এখন সময়:- আজ: ---

এখন সময়:- আজ:
--

শরণার্থী যারা একাত্তরের বেদনা ও অশ্রুতে শ্রদ্ধা

মনি হায়দার

 

একাত্তর!

সেই একাত্তর। মানে নেই। আহা, ১৯৭১ সাল। একটু একটু আবছা মনে পড়ছে। হোক না আবছা তবুও মনে পড়ছে এই যথেষ্ঠ। আবছা মেঘ কেটে গেলে, আবার সবটা মনে পড়বে।  দেখতে পাবে, হাড় জিরজিরে শত শত, হাজার— না লাখ লাথ মানুষ পথে পথে দৌড়ুচ্ছে। আর ভয়ে, ত্রাসে পিছনে ফিরে তাকাচ্ছে। দেখার চেষ্টা করছে, পিছনে হায়েনারা কতদূর? হায়েনা চিনলে না বন্ধু? হায়েনা হচ্ছে গভীর বনের এক ধরনের দাঁতাল প্রাণী। অনেকটা কুকুরের মতো কিন্তু মুখের সারি সারি দাঁত সামনে বের হয়ে থাকে। দেখতে বিশ্রী আর ভয়ংকর। সেই বিশ্রী আর ভয়ংকর প্রাণী, মানুষের রূপ ধারণ করে, ঝাঁপিয়ে পরেছিল আমাদের শ্যামল কোমল বাংলাদেশের ওপর ১৯৭১ সালে। সেই দাঁতাল প্রাণীরা এসেছিল পাকিস্তান নামক একটা বিদঘুটে রাষ্ট্র থেকে। পাকিস্তান রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের বাংলাদেশের দূরত্ব কতো কিলোমিটার জানো? প্রায় ষোলোশো কিলোমিটার। তো সেই ষোলোশো কিলোমিটার দূর থেকে আমাদের শাসন করতে চায়। অথচ দেখো, ওদের সঙ্গে একমাত্র ধর্ম ছাড়া আমাদের কোনো কিছুতেই মিল নেই। আমরা খাই ভাত, ওরা খায় রুটি। আমরা পরিধান করি লুঙ্গি জামা, ওরা পরিধান করে লম্বা জামা আর পাজামা। ওদের দেশ ধূলি ধূসরিত, আমাদের দেশ সবুজে আর নদীনালায় খালে বিলে ভরা। সবচেয়ে বিশাল যে পার্থক্য, সেটা ভাষা। ওরা কথা বলে উর্দু ভাষায়। আমরা বলি পরম প্রিয় বাংলা ভাষায়। সেই, ওরা কেনো আমাদের শাসন করবে?

এই প্রশ্ন তুলেছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান।

কে শেখ মুজিবুর রহমান?  শেখ মুজিবুর রহমান একজন বাঙালি। জন্মেছেন ১৯২০ সালে ১৭ মার্চ  সেই কালে ফরিদপুর জেলার  গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে। বাড়ির পাশে প্রবহমান নদী বাইগার। সেই নদীতে সাঁতার কাটতে কাটতে তিনি স্বপ্ন দেখতেন— একদিন বাইগার নদী থেকে তিনি ছড়িয়ে পরবেন সারা বাংলায়। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্ত হয়ে দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়, একটি ভারত। অন্যটি পাকিস্তান। পাকিস্তানের জন্য বাংলার বাঙালিরা অনেক পরিশ্রম করেছে। মিছিল মিটিং সহ পোস্টারিংও করেছে বাঙালিরা। কলতাকায় থেকে ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময়ে, শেখ মুজিব পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পরেছিলেন। পাকিস্তান হওয়ার পর পূর্ব বাংলায়, বাঙালির বাংলাদেশে আসার পর দেখতে পেলেন, স্বাদের পাকিস্তান পোকায় খাচ্ছে। মানে গোটা পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তানের কবজায়। বাঙালিরা থেকেও নেই। ফুঁসে উঠলেন প্রতিবাদী শেখ মুজিবুর রহমান।

ইতোমধ্যে এলো ভাষা আন্দোলন। ওরা, পাকিস্তানিরা আমাদের চিরকালের মায়ের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চাইলো। বললো, বাংলা নয় তোমাদের কথা বলতে হবে উর্দুতে। প্রতিবাদে, প্রতিরোধে জ্বলে ওঠে বাংলা। চারণশিল্পী আবদুল লতিফ লিখলেন সেই অমর গান, ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিয়ে চায়, কথায় কথায় শিকল পরায় আমার হাতে পায়..। বায়ান্নোর ফেব্রুযারী মাসের একুশ তারিখে জ্বলে উঠলো ভাষা, পাকিস্তানি পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারায় আবুল, বরকত, রফিক, জব্বার আর শফিক। বাঙালি, বুঝে যায় ওরা, পশ্চিম পাকিস্তনীরা কেউ আমাদের নয়। ওরা শত্রু।

শেখ মুজিবসহ বাংলার রাজনৈতিক নেতাদের কারাগারে বন্দী করে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীরা। তার আগে,  শেখ মুজিব তাঁর দল আওয়ামী লীগ ঘোষনা করে, বাঙালির মুক্তির সনদ— ছয় দফা। ছয় দফা বাঙালি আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করে। ছয় দফার জনপ্রিয়তায় ভয় পায় পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী। ভয় পেয়েই থেমে থাকে না ওরা, বন্দি করে কারাগারে আটকে রাখে শেখ মুজিবকে। কেবল আটকে রেখেই ক্ষান্ত হয় না পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী, শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে আগরতলা মামলা দায়ের করে। মামলার বিষয় ছিল, শেখ মুজিব প্রতিবেশী ভারতের আগরতলায় গিয়ে ভারতের সরকারের সঙ্গে পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন ‘বাংলাদেশ’ সৃষ্টির চেষ্টা করছেন। মামলার নাম ছিল ‘রাষ্ট্র : বনাম শেখ মুজিবুর রহমান’। এ মামলায় অভিযুক্ত যে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করা হয় তারা হচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান, কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, স্টুয়ার্ড মুজিবুর রহমান, প্রাক্তন এলএস সুলতান উদ্দিন আহমেদ, সিডিআই নূর মোহাম্মদ, আহমেদ ফজলুর রহমান সিএসপি, ফ্লাইট সার্জেন্ট মাহফিজউল্লাহ, প্রাক্তন কর্পোরাল আবুল বাশার, মোহাম্মদ আবদুস সামাদ, প্রাক্তন হাবিলদার দলিল উদ্দিন, রুহুল কুদ্দুস সিএসপি, ফ্লাইট সার্জেন্ট মো. ফজলুল হক, ভূপতিভুষণ চৌধুরী ওরফে মানিক চৌধুরী, বিধানকৃষ্ণ সেন, সুবেদার আবদুর রাজ্জাক, প্রাক্তন হাবিলদার ক্লার্ক মুজিবুর রহমান, প্রাক্তন ফ্লাইট সার্জেন্ট মো. আবদুর রাজ্জাক, সার্জেন্ট জহুরুল হক, মো. খুরশীদ, খান মোহাম্মদ শামসুর রহমান সিএসপি, হাবিলদার আজিজুল হক, মাহফুজুল বারী, সার্জেন্ট শামসুল হক, শামসুল আলম এএমসি, ক্যাপ্টেন মো. আবদুল মোতালেব, ক্যাপ্টেন এ শওকত আলী মিয়া, ক্যাপ্টেন খন্দকার নাজমুল হুদা এএমসি, ক্যাপ্টেন এ.এন.এম নুরুজ্জামান, সার্জেন্ট আবদুল জলিল, মো. মাহবুব উদ্দিন চৌধুরী, লে. এস.এম.এম রহমান, প্রাক্তন সুবেদার এ.কে.এম তাজুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী রেজা, ক্যাপ্টেন খুরশিদ উদ্দিন আহমেদ এএমসি এবং লে. আবদুর রউফ।

ঢাকার সেনানিবাসে সামরিক বাহিনীর আয়ত্ত্বে বিচারকাজ চলছিল। প্রতিদিন পত্রিকার পাতায় আদালতের খবর প্রকাশ হতে থাকে আর আগরতলা মামলার আসামীদের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠে যান, শেখ মুজিবুর রহমান। কারণ, বাংলার সাধারণ মানুষ দেখতে পেয়েছিলেন, এই মানুষটার রাজনৈতিক সততা আর আপসহীন মনোভাব। এদিকে জনতার দীর্ঘদিন ধরে সরকারের অনাচার দেখে বিদ্রোহ ঘোষণা করে। সঙ্গে যোগ দেয় ছাত্ররা। ওদিকে, পশ্চিম পাকিস্তানের জনসাধারণও আইউবের শাসনে ত্যক্ত বিরক্ত। তারাও মাঠে মানে। অবস্থা বেগতিক দেখে আইউব ১৯৭০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি আগরতলা মামলা তুলে শেখ মুজিবসহ সবাইকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তানের সরকার। পরের দিন, ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ জনতার উপস্থিতিতে তৎকালীন ছাত্র নেতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি তোফায়েল আহমদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন।

পাকিস্তান সরকার নির্বাচন ঘোষণা করে। আওয়ামী লীগ সেই নির্বাচনে অংশ নিয়ে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। কিন্তু পাকিস্তানিরা বাংলার বাঙলির হাতে ক্ষমতা দিতে চায় না। তারা চিরকাল আমাদের শাসন করবে, শোষণ করবে। অথচ আমাদের দ্বারা শাসিত হতে চায় না। শুরু হয় বাংলার স্বাধীনতার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র। সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট মি. ‘ইয়াহিয়া’ জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে। দারুণ ক্ষোভে ও বেদনায় রাস্তায় নেমে আসে বাংলার জনগণ। আর বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের সাত মার্চ রেসকোর্স ময়দানে দিলেন এক অনন্য ভাষণ, দিলেন স্বাধীনতার ডাক। বললেন—‘ তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে, জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা কিছু আছে, আমি যদি হুকুম দেয়ার নাও পারি— তোমরা বন্ধ করে দেবে।’ এবং ঐতিহাসিক ভাষণের শেষ লাইনে বললেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’

শুরু হয়ে গেলো আমাদের মানে বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রাম।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী ২৫শে মার্চ মধ্য রাতে ঢাকা শহরের ঘুমিয়ে থাকা অসহায় মানুষের ওপর রাইফেল, ট্যাংক, বোমা, মেশিনগান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর বাঙালির প্রিয়তম নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বন্দি করে নিয়ে যায় পশ্চিম পাকিস্তানে।  বঙ্গবন্ধুর অন্যতম সহচর, আওয়ামী লীগের সাধারণ সাধারণ সম্পাদক— তাজউদ্দীন আহমদ, আওয়ামী লীগের বিশিষ্ট নেতা ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম ছদ্মপরিচয় ধারণ করে সীমান্তের দিকে যাত্রা শুরু করেন। এবং সেই যাত্রার মধ্যে দিয়ে শুরু হয় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন। ভারতে আশ্রয় নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠক করেন। এবং গঠন করে মুজিবনগর সরকার অনেক বাঁধা বিপত্তি অতিক্রম করে। শুরু হয়, যুদ্ধ আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের।

অন্যদিকে পাকিস্তানিরা চালায় গুলি, নিরস্ত্র মানুষের ওপর। বিশেষ করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস আর পুরোনো ঢাকার হিন্দু অধিবাসীদের ওপর ওদের আক্রোশ ছিল বেশি। কারণ, আমাদের মানুষ মনে করতো না। মনে করতো নিম্ন শ্রেণির হিন্দু। আর হিন্দুদের হত্যা করা সওয়াবের কাজ। অথচ ইসলাম এসেছে দুনিয়ায় সব মানুষের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলিয়ে একটি মানবিক সমাজ তৈরী করবার জন্য। সেই পবিত্র ইসলামকে অন্যভাবে ব্যবহার করে পাকিস্তানিরা আমাদের হত্যার উৎসবে নামে, রাতের অন্ধকারে।  যেহেতু, বাংলার অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু বলেছেন, শান্তিপূর্ণভাবে স্বাধীনতার আন্দোলন চালিয়ে যেতে, তাই বাঙালি সমাজ ছিল নিরস্ত্র। আর সেই নিরস্ত্র ঘুমন্ত মানুষের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনী অত্যাধুনিক অন্ত্র নিয়ে জলে স্থলে অন্তরীক্ষে চালায় গুলি। রাস্তার উপর, ফুটপাথের উপর, দোকানের সামনে, বস্তিতে— নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে মানুষের লাশ লাশ আর লাশ। তরুণ-তরুণী, বৃদ্ধা বৃদ্ধ, শিশু কিশোর, রিকশাঅলা মজুর শ্রমিক অধ্যাপক শিক্ষকদের লাশে ভরে যায় রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলা। বাংলাদেশ হয়ে ওঠে লাশের বাংলাদেশ। ঢাকা আক্রমণের কয়েকদিনের মধ্যে পাকিস্তানি হায়েনা সেনাবাহিনী ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশের সব থানা, জেলা, মহকুমা আর গ্রামে গ্রামে অস্ত্র নিয়ে ঢুকে পরে। খুঁজে বেড়ায় জয় বাংলার লোক। আর ওদের সঙ্গে জোটে এ দেশীয় মোনাফেক পাকিস্তানের সমর্থক— জামাত-রাজাকার-আলবদর-আল শামস বাহিনী। পাকিস্তানের আর্মিরা তো পথঘাট চিনতো না। এই মোনাফেকের দল মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক মানুষদের বাড়িঘর দোকানপাট দেখিয়ে দিলে, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আগুন জ্বালিয়ে দেয়। দাউ দাউ পুড়ে যায় গ্রামের পর গ্রাম। আর গ্রামের শহেরর সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? প্রাণতো বাঁচাতে হবে। আমরা জানি, সবার আগে আমার প্রাণ। একাত্তরে সেই ভয়াল দিনগুলোতে আমার নয়, সাড়ে সাত কোটি বাঙালি একটি সত্তায় মিলে বলেছিল, আমাদের প্রাণ। আমরা বাঁচবো। কিন্তু‘ নিরস্ত্র সাধারণ মানুষেরা বাঁচে কি করে? বাঁচার পথ কোথায়? পলায়ন। কোথায় পালাবে বাঙালিরা? চারদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারত। আর দক্ষিণে বিশাল জনস্রোত, বঙ্গোপসাগর। আবাল বৃদ্ধ বনিতা পালাতে শুরু করে ভারতে।

 

আহারে, মানুষের সে কি মর্মান্তিক যাত্রা! আপন হাতে তৈরি ঘরবাড়ি উঠোন রান্নাঘর ছেড়ে, প্রাণ হাতে— দিগন্তের দিকে ছোটা, দিনের পর দিন, রাতের পর রাত। খাওয়া নেই, বিশ্রাম নেই। একটাই আকুতি, কখন কখন পৌঁছাবো প্রিয় মাতৃভূমি ত্যাগ করে ভারতের মাটিতে। ভারতের মাটিতে পা ফেললেই মুক্তি। সময়টা কেমন ছিল? সেটা এখন আমাদের চোখের সামনে নতুন করে দেখা দিয়েছে।  যেভাবে মিয়ানমারের সাধারণ নাগরিকেরা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হত্যাযজ্ঞ থেকে মুক্তি পাবার জন্য সবকিছু হারিয়ে কেবল শরীর, শরীরের ভেতরের প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসছে বাংলাদেশের কক্সবাজারে। ঠিক অবিকল, একাত্তরে বাংলাদেশের বাঙালিরা, প্রায় এক কোটি থেকে দেড় কোটি আশ্রয় নিয়েছিল ভারতে। মাঝে মাঝে আমাদের দেশের টিভি চ্যানেলে সেই পালিয়ে যাওয়া সময়ের কিছু ফুটেজ দেখায়। দেখা যায়, হাজার হাজার মানুষ কাদা লেপানো পথে, হাতে সামান্য বোচকা নিয়ে সামনের দিকে ছুটে যাচ্ছে। ছবিতে একজন পঙ্গু মানুষকে কাঁদার মধ্যে চারহাত পায়ে হামাগুড়ি দিয়ে চলতে দেখা যাচ্ছে। কোথায় চলেছে সে? প্রাণ বাঁচাতে শরণার্থী হতে, ভারতে ছুটছে।

সে সময়ে খুব বৃষ্টি হতো। এক নাগাড়ে তিন দিন, পাঁচ দিন, সাত দিন। ভারতের রঘুরাই বিখ্যাত ক্যামেরাশিল্পী। তারঁ একটা বিশাল ছবি বইয়ে দেখেছি—বৃষ্টির মধ্যে হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছে হাজার হাজার বাঙালি শরনার্থী। মাথার উপরে কারো হাতে ধরা- কলা গাছের  পাতা। কিন্তু‘ তাতে বৃষ্টির পানি কি আর থামে? বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে সেই মানুষেরা, বাংলার সাধারণ জনগণ কি ভেবেছিলেন? আহারে, কবে দেশ, প্রিয় মাতৃভূমি স্বাধীন হবে? কবে দেশে ফিরবো? আর কি কখনো ফিরতে পারবো? বাংলাদেশের বাড়িতে রেখে এসেছি মুরগি আর ক্ষেতের মসুরের ডাল। কি হবে সেগুলোর?

আমরা আরও দেখতে পারি, পুরো ইউরোপজুড়ে আফ্রিকার আর আরব অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষ শরণার্থী হয়ে পথে পথে ঘুরছে। পথে প্রান্তরে মানবেতর জীবনযাপন করছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে অনেক যেমন এই দেশের মোনাফেকগণ বাংলাদেশ ও বাঙালির বিরুদ্ধে কাজ করেছে, ঠিক সেই সময়ে সুইডেনের স্কুলের শিশুরা টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে শরণার্থীদের জন্য অর্থ পাঠিয়েছে। আর আরব দেশগুলো আমাদের স্বাধীনতার বিরোধীতা করেছে। তারা এইসব অসহয় মুমূর্ষু শরণার্থীদের পাশে দাঁড়ায়নি। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে পৃথিবীর নানা দেশের মানুষেরা দুর্দশাগ্রস্থ’ শরনার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিল। অক্সফার্ম সহ জাতিসংঘ শরণার্থীদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিল।

ঘরবাড়ি পুকুরভরা মাছ, গোয়ালভরা গরু, সব ফেলে যখন ছুটছে শরাণার্থীরা, তখন অনেক জায়গায় বাঙালিরা পানি, চিড়া; মুড়ি দিয়ে শরণার্থীদের আপ্যায়ন করেছে। আবার ঘটনা এমন হয়েছে—মাইলের পর মাইল স্বামী স্ত্রী মা প্রতিবেশী  কয়েকজন মিলে একটা দল যাত্রা করছে। দিনরাত হেঁটে হেঁটে পথ পার হতে হতে সামনে পরে খাল। খালে নেই খেয়া বা সাঁকো। কি করা? পিছনে আসছে অস্ত্র হাতে অজগর। মুখ হা। খেয়ে ফেলবে। সুতরাং সাঁতার। স্বামী সাঁতার জানে। বৃদ্ধ মা জানে না। জানে না স্ত্রী। পুত্র বৃদ্ধ মাকে কাঁধে নিয়ে সাঁতার দেয়। সাঁতার দিয়ে খালের মাঝ বরাবর এসেছে, ঠিক এই সময়ে পাকিস্তানি আজদাহা আর্মীরা চলে আসে সঙ্গীন হাতে।  কি করবে মাকে নিয়ে পুত্র খালের মাঝখানে সাঁতার কাটতে কাটতে? না, ক্ষণকাল মাত্র, গর্জে ওঠে পাকিস্তানি আর্মির অস্ত্র। সাঁতার কাটা পুত্র মাকে কাঁধে নিয়ে সাঁতার কাটছেই বিহ্বল। আর গর্জে ওঠে ওদের অস্ত্র। মুহূর্ত মাত্র, খালের পানি রক্তে রঙিন হয়ে ওঠে আর মা পুত্র হারিয়ে যায় জলের অতলে। আর পাড়ে অপেক্ষারত স্ত্রী পুত্রসহ অন্যান্যদের ওপর চালায় অস্ত্রের সিস। চিরকালের জন্য হারিয়ে গেছে বাংলার জলে বাংলার কিষাণ, কিষাণ বধূসহ একটি দল। এইভাবে, একাত্তরের দিনে রাতে বাংলার পথে ঘাটে মাঠে হাটে হারিয়ে গেছে অসংখ্য শরণার্থী। কলকাতার রাস্তায় রাস্তায়, পথের মোড়ে মোড়ে, পাইপের ভেতর, আগরতলায় বনে বাগানে, ত্রিপুরার গোয়াল ঘরে— উঠোনে রাস্তার ধারে হাজারো শরণার্থী কাটিয়েছে দুর্বিষহ জীবন। সেই অমানবিক শরণার্থীর জীবনকে আজ এতোদিন পরে, কেনো মনে করলাম?

মনে করলাম, কারণ এই দেশ এই মাটি— বাংলাদেশের। স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি। এই স্বাধীন মাটির বাংলাদেশ কেমন করে হলো, কীভাবে আমরা বেঁচে আছি, কেমন ছিল বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাস, এই সৃষ্টির ইতিহাসে কারা রেখেছিলেন মর্মান্তিক অবদান, আমাদের জানা খুব দরকার। জানা আমাদের দায়। একটু একটু জলকণা নিয়ে নিয়ে তৈরি সাগর- শরণার্থীদের বেদনা দুঃখ ও সীমাহীন দিনযাপনের গ্লানিও আমাদের সম্পদ। তারা ছিলেন, তাই আজ আমরা আছি। ভবিষৎও থাকবে।

লাখো লাখো বাঙালি শরণার্থীর নি:শব্দ বিপন্ন আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে অর্জিত হয়েছে বাংলাদেশ। কিন্তু‘ সেইসব অসহায় শরণার্থীদের আমরা মনে রাখিনি। এটা অন্যায়। এক ধরনের অপরাধও। আমাদের উচিত, সেইসব ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়া বিপন্ন  শরণার্থীদের জীবন গাথা ও আত্মত্যাগ অবশ্যই মনে রাখতে হবে, যদি আমরা বাঙলি হই।

প্রার্থনা, বাংলাদেশ যেনো চিরকাল ভালো থাকে।

 

মনি হায়দার, কথাসাহিত্যিক, ঢাকা

‘কল্লোল যুগের পরে’ অগ্রগতি’র কথা

ইসরাইল খান এই রচনাটির শিরোনাম হতে পারে—‘ত্রিশের দশকের সাহিত্যান্দোলন ও সাপ্তাহিক অগ্রগতি (১৯৩৫-৩৯)’। কিন্ত তার দরকার নেই । ‘অগ্রগতির কাহিনী’ নামে গল্পটা বলি—। ঊনিশ শতকে

তরুণ লেখক আতিকুর রহমান’র আরবে মুসাফির গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান

তরুণ লেখক আতিকুর রহমান আতিক’র লেখা আরবে মুসাফির গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠান ১০ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম নগরীর পিটস্টপ হল রুমে আবির প্রকাশন-এর নির্বাহী পরিচালক মুহম্মদ নুরুল আবসার’র

অপূর্ণতার ভেতর পূর্ণ এক সৃজনযাত্রা : কামরুল হাসান বাদল

এজাজ ইউসুফী কোনো লেখককে মূল্যায়ন করা সহজ নয়, বিশেষত যখন তার সৃজনী কাজের বিস্তার একক কোনো সাহিত্যধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। কবিতা, গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ,

উদীচী’র সুর-আলেখ্য ‘একতারা ও রবীন্দ্র – বীণা’র অনুরণন

অনিন্দিতা অনি   অন্ধকার মঞ্চ। শিল্পীবৃন্দ সারিবদ্ধভাবে বসে আছেন, সঙ্গে তালবাদকেরা। হঠাৎ মঞ্চের মাঝখানে গোল হয়ে নেমে এলো এক আলোকরশ্মি। দুহাত তুলে দাঁড়িয়ে আছেন এক

চক্র

সৈয়দ মনজুর কবির   দরজায় অনবরত হাত চাপড়ানোর ধুপ ধুপ শব্দে সিহাবের সকালের মজার ঘুমটা যায় ভেঙে। মেজাজটা যায় বিগড়ে। এভাবে দরজায় শব্দ তো কারো