রাজকুমার শেখ
ভরপুর পুজোর গন্ধ। সরস্বতী পূজা। গ্রাম বাংলাতে মাইকে বাংলা গান। মাটির উঠানে আলপনা। গাঁদাফুল। হালকা শীতের আমেজ। কি না ভালো লাগা। আজও আলমুনের গল্পে এ সব ওঠে আসে। এখন আর সেই রূপ রস শুকিয়ে গেছে। শুধু লেখনিতে পড়া যায়। তার আর মন ভরে না। সবই কেমন বদলে যাচ্ছে। কাশ ফুলের বনে বসে হারিয়ে যাওয়া। নদীর পাড় এ ছিপ দিয়ে মাছ ধরা। পুঁটি মাছ। কই। আরও কত রকমের মাছ। সারাদিন কেটে যেত। বিলে গিয়ে সাঁতরানো। দূরে ঢাকের শব্দ।
আলমুন বসে বসে এ সব ভাবছিল। কতদিন আর যাওয়া হয়না পরিদের পাড়াতে। ও জানেনা পরি এখন কেমন আছে। আর দেখাও হয় না। এখন ও অন্য সংসারে।
আলমুন তাকে মনের রেশম সুতো দিয়ে বাঁধতে পারেনি। ভালোবাসা আসলে মনে থাকায় ভালো। তা মন থেকে উড়ে অন্য মনে গেলেই তা অন্য রূপ নেয়। তার একান্ত মনে একা পরি ছিল। কেন যে তাকে আগ বাড়িয়ে সব বলতে গেল! না বললেই ভাল হত। চলে তো যাচ্ছিল।
এ সব মনে পড়লে আলমুনের এখন হাসি পায়। হাসি পেলেও তো তার প্রথম ভালোবাসা! পুজোর দিন তার ঠোঁটে আলতো করে ছোঁয়ানো লিপিস্টিক। পরনে শাড়ি। সুন্দর কপালটাতে মিহি টিপ। যেন প্রজাপতি মনে হচ্ছিল। আলমুনের কেমন নেশা ধরে যায়। সেই প্রথম কোন মেয়েকে আবিস্কার করলো। পরির পিছনে ও পড়ে গেল। পড়াশোনা মাথায়। সারাদিন বাবুদের বাগানে। বাগান লাগেয়া ওদের বাড়ি। দেখা হত কখনো সখনো। কথা বলতে চায় ও। কিন্তু তেমন সুযোগ আর মেলে না। সময় গড়িয়ে যায়। সময় বয়ে যেতে থাকে। তারপর ওরা যখন স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দেয় তখন আলমুন কথা বলে। সেই শুরু ওদের। দুজনে একই সঙ্গে কলেজ। পড়া শেষ না হতেই দুম করে পরির বিয়ে হয়ে গেল।
আলমুন একা হয়ে যায়। পরি অন্য শহরে চলে গেল। ওদের আর দেখা হয় না। তার শহরে একা সে। পরি চায়নি বিয়ে করতে। কিন্তু ওর বাড়ির লোকজন ভালো ছেলে পেয়ে বিয়ে দিল। পরি তার সামনে এসে অনেক কেঁদেছিল।
এ সব আর ওর মনে রেখে কি লাভ? সময়ে সে এসেছিল। আবার সে চলেও গেছে। কিন্তু তার কলম থামেনি। কলম তার এখন চিরসঙ্গী। আজ সকালটা কেমন পরিময় হয়ে উঠেছে। অনেক দিন পর ওকে নিয়ে ভাবতে ভাল লাগছে। এত ওর লেখা। কিন্তু ওর নামে কোন গল্পে তার নাম উল্লেখ করেনি ও। না– এবার তাকে নিয়ে একটা বড় গল্প লিখবে। এমন সময় একটা হলুদ বসন্ত পাখি ডেকে গেল। আজ ওরও মন করছে উড়ে যায় কোথাও অজানা কোন আকাশে। ওর আর বিয়ে করা হয়নি। একা একা এত গুলো বছর কাটিয়ে দিল। এখন ভালো চাকরি করে। লেখে। বই বের হয়। যা রয়্যালিটি পায় তাও দান করে দেয়।
এবারের বইমেলায় ওর উপন্যাস আসছে। সেটার কাজ শেষের দিকে। অনেক বড় উপন্যাস। অনেক দিন ধরে একটু একটু করে ও লিখছিল। ও বুঁদ হয়ে ছিল লেখায়। কিন্তু পরিকে আজ হঠাৎ মনে পড়ায় ও কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে। চা খেতে ভুলে যায়। মাসি কখন এসে তার টেবিলে চা দিয়ে গেছে। কিন্তু তার মন এখন পরিকে খুঁজছে। আজ পরি থাকলে সকালটা অন্য রকম হত। সকালে তার মিষ্টি মুখটা দেখে সকাল শুরু হত। ওর সুন্দর হাতে চা খেয়ে লিখতে বসতো। সকালে ও জড়িয়ে ধরে বলতো,’ আর একটু শোও আমার কাছে’।
‘ এই অফিস যেতে হবে না’?
‘ আঃ! এসো না একটু কাছে’?
পরি ওকে দু বাহু দিয়ে আঁকড়ে ধরে। আলমুন ওর নরম বাহুর উষ্ণতায় ডুবে যায়। ভরাট বুক ওর বুকে চেপে বসে। সত্যি পরি খুব সুন্দরী। ওর মায়াবী মুখটাতে সকালের চুম্বনে ভরিয়ে দেয় ও। আদরে আদরে ওর মন ভরে ওঠে।
এ সব ভাবতে ভাবতে আলমুনের চোখ ভিজে ওঠে। লেখার পাতাতে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে ভিজে যায়। ঝাপসা দেখছে চোখে। হলুদ বসন্ত পাখিটা আবার ডাকছে। হয়তো ওর বুকেই ডাকছে।
২.
পরির কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। ওর বন্ধুগুলো এখন কে কোথায় তার কোনো খোঁজ নেই। বাবুদের বাগান কেটে নতুন বসত গড়ে উঠছে। শুধু শিমুল গাছটা এখনো মাথা উঁচু করে একা দাঁড়িয়ে আছে। আলমুনের মতোই একা। গাছটার কাছে এসে ও দাঁড়ায়। কত স্মৃতি নিয়ে ও দাঁড়িয়ে। ওদের আড্ডা ছিল এই গাছের গোড়ায়। লাল লাল শিমুল ফুল ঝরে পড়তো। শালিকগুলো চিৎকার করতো। বসন্ত আসতে এখন অনেক দেরি। শরত চলছে।
আলমুনকে আবার ফিরতে হবে। তবে যে কদিন আছে সে একবার করে আসবে এখানে। সব বদলে গেলেও তার মনে যে ছবি বসে আছে তা কোনো দিনে বদলাবে না।
ও গাছটার নিচে বসে থাকে। এখান থেকেই পরিদের বাড়ি দেখা যেত। ও এখন এখানে আসে কি না ও জানে না।
ওর কি মনে পড়ে তাকে? বড্ড জানতে ইচ্ছে করে ওর। সময় নাকি সব ভুলিয়ে দেয়। তার পরও ও জানতে চায়। কেন চায় ও তা বলতে পারবে না। বহতা নদীও কি ফিরতে চায়? মানুষ যেমন চায়। পুরনো মানুষের কাছে সকলে ফিরতে চায়। সত্যি কি? ও জানে না।
সময় বয়ে চলে। পাখিরা বাসায় ফিরে আসে। এবার তাকেও ঘরের দিকে ফিরতে হবে। আবারও ও আসবে। বসবে। যদি সে আসে কখনো। ওর মন চায়ছে একবারটি যদি দেখা হয়। কি বলবে ও?
সময় চলে আপন নিয়মে। পাখিরা ডাকছে। পশ্চিমে সূর্য হেলে পড়েছে। ও আরও কিছুটা সময় বসে থাকে।
৩.
ও চলে যাবার আগে আবার আসে শিমুল গাছটা কাছে। হয়তো তার আর আসা হবে না। গাছটা দুচোখ ভরে দেখছে। গাছটাও আর কতদিন এ ভাবে টিকে থাকবে কে জানে। যে ভাবে বসত গড়ে উঠছে চারপাশে। গাছটা শেষ হলে তার সব ভাল লাগা মরে যাবে। কার টানে এখানে আসবে সে? ও একবার গাছটাকে হাত দিয়ে ছোঁয়। যেন তার ভাল বাসাকে ছুঁলো। মনটা তার ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। হিম হমি সন্ধে নামে। এমন সময় হঠাৎ কার গলা। তাকিয়ে দেখছে পরি। ও খুব অবাক হয়ে যায়।
‘তুমি এখানে’?
আলমুন অবাক হয়ে ওকে দেখছে। মুখে কিছু বলছে না। কি বলবে ও ভেবে পাচ্ছে না।
‘ কি হল তোমার’?
কথা শেষ করে পরি বলে, ‘ আমি পুজোতে এসেছি। তোমার খোঁজ করেছি অনেক। তুমি কোথায় যেন চলে গেছ। কেউ খোঁজ দিতে পারেনি। তুমি এত দিন কোথায় ছিলে’?
‘ জানি না’!
পরি অবাক হয়ে ওকে দেখছে। মানুষটা অনেক বদলে গেছে। পরি ওর কাছে এগিয়ে আসে। ওর চোখে চোখ রাখে। যে চোখে সে বসত করতো। বসত করতো তার মনে। পরি তার হতে পারেনি। কিন্তু মানুষটা আজও তার মনে বেঁচে আছে। থাকবে চিরকাল। তার মনের মানুষ। তার সুখের মানুষ। দুঃখের মানুষ। তাকে পাগল করা মানুষ।
আলমুন কাঁদছে। ওর দুচোখ দিয়ে আপনা থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে। পরি তার শাড়ির আঁচল দিয়ে ওর চোখ মুছিয়ে দেয়। তার মনে যে এতকাল ঘর করছে। আজ আবার তার কাছে। আজ পরি নীল শাড়ি পরে। ওর আঁচল এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে বাতাসে। হিম হিম সন্ধ্যায় পরিকে সত্যি পরি মনে হচ্ছে। এমন সময় বলে পরি,
‘ তোমাকে গত কাল দেখলাম এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে। তোমাকে ডাকলাম। তুমি সে ডাক শুনতে পাওনি। পুজো শেষে আমিও চলে যাবো। দেখা হবে না আর! তুমি ভালো থেকো ‘!
পরির গলা ধরে আসে। শিমুল গাছটা কি শুনছে ওদের কথা? পরি নীল শাড়ির আঁচলটা নিয়ে ওর চোখ মোছে। জলে ভেসে যাচ্ছে সব। জীবনের খেলাতে সবাই জেতে না। হেরে গিয়েও সে পরিকে আজ তার মনের বারান্দায় বসিয়ে দেখবে চিরকাল।
রাজকুমার শেখ : কথাসাহিত্যিক, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত




