ভূমিকা ও বাঙলায়ন : রানাকুমার সিংহ
২০২০ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী আমেরিকান কবি লুইস গ্লুক (১৯৪৩-২০২৩) সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম অগ্রগণ্য ও প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর। নিউইয়র্কে জন্ম নেওয়া এই কবি পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তাঁর প্রখর মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা এবং নির্মোহ কাব্যভাষার মাধ্যমে কবিতার জগতকে সমৃদ্ধ করেছেন। ১৯৬৮ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ফার্স্টবর্ন’ (ঋরৎংঃনড়ৎহ) প্রকাশের পর থেকেই তিনি সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। পরবর্তীতে ‘দ্য ট্রায়াম্ফ অব অ্যাকিলিস’ (ঞযব ঞৎরঁসঢ়য ড়ভ অপযরষষবং), ‘আভের্নো’ (আবৎহড়) এবং ১৯৯২ সালে পুলিৎজারজয়ী বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘দ্য ওয়াইল্ড আইরিস’ (ঞযব ডরষফ ওৎরং) তাঁকে মার্কিন কবিতার শীর্ষে নিয়ে যায়। এছাড়াও তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ‘পোয়েট লরিয়েট’ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
গ্লুকের কবিতার মূল শক্তি নিহিত তাঁর চরম পরিমিতিবোধ ও নিরাসক্ত প্রকাশভঙ্গিতে। ধ্রুপদী গ্রিক ও রোমান মিথোলজি, প্রকৃতির অমোঘ রূপক এবং ব্যক্তি জীবনের ট্র্যাজেডি—যেমন বিচ্ছেদ, একাকীত্ব ও মৃত্যুচেতনাকে তিনি বুনেছেন এক অদ্ভুত বাস্তবসম্মত ও মেদহীন সুতোয়। কোনোরকম সস্তা ভাবালুতা বা আবেগের আধিক্য ছাড়া, আটপৌরে জীবনের ভেতর থেকেই তিনি বিশ্বজনীন সত্যকে আবিস্কার করেছেন। নোবেল কমিটির ভাষায় গ্লুকের লেখা এক অনবদ্য কাব্যিক কণ্ঠস্বর, যা চরম সৌন্দর্যের সাথে ব্যক্তির অস্তিত্বকে সর্বজনীন করে তোলে।
রুপোলি লিলি
রাতগুলো আবার ঠান্ডা হয়ে এসেছে, ঠিক বসন্তের শুরুর
সেই রাতগুলোর মতো; চারপাশ আবার শান্ত। আমার কথা বলায় কি
তোমার অশান্তি হবে? আমরা তো এখন একেবারে একা;
আমাদের চুপ করে থাকার আর কোনো মানে হয় না।
দেখো, বাগানের ওপর—পূর্ণিমার চাঁদ উঠছে।
পরের পূর্ণিমাটা দেখার জন্য আমি আর থাকব না!
বসন্তে যখন চাঁদ উঠত, মনে হতো সময় অফুরান।
স্নোড্রপ ফুলগুলো খুলত আর বুজত,
ম্যাপল গাছের গুচ্ছ গুচ্ছ বীজ ঝরে পড়ত ফ্যাকাশে স্তূপে।
সাদার ওপর সাদা মেখে, চাঁদ উঠত বার্চ গাছের মাথায়।
আর যেখানে গাছের ডালটা দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে, সেই খাঁজে—
প্রথম ফোটা ড্যাফোডিলের পাতাগুলো, চাঁদের আলোয়
হয়ে উঠত ঠিক নরম সবুজ-রুপোলি।
শেষের দিকে আমরা একসাথে এতটা পথ চলে এসেছি যে
এখন আর শেষকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
এই রাতগুলোয়, আমি নিজেও আর নিশ্চিত নই—
আসলে শেষ বলতে কী বোঝায়!
আর তুমি—
যে পুরুষের সাথে থেকেছ—
প্রথম সেই চিৎকারের পর,
আনন্দ কি ভয়ের মতোই সম্পূর্ণ নিঃসাড়, শব্দহীন হয়ে যায় না?
সর্বসাধু দিবস
এমনকি এখনও, এই ভূদৃশ্য নিজেকে সাজিয়ে নিচ্ছে।
পাহাড়গুলো আঁধারে ডুবছে। বলদ জোড়া
ঘুমিয়ে পড়েছে তাদের নীল জোয়ালে
মাঠের বুক থেকে সব শস্য তখন
তুলে নেওয়া শেষ, আঁটিগুলো
সমান করে বেঁধে জমিয়ে রাখা হয়েছে রাস্তার ধারে
পঞ্চদল পুষ্পের ভিড়ে; আর তখনই উঠছে খাঁজকাটা চাঁদ।
এ যেন এক বন্ধ্যাত্ব—
ফসলের শেষ কিংবা মহামারীর প্রকোপ।
আর জানালা দিয়ে ঝুঁকে থাকা সেই বধূ
হাতটি বাড়িয়ে রেখেছে— যেন কোনো ঋণ শোধ করছে,
আর বীজগুলো—
আলাদা, সোনালী, ডাকছে—
এদিকে এসো এদিকে এসো, ছোট্ট সোনা।
আর গাছ থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে আসছে আত্মা।
স্বীকারোক্তি
আমি ভয়হীন— এ কথা বলাটা
সত্যি হবে না।
আমি অসুস্থতা আর অপমানে ভয় পাই!
অন্য সবার মতোই, আমারও কিছু স্বপ্ন আছে।
কিন্তু আমি ওগুলোকে লুকিয়ে রাখতে শিখে গেছি
নিজেকে আড়াল করতে শিখেছি
স্বপ্নপূরণের আনন্দ থেকে। কারণ, সব সুখই
নিয়তির দেবীদের ক্রোধকে আকর্ষণ করে।
ওরা তিন বোন, বুনো ওদের স্বভাব—
দিনশেষে হিংসা ছাড়া কোনো অনুভূতিই অবশিষ্ট নেই ওদের।




