এখন সময়:রাত ১২:২৯- আজ: শুক্রবার-৩রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৯শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ১২:২৯- আজ: শুক্রবার
৩রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৯শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

মনি হায়দারের কিংবদন্তির ভাগীরথী: বিপন্ন মানুষের অজেয় সাহসের উপাখ্যান

আনোয়ার মল্লিক

প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থের বিবেচনায় মনি হায়দারের লেখালেখির বয়স তিরিশ বছর। আর যদি ছাপার অক্ষরে প্রথম লেখা প্রকাশের হিসাব ধরি, তাহলে এই বয়স হয় চল্লিশ বছর। ১৯৬৮ সালে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলায় তার জন্ম। গ্রামের নাম বোথলা। ১৯৮২ সালে লেখক হওয়ার অদম্য বাসনা নিয়ে তিনি ঢাকা আসেন। ১৯৮৬ সালে অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক বাংলার বাণী’র শাপলা কুড়ি পাতায় তার প্রথম লেখা ছাপা হয়। তার প্রথম বই ‘দীর্ঘ দীর্ঘশ্বাস’প্রকাশিত হয় রামন পাবলিশার্স থেকে, ১৯৯৬ সালে। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যা ষোলটি। তিনি অজস্র ছোটগল্প লিখেছেন। তার প্রকাশিত ছোট গল্পের বই বত্রিশটি। এছাড়া  শিশুতোষ গল্প-কাহিনি সংক্রান্ত বেশকিছু বই আছে তার। সব মিলিয়ে তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ষাটের অধিক। বলা যায়, তিনি একজন বহুপ্রজ লেখক, লিখতে ভালোবাসেন। এখনও অবিরাম লিখে চলেছেন।

বর্তমান নিবন্ধে মনি হায়দারের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘’কিংবদন্তির ভাগীরথী’’নিয়ে আমরা আলোচনা করবো।

অনেকের অভিযোগ, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যে মহাকাব্যিক প্রেক্ষাপট এবং মুক্তির জন্য একটা জনগোষ্ঠীর যে অসীম ত্যাগ এবং সংগ্রাম, তার যথাযথ রূপায়ণ সাহিত্যে ঘটেনি। একথা আংশিক স্বীকার করে নিয়েও বলা যায়, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলা ভাষায় বেশ কিছু কালোত্তীর্ণ সাহিত্য রচিত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধান লেখকদের প্রায় সকলেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গল্প এবং উপন্যাস লিখেছেন।

শহীদ বুদ্ধিজীবী আনোয়ার পাশা দখলদার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চের বর্বর গণহত্যা এবং তার বিরুদ্ধে বাঙালির রুখে দাঁড়ানোর বীরোচিত ঘটনা নিয়ে লেখেন ‘রাইফেল রোটি আওড়াত’ নামের একটি কালজয়ী উপন্যাস।

মাহমুদুল হকের ‘জীবন আমার বোন’মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত আরেকটি উল্লেখযোগ্য উপন্যাস।

কথাসাহিত্যিক শওকত ওসমান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কয়েকটি সফল উপন্যাস লিখেছেন যেমন, নেকড়ে অরণ্য, জাহান্নাম হইতে বিদায় ও জলাংগী। মুক্তিযুদ্ধের প্রথমদিকের ঘটনা প্রবাহ নিয়ে শওকত আলী লিখেছেন ‘যাত্রা’নামে একটি উপন্যাস। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কয়েকটি স্মরণীয় উপন্যাসের স্রষ্টা। যেমন ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’’,’ নীল দংশন’ ও ’নিষিদ্ধ লোবান’’।  এছাড়া হুমায়ূন আহমেদের ‘জোছনা ও জননীর গল্প,’ ‘আগুনের পরশমনি’’, শ্যামল ছায়া,’ ১৯৭১’, সেলিনা হোসেনের ‘হাওর নদী গ্রেনেড’ আহমদ ছফার ‘ওঙ্কার’’ শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ উপন্যাসে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের অনুষঙ্গ তীব্রভাবে উঠে এসেছে। আরও কিছু উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের বিভীষিকা, বাঙালির বীরত্ব, ত্যাগ এবং সংগ্রামের মর্মস্পর্শী চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। উপন্যাসগুলো সময়ের মাপকাটিতে উত্তীর্ণ হয়ে ব্যাপক পাঠক প্রিয়তাও লাভ করেছে। যেমন রাবেয়া খাতুনের ‘ফেরারী সূর্য’’, রিজিয়া রহমানের ‘রক্তের অক্ষরে’’, মইনুল আহসান সাবেরের ‘কবেজ লেঠেল’ রশীদ হায়দারের ‘খাঁচায়’’, ইমদাদুল হক মিলনের ‘সাড়ে তিন হাত ভূমি, আনিসুল হকের ‘মা’ তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

 

মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট নিয়ে রচিত মনি হায়দারের “কিংবদন্তির ভাগীরথী” মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাসের ধারায় আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। ভাগীরথী নামের অতি সাধারণ এক নারীর ওপর দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর পাশবিক অত্যাচারের মর্মস্পর্শী চিত্র ফুটে উঠেছে এই উপন্যাসে। ভাগীরথী একাত্তরে বাংলাদেশের অগণিত নির্যাতিতা নারীর এক প্রতিনিধি। পাক নরপশুদের অত্যাচার এবং পাশবিকতাকে পেছনে ফেলে সে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে স্বদেশের মুক্তির সংগ্রামে। তৎকালীন পিরোজপুর মহকুমা শহর এবং তৎসংলগ্ন অঞ্চল বাংলাদেশের কোনো বিচ্ছিন্ন এলাকা ছিলো না। একাত্তরে ওই অঞ্চলে যে সব ঘটনা প্রবাহ সংঘটিত হয়, তা ছিলো  সমগ্র বাংলাদেশেরই এক প্রতিচ্ছবি।

“কিংবদন্তির ভাগীরথী” উপন্যাস আবর্তিত হয়েছে প্রধান চরিত্র ভাগীরথীকে কেন্দ্র করে। বয়সে সে যুবতী। আকর্ষণীয় তার শারীরিক গড়ন। দেখতেও সে অপরূপ সুন্দরী। তার স্বামী ঘনশ্যাম পিরোজপুর শহরে মুচির কাজ করে জীবন নির্বাহ করে। লালশ্যাম নামের চার বছর বয়সী একটা শিশু আছে তার। সব মিলিয়ে ছোট এক সুখী পরিবার। ১৯৭১ সালের ২৫ শে মার্চ পাকিস্তান দখলদার বাহিনী এ দেশে গণহত্যা শুরু করলে ঘনশ্যাম স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ইন্ডিয়া চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ উপলক্ষে আব্দুর রহিম নামের এক দালালের সাথে পাকা কথাও হয়েছিলো তার। টাকার বিনিময়ে সে ইন্ডিয়া পার করে দেবে। কিন্তু এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানি মিলিটারি পিরোজপুর মহকুমা শহরের কেন্দ্রস্থলে হাই স্কুল দখল করে ক্যাম্প স্থাপন করলে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যায়। মদ এবং মেয়েমানুষে ছিলো মিলিটারিদের প্রবল আসক্তি। তাদের জন্য নারী সংগ্রহে এগিয়ে আসে স্থানীয় রাজাকার ও আলবদর বাহিনী। এদের অন্যতম ছিলেন পিরোজপুর মহকুমা মুসলিম লীগের সভাপতি সরদার সুলতান মাহমুদ। একদিন তিনি পথ দেখিয়ে মিলিটারিদেরব ঘনশ্যামের বাড়িতে নিয়ে যান। তারা ঘনশ্যামের সুন্দরী স্ত্রী ভাগীরথীকে বাড়ি থেকে তুলে মেজর ইস্কান্দার হায়াত খানের ক্যাম্পে নিয়ে আসে। সেখানে আটকে রেখে দিনের পর দিন ভাগীরথীর ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। ভাগীরথীর মতো আরও বহু নারীকে তুলে এনে সেই ক্যাম্পে বন্দী করা হয়েছিলো। এসব নারীদের কাপড় পরতে দেয়া হতো না। দিনরাত উলঙ্গ রাখা হতো যাতে কাপড় প্যাঁচিয়ে তারা আত্মহত্যা করতে না পারে। উপন্যাস পাঠে আমরা জানতে পারি, “ভাগীরথীকে ছোট ব্লাউজ আর হাফপ্যান্ট পরিয়ে রাখে। শাড়ি বা লম্বা সালোয়ার-কামিজ পরালে সুযোগ পেলেই ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আত্মহত্যা করে ক্যাম্পে ধরে আনা বাঙালি মেয়েরা। গত দু’মাসে কমপক্ষে চারজন মহিলা আত্মহত্যা করেছে।”(পৃষ্ঠা -৫৮)। মেজর ইস্কান্দার হায়াত খান এক নারীতে সন্তুষ্ট থাকতেন না। তাকে নতুন নারী জোগান দিতে হতো। পুরাতন ভাগীরথীকে তিনি ক্যাপ্টেন দিলদার বেগের  নিকট হস্তান্তর করে দেন। দিলদার বেগের নিকট আরেক দফা নির্যাতনের শিকার হয় ভাগীরথী। ভাগীরথী কৌশলে ক্যাপ্টেন দিলদার  বেগের  মন জয় করে ফেলে। ক্যাপ্টেন ভাগীরথীর রূপে মুগ্ধ হয়ে তাকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সুযোগ নিয়ে অনেক অনুনয় করে বাড়িতে তার ছেলে লালশ্যামকে দেখার জন্য ক্যাপ্টেনের সম্মতি আদায় করে ভাগীরথী। কথা দেয় ছেলেকে দেখেই আবার ক্যাম্পে ফিরে আসবে। বাড়িতে গেলে তার স্বামী ঘনশ্যাম তাকে ভালোভাবে গ্রহণ করেনা। ফিরে আসার সময় সে তার সন্তান লালশ্যামকে সঙ্গে নিয়ে আসতে চাইলে তার স্বামী সন্তানকে না দিয়ে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ভাগীরথীর সুখের সংসার কেমন ছারখার হয়ে যায়। বাড়ি থেকে ক্যাম্পে ফেরার পথে ভাগীরথী মানসিকভাবে ছিল বিধ্বস্ত। লেখক জানাচ্ছেন, “স্থির দাঁড়িয়ে থাকে ভাগীরথী। ওর চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে। ভেসে যাচ্ছে সংসার। ভেসে যাচ্ছে স্বামী,স্ত্রী-পুত্র”(পৃষ্ঠা- ৮১)। সন্তানকে দেখে ভাগীরথী মিলিটারি ক্যাম্পে ফেরার পথে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হানিফের সঙ্গে দেখা হয়। হানিফ তাকে মিলিটারিদের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য দেওয়ার অনুরোধ করলে সে রাজি হয়ে যায়। ক্যাপ্টেন বেগের সাথে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে মিলিটারি অপারেশনের বিভিন্ন তথ্য অবগত হয়ে সেই তথ্য সে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পাচার করতে থাকে। তার দেয়া গোপন তথ্যের ভিত্তিতে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হানিফ পাক মিলিটারির বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সফল অপারেশন চালায়। সেই অপারেশনে পাক বাহিনীর কয়েকজন ক্যাপ্টেন ও বহু সৈন্য নিহত হয় এবং বেশকিছু যানবাহন ধ্বংস হয়। ভাগীরথীর এই তথ্য পাচারের খবর একপর্যায়ে কাছে ধরা পড়ে যায়। ফলে ভাগীরথীর ওপর ভয়ংকর নির্যাতন নেমে আসে। তার দুই হাত জিপের সঙ্গে বেঁধে দুই  কিলোমিটার পথ হেঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ভাগীরথীর শরীর ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যায়। তার বীভৎস চিৎকার আর আর্তনাদে রাস্তার দুইপাশের মানুষজন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। ভাগীরথীর রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায় পিরোজপুর শহরের সড়ক। অবশেষে মৃতপ্রায় ভাগীরথীকে বলেশ্বর নদীতে ছুড়ে ফেলে দেয় পাক সেন্ট্রির  দল।

“কিংবদন্তির ভাগীরথী” একশত বিশ পৃষ্ঠার ক্ষুদ্র কলেবরের এক উপন্যাস। কিন্তু ঔপন্যাসিক মনি হায়দার উপন্যাসের এই ক্ষুদ্র আয়তনের মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধের বিস্তৃত অবয়বকে ধরতে চেষ্টা করেছেন।

পাকিস্তানি সামরিক জান্তা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে একাত্তরে নির্বিচার গণহত্যা চালিয়ে বাঙালিদের দমন করতে মিলিটারি প্রেরণ করে। পিরোজপুর মহকুমার পাক কমান্ডার মেজর ইস্কান্দার হায়াত খানকে তার ঊর্ধ্বতন বস  গভর্নর টিক্কা খানের বক্তব্য স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, “পূর্ব পাকিস্তানের কোনো জীবিত মানুষ আমরা চাই না। মুসলমান, যারা সাচ্চা মুসলমান,পাকিস্তান আর ইসলামকে পেয়ার করে, কেবল তারাই থাকবে। কোনো হিন্দু পবিত্র পাকিস্তানের মাটিতে, আমাদের কলোনিতে থাকতে পারবে না। আমরা রাখব না। আমরা চাই মাটি কেবল মাটি।”(পৃষ্ঠা ২৮)। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বাঙালিদের ব্যাপারে পাকিস্তানিদের কুৎসিত মনোভাব স্পষ্ট হয়ে যায়। পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী ছিল অত্যন্ত ক্ষমতালিপ্সু। তাদের ব্যক্তিগত জীবনাচরণ ছিলো অনৈতিকতায় পূর্ণ।মদ আর নারীলোলুপতা ছিলো তাদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। অথচ পবিত্র ইসলামকে তারা তাদের অপকর্মের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতো। তারা ছিলেন প্রবল সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন। এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ ধর্মভীরু মুসলমান। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক জান্তা নিজ দেশে প্রচার করেছিলো,পাকিস্তানের মানুষ সব হিন্দু হয়ে গেছে। এই মিথ্যা প্রোপাগাণ্ডা ছড়িয়ে একাত্তরের গণহত্যাকে বৈধ করার অপপ্রয়াস চালিয়েছিলো তারা। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। সত্যের জয় হয়েছে। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে এদেশের তিরিশ লক্ষ মানুষ তাদের জীবন বিসর্জন দেয়। দুই লক্ষ নারী সম্ভ্রম হারায়। বাঙালিদের লক্ষ লক্ষ ঘরবাড়ি ভস্মীভূত হয়। ধ্বংস হয় সকল যোগাযোগ অবকাঠামো। তারপরও বাঙালিদের দমিয়ে রাখা যায়নি। এই বিপুল ত্যাগ এবং ধ্বংসস্তূপের ওপর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় হয়।

“কিংবদন্তির ভাগীরথী” উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ভাগীরথী। অতি সাধারণ এক গৃহবধূ সে।কিন্তু নানা ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে, নিজের সংসার আর  সম্ভ্রম হারিয়ে  সময়ের অনিবার্য অভিঘাতে সে হয়ে ওঠে  মুক্তি সংগ্রামের এক অকুতোভয় অংশীজন। একদিকে সে ছিলো রূপবতী এবং সন্তানবৎসল এক মা। অন্যদিকে দেশ মাতৃকার মুক্তিকামী এক সহযোদ্ধা। পাকিস্তানি নরপশুদের নির্মম অত্যাচারেও সে মনোবল হারায়নি। বরং স্বদেশের মুক্তির জন্য কাজ  করতে পারায় গর্ব অনুভব করে সে। দেশের জন্য অবিচল চিত্তে  নিজেকে বিসর্জন দিয়েছিলো সে।

মেজর ইস্কান্দার হায়াত খান পিরোজপুর মহকুমার আর্মি ক্যাম্পের কমান্ডার। অত্যন্ত নিষ্ঠুর এবং নারীলোলুপ এই মেজরকে অধিকাংশ সময় মাতাল অবস্থায়  দেখা যায়।

মেজর ইস্কান্দারের অধীনে একজন ডেপুটি কমান্ডার হলেন ক্যাপ্টেন দিলদার বেগ। তার মতো নিষ্ঠুর না হলেও নারীলিপ্সায় তিনি কোনো অংশে কম ছিলেন না। ভাগীরথীকে বিয়ে করে তিনি  পাকিস্তানে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন।

এই উপন্যাসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র সর্দার সুলতান মাহমুদ। তিনি পিরোজপুর মহকুমা মুসলিম লীগের প্রধান। ওই অঞ্চলের রাজাকার বাহিনী তার অধীনেই কাজ করতো। তার কাজ ছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের গতিবিধি লক্ষ করে মিলিটারি ক্যাম্পে অবগত করা। এছাড়া আরেকটা কাজ ছিলো এলাকার যুবতী মেয়েদের ধরে পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে পৌঁছে দেওয়া। তার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব বলে কিছু ছিলো না। হানাদার মিলিটারিদের পদলেহনে তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।

উপন্যাসের শেষের দিকে গেরিলা কমান্ডার হানিফ রহমানকে আবির্ভূত হতে দেখা যায়। তার নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল ওই অঞ্চলে মিলিটারির বিরুদ্ধে অপারেশন পরিচালনা করার জন্য অবস্থান নেয়। পাকিস্তানি আর্মির জন্য গেরিলা হানিফ রহমান ও দল ছিলো এক মূর্তিমান আতঙ্ক। কিন্তু কিন্তু সেই গেরিলা কমান্ডার হানিফ ভাগীরথীর কাছে একেবারেই ভিন্ন মানুষ। কোনো হিংস্রতা নেই, নিষ্ঠুরতা নেই, লোভ নেই। ভাগীরথীকে দিদি সম্বোধন করে তিনি মিনতি জানান মিলিটারিদের গতিবিধি সংক্রান্ত তথ্য দিয়ে সাহায্য করার জন্য। ভাগীরথীও রাজি হয়। এবং তার দেয়া তথ্য মতে পাক আর্মির বিরুদ্ধে কয়েকটি  সফল অভিযান পরিচালনা করে তারা। মুক্তিযোদ্ধা হানিফ রহমান মানবতা ও দেশপ্রেমে উজ্জীবিত এক যুবক।

উপন্যাসের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ঘনশ্যাম। তিনি ভাগীরথীর স্বামী। পেশায় মুচি। ভাগীরথীকে মিলিটারি ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গেলে তাদের একমাত্র সন্তান লালশ্যামকে গভীর মমতায় নিজের কাছে রেখে দেন। স্ত্রী ভাগীরথীর জন্যও তার ছিলো গভীর ভালোবাসা।স্ত্রীর অনুপস্থিতে লালশ্যামকে নিয়ে দিশাহারা হয়ে যান তিনি।মিলিটারির অত্যাচারে পরিবারসহ ঘনশ্যামের জীবন বিপন্ন হয়ে যায়।আপাত এই নিরীহ ঘনশ্যামও সময়ের কশাঘাতে নরপশু হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠেন।তিনি চার বছর বয়সী শিশু পুত্র লালশ্যামসহ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হানিফের কাছে দাবি জানান,দেশ স্বাধীন হলে রাজাকার সুলতান মাহমুদের বিচার তিনি নিজ হাতে করবেন।

“কিংবদন্তির ভাগীরথী” উপন্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো এর ঘটনা প্রবাহ। ১৯৭১ সালে তৎকালীন পিরোজপুর মহকুমা শহর এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় পাক হানাদার  বাহিনীর নির্যাতন, মানুষের জীবনে সেই ঘটনার অভিঘাত এবং তার প্রেক্ষিতে মুক্তিকামী মানুষের প্রতিরোধ এই উপন্যাসের উপজীব্য। উপন্যাসের সকল ঘটনা আবর্তিত হয়েছে  প্রধান চরিত্র ভাগীরথীকে কেন্দ্র করে। ভাগীরথী, তার স্বামী ঘনশ্যাম, মুক্তিযুদ্ধা কমান্ডার হানিফ এবং চারবছর বয়সী শিশুপুত্র লালশ্যামের  প্রতি গভীর মমত্ববোধ তৈরি হয় পাঠকের মনে। তবে মেজর ইস্কান্দার হায়াত খান,ক্যাপ্টেন দিলদার বেগ এবং রাজাকার প্রধান সুলতান মাহমুদের চরিত্র

 

আরেকটু বিকশিত হতে পারতো উপন্যাসে পাকিস্তানি সেনা অফিসারদের সার্বক্ষণিক মদ্যপ অবস্থায় দেখা যায়। বিষয়টা মাঝে মাঝে কৃত্রিম মনে হয়েছে। এছাড়া কয়েকটি জায়গায় এমন কিছু শব্দের ব্যবহার আছে,পড়ার সময় সেগুলো কাজে বাজে। উপন্যাসের সংলাপেও মাঝে মাঝে পরিমিতি বোধের অভাব অনুভূত হয়েছে। আরেকটি বিষয়;ভাগীরথীর স্বামী ঘনশ্যাম মুক্তিযোদ্ধা হানিফের নিকট দাবি জানিয়েছিল, তার বউকে তার কাছে ফিরিয়ে এনে দিতে হবে। কিন্তু একপর্যায়ে ভাগীরথী যখন তার বাড়িতে ফিরে আসে, তখন ঘনশ্যাম  তাকে গ্রহণ না করে তাড়িয়ে দেয়। বিষয়টা পরস্পর বিরোধী মনে হয়।

তবে এসব ছোটখাটো বিষয় উপন্যাসের মহৎ ব্যঞ্জনাকে খর্ব করতে পারে নি। ভুক্তভোগী মানুষের জীবনে একাত্তরের ওই বিপন্ন সময় যে অভিঘাত সৃষ্টি করেছিলো,তা লেখক অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এই উপন্যাসে।

উপন্যাসটির ভাষা অত্যন্ত প্রাঞ্জল। কাহিনির মধ্যে একটা সাবলীল গতি আছে। ফলে এক টানে পড়ে ফেলা যায় বইটা। এই উপন্যাসের আরেকটা বৈশিষ্ট্য হলো, পাঠককে ঘটনার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যেতে হয়। নিজেকে ঘটনা থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারেন না পাঠক এবং এখানেই ঔপন্যাসিক মনি হায়দারের সার্থকতা।

 

আনোয়ার মল্লিক : অতিরিক্ত পোস্টমাস্টার জেনারেল, রাজশাহী বিভাগ, রাজশাহী

আবুল ফজল : বাঙালি মুসলমান সমাজের বিবেকের কণ্ঠস্বর

ইসরাইল খান বাংলার নবজাগরণের সার্থক উত্তর-সাধক মনস্বী আবুল ফজল ছিলেন বাঙালি মুসলমান সমাজের বিকাশের এবং বিবেকের এক অন্যতম প্রধান কারিগর। বিশ শতকে মুসলমান সমাজকে যতোগুলো

মেরিল্যান্ড ডিসি বই মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তসলিমা নাসরিন : যতদিন বেঁচে থাকি-  প্রগতিশীলের পক্ষে, ধর্মান্ধ মৌলবাদের বিপক্ষে আমার লেখা ও লড়াই চলবে

সাইয়িদ মাহমুদ তসলিম : নির্বাসিত লেখিকা ও  কবি তসলিমা নাসরিন বলেছেন, যতদিন বেঁচে থাকি , আমার লড়াই ও প্রতিবাদ থাকবে ধর্মান্ধ মৌলবাদের বিরুদ্ধে। অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল

‘কবিতার কথা’ চট্টগ্রাম আড্ডায় বক্তারা : ‘শুদ্ধতাই হোক কবিতার বুনিয়াদি রূপ’

রুহু রুহেল : ২৮ জুন ২০২৬ রবিবার সন্ধ্যায় অনাড়ম্বররূপে মুগ্ধতার কবিতা পাঠের আসর অনুষ্ঠিত হলো ‘কবিতার কথা চট্টগ্রাম আড্ডা’র ব্যানারে, মহিলা অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপ-পরিচালকের কার্যালয়ে।

বাংলা আমার প্রণোদনা পুরস্কার-২০২৬ পেলেন সংস্কৃতিকর্মী

চিংলামং চৌধুরী “শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চায় বিকশিত হউক নতুন প্রজন্ম” প্রতিপাদ্যে দিনব্যাপী বর্ণিল আয়োজনে রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি-এর জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হলো বাংলা আমার উৎসব-২০২৬।

শুদ্ধ সংগীতের সুরে মুখর সীতাকুণ্ড সুরনন্দনের ১ম বার্ষিক সঙ্গীত সম্মিলন অনুষ্ঠিত

দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য : সীতাকুণ্ডে শুদ্ধ সংগীতচর্চার এক অনন্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে সুরনন্দনের ১ম বার্ষিক শাস্ত্রীয় ও উপ-শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সম্মিলন। গত ২ জুন ২০২৬