এখন সময়:- আজ: ---

এখন সময়:- আজ:
--

রাজিয়া খান-এর হে মহাজীবন: নারীর বিদ্রোহীসত্তার শিল্পিত আলাপ

নূর সালমা জুলি

One is not born, but rather becomes, a woman সিমোন দ্য বোভেয়ার তাঁর ঞযব ঝবপড়হফ ঝবী (১৯৪৯) গ্রন্থে এমন কথা বলেন। সমাজ ব্যক্তিকে নারী বানিয়ে তোলে। এই সমাজ অবশ্যই পুরুষতন্ত্রিক। পুরুষতন্ত্র তার তৈরি করা কাঠামোর মধ্যে নারীকে ফেলে একজন ছাঁচে ঢালা মানুষে রূপান্তর করতে চায় নিজের খেয়ালমাফিক। আর এসব কারণেই নারী তার প্রতি হওয়া বৈষম্য নিয়ে অল্প অল্প করে সোচ্চার হতে শুরু করে। ১৮ শতকে ম্যারি ওলস্টোনক্রাফট থেকে শুরু করে আজকের জুডিথ বাটলার নারীর অধিকারের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলে চলেছেন। নারী তার নিজের জীবন নিজে গড়ে তোলবার সক্ষমতা রাখে। তার চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে যাওয়ার অধিকার পুরুষতন্ত্র জোর করে আদায় করবার চেষ্টা করে। কিন্তু আধুনিক বোধ ও বোধির একজন নারী তার ওপর প্রভুত্ব করবার অধিকার অন্যকে দেবে কেন? খুব স্বাভাবিক ও সহজাত ব্যাপার এগুলো। কারও ব্যক্তিস্বাধীনতাকে খর্ব করবার সুযোগ আসলে নেই। যদি এমন কেউ করে সেখানে বিদ্রোহ অনিবার্য। এমন বিশ্বাসের রূপায়ন ঘটেছে রাজিয়া খানের (১৯৩৬-২০১১) উপন্যাস হে মহাজীবন (১৯৮৩) এ।  উচ্চ শিক্ষিত, রুচিশীল, মার্জিত ও পরিশীলিত অনুভবের মানুষ আমিনা। ইংরেজি পত্রিকায় কাজ করে। পিতৃ-মাতৃহীন আমিনা সৎমায়ের সঙ্গে ছিল। অনেকটা পছন্দ করেই আনিসকে বিয়ে করে। আনিস সামাজিক মর্যাদায় আমিনার চেয়ে কম উজ্জ্বল ছিল। কিন্তু আমিনা নিজেকে, নিজের ব্যক্তিত্বকে আড়াল করে স্বল্প আয়ের মধ্যেই নিজেদের গৃহকোণকে স্বর্গ বানিয়ে তোলা শুরু করে। শ্রম, অর্থ এবং নিজেকেও সে এই স্বর্গ রচনায় বিনিয়োগ করে বসে। তবে

একটা সময় আবিষ্কার করে—‘তার সৃজিত নীড় এক শূন্য মন্দির।’ আমিনার পরিশীলিত মন আর সূক্ষ্ম রুচিবোধের সঙ্গে ‘বাংলাদেশের বাজারি পরিবেশে’ বড়ো হওয়া আনিস ও তার পরিবারের নিবিড় সম্পৃক্ততা তৈরি হওয়ার সুযোগ নেই। তারা দুজনেই ইউরোপে শিক্ষা নিতে যায়। লেখক বলছেন সেখান থেকে আনিস এনেছে নিখুঁত কার্যের স্যুট, লালচে রং, মদ্যপান, অগণিত নারী সঙ্গের লালসা আর এক পশলা স্মার্টনেস। আর আমিনা বিদেশ থেকে ফিরেছে স্যান্টা তেরেসা আর জন অফ দ্য ফ্রঁসের রচনাবলি নিয়ে; সেই সঙ্গে দ্বিগুণ বৈরাগ্য আর পাশ্চাত্য বিমুখতা। ফলশ্রুতিতে মানসিক গড়নের এই ফারাক দাম্পত্য সম্পর্কে গভীর প্রভাব ফেলে।

 

লোক দেখানো আনিসের স্মার্টনেসের সমঝদার গোটা পরিবার এমনকি পুরো সমাজও। সকলেই আনিসের উদ্দাম জীবনের অনুরাগী। এমনকি তাদের সন্তান দুজনও মায়ের চেয়ে বাবাকেই বেশি পছন্দ করে। আমিনাকে হেয় করতে তাই আর কোনো কসুর করে না আনিস। লেখক আনিসের আচরণগত দিকের এই ক্রমাবনতির একটা ব্যাখ্যা দিয়েছেন। বিয়ের পর থেকেই আমিনার প্রতি আনিসের আচরণ পরিবর্তন হতে থাকে। অথচ বিয়ের আগে তার মৃদুভাব, নম্রতা, চৌকস অবয়ব আমিনাকে মুগ্ধ করেছিল। অতঃপর:

গর্ভে সন্তান ঢেলে দিয়ে আনিস যখন বুঝল ব্যবস্থা পাকাপোক্ত—খাঁচার পাখি আর পালাতে পারবে না—দ্বিগুণ উগ্র হয়ে উঠল সে। সংসারে অপরিসীম শ্রম, অর্থ পেলেও আমিনা মর্যাদার আসনটা পেল না। আনিস—যে ছিল মিতভাষী, বাচাল হয়ে উঠল। আমিনাকে রুচিহীন, অশিক্ষিত, এমনকি তার জন্মে দোষ আছে এসব কথাও সে বলল।

 

এবং একটা সময় আমিনার মনে হতে লাগল বিয়েটা একধরনের ’টর্চার-চেম্বার’। সে বের হয়ে আসে অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে। কোনো বাদ-বিসম্বাদের মধ্যে দিয়ে না গিয়ে কলকাতায় চলে আসে। লোকে জেনেছে সে মৃত মামার সৎকারে এসেছে। এমনকি স্বামী আনিসও কিছু বুঝতে পারেনি। আসলে আমিনা নির্বিকারচিত্তে সংসারের সকল বঞ্চনা মেনে নিয়ে চলে আসছে বলে আনিস বা অন্যান্যরা তার এই বিদ্রোহ কল্পনাও করতে পারেনি।

 

কলকাতায় আমিনা তার বিয়ের আগের জীবনটা কাটিয়েছে। বন্ধু, স্বজন, সহপাঠীদের সঙ্গে অনেকদিন পর দেখা হয় তার। ফেলে আসা দিনের স্মৃতিতে ভরে ওঠে সময়। স্মৃতি সতত মধুর। একটা সময় সে দিল্লি হয়ে আজমীরের পথে রওনা হয়। আজমীরে কাকতালীয়ভাবে দেখা হয়ে যায় একসময়ের পছন্দের পুরুষ গৌতমের সঙ্গে। তার সঙ্গেই গৌতমের আগ্রহে দক্ষিণ ভারতের বিভিন্ন স্থান ঘুরে বেড়ায় আমিনা। তারপর দিল্লিতে ফেরার কথা দিয়ে আখ্যান শেষ। কেউ না জানলেও পাঠক জানে আমিনা ঘর ছেড়েছে। নরক বাসের ইতি টেনেছে নিজেই। সে সংসারের ক্ষুদ্র গণ্ডির সীমা পেরুতে পেরেছে নিজের আত্মবিশ্বাসের জোরে। বলা যায় এক মহাজীবনের উদ্দেশ্যে এবার তার নতুন পথ চলা। যে জীবনে নিজেকে আবার খুঁজে পাওয়ার প্রত্যাশা থাকবে। কেননা তার সংসারের মানুষের সঙ্গে তার ছিল আত্মিকভাবে বিশাল এক ফারাক। লেখক বলছেন:

 

আমিনা হয়তো চায় আকাশ ছুঁতে, কিন্তু তারা মর্ত্যরে মানুষ। অমৃতের সন্ধান তারা করে নেশায়, সুদক্ষ রন্ধনে, সতৃপ্ত ভোজনে আর চটচটে সার্বক্ষণিক আত্মীয়তায়। আমিনা বৈরী পৃথিবীর জীব—

কোনো জন্মেই এ দুই বৃত্ত মিল হবার নয়। আমিনা বুঝিয়ে দিয়েছে সে তার স্বতন্ত্র জগতে ব্যস্ত, এসব বিরতিহীন আদান-প্রদান তার জন্য সময়ের অপচয়।

 

সূক্ষ্ম ও পরিশীলিত রুচি এবং মার্জিত বোধের এক বিদগ্ধ মানুষ আমিনা। যেখানে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ তার চেতনার সঙ্গে একটুও মিলে না। শুধু পুরুষ নয় অনেক নারীও তাকে পছন্দ করে না। এসব নারী পুরুষতন্ত্রের ছাঁচে ঢালা মানুষ। আমিনার স্বতন্ত্র অনুভব আর আচরণ তাই বাজারি সমাজে অমানানসই। শেষ অবধি কম্প্রোমাইজ করার পঠ শেষ করে সে। এবং সব ছেড়ে দিয়ে বের হয়ে আসে। নারী কেন সকলেরই নিজের মতো করে বাঁচবার অধিকার আছে। আমিনার সংসার ত্যাগ আসলে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে এক নীরব বিদ্রোহ।

 

রাজিয়া খান নারীর আত্মমর্যদাবোধকে গৌরবান্বিত করেছেন। তবে এটা করতে গিয়ে অযথা পুরুষবিদ্বেষ ছড়াননি। ব্যক্তির মানসিকতার কাঠামোকে সামনে এনেছেন। যদিও এর অন্তরালে এটা লুকিয়ে আছে যে পুরুষের আধিপত্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা আদিম। অনেকটা সুপ্ত অবস্থায় এ আকাঙ্ক্ষা পুরুষের মধ্যে থাকে। নারীর প্রখর আত্মসচেতনতা, অনমনীয় মনোভাব, প্রতিষ্ঠা এসব পুরুষকে ভেতর থেকে নাড়া দেয়। তখন সে তার বিকৃত মানসিকতার নগ্ন প্রকাশ ঘটাতে শুরু করে। এই উপন্যাসে খুব সঙ্গোপনে লেখক পুরুষের সেই সুপ্ত রূপের বিকৃত প্রকাশ দেখিয়েছেন।

 

আমিনা ভাবে আনিসের সঙ্গে প্রথম আলাপের সময়টার কথা। তখন কী এক অব্যক্ত প্রত্যাশায় উজ্জ্বল ছিল সবকিছু। আনিসকে কী ভদ্র আর নরম মনে হয়েছিল তার। অথচ বিয়ের কিছুদিন পেরুতে না পেরুতে আনিস পাল্টাতে শুরু করে। তার মতো করে আমিনা উদ্দাম জীবনে চলতে অভ্যস্ত না হওয়ায় আমিনাকেই অমার্জিত ভাষায় আঘাত করতে থাকে। একজন লম্পট গোছের মানুষকে আনিস তার আয়োজন করা লাঞ্চে নিমন্ত্রণ করে। আমিনা এর প্রতিবাদ করলে তাকে সে শোনায়, ‘দুনিয়ার পুরুষমানুষ যেন বসে আছে তোমার মতো বাসি মেয়ে মানুষকে বিছানায় নামাতে।’ এই কদর্যতা পুরুষ লালন করে নারীর প্রতি প্রভুত্ব তথা আধিপত্য বিস্তারের অভিপ্রায়ে। এভাবে এই উপন্যাসের পরতে পরতে ছড়িয়ে নারীর লাঞ্ছিত হওয়ার করুণ গাথা।

 

আলোচনার উপান্তে এসে বলা যায় হে মহাজীবন-এ রাজিয়া খান নারীর নীরব বিদ্রোহকে উপস্থাপন করেছেন। পুরুষতন্ত্রের অহমিকাকে চূর্ণ করে নারী কীভাবে আত্মবিশ্বাসী হয়ে নিজের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে সাহসী হয়ে উঠতে পারে তারই শিল্পময় আলাপ হে মহাজীবন।

 

নূর সালমা জুলি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক, রাজশাহী

‘কল্লোল যুগের পরে’ অগ্রগতি’র কথা

ইসরাইল খান এই রচনাটির শিরোনাম হতে পারে—‘ত্রিশের দশকের সাহিত্যান্দোলন ও সাপ্তাহিক অগ্রগতি (১৯৩৫-৩৯)’। কিন্ত তার দরকার নেই । ‘অগ্রগতির কাহিনী’ নামে গল্পটা বলি—। ঊনিশ শতকে

তরুণ লেখক আতিকুর রহমান’র আরবে মুসাফির গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান

তরুণ লেখক আতিকুর রহমান আতিক’র লেখা আরবে মুসাফির গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর পিটস্টপ হল রুমে আবির প্রকাশন-এর নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ নুরুল আবসার’র

অপূর্ণতার ভেতর পূর্ণ এক সৃজনযাত্রা : কামরুল হাসান বাদল

এজাজ ইউসুফী কোনো লেখককে মূল্যায়ন করা সহজ নয়, বিশেষত যখন তার সৃজনী কাজের বিস্তার একক কোনো সাহিত্যধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কবিতা, গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ,

উদীচী’র সুর-আলেখ্য ‘একতারা ও রবীন্দ্র – বীণা’র অনুরণন

অনিন্দিতা অনি   অন্ধকার মঞ্চ। শিল্পীবৃন্দ সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন, সঙ্গে তালবাদকেরা। হঠাৎ মঞ্চের মাঝখানে গোল হয়ে নেমে এলো এক আলোকরশ্মি। দুহাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন এক

চক্র

সৈয়দ মনজুর কবির   দরজায় অনবরত হাত চাপড়ানোর ধুপ ধুপ শব্দে সিহাবের সকালের মজার ঘুমটা যায় ভেঙে। মেজাজটা যায় বিগড়ে। এভাবে দরজায় শব্দ তো কারো