নাহার তৃণা
খেলা
এ গাছ-ও গাছ ওড়াউড়ি শেষে সবেমাত্র ফড়িংটা ঘনসবুজ একটা ডালে বসেছে। সে তো আর জানতো না, এতক্ষণ কেউ তার মুক্ত চলাচল একমনে লক্ষ করছিল। অতএব ফড়িংটা থিতু হওয়ার সময় বিশেষ পেলো না। ধরা পড়ে গেল নিষ্ঠুর এক থাবার নিচে। ধরা পড়তেই আতঙ্কে ফড়িঙের বুকটা কেমন ধড়ফড় করে উঠল। মরে যাচ্ছে ভেবে তার ভারি কান্নাও পেলো। দিনের আলো তাপ ছড়ানোর আগেভাগে সে যখন ঘর ছাড়ছিল, মা তখন পইপই করে বলে দিয়েছিল বেশিক্ষণ যেন বাইরে না থাকে। আধঘন্টার ভেতরই ফিরবে, বলে সে ফুরফুরে বাতাসে পাখা মেলে দিয়েছিল। মা আজ মেঘ পেরিয়ে রংধনু মাসির বাড়ি যাবে। সেখানে ওদের নেমতন্ন রয়েছে। অল্পক্ষণ পর ফিরবে বলে এলেও, ওড়াউড়ির আনন্দে কথাটা সে বেমালুম ভুলে গেছে। ধরা পড়ে এখন মনে পড়লো। মায়ের জন্য তার বুকের ভেতর কেমন একটা করে উঠল। সময়ের হিসেব না থাকায় নিজের ওপর তার ভীষণ রাগ হলো।
ফড়িংটা খপ করে ধরে ফেলায় গাবলুর ভারি আনন্দ হলো। নিবিষ্ট হয়ে এতক্ষণ অপেক্ষার ফলাফলে গর্ব নামের অনুভূতি তাকে ঘিরে ধরতে চাইলো। অনুভূতির সে স্তরকে ঠেলাধাক্কা দিয়ে মাথা চাড়া দিলো নিষ্ঠুরতা। বেশ কায়দা করে সে যেন গাবলুর কানে কানে ফুসমন্তর দিলো, ‘এবার ফড়িঙের ডানা দুটো দুদিক থেকে ধরে ফরফরিয়ে ছিঁড়ে ফেলো খোকা!’ তাই বুঝি? বেশ হবে তাহলে! ফড়িংটার ফিনফিনে ডানা দুটো ধরে ছিঁড়ে ফেলার মুহূর্তে তার মন বদলে গেল। সে ফড়িংটাকে আগলে রেখে ছুটে ঘরে গেল। মায়ের সেলাইয়ের বাক্স ঘেটে নিয়ে এলো সুতোর গুটি। ফড়িং দিয়ে সে ঘুড়ি বানাবে। তাই দেখে হাবলু হিংসেতে জ্বলবে নির্ঘাত। গতকাল হাবলু ছাদে উঠে জলবন্দুক নিয়ে একাএকাই খেলেছে। একবারের জন্যও তাকে ডাকেনি। জানতে চায়নি সে খেলতে চায় কি না! মনপ্রাণ দিয়ে সে জলবন্দুকের খেলায় অংশ নিতে চেয়েছিল। কিন্তু হাবলু তার দিকে ফিরেও তাকায়নি। ঘোড়েল মামু ঠিকই বলে, দিন কারো একার মুঠোতে থাকে না। আজ ওর তো কাল তোর। আজকের দিনটা গাবলুর!
ফড়িঙের ল্যাজে সুতো বেঁধে গাবলুকে খেলতে দেখে হাবলু। খেলাটা শুধু অভিনবই না ভারি মজাদারও। মুহূর্তেই হাবলুর বুকের ভেতর লোভ তৈরি হয়। জানালার স্লাইডিং পাল্লাটা ঠেলে সরিয়ে সে এমনভাবে দাঁড়ায়, যেন গাবলু চোখ তুলতেই তাকে দেখতে পায়। উদগ্রীব হয়ে সে বাগানময় ছুটোছুটি করতে থাকা গাবলুর দিকে তাকিয়ে রইল। মনে মনে সে খুব করে চাইতে লাগলো, গাবলু তাকে খেলায় ডেকে নিক।
মৃত্যুভয় কেটে গিয়ে ফড়িঙের এখন খুব একটা মন্দ লাগছে না। প্রথমে তো সে ভেবেছিল তার বুঝি সময় শেষ। কিন্তু সেরকম কিছু ঘটেনি। সে দিব্যি মুক্ত-স্বাধীন। কেমন উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। শিকারি ছেলেটিকে যতটা নিষ্ঠুর মনে হয়েছিল অতটাও সে নয়। ওকে মুক্তভাবে ওড়াউড়ি করতে দেখে কেমন দিব্যি আনন্দ নিয়ে পিছু পিছু ছুটে চলেছে!
সেই কাকভোর থেকে উপন্যাসের সমাপ্তি টানার ধস্তাধস্তিতে ক্লান্ত আমি টেবিল ছেড়ে খোলা জানালার সামনে এসে দাঁড়ালাম। বাইরে তাকাতেই সামনের বাড়ির বাগানে চোখ আটকে গেল। ফড়িঙের ল্যাজে সুতো বেঁধে খেলছে এক বালক। খেলাটা যে তাকে আনন্দ দিচ্ছে সেটি তার চোখমুখে স্পষ্ট। শিশুর কাছে আনন্দটাই মুখ্যু সেটি সে কীভাবে পাচ্ছে; ন্যায় কী অন্যায়, সেরকম কিছু তার বুকে বুড়বুড়ি কাটে না। বড়দেরও কি কাটে? না মনে হয়। সেরকম হলে পৃথিবী বৈচিত্রহীন হয়ে পড়তো। পৃথিবী জুড়ে ন্যায়ের পাল্লা অন্যায়ের সামনে নতমুখী না হলে খেলাটাই যে জমতো না! আমাদের সবার পেছনে অদৃশ্য সুতো বেঁধে কেউ একজন ছেড়ে দিয়েছেন পৃথিবী নামের বিশাল মাঠে। আমরা আনন্দে নেচেকুঁদে, মুক্ত-স্বাধীন থাকার ভান ধরে জীবন পার করছি। আমাদের নিয়ে খেলে চলেছেন এক বিরাট শিশু। অথচ তাঁর মুখে সামনের বাড়ির ছেলেটির মতো আনন্দ ঝুলে নেই। তিনি চিন্তিত-বিষণ্ন!
কোলাজ
মহল্লার শেষ প্রান্তের শ্যাওলা ধরা বাড়িটির সামনে বেদম জটলা। আগুন, আগুন, বলে চেঁচাতে, চেঁচাতে, তখনও এসে পৌঁছায়নি লাল গাড়ি। সেই অবসরে, দারুণ উৎসাহে চোখ ফেড়ে জনতা দেখছে আগুনের যুযুৎসু। আশেপাশেই কেউ গুজগুজ করে, ‘বড় গোমড় ছিল এ বাড়ির কর্ত্রীর। কারো সঙ্গে মিশতে চাইতো না।’ ওদিকের কোণটাতে দাঁড়িয়ে জনৈক শিল্পী স্মরণে আনতে চেষ্টা করেন, কার ক্যানভাসে দেখেছিলেন আগুনের বর্ণিল শেডের এমন দাপট! মুখ চুন হকার ছোকরাটির দৃষ্টি এ মাসের বিল না পাওয়ার আফসোসের অনুবাদ করে যায় নীরবে।
একটু তফাতে মোবাইল কানে স্কয়ার ফিট সংক্রান্ত আলাপে ব্যস্ত ভদ্রলোকটি কোন এক রিয়েল এস্টেট ব্যবসার নবীন কাণ্ডারী। হায় হায় করে ওঠা ভিখিরিটি মনে মনে হিসাব কষে ফেলেছে, আজ থেকে তার এ বাড়ির খাতা বন্ধ। দু’ একটি চলচ্চিত্রে হাত পাকানো তুখোড় তরুণ, সক্ষোভে চুলে আঙুল চালিয়ে অস্থিরতা কমাতে চায়। তার কেবলি মনে হতে থাকে, কেন যে খামোখাই হ্যান্ডিক্যামটা দিতে গেল পিন্টুকে! যদিও যার যার হাতে ধরা মোবাইলের ভিডিও অপশন দারুণ সক্রিয়। তাতে আর কতটুকু মুন্সিয়ানার গ্যারান্টি।
বাজার ফেরত পাড়ায় মাস্তান পরিচিত গাঁজাখোর হারু, বাড়িটিকে ওভাবে জ্বলতে দেখে প্রথমটায় কেমন ভ্যাবাচাকা খায়। ধাতস্থ হতেই ভিড় ঠেলে এগোয়। দৃশ্যপটের ছন্দপতন ঘটিয়ে, আগুপিছু না ভেবে দ্রুত ছুটে যায় বাড়িটির ভেতর। অবহেলায় ফেলে যাওয়া হারুর ব্যাগে উঁকি দেওয়া আনাজ পাতি বাতাসে ছড়াতে থাকে অভিমন্যুর চক্রব্যূহ ভেঙে না ফেরার দীর্ঘশ্বাস।
নাহার তৃণা : কথাসাহিত্যিক, নিউ ইয়র্ক প্রবাসী লেখক




