আজাদ বুলবুল
লকডাউন ঘোষণার পর সামনের দিনকাল কীভাবে কাটবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় মাথা খারাপ হবার অবস্থা পুনংচানের। যেখান থেকে বা যাদেরকে ভুলিয়ে ভালিয়ে তার ভাষার কায়দা করে জোগাড় যন্তর হতো টাকাকড়ি, সেখানে এখন চৈতমাসের খরাকাল। ক্লাবঘরে আড্ডাবাজি যদি না থাকে, তাসখেলা যদি না চলে, মদ্যপান যদি বন্ধ থাকে তাহলে ধান্ধার ভবিষ্যৎ অন্ধকার। লক্ষ্মী পয়মন্ত এই ক্লাবটির কারণেই তার ফুটানি, বাবুগিরি নির্বিবাদে চলছিলো। এখন শোনা যাচ্ছে করোনার কারণে বন্ধ থাকবে ক্লাবঘর। ঘটনা সত্যি হলে চলবে কী করে সে? আয় রোজগার হবে কোত্থ্যেকে? কোনো এক অচেনা ভাইরাস তার বাড়াভাতে ছাই ফেলবে এটা কী মেনে নেয়া যায়?
পুনংচানের দাদু নিলকচান ছিলেন খাগড়াপুরের বিখ্যাত গুণীন। কালাজ্বর, ভেদবমি, রাঙাপীড়ার মতো অসুখ দেখা দিলে গ্রামবাসী ধর্ণা দিতো নিলকচানের দুয়ারে। নানা পূজা, অর্চনা ও মন্ত্রপাঠ করে রোগমুক্তির ব্যবস্থা করতেন তিনি। এতে সমাধান না হলে নানা আচার পালন করে স্বপ্নদর্শনের মাধ্যমে প্রাপ্ত ওষুধ দিয়ে মানুষজনকে রক্ষা করতেন। দাদুর কালে মহামারি হলে পাড়া বন্ধ হতো। গ্রামে কেউ ঢুকতে বা বেরুতে পারতো না। পাড়ার লোকেরা একে অপরকে বাঁচিয়ে রাখতো সেবা যত্ন করে। চাল সিদোল দিয়ে সাহায্য করতো অকৃপণভাবে। এ যুগে কি উদারতা মানবতা আছে? দয়া-দাক্ষিণ্য আছে? সবাইতো নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। লকডাউন হলে কে কাকে দেখবে?
পুনংচানের দৃশ্যমান কোনো রোজগারপাতি নেই। চাকরি, ব্যবসা, চাষাবাদ কোনোটার হাতেখড়ি হয়নি তার। সরকারি চাকুরে বড়ভাই, গাছ ব্যবসায়ী ধনাঢ্য বোনজামাই, বাগানচাষি শ্বশুর- কারও হাত গলে তার জন্য একটু সাহায্য সহায়তা বেরোয় না। মহাজন পাড়ার সদরক ক্লাব তার টুপাইস কামানোর জায়গা। এই ক্লাব যদি বন্ধ থাকে তবে পুনংচানের চোখে শর্ষে ফুল দুলবেই দুলবে।
অথচ অফিস আদালত, দোকানপাট, হাটবাজার, ইসকুল কলেজ বন্ধ হয়ে গেছে। লোকচলাচল আগের তুলনায় দশভাগও নেই। যাত্রীশূন্য টমটমগুলো চেঙ্গি ব্রিজ থেকে জেলা গেট, কলেজ স্কোয়ার, মহাজন পাড়া হয়ে নারকেল বাগান ছুঁয়ে অলস ভঙ্গীতে শাপলা চত্বর পৌঁছে। ভাড়ায় খাটা হোন্ডাচালকদের অস্থির চোখ প্যাসেঞ্জার খোঁজার আকুতি নিয়ে লারমা মূর্তির বটতলায় পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকে। অপ্রাপ্তির বিষণ্নতা লেপ্টে থাকে আলুটিলার আঁধারের মতো। মানুষের রোজগারশুণ্যতার বিবর্ণ দৃশ্য পুনংচানের বুকে হাহাকার তৈরি করে। মানুষ টাকা রোজগার করতে না পারলে ক্লাবের তাসের টেবিল, মদের আড্ডা, খাজির বাটি সবইতো খালি রয়ে যাবে।
মোবাইল ফোনের ফেইসবুক এখন বিরাট ডাক্তার! বাঘা কনসালটেন্ট! এটা কেবল তার ধারণা নয়, সদরক ক্লাবের এক নিয়মিত সদস্যেরও বিশ্বাস। করোনা নিয়ে ফেইসবুক বিনে পয়সায় পরামর্শ বিলাচ্ছে অহোরাত্র। সাবান দিয়ে হাত ধুতে বলছে। সেনিটাইজার মেখে হাত জীবাণুমুক্ত করতে বলছে। ইতোমধ্যে সেনিটাইজার হাওয়া হয়ে গেছে ওষুধের দোকান থেকে। তাতে অসুবিধা নেই। ক্লাবের মদপিয়াসী দাদারাই নিদান দিয়েছে। দেশি মদের অ্যালকোহলই এখন সেরা সেনিটাইজার। যতো খুশি হাতে মাখো। গলায় ঢালতে পরিমাণে বেশি লাগে। হাতে মাখতে অল্প ক’ফোঁটাই যথেষ্ট।
পুনংচান জুয়া খেলে টাকা কামায় না। সেরকম টাকাকড়িই বা কোথায়! তবে শূন্যস্থান পূরণের জন্য বা হেরে যাওয়া হাতকে রিলিফ দেয়ার জন্য কখনো সখনো বসতে হয়। এতে লাভের হিস্যা পকেটে ঢোকে। নিজের টাকায় মদও কিনে না । বাগিয়ে নেয়। বাগানোর এই শিল্পময় অথচ কিঞ্চিত নিন্দিত আচরণটি খুব সাবধানে সম্পন্ন হয় যা অন্য কারো চোখে বিরক্তি নয়, আমোদই তৈরি করে। ফলে প্রতি রাতে এ পকেট ও পকেট মিলিয়ে দু’চারশ টাকা, পেটভরতি দোচোয়ানি, দুবড়ানো প্যাকেটে কয়েকশলা সিগারেট, হাফবোতল দেশী মদ নিয়ে ঘরে ফেরা তার বাহাতের কারবার হয়ে দাঁড়ায়।
কিন্তু সেদিন হয়েছে বাসি। নগরে নেমেছে কাশি। কারবারে পড়েছে ভাটা। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে ভগবান। জমজমাট সদরক ক্লাব এখন জনশূন্য, নীরব। নেই তাসের টেবিলে হাসির গররা। বাজে না মদের গ্লাসের টুংটাং ফূর্তি। দিলখোলা হুল্লোড়ের প্রাণময় হর্ষ যেন দূরাগত স্মৃতি। করোনার ভয়ে গৃহবন্দি সদস্যকুল। সরকারি নির্দেশ মান্য করার এমন প্রবণতা জীবৎকালে কখনো দেখেনি পুনংচান।
সদরক ক্লাব বন্ধ হবে এমন আশংকা কখনো মনে হয় নি তার। অফিসের বাবু, পেনশানভোগী বুড়ো, তরুণ ঠিকাদার, সরকারি দলের যুবনেতারা উচ্চকণ্ঠে বলেছিলো, কে বন্ধ করতে আসবে? আসুক না একবার! কার এমন বুকের পাটা! ডিসি, এসপি; আর্মি-পুলিশ! পা ভেঙে ঠিক ঠিক হাতে ধরিয়ে দেবো। চেনে না আমাদের, ফুঃ!আস্ফালন কিন্তু ওই পর্যন্তই। সাহসী শার্দুলরা এখন এঁদো বিলের কুচ্চি মাছের মতো মুখ লুকাচ্ছে বউয়ের থামির নীচে। করোনার ভয়ে কম্পমান সবাই। স্বেচ্ছাগৃহবন্দি হয়ে জান বাঁচানোর ইঁদুর দৌড় দৌড়ুচ্ছে। মাঝখানে কপাল পুড়েছে পুনংচানের।
মুদিমালের দাম বাড়ছে হু-হু করে। চাল, ডাল, পেঁয়াজ, শুটকি, নাপ্পি সবকিছুরই উচ্চ মূল্য। ট্যাকের জোর যাদের ছিলো তারা আগেভাগেই মালামাল কিনে ঘর ভরেছে। হেঁসেল খালি কেবল তার মতো অভাবী মানুষের।
সন্ধ্যার পর দু’পাত্তর টানা পুনংচানের বহুকালের অভ্যেস। এখন ক্লাব বন্ধ। মাগনা মদ জোগাড়ের সুযোগও বন্ধ। তাই বলে এতোকালের নেশা কী বন্ধ করা যায়! যায় না। অগত্যা একাকি মদ্যপানের নিদারুণ অসুখ সইতে হয় তাকে।
সে জানে করোনার থাবায় পর্যুদস্ত পানছড়ি, দিঘিনালা, মাটিরাঙার লোক লোকালয়। ভীত সন্ত্রস্ত ফেনী, চেঙ্গী, মাইনি উপত্যকার পাহাড়ি বাঙালি। আদিবাসী আর স্যাটেলারের বিরোধ এখন করোনার থাবার নীচে কাঁপছে থর থর করে। ওষুধ নাই পত্তর নেই, টীকা নাই, জোলাপ নাই, তাবিজ-কবজ কোনোটাই নাই। তাহলে নিদান কী? সমাধান কী। আরেক চুমুক দোচোয়ানী গলায় ঢেলে ভাবনার অতলে ডুবে যায় সে।
সমতলের বাঙালিরা স্বপ্নে ওষুধ পেয়ে গেছে ইতোমধ্যে। খালি পেটে সূর্যোদয়ের আগে তিনটা থানকুনি পাতা চিবিয়ে খেলে করোনা ভালো হয়ে যায়, স্বপ্নে পাওয়া এই ঔষধের খবর পুনংচান জানে। নোয়াখালীর এক সদ্যজাত শিশুর বরাত দিয়ে আরেকটা স্বপ্নেপ্রাপ্ত মহৌষধ দেশজুড়ে লোকপ্রিয়তা পেয়েছে। আদাকুচি দিয়ে চিনিছাড়া রং চা খেলে করোনাভাইরাস কাছে ঘেষতে পারে না। কিন্তু খাগড়াছড়ির চাকমারা এসব ওষুধকে পাত্তা দিয়েছে কী? স্বপ্নে পাওয়া ওষুধের বিষয়ে পুনংচানের চাইতে বেশি আর জানবে কে? তার দাদু নিলকচান ছিলেন এই শহরে স্বপ্নে পাওয়া ওষুধের নির্ভরযোগ্য গন্তব্য। প্রতি হপ্তায় বারকয়েক স্বপ্ন দেখে তিনি লোকজনের রোগভোগের সমাধান করতেন। তাহলে পুনংচানও পারবে। স্বপ্নে পাওয়া ওষুধ দিয়ে করোনার বংশ ধ্বংস করতে পারবেই।
খাগড়াপুরের মহাগুণীন নিলকচান বৈদ্যের নাতি পুনংচান হাতে ধরা বোতলের শেষ পানীয়টুকু এক লহমায় গলায় সেঁদিয়ে দেয়। নাপ্পিমাখা মরিচ গুদিয়ের সাথে সেদ্ধ বাঁধাকপির বড়ো এক টুকরা মুখে পুরে চিবুতে থাকে। ঝাল মরিচ আর রসালো সব্জির মিলিত ফোয়াদ টাকরায় তৃপ্তির নিনাদ তুললে মগজের দুয়ার খুলে যায় তার। পুনং ভাবে, সে যদি কাল সকালে মহাজন পাড়া লারমা স্কোয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে, “মুই স্ববনে করোনা পীরার দারু পেইয়ুং”(আমি স্বপ্নে করোনার ওষুধ পেয়েছি) তাহলে চাকমারা কী তা অবিশ্বাস করবে? স্বপ্নদ্রষ্টা নিলকচানের নাতি পুনংচানের এই স্বপ্ন দেখবার অধিকার নিশ্চয়ই আছে। সমতলের উন্নত শিক্ষিত বাঙালিরা যদি স্বপ্নে পাওয়া ঔষদ বিশ্বাস করতে পারে তাহলে পশ্চাৎপদ স্বল্পশিক্ষিত চাকমারা অবিশ্বাস করবে কোন যুক্তিতে!
পুনংচানের কপাল থেকে মিলিয়ে যায় দুশ্চিন্তার ভাঁজ। সামনের দিনগুলোর সুখভাবনায় মুখজুড়ে নামে প্রশান্তির ভাব। মহাজন পাড়ার সাঁঝবেলার মলিন আঁধার এখন পুনংচানের চোখে শস্যপূর্ণ জুমক্ষেতের মতো ফকফকা আলোয় হাস্যোজ্জ্বল।
আজাদ বুলবুল, গবেষক ও কথাসাহিত্যিক, চট্টগ্রাম




