রানাকুমার সিংহ
পুরোনো ঘড়ি
দেয়ালের ওপর একটা পুরোনো ঘড়ি ঝুলে আছে বহুকাল,
ঘড়িটার কাটাগুলো ঘোরে না, কেবল ছায়াগুলো হাঁটে।
বাবা বাজার থেকে ফেরার সময় হাতে করে নিয়ে এলেন
কিছুটা ভাঙা দুপুর আর একমুঠো বিষণ্ণ নোনাজল।
সন্ধ্যায় জানালার ছিটকিনি খুলে দেখি—
রাস্তার ল্যাম্পপোস্টটা একটা হলুদ আলোর চাদর মুড়ি দিয়ে
আমার শৈশবের দিকে হেঁটে যাচ্ছে!
চায়ের কাপে তখন ভেসে উঠছে চেনা কোনো ট্রামের ঘন্টি,
অথচ এই শহরে কোনোদিন ট্রাম ছিল না।
টেবিলের ওপর রাখা খবরের কাগজটি হঠাৎ কাশে,
গতকাল যে নামটি ছাপা হয়েছিল মৃতদের তালিকায়,
সে এসে বসেছে পাশের চেয়ারে, চশমাটা মুছে বলছে—
চা-এ চিনি একটু কম হয়ে গেল না?
অনুপস্থিতির জ্যামিতি
বৃত্তটা নিজেকে ভাঙতে চেয়েছিল,
কিন্তু কোণগুলো এসে তাকে আটকে দিল তিনকোণা এক কামড়ায়।
আমি আর তুমি যেখানে বসে আছি,
সেখানে টেবিল আছে, দুটো চেয়ার আছে,
কেবল আমরা দুজন নেই।
আমাদের কথাগুলো শূন্যে জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে,
যা কুড়িয়ে নিয়ে বাইরের ছেলেরা মার্বেল খেলছে রাস্তায়।
দেয়ালের ঘড়িটা হঠাৎ উল্টোদিকে ঘুরতে ঘুরতে
আমাদের নিয়ে গেল সেই শনিবারে—
যেদিন তোমার সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হওয়ার কথা ছিল,
অথচ আমরা কেউ কারো দিকে হেঁটে যাইনি।
দরজায় কড়া নাড়ছে এক অদ্ভুত নীরবতা,
খুলব কি খুলব না ভাবতেই দেখি—
হাতলটা আমার নিজেরই আঙুল চেপে ধরেছে।
একজন অচেনা আমি
যে মানচিত্রটা দেয়ালের ওপর টাঙানো আছে,
তার নদীনালাগুলো রাতে নেমে আসে মেঝের কার্পেটে।
আমি হাঁটতে গিয়ে দেখি আমার একজোড়া অতিরিক্ত পা গজাচ্ছে,
যেগুলো আমাকে নিয়ে যাচ্ছে এমন এক অলিগলিতে
যেখানে বাড়ির নম্বরগুলো প্রতিদিন বিকেলে বদলে যায়।
পোস্টম্যান এসে চিঠি দিয়ে গেল আমারই নামে,
কিন্তু ভেতরের হরফগুলো আমার জন্য নয়।
চিঠিতে লেখা—তুমি যে ট্রেনটা ছেড়ে দিয়েছিলে গতবছর,
সেটা এখনো প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে,
কেবল লোকোমাস্টারের সিটে তুমি বসে আছ।
আমি আয়নার সামনে দাঁড়ালে আয়নাটা একটু হাসে,
তারপর ভেতরে চলে যায়, আমাকে একা বাইরে ফেলে রেখে।
অবচেতনের রেস্তোরাঁ
একটা নিয়ন আলোর নিচে বসে আমরা অর্ডার দিলাম
দুটো নিখোঁজ হয়ে যাওয়া বিকেলের রোদ্দুর।
ওয়েটার এসে প্লেটে ঢেলে দিয়ে গেল কিছুটা পুরনো স্মৃতি,
যার ওপর সামান্য ধুলো আর গোলমরিচের গুঁড়ো ছেটানো।
পাশের টেবিলে বসা লোকটি নিজের মাথাটা খুলে
স্যুটের পকেটে রেখে শান্তভাবে কফি খাচ্ছে।
কেউ তাতে অবাক হচ্ছে না, কারণ এ শহরে সবাই জানে—
মাথা সঙ্গে নিয়ে ঘুরলে আজকাল বড্ড ক্লান্তি আসে।
বিল দেওয়ার সময় ক্যাশিয়ার চাইল আমার ডাকনাম,
নিজের ছায়াটাকে টিপস হিসেবে রেখে— বকেয়া চুকিয়ে
বেরিয়ে এলাম।
প্রতিসংবাদ
টেলিভিশনের পর্দায় আজ কোনো খবর নেই,
এক টানা বৃষ্টি হচ্ছে ক্যাবলের ভেতর।
সংবাদপাঠক বলে উঠলেন— আজ আর নতুন কোনো ঘটনা ঘটেনি,
গতকাল যা ঘটেছিল, মানুষ সেগুলোকে আবার
উল্টো দিক থেকে দেখে নিচ্ছে।
মা রান্নাঘরে শিমের বিচির তরকারি চড়াচ্ছেন,
যার গন্ধে আমার মনে পড়ে যাচ্ছে এমন এক মায়ের কথা
যাকে আমি কোনোদিন দেখিনি।
মোবাইলের স্ক্রিনে একটা নোটিফিকেশন এল—
আপনার অতীত সফলভাবে আপডেট হয়েছে,
অনুগ্রহ করে নিজের বর্তমান যাচাই করুন।
আমি বারান্দায় এসে দেখি— বৃষ্টি পড়ছে নিচ থেকে ওপরের দিকে,
আকাশ ভিজে যাচ্ছে আমার শুকনো ছাতার স্পর্শে।




