বাঙলায়ন : সালিম সাবরিন
[ কবি পরিচিতি: ফের্নান্দো পেসোয়া (১৮৮৮-১৯৩৫) ব্রাজিলিয়ান সাহিত্যের একজন তারকা লেখক। তিনি শুধু পর্তুগিজ ভাষাতেই নয়,একই সঙ্গে ইংরেজি ভাষায় কাব্যচর্চার মাধ্যমে সমগ্র ইঙ্গ-মার্কিন আধুনিক সাহিত্যের শীর্ষসারির কবিও। তিনি জন্মগ্রহণ করেন লিসবন সিটিতে। বেড়ে ওঠেন ব্রাজিলে এবং জীবনে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। রহস্যময় এই মানুষটি কেবল কবিই নন,তিনি ছিলেন বহুমাত্রিক সত্তার সংমিশ্রণ। সাহিত্যিক জীবনে কখনো আলবার্তো কেইরো,কখনো রিকার্দো রেয়েস কিংবা আনভারো ডি কাম্পোস- এইসব ছদ্মনাম শুধু ধারণ করেননি,প্রতিটি নামের কবিত্বের স্বাতন্ত্র্য পরিচিতি গড়ে তুলেছিলেন। প্রতিটি নামেই তাঁর কাব্যশৈলি, জীবন দর্শনের ভিন্নরীতি স্বতন্ত্রভাবে মূর্ত করেন। তবে একথা অনস্বীকার্য যে,ফের্নান্দো পেসোয়ার জীবনের মূলে ছিল এক ধরনের একাকীত্ব ও আত্ম-জিজ্ঞাসা। এই চিন্তা ও জিজ্ঞাসার পথে তাঁর কবিতাকে চেনা পৃথিবীর বাইরে এক অতীন্দ্রিয় জগতের যাত্রী করে নিয়েছিলেন।
ফের্নান্দো পেসোয়ার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে – তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত ইংরেজি কাব্যসমূহ-
Anrinous (1918),35 Sonnets(1918),English Poems (1921) ,পর্তুগিজ ভাষায় – Mensagem (1934)। এছাড়াও তাঁর ছদ্মনাম- আলবার্তো কাইরো নামে – Guardaor de Rebanhos (ভেড়ার রাখাল), Opastor Amoros,Poems Injcntos ইত্যাদি।
আলবার্তো ডি কাম্পোস নামে – Aivaro de Compos,Ode Mantina (সামুদ্রিক ওড) Tabacaria (তামাক দোকান) ইত্যাদি।
রিকার্দো রেয়েস নামে তাঁর Odes (ওডসমূহ) পাওয়া যায়। এছাড়াও ফের্নান্দো পেসোয়ার বিখ্যাত প্রবন্ধগ্রন্থ The Book Of Disqviet সমগ্র বিশ্বসাহিত্যে সমাদৃত। বলাই বাহুল্য, ফের্নান্দো পেসোয়ার এই বিশাল কাব্যভুবনকে সমকালীন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেয়ার পেছনে যে মানুষটির অবদান অনস্বীকার্য, তিনি হলেন— ব্রাজিলের সাল পাওলো ইউনিভার্সিটির ল্যাটিন লেটার্স প্রফেসর ক্লিওনিস বেরার
ক্লিওনিস সেরোয়া দা মোত্তা বেরারদিনেল (১৯১৬-২০২৩) সাও পাওলো ইউনিভার্সিটির প্রফেসর এবং পর্তুগিজ সাহিত্য বিশেষজ্ঞ। তিনিই প্রথম ফের্নান্দো পেসোয়ার ইংরেজি ও পর্তুগিজ ভাষায় রচিত কাব্যসমূহ সংগ্রহ, সম্পাদনা ও সংকলন করেন।ক্লিওনিস ব্রাজিল ইউনিভার্সিটি থেকে ফের্নান্দো পেসোয়ার জীবনী কবিতা ও কাব্যতত্ত্ব নিয়ে দীর্ঘ সময় অণুবীক্ষণিক গবেষণার মাধ্যমে পিএইচডি ডিগ্রি নেন। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালে এই অনুবাদক ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে ভ্রমণের সময় কাকতালীয় ভাবে পরিচিত হন ক্লিওনিসের সহকর্মী এবং ব্রাজিল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও কবি রোসারিয়া মোত্তার সঙ্গে। রোসারিয়া মোত্তার সঙ্গে আলাপ প্রসঙ্গে অনুবাদক প্রথম জানতে পারেন ফের্নান্দো পেসোয়ার কবিতা সম্পর্কে। রোসারিয়া মোত্তা নিজেও ফের্নান্দো পেসোয়ার ইংরেজি কবিতা অনুবাদ ও সংকলন করেন- Selected Poems Of Fernando Pessoa । ]
পরামর্শ (CONELHO)
তোমার স্বপ্নগুলো রাখো বৃহৎ প্রাচীরের কাছাকাছি,
তারপর, সেখান থেকে যে বাগান দেখা যায়,
বড় গ্রিলের দরজা খুলে দাও,
ওখানে সাজাও সবচেয়ে প্রফুল্ল ফুলগুলো –
যা দেখে সবাই চিনবে তোমাকে।
বানাও ফুলের সাজি অন্য সবার মতো,
যেখানে সকল চোখ উঁকি দিতে পারে-
ঠিক যেমন দেখাতে চাও তোমার বাগান।
কিন্তু যেখানে শুধু তুমিই তোমার নিজের –
যা আর কেউ ওখানে দেখে না-
ওখানে ছেড়ে দাও মাটি থেকে জন্ম নেয়া ফুলগুলো,
আর বাড়তে দাও বুনোঘাস গুলো নিজের খেয়ালে….।
তারিখ : ৩ নভেম্বর, ১৯২৬।
কুয়াশা (NEVOEIRO)
না রাজা না আইন, না যুদ্ধ না শান্তি,
পৃথিবীর এই ম্লান দীপ্তিকে
সংজ্ঞায়িত করে সত্তার রূপরেখা –
যা পর্তুগালকে বিষণ্ন করে তোলে–
আলোহীন এবং প্রজ্জলনহীন উজ্জ্বলতা
যেমনটি আটকে থাকে নকল আগুনে।
কেউ জানে না সে কী চায়।
না যা মন্দ, না যা ভালো –
কেউ জানে না তার কী আত্মা আছে।
কোন দূরবর্তী আকুলতায় সে কাঁদে?
সবই তো অনিশ্চিত ও অন্তিম।
কিছুই পূর্ণাঙ্গ নয়,সব কিছু বিচ্ছিন্ন।
ও পর্তুগাল তুমি আজ কেবলই কুয়াশা…।




