রিজোয়ান মাহমুদ
সাহিত্য খুব সহজ কিছু নয়। মেধা, প্রতিভা, চর্চা এবং ঈশ্বরের অনুগ্রহ থাকলে হওয়া যায় লেখক কবি, হয়তোবা । দরকার হয় কঠিন তপস্যা। একটা সমাজের সবাই লেখক হতে পারেন না। লেখকের থাকে তৃতীয় চোখ, উপলব্ধির যথার্থ জায়গা এবং সংবেদনশীল তীক্ষ্ম দহন ও অনুভূতিময় সংরাগ। আর পঠনপাঠনের ক্ষেত্রে নিবেদিত, প্রজ্ঞাবোধের অনন্য যাপন। সাহিত্যকে সমাজের আয়না মনে করা হয়। একজন সাহিত্যিক, কবি গভীর প্রজ্ঞা দিয়ে সমাজ – রাষ্ট্রকে বিচার বিশ্লেষণ করেন। সবাই যেহেতু লেখেন আমাকেও লেখতে হবে, ব্যাপারটাও এতটা সরল সহজ নয়। রাষ্ট্রের সব নাগরিকের লেখার অধিকার আছে। তবে লেখার পূর্বে গভীর পর্যবেক্ষণ ও অধ্যয়ন বেশি বেশি প্রয়োজন। সমকালীন বিষয় অনুষঙ্গ ধরে ও মেনে লেখতে আসা দরকার। একবিংশ শতাব্দীতে বাস করে, আঠারো কিংবা ঊনবিংশ শতাব্দীর লেখকের মতো পুরনো ভাষা ও বিষয় পদ্ধতিতে লেখলে যিনি লেখবেন তার আইডেন্টিটি বা অস্তিত্বের সংকট হতে পারে, তাঁকে শনাক্ত করা মুশকিল হবে। অষ্টাদশ শতকের জগদ্বিখ্যাত ফরাসি দার্শনিক, লেখক ও প্রাবন্ধিক লেখালেখি প্রসঙ্গে বলেছিলেন, যে লেখক মনে করবে লেখালেখিতে নতুন কিছু দেবার ক্ষমতা ফুরিয়ে গেছে, অন্য বিকল্প না ভেবে তাঁর লেখালেখি ছেড়ে দেওয়া উচিত। লেখকের মহত্তম কর্ম নিজের সময় ও যুগকে নবায়ন করা নতুন চিন্তায় ও দার্শনিকতায়।
আমাদের শহরে সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের কমতি নেই। যারা বা যে সংগঠন সাহিত্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন তাঁদের সর্বাংশে সতর্ক থাকা দরকার। মঞ্চে গড়পড়তা সবাইকে বসিয়ে কবিতা বা ছড়া পড়িয়ে নেবার দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। হরেদরে সবাইকে পুরস্কার প্রদানের রেওয়াজ থেকে মুক্তি দিতে হবে সংগঠনকে। এমনও দেখতে হয়েছে বছর দেড়েক লিখে মঞ্চে উঠে লেখার জন্য পুরস্কার পাচ্ছে বা ক্রেস্ট নিচ্ছে বেজায় খুশি মনে। এতে দুপক্ষেরই ক্ষতি। সংগঠক ও নির্বাচকম-লীর দুর্বলতা চোখের সামনে এসে দাঁড়ায়। পুরস্কারপ্রাপ্তজন ভাবে দুনিয়াতে লেখা ও পুরস্কার অর্জন খুবই সহজ কাজ। সে-ই সর্বোত্তম লেখক যেহেতু সে পুরস্কৃত। তৎপরবর্তী দম্ভের কারণে লেখাজোকা আর হয়ে ওঠে না। রাতদিন কত পরিশ্রম করে, কত বইপত্র পড়ে, চিন্তার জগৎ কর্ষণ করে একেকজন লেখক কবি তৈরি হতে থাকে। যুগের পর যুগ চলে যায় পুরস্কার হাতে ওঠে না। কবি জীবনানন্দ দাশ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, অভাব অনটনের দিন কাটিয়েছেন, সুকান্ত ভট্টাচার্যসহ আরও অনেক স্বনামধন্য ধীমান লেখক কবিরা পুরস্কৃত হননি। পাশ্চাত্যে এ সংকট আরও প্রবল প্রতীয়মান হয়। দ্য আনবিয়ারেবল লাইটনেস অফ বিয়িং, উপন্যাসের বিশ্বখ্যাত চেক ঔপন্যাসিক ও দার্শনিক মিলান কুন্দেরার। কয়েকবার নোবেল শর্টলিস্টে নাম থেকেও শেষ পর্যন্ত নোবেল পাননি। সে রকম আরও কয়েকজন বিশ্ববিখ্যাত লেখক জেমস জয়েস, ফ্লানৎস কাফকা, লাতিন আমেরিকার জাদুকরী বাস্তববাদী লেখক হোর্হে লুইস বোর্হেসকে নোবেল পাওয়ার যোগ্য মনে করা হলেও শেষ অব্দি নোবেল প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এভাবেই হারুকি মুরাকামি, আন্তন চেখভ, জর্জ অরওয়েল, এনিম্যাল ফার্ম এর মতো জগদ্বিখ্যাত উপন্যাস লেখে নোবেল জুটেনি। লেখালেখি কঠিন সাধনা ও নিয়মিত চর্চার বিষয়। এ জন্য নতুন সংগঠনগুলোর প্রয়োজন প্রত্যেক মাসে অন্তত একটা করে সাহিত্য সভার আয়োজন করা। এবং সে সভাতে পঠিত লেখার ওপর আলোকপাত করা। ভুল শুদ্ধ ধরিয়ে দিয়ে লেখক কবিকে প্রশিক্ষিত করে তোলা। বিশেষ করে লেখনশৈলী ও ছন্দ বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা করা।
যে সাহিত্য সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংগঠনগুলো চট্টগ্রামে কাজ করছে তাদের দরকার সুপরিকল্পিত চিন্তা। নন্দন ভাবনা ও শুভ বুদ্ধিসম্পন্ন সৃজনশীল পরমায়ু বাড়ানো। বসন্তকালে কবিতা পাঠের আসর, একটু আধটু আলোচনা। রবীন্দ্র -নজরুল নিয়ে গান এবং তিন মিনিটের একটা বক্তৃতা, সেখানে না পাওয়া যায় রবীন্দ্র নজরুলকে নতুন ভাবনায়, না প্রাপ্তি ঘটে তাদের পূর্বেকার লেখার সমকালীন ব্যাখ্যা।
পহেলা বৈশাখ আমাদের বাঙালিদের চিরায়ত সংস্কৃতির বড় অংশ। একটা অসাম্প্রদায়িক বাঙালি চৈতন্যবোধ উজ্জীবিত ও নবায়ন হতে থাকে। এতে বিলুপ্ত সংস্কৃতির পুনরুদ্ধারেও প্রস্তুতি নেওয়া যায়। অথবা সংশোধিত সংস্কৃতি যা ধর্ম বর্ণ ভেদে বাঙালির সাথে গেলে সাংঘর্ষিক হবে না তা নতুন করে ধারণ ও পালন করা। অর্থাৎ নির্মল স্নিগ্ধ সহাবস্থানের সংস্কৃতি।
পহেলা বৈশাখ ঘিরে কিছু অনুষ্ঠান হতে দেখা যায় সাহিত্য সংগঠনের ব্যানারে, অথচ প্রয়োজনীয় বিষয় সেখানে অনালোকিত থেকে যায়।
শুধু নামকাওয়াস্তে সাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্য অনেক কিছু করা হয়েছে ভেবে যাঁরা আত্মসুখে ভোগেন, তাঁরা মূলস্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হবেন নির্দ্বিধায় বলা যায়।
সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক সংগঠনগুলোকে সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা করতে হবে। যেমন-
এক: সাহিত্য সংস্কৃতিতে স্থানীয় চিরায়ত একটা বিষয় থাকে। লোক সংস্কৃতি গড়ে ওঠে লোকায়ত জীবন দর্শন আচার অনুষ্ঠান পালনের মধ্যে দিয়ে। সেখানেই থাকে একটা সমাজের অস্তিত্বের চেহারা। অথচ ভীষণ ভয়ঙ্করভাবে সংকোচিত হয়ে আসছে লোক জীবনের বিবিধ অনুষঙ্গ। আজকাল যাত্রাপালা, পুতুলনাচ, বাউলগান, পালাগান, গ্রামীণ বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নেই বললেই চলে- সে বিষয় কাজ করার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত করা বিবিধ সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংগঠনের দায়িত্ব ও কর্তব্য। কিংবা পাল্টে যাওয়া সময় বিবেচনায় হুবহু করা না গেলেও বিকল্পধারার চিন্তা করা।
দুই : স্টাডি সার্কেল আয়োজন করা। যেখানে নির্ধারিত বিষয়ভিত্তিক আলোচনা হবে। এখনকার সময়ে উত্তর – ঔপনিবেশিক সমাজ রাষ্ট্র, সাহিত্য নিয়ে খুব আলোচনা হচ্ছে সারা বিশ্বব্যাপী। নিম্নবর্গীয় মানুষের সাহিত্য ও অধিকারবোধ নিয়ে কেউই কথা বলে না -সে বিষয় নিয়ে উচ্চকণ্ঠ হওয়া দরকার।
তিন : গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে উত্তর আধুনিক দর্শন ও সাহিত্য নিয়ে সব জায়গায় তাত্ত্বিক আলোচনা হচ্ছে – সে বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
চার : সাহিত্যে নৃতাত্ত্বিক আদিবাসী সংখ্যালঘুদের সাহিত্য অধিকারবোধ নিয়ে আমরা কম বেশি চুপচাপ থাকি – সে বিষয় রাষ্ট্র কাঠামোর পরিধিতে এ বিষয় নিয়ে বিস্তৃত খোলামেলা আলোচনা দরকার।
পাঁচ : আমাদের লোকমানস চেতনা যাঁরা উর্বর করে গেছেন এ দেশের মাটি নিংড়ানো সাহিত্য গান, রসের ধারা, তাঁরা আজ উপেক্ষিত। হাছন রাজা, লালন শাহ, শাহ আবদুল করিম, গগন হরকরা, নবীনচন্দ্র সেন, যাত্রামোহন সেন, আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ, আহমদ শরীফ, আহমদ ছফা, নিয়ে নতুন কোনো আবিষ্কার নেই। সাহিত্য-সংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নতুন চিন্তার উদ্রেক করতে পারে।
ছয় : বগুড়ার মহাস্থানগড় বরেন্দ্রভূমি অঞ্চল বড় একটা ইতিহাসের জায়গা। কুষ্টিয়ায় লালন আখড়া লেখক সাংস্কৃতিকজনদের অভিজ্ঞতা অর্জনের জায়গা। ধর্ম-বর্ণ ভেদে একটি বড় মানবিক স্থান লালনের ছেউড়িয়া অঞ্চল। সংগঠনগুলো যদি প্রতি বছরের শেষে অন্তত দু’জন লেখক প্রতিনিধি পাঠিয়ে সে-সব ঐতিহাসিক বাস্তব বিষয়ে সম্যকরূপে জ্ঞান অর্জন করে পরবর্তী পর্যায়ে লেখাজোকায় নিবেদিত থাকে, সে-ই লেখা সমৃদ্ধ হবে নিঃসন্দেহে।
সাত : আমরা কেন ভুলে যাই বছরের পর বছরজুড়ে পাহাড়ের গহিনে অস্থায়ী বসবাস করে উপমহাদেশের বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবী আদিবাসীদের জীবন সংগ্রাম লিখেছেন ; অরণ্যের অধিকার, চোট্টি মুন্ডা এবং তার তীর, কবি বন্দ্যঘটী গাঞির জীবন ও মৃত্যু। সেলিনা হোসেন এর আদিবাসীদের গল্প। এ-সব বলতে গেলে অনেক তালিকা চলে আসবে।
আট : এ সমস্ত বিষয়কে ধারণ ও বহন করার জন্য দরকার সংগঠনের নিয়মিত মুখপত্র। সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত সাহিত্য জনেরা বছরে একটা কিংবা দুটি মুখপত্র প্রকাশ করে চুপচাপ বসে থাকে। তা-ও ক্লিশে অপরিপক্ব সূচি নিয়ে প্রকাশিত ম্যাগাজিন। প্রয়োজনীয় স্টেজ অনুষ্ঠান ব্যতীত অন্যান্য অপ্রয়োজনীয় অনুষ্ঠান
কাটছাঁট করে যদি সংগঠনের মুখপত্র কিংবা ম্যাগাজিন প্রকাশে মনোনিবেশ করলে সংগঠনের অন্যান্য সভ্যরা সচেতন হবে লেখাপড়ায়। গত ৪ দশক পূর্বেও তখনকার তরুণদের মধ্যে লিটলম্যাগ, ছোট পত্রিকা কিংবা নিছক সাহিত্য পত্রিকার বের করার প্রতিযোগিতা ছিলো। সাহিত্যের নিরীক্ষাধর্মী কাজ কে কতভাবে কত বিষয় নিয়ে করতে পারে সে নিয়ে সুস্থ প্রতিযোগিতা চলতো। সে-সব সোনালি দিনের ইতি ঘটেছে ফেসবুক নামক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রচলনের ফলে। ফেসবুকে আসক্তি, লেখাজোকার অবারিত অসম্পাদিতের সুযোগে লেখক বেড়েছে অগুনতি। প্রতি সপ্তাহান্তে ফেসবুক নতুন নতুন লেখকের জন্ম হচ্ছে। এঁদের মধ্যে এ আইয়ের আগ্রাসন চলছে। এ আই কবিতা গদ্য প্রবন্ধ আলোচনা এক বোতামের টিপে বের করে দিচ্ছে। ফলে, বই পড়ার যে তাগাদা চল্লিশ বছর পূর্বে ছিলো সেটি অবশিষ্ট নেই। লেখকদের চিন্তার ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। সব কিছু তৈরী পেলে কে আর কষ্ট করতে চায়। এখনকার লেখকদের মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ক্রমশ তলানিতে। সামাজিক, রাষ্ট্রীক ও মেধার অবক্ষয় বিখ-ায়নে একটা জলজ পচনশীল পানার মতো। অর্থের বিনিময়ে স্বীকৃতিও লাভ করছে খুব সহজেই। সংগঠনগুলোও হাঁটছে পুরনো পদ্ধতিতে। কোন গুণসম্পন্ন ভাবসমৃদ্ধ মুখপত্র নেই, কিন্তু জাঁকজমকপূর্ণ স্টেজ অনুষ্ঠান চাই। দশ বিশ বছর পরে এ-সব অনুষ্ঠানের কথা খুব একটা আলোচিত হবেনা আগামী প্রজন্মধারায়। যদি পত্রিকা বা ম্যাগাজিন থাকে হাতে সেটি নিয়ে আলোচনা হবে। কোন সংগঠন কি কি সিরিয়াস কাজ করেছে, নাকি দায়সারাভাবে কাজ সেরেছে তার মূল্যায়ন আগামী প্রজন্মের হিসাবে চলে যাবে। যদি গুণগত উৎকর্ষতা থাকে রুচি ও সূচিতে পত্রিকায় মূল্যায়ন হবে ভিন্ন ও ইতিবাচক। অগ্রসর সাহিত্য সমাজ দর্শন এভাবেই গঠিত হতে থাকে। মানসম্পন্ন কাজ করেছে যাঁরা এমন কেউ বেঁচে থাকলে নিজেদের কাজের জন্য আত্মতুষ্টি লাভ করবে। যাঁদের অপেক্ষাকৃত দুর্বল কাজ তাঁরা নিজেদের সীমাবদ্ধতা টের পাবে।
রিজোয়ান মাহমুদ : কবি ও প্রাবন্ধিক, চট্টগ্রাম




