রতন কুমার তুরী
কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের করুণ ট্র্যাজেডি হলো তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্র বুলবুলের অকাল মৃত্যু। ১৯৩০ সাল। তখন কবির নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। কবির অসংখ্য ভক্তরা প্রায় প্রতিদিনই তাঁর পিছুপিছু ঘুরতো। কখনও কবিতা কখনও গান আবার কখনও ছোটদের ছড়া নিয়ে কবি সারাক্ষণ মেতে থাকতো। বাড়িতে কবির সাথে সাথে থাকতো ছোট্ট পুত্র বুলবুল। নজরুল যখন বাড়িতে কবিতা কিংবা গান রচনা করতো তখন বুলবুল তাঁর আশেপাশেই থাকতো আর কবির কবিতা আর গানগুলো গুনগুন করে গাইতো আর এসময় পশ্চিমবঙ্গের নামিদামি সব পত্রিকায় একের পর এক কবির বিখ্যাত সব কবিতা প্রকাশ হতে লাগলো। কবির বন্ধুদের মধ্যে সবাই বুলবুলকে চিনতো এবং তারা সবাই তাকে বেশ স্নেহ করতো। হঠাৎ ১৯৩০ সালের ৭ মে কবির জীবনে ছন্দপতন ঘটে। এ দিন কবির প্রাণপ্রিয় পুত্র অরিন্দম খালেদ বুলবুল গুটিবসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে মাত্র ৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করে। পুত্রের মৃত্যুতে কবি মুষড়ে পড়েন এবং নিরবে অশ্রুপাত করতে থাকেন। এসময় বিখ্যাত বিদ্রোহী কাজী নজরুল ইসলাম সব সমস্ত গান রচনা করেছিলেন তার অনেকগুলোতেই পুত্র বুলবুলের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। তখন কলকাতার স্ট্রীট রোড এলাকায় কবির বন্ধুদের মধ্যে কমরেড মুজাফফর আহমদ, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, কাজী মোতাহার হোসেন, নৃপেনকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ নজরুলের সাথে যোগাযোগ রাখতো। বুলবুলের মৃত্যু সংবাদ দ্রুত তাদের কাছে পৌঁছে গেলে তারাও কবির জন্য বেশ দুশ্চিন্তায় পড়ে গেলেন। কারণ তারা সবাই জানতো যে নজরুল বুলবুলকে খুবই ভালোবাসতেন। ঠিক এ সময় কলকাতার কৃষ্ণনগরে কবি যেখানে থাকতেন সেখানে কবির বন্ধুরা জড়ো হয়ে কবিকে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন। মূলতঃ কবি চির দুঃখী। এতোবড় নামকরা কবি হয়েও অভাব তাকে পিছু ছাড়েনি। পুত্র বুলবুলের মৃত্যুর সময়ও কবির পকেটে এক টাকাও ছিল না। বলতে গেলে কবিপুত্রের দাফন কাফনের টাকাও ছিল না তাঁর কাছে। কবি বাধ্য হয়ে তৎক্ষণাৎ গান লিখে দেয়ার শর্তে এক প্রকাশকের নিকট থেকে কিছু টাকা নেন। আর ঠিক তখনই কবির হৃদয় থেকে কলমে নেমে আসে কবির এই অমর গানটি –
ঘুমিয়ে গেছে শ্রান্ত হ’য়ে আমার গানের বুলবুলি-
করুন নেশায় চেয়ে আছে সাঁঝের ঝরা ফুলগুলি।
ফুল ফুটিয়ে ভোরবেলাতে গান গেয়ে
নীরব হলো কোন নিষাদের বান খেয়ে,
বনের কোলে বিলাপ করে সন্ধ্যা-রাণী চুল খুলি’—–
প্রকৃতপক্ষে নজরুল এর আগেও অনেকগুলো গান লিখেছেন এবং তা জনপ্রিয়ও হয়েছে কিন্তু নজরুলের – ঘুমিয়ে আছে শ্রান্ত হয়ে আমার গানের বুলবুলি —– গানটির মতো এতো বিষাদময় গান নজরুল এর আগে আর কখনও লিখেননি। এ গানের প্রত্যেক শব্দ এবং লাইন নজরুল তাঁর অকালপ্রয়াত পুত্র বুলবুলকে উদ্দ্যেশ্য করে লিখেছেন। পুত্র শোক কাকে বলে নজরুলের এ গানটি মনোযোগ দিয়ে কেউ শুনলে বুঝতে পারবে। অধিক শোকেও যে বিখ্যাত মানুষদের হৃদয় থেকে উদ্ভাসিত সকল লেখাই অমর সাহিত্য হতে পারে তা নজরুলপুত্র বুলবুলের মৃত্যুর পরবর্তী নজরুল লেখনি দেখলে আমরা বুঝতে পারি। বুলবুলের মৃত্যুর পর নজরুল বেশকিছু গান লিখেছিলেন এবং তিনি সেগুলো নিজে সুর দিয়ে গেয়েছিলেন। সেরকম নজরুলের আরেকটি বিষাদময় গান হলো-
‘ কাঁদ কেন পথ ভোলা পাখি—‘
” মোসাফির! মোছ এ আঁখি জল—‘
“কেন আন ফুল-ভোর আজি বিদায় বেলা—‘
এবং
কেন কাঁদে পরান কী বেদনায় কারে কহি।
সদা কাঁপে ভীরু হিয়া রহি রহি।
————————————
” কেন কাঁদে চাতকিনী মেঘের সনে–
——————————-
আরেকটি বিষয় অনেকেই মনে করে থাকেন যে ” বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুল শাখাতে দিসনে আজি দোল — এ গানটি বুলবুলের মৃত্যুর পরে লেখা। আসলে এ গানটি নজরুল লিখেছিলেন ১৯২৬ সালে বুলবুলের জন্মের আগে। পরবর্তীতে এ গানটি বুলবুলের নামের সাথে মিশে একাকার হয়ে যায়। অনেকেই এ গানটিকে বুলবুলের স্মৃতির উদ্দেশে সভা মঞ্চে গাইতে থাকে। মানুষের মুখে মুখে এ গানটি ক্রমেই বুলবুলের গান হয়ে ওঠে।
মূলতঃ নজরুলের লেখা এ গানগুলো পুত্র শোকে লেখা হলেও পরবর্তীতে এগানগুলো মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
প্রকৃতপক্ষে বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত জনপ্রিয় সাহিত্যিক কাজী নজরুল ইসলামের জীবনের দুঃখ তাকে কখনই পিছু ছাড়েনি। ছোটকাল থেকেই নজরুলের জীবন ছিল বেদনায় ভরা। ছোট বয়সো পিতা হারানো, মোয়াজ্জিনের চাকরি করা, রুটির দোকাবে চাকরি করা এমন বন্ধুর পথ পেরিয়েই নজরুলকে সাহিত্য সাধনা করতে হয়েছিল। নজরুলও দমবার পাত্র ছিলেন না। নজরুল সকল প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েই তা মোকাবেলা করেই পথ চলেছিলেন আপন মহিমায়।
রতন কুমার তুরী : শিক্ষাবিদ ও প্রাবন্ধিক, চট্টগ্রাম




