গৌতম কুমার রায়
কবি জয়দেব গোস্বামী। দ্বাদশ শতাব্দির শেষ ভাগে তিনি গীতিগোবিন্দ কাব্য লেখেন। অর্থাৎ পদাবলি গানের সূচনা করেন। পদাবলি হলো প্রভু শ্রীকৃষ্ণ ও নিমাইয়ের “লীলাকথা” নিয়ে রচিত গান। লীলা করার জন্য রচিত কমনীয় কবিতা গুচ্ছ। পদাবলি রচনার মূল কারণ শ্রীকৃষ্ণকে নিজে অনুভব কর এবং তা অন্যকে অনুভব করাও। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সম্পর্কে এবং তার প্রেম লীলা সম্পর্কে যত আলোচনা, যত ভক্তি ও প্রার্থনা তার সাথে এতটুকু বলবো শ্রীকৃষ্ণ হলেন বিষ্ণুর অষ্টম অবতার। আবার ভগবত মতে তিনি বিংশ অবতার। শ্রীমতি রাধার ভাবধারা অঙ্কন করে পদাবলিকে অনুভবের পূর্ণতায় আনা হয়। মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য এই পূর্ণতার পথিকৃৎ মানব। শ্রী চৈতন্য আবির্ভাব হলে পদাবলির ভক্তি রস সমগ্র বাংলায় আপ্লুত হয়ে পড়ে। মহাপ্রভুর ভাব অঙ্কনের রাধার মূর্তিটি কবিগণ নিপুণ চিত্রকল্প দিয়ে ফুটিয়ে তুলেছে। এই কাব্যে প্রথম এই কবি সঙ্গীত শ্লোকে পদাবলি শব্দটা ব্যবহার করেন। কবি জয়দেব গোস্বামীর এই অমর সৃষ্টির গীতিগোবিন্দ সাহিত্যেও ধর্মের মিলিত যে রূপ তা হলো বৈষ্ণব জীবন দর্শন সাহিত্য। এই পদাবলি। পদাবলি হলো পদের আবলী। যা গীতি ও কবিতা সমৃদ্ধ। রাধা-কৃষ্ণের লীলা বিষয়ক কাব্য। পদাবলি- বৈষ্ণব- মহাপ্রভু চৈতন্য ত্রিবিধ চিন্তার সমন্বয় হয়ে আমরা খুঁজে পাই শ্রীকৃষ্ণের লীলা। কবি জয়দেব গোস্বামীর অনুসৃত সৃষ্টিকে অনুসরণ করে গৌড়ীয় বৈষ্ণব মহাজনেরা কবির ভাব, ভাষা, ছন্দ এবং প্রণীত অলংকার দিয়ে পদাবলি রচনা করেছেন। এই পদাবলিই হলো শ্রীশ্রী চৈতন্য দেব প্রচারিত বৈষ্ণব ধর্মের মূল ভিত্তি। যা হলো বৈষ্ণব চেতনার মহিমানি¦ত গীতিগোবিন্দ। রূপ রসের এই ভিত্তিকে কেন্দ্র করে ভক্তদের মনে প্রাণে ভক্তি ও আনন্দের সূত্র গ্রথিত হতে লাগলো। প্রেমের নতুন মাত্রা খুঁজে পেল। ১৪৮৬-১৫৩৩ খ্রিস্টাব্দ সময়টা হলো মহাপ্রভু চৈতন্য দেবের যুগ সন্ধির কাল। যিনি পাড়া পড়শীর কথিত গৌড়, গোরাচাঁদ, গৌরাঙ্গ। গুরু কেশব ভারতির দেয়া নাম শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য। পিতামহির শোভা দেবীর স্বপ্নে প্রাপ্ত দৌহিত্র। মাতামহের হৃদয় লালিত বিশ্বম্ভর। যার জন্ম হয় পবিত্রের মহাসঙ্গ ভাগিরথি ও গঙ্গার পলল ও সলল ধারার ধন্য ভূমি নবদ্বীপে। বিস্ময়কর মানব মুক্তির মহাপ্রাণ এই মানব নিমাই সন্ন্যাসী। সাধারণ মানব থেকে সাধন দীক্ষায় সন্ন্যাস ব্রত ধারণ করেন ১৫১০ খ্রিস্টাব্দে। ভক্তি, প্রেম আর ভালোবাসা দিয়ে তার অমোঘ উপাদানে বিদিক পথের মানুষকে সরল ও ভাবের পথে এনেছেন। মানুষ পথ পেতে যার রথে চেপেছেন। তিনি প্রেমের, মায়া আর স্বপ্ন পথের মহান দেবতা, প্রেমের দেবতা শ্রী নিমাই। আমাদের চৈতন্যের দেবতা চৈতন্য দেব। এই দেবতার অলৌকিক আশীর্বাদে ভগবান বিষ্ণুর আরাধ্য মানবকুল বৈষ্ণব নামে পরিচিত। বিষ্ণু হলেন সত্ব গুণময় ব্যাপক দেব। বিষ্ণু সৃষ্টির পালন কর্তা হিসেবে কথিত। তিনি পিতা মহর্ষি কাশ্যপের এবং মাতা আরতির গর্বে তার জন্ম। ইতি তপোবনে দেবগণের মধ্যে তিনিই শ্রেষ্ঠ। সর্ব লোকে হিতার্থে তিনি যুগে যুগে অবতীর্ণ হন। অনেকের মতে চৈত্যদেবের জন্মেরও আগে সদ্বীপে বৈষ্ণব পরিক্রমার আগমন ঘটেছিল। যতদূর জানা যায়, সে সময়ে কোন কোন সমাজপতি ব্রাহ্মণদের কারণে সমাজে বৈষ্ণব ধারার চর্চা করা সম্ভব হতো না। আর্থ-সামাজিক অবস্থায় শ্রী কৃষ্ণপ্রেম বা কৃষ্ণভক্তি সাধন ছিল অসম্ভব প্রায় অবস্থা। শ্রীবাস পণ্ডিতের ডেরায় এই ভাবধারার মানুষেরা জড়ো হতেন মনের আবেগ উগরে দিতে। এখানে আরো আসতেন শ্রীবাস অদ্বৈত আচার্যের মত কুলীন পণ্ডিতও।
বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে বহু আগ থেকেই বৈষ্ণবীয় চলন-বলন-আঁচরণ বাঙালিদের হৃদয়ে তরঙ্গিত হতো। যে ধারায় মানবীয় ধারার সহজ-সরল ও ভাব সাধনার লৌকিক আচার দিয়ে এখানে বৈষ্ণবীয় ধারা পরে রূপান্তরিত হয়ে আসে বাউল ধারা। এই ধারার সাক্ষ্য আসে
“ আমার মনের মানুষ যে রে,
আমি কোথায় পাবো তারে।” এমন সব বাউল গানে।
তবে বাউল ধারার আগে বাংলার অবলীলায় প্রবাহিত যে বৈষ্ণব ধারা তার প্রাণপুরুষ ছিলেন চৈতন্য মহাপ্রভু। ষোড়শ শতাব্দির কথা চৈতন্য মহাপ্রভু বাংলায় বৈষ্ণব ধর্মকে বিস্তর এলাকায় ছড়িয়ে দিলেন। এই ধর্মের মাধ্যমে প্রেম, ভাব ভালোবাসার মাহাত্ম্যকে পূজা পার্বণের আবরণে ভাসিয়ে তোলেন। তিনি আধুনিক বৈষ্ণব চিন্তার প্রাণ পুরষ। তিনি শ্রীকৃষ্ণের অবতার। ১৪৮৫ খ্রিস্টাব্দে বাংলার শেষ রাজধানী নবদ্বীপে তিনি জন্ম নেন। তার পিতা জগন্নাথ মিশ্র মৃতবৎস জননীর পুত্র ছিলেন নিমাই। তার শরীর উজ্জ্বল গৌর বর্ণময় বলে তিনি গৌরাঙ্গ। উত্তরকালে সন্ন্যাস গ্রহণের জন্য তিনি চৈতন্য দেব। নিমাই খুব অল্প বয়সে সাহিত্য, সংস্কৃতি, ব্যাকরণ, অলঙ্কারপুরাণ, স্মৃতি, ন্যায়শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি প্রগাঢ় বুৎপত্তি লাভ করেন। তিনি চতুষ্পাঠী ত্যাগ করে সতত অধ্যয়নে রত থাকতেন। তার সময়ে প্রিয় ও আপন অনেকে বৈষ্ণব ধর্মের আচার সন্ন্যাসী হয়ে গৃহ ত্যাগী হলে মহা প্রভু হতাশ ও মনে প্রচণ্ড ব্যথা পান। তিনি মায়ের চেষ্টায় তার ইচ্ছেয় বল্লভ ভট্টাচার্যের মেয়ে লক্ষ্মীকে বিয়ে করেন। অল্পদিনে লক্ষ্মীর মৃত্যু হলে তিনি বিষ্ণুপ্রিয়াকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। তার বয়স কুড়ি উড়িয়ে গেলে নিমাই চৈতন্য চতুষ্পাাঠী স্থাপন করে অধ্যাপনা শুরু করেন। অতি অল্প দিনে তার প্রগাঢ় বুদ্ধি, মেধা খ্যাতি, পাণ্ডিত্য চারদিকে ছড়িয়ে যায়। এই মহামানব চৈতন্যশ্বর একদিন রজতশুভ্র চন্দ্রিকাময়ী রজনীতে পুণ্যতোয়া ভাগিরথি নদীর পাড়ে তার শিষ্যদেরকে নিয়ে শাস্ত্রালাপ করছিলেন। এমন সময়ে এক দ্বিগবিজয়ী পণ্ডিত হাজির হয়ে বললেন, নিমাই তুমি নাকি বড় পণ্ডিত? উত্তরে প্রভু নিমাই পণ্ডিতজীকে বললেন,“আমি কিজানি আপনি তো বিখ্যাত পণ্ডিত ও কবি, আপনি দয়া করে গঙ্গার মাহাত্ম্য বর্ণনা করুন আমরা শুনিয়া সুখী হই।” আগুন্তক পণ্ডিত তৎক্ষণাৎ কয়েকটি শ্লোক রচনা করে আবৃত্তি করলেন। প্রভু নিমাই তখন শ্লোকগুলোর দোষাদোষ বর্ণনার পর তার অর্থ ও অলঙ্কারের দোষ দেখিয়ে দিলেন এবং তা তিনি আবৃত্তি করলেন তখন এই আত্মাভিমানি পণ্ডিত অতিশয় অপ্রতিভ হয়ে প্রভু নিমাইকে সরস্বতীর বরপুত্র বলে বিদায় নিলেন।
১৬০০-১৭০০ খ্রিস্টাব্দকালে পদাবলির ধারা বিভিন্ন ভাবে প্রসারিত হতে থাকে। এই সময়ে অনেক কবি ও মহাজন পদাবলির রূপ ও রসকে মাথিত করে প্রকারান্তে বৈষ্ণব মতকে অলংকৃত করেছিলেন। পদাবলির এমন সৃজনশীল কাজ দেখলে বোঝা যায় প্রতিজন সৃষ্টিবান মানুষ কত রকমের বুদ্ধি ও মেধা খাটিয়ে পদাবলির কাঠামোকে পল্লবিত করে গেছেন। যে কারণে মহাপ্রভু শ্রীচৈতন্য তার ব্যাকুল হৃদয়ে আনন্দ ও প্রেমমার্গের রসের যোগান পেতে সক্ষম হয়েছেন এখান থেকে। পদাবলিতে সে সময়ের সমাজ-সাহিত্য সম্পর্কে ছায়া উঠে এসেছে। পদাবলির আদি রস হলো গীতি কবিতা অথবা পদ। এই গীতিকবিতা আসর করে তা কীর্তন বাসরে পরিবেশিত হতো। সময়ের তাগিদে মনের কথা এং ব্যথাতে তুলে ধরা হতো। জীবন-জন্ম এবং জন্মান্তরের প্রকাশ রূপকে আক্ষরিক অর্থে ফুটিয়ে তোলা হতো। যে জন্য মহাপ্রভু কিংবা তার ভাব শিষ্যরা তাদের আবেগ, ভাব দর্শনের ব্যবহার করতে শক্তি খুঁজে পেতেন। গেল সপ্তদশ শতকেও আমাদের বাংলাদেশে বৈষ্ণব ও পদাবলি এবং চৈতন্য দেবের পুণ্যায়ন আবেগ গতি স্রোতে প্রবাহিত হয়েছে। এ কারণে সমাজ ছিল নীতি নৈতিকতায় এক সাবলীল মানবিক সমৃদ্ধ ধারায়। সংস্কৃতি এবং সাহিত্য পল্লব ছিল উজ্জীবিত। কাব্য.সাহিত্য, পুঁথি বিদ্যার প্রভাব আঁকড়ে ছিল মানুষের মনকে। এমনও সংকটকালীন সময়ে সমাজ পদাবলি, বৈষ্ণবীয় ধারা এবং কৃষ্ণ ও চৈতন্য ভাবকে বিশ্লেষিত করে মনে ধারণ করলে মানুষ সংকটময় সময় উতড়াতে পারবেন। আজ মানুষের মন অহঙ্কারবদ্ধ।
কোথাও প্রেম কিংবা ভালোবাসার লেশমাত্র উপস্থিতি নেই। ভক্তি ভাব হারিয়ে গেছে। ভোগ ও বিলাস মানুষকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। কেউ প্রভু বা তার লক্ষ্যকে ধরতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। আমরা যদি এই সময়ে হরিনামের উচ্চারণে নিজেকে কৃষ্ণপ্রেমে সংকীর্তন করে আত্মনিয়োগ করতে পারি তবে সমাজ, মানর জীবন পরিশুদ্ধ হবে। প্রকৃতি আপনার হবে জীবের জন্য।
শেষ কথা ঃ
“কীর্তন ছাড়িব. প্রতিষ্ঠা মাখিব,”
কি কাজ ঢুড়িয়া (খুঁজিয়া) তাদৃশ (এই রকম) গৌরব।
মাধবেন্দ্র পুরী, ভাব ঘরে-চুরি (অনুকরণ),
না করিলে কভু সদাই জানিব \
তাৎপর্য- মহাত্মা পুরুষ মাধবেন্দ্র পুরী নির্জন ভজন সাধন করতেন। তিনি কারো অনুকরণ করতেন না। তিনি দিন রাত নাম জপ করতেন, তিনি শ্রী কৃষ্ণের নামে নিমগ্ন থাকতেন। তিনি ভক্তবাসে ভজনা করতেন। শ্রী চৈতন্যামৃত গ্রন্থে পাওয়া যায় বাহ্যিক আড়ম্বর করে ভগবানের শুদ্ধ প্রেম লাভ করা অসম্ভব। আমাদের অন্তরে যে কলুষতা আচ্ছন্ন করে রেখেছে তা পরিমার্জন করা গেলে ভগবৎ প্রেম জাগরিত হবে। সেটা সম্ভব কীর্তন করে। আমার আত্মা পরম প্রাপ্তি ঘটাতে হলে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক করতে হবে শ্রীকৃষ্ণের সাথে। পদাবলি এই যথার্থ উপলদ্ধির সম্পর্ক সেতু মাত্র। চারদিকে এখন উচ্চারিত হোক-“ হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে ।
হরে রাম হরে রাম রাম রাম হরে হরে \”
( সূত্র- জয় পতাকা স্বামী মহারাজ সম্পাদিত “বৈষ্ণব কে?” শ্লোক-৭)।
গৌতম কুমার রায় : গবেষক, উদ্ভাবক ও পরিবেশবিজ্ঞানী, কুষ্টিয়া




