়াতাড়ি শেষ করুন।
সাদির এই কথার পরে সাত্তার সাহেবও আর দেরি করলো না। উনিও পরবর্তী আধা ঘন্টার মধ্যেই গাড়ি ইঞ্জিন স্টার্টের ব্যবস্থা করে ফেললো। সাদিকে বললো, ভাইজান, যান স্টার্ট দেন।
সাদির পাশেই মিশু দাঁড়িয়ে ছিলো। সাদি মিশুকেই এই কাজটা করতে বলে।
মিশু বেশ অমায়িক ভাবেই প্রস্তাবটা ফিরিয়ে দেয়। পরে সাদিই ড্রাইভিং সিটে বসে পড়ে। এদিকে অন্য কর্মীরাও গাড়ির পাশে এসে দাঁড়ায়। বিসমিল্লাহ বলে সাদি চাবি ঘুরায়। ইঞ্জিন মৃদু শব্দ করে চালু হয়ে যায়। আর সঙ্গে সঙ্গেই পাশে অপেক্ষমান সবার মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। এদিকে সাদি গাড়িটাকে পার্কিং মুডে রেখে গাড়ি থেকে নেমে এসে মিশুকে জড়িয়ে ধরে, মিশু ভাই, ইউ আর সিম্পলি গ্রেট। আপনার সাথে পরিচিত হতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি। ওয়াও, হোয়াট এ এক্সেলেন্ট ওয়ার্ক। আনন্দে সাদি মিশুকে আরো জোরে জড়িয়ে ধরে। সাদির এমন আনন্দে মিশু অভিভূত। ওর চোখে কেনো জানি এমন আনন্দে জল চলে আসে। ওর মুখে কেনো যেনো কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। কোনো মতে নিজেকে সামলে যখনই কথা বলতে যাবে ঠিক তখনই গ্যারেজের কোনো এক জায়গা থেকে ইন্টারকম বেজে ওঠে। সাথে সাথেই সাদি মিশুকে ছেড়ে দৌড়ে গ্যারেজের ডানদিকের দেয়ালটার মাঝামাঝি লাগানো সাদা রঙের এক ইন্টারকমের লাউড স্পিকার বাটন অন করে।
হ্যালো, কে?
আমি। একটা মেয়ের কন্ঠ ভেসে ওঠে।
ও, আপু! জানিস, আজকে এই গ্যারেজে কি মিরাকল ঘটনা ঘটেছে?
হাঁ, জানি।
তুই কিভাবে জানলি? সাদি অবাক!
মেয়েটা হাসে। সে হাসির স্নিগ্ধতা ওখানে উপস্থিত সবার মাঝেই ছড়িয়ে যায়। আরে, তুই তো এতই এক্সাইটেড যে গ্যারেজ যে পুরো সিসি ক্যামেরায় আবদ্ধ তা তুই কি ভুলে গেলি?
সাদি একটু বোকা বনে যায়। ও আসলেই ভুলে গেছিলো। সামনের কাচে ঘেরা অফিস কক্ষের মতো ওদের বাড়ির একটা রুমেও রাখা মনিটরে তো গ্যারেজের সব কিছুই দেখা যায় আবার শোনাও যায়। দ্রুত সরি বলে। ইসসিরে, আপু একদম মনে ছিলো না। তো তুই কখন দেখলি?
আমি তো মিশুভাইকে গ্যারেজের গেট দিয়ে ঢোকার পর থেকেই মনিটরের সামনে স্ট্যাচু হয়ে গেছি। এতক্ষণ পর্যন্ত সবই তো দেখছিলাম। তোর মতো আমিওতো ধ্যানে মগ্ন হয়ে ছিলাম। ওনার আরো গুণের কথাতো তুই এখনো কিছুই জানিস না।
আপু, তুই ওনার আরো গুনের কথা জানিস নাকি? কিভাবে কি? আচ্ছা, কেমন যেনো রহস্য রহস্য মনে হচ্ছে?
ফোনের ওপাশ থেকে একটু আমতা আমতা ভাবের জড়ানো কথা শোনা গেলো। মনে হচ্ছিলো এই মাত্র কোনো বেফাস কথা বলে ফেলেছে। ও ও য়ো, ওই তো, ওই যে উনি কীভাবে কঠিন জিনিসটা মানে ওই কঠিন ত্রুটিটা সমাধান মানে গাড়িটা ঠিক করে দিলো। আরে দেখলি না। তোর সামনেই তো করলো। তুই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ তাহলে কি দেখলি, হাঁদা?
এই কথায় মিশু বাদে উপস্থিত অন্য শ্রোতারা অজান্তেই জোরে হেসে ওঠে। এটা ওপাশের মেয়েটি শুনতে পেয়েই বলে, আরে, আরে, গাধা, তুই দেখছি ইন্টারকমের লাউড স্পিকার দিয়ে রেখেছিস। উনিও শুনে ফেলেছে আমার কথা? ছি, ছি, ছি! কি লজ্জা! রাখ, রাখ। এক্ষুনি রাখ। (চলমান)
সৈয়দ মনজুর কবির : গল্পকার, ঢাকা




