অমল বড়ুয়া
ভারত-উপমহাদেশে ঋতুভিত্তিক কিছু লোকপ্রথা বা উৎসব আছে, যেখানে কোনও ধর্মীয় অনুষঙ্গ না থাকায় উৎসবগুলি সমগ্র মানুষের মহামিলন ক্ষেত্র হিসেবে পূর্ণরূপে প্রকাশিত হয়। আর এই সব নানান লৌকিক উপাচার নানাভাবে বাঙালির সাংস্কৃতিক চেতনার আকর হয়ে উঠেছে। এই সব নিবজন উৎসবের মাধ্যমেই একাত্ম হয়ে উঠতে পেরেছে বাঙালি জাতির সব অংশের মানুষ। উৎসব কোনো সংস্কৃতি বা জাতিগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে তাদের সামাজিক ঐতিহ্য বা ধর্মীয় রীতিনীতি উদযাপন ও সমুন্নত রাখার একটি উত্তম উপায় হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। এই উৎসবসমূহ আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা নির্বিশেষে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে একতার অনুভূতি জাগিয়ে তোলে এবং আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে ও বজায় রাখতে সাহায্য করে। অনেক প্রাচীন সভ্যতার এমন উৎসব ছিল যা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস এবং কৃষি পদ্ধতির সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত ছিল। এই উৎসবগুলিতে প্রায়শই পূজা, পূর্বপুরুষদের সম্মান, ঋতু পরিবর্তন উদযাপন এবং প্রচুর ফসলের জন্য আশীর্বাদ প্রার্থনা করা হয়। আর এই রকম বহু উৎসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘হলকর্ষণ’ উৎসব। আদিকালে হলকর্ষণ-উৎসবের ঐদিন রাজা এবং অমাত্য ও সম্ভ্রান্তরা নিজের হাতে হাল বা লাঙল চালনা করে সারা বছরের কৃষি কাজের শুভসূচনা করতেন।
মানবসভ্যতার বিকাশের ক্ষেত্রে কৃষির অবদান ও গুরুত্ব অপরিসীম। পৃথিবীতে মানবসভ্যতার ইতিহাসের শুভসূচনা প্যালিওলিথিক বা পুরাপ্রস্তর যুগে। প্যালিওলিথিক যুগ হচ্ছে আদিম মানুষের পাথরের যন্ত্রপাতি তৈরির যুগ। দুই দশমিক ছয় মিলিয়ন বছর আগে হোমিনিনিন যেমন অস্ত্রালোপিথেচিনদের মাঝে পাথরের যন্ত্রপাতি প্রচলনের সময় থেকে বর্তমান হতে ১০,০০০ বছর পূর্বে প্লাইস্টোসিন যুগের শেষভাগ পর্যন্ত এর বিস্তৃত। প্রাগৈতিহাসিক পুরাপ্রস্তর যুগ থেকে সভ্যতা প্রবেশ করে নব্যপ্রস্তর যুগে এবং এসময় কৃষি বিপ্লবের (খ্রিস্টপূর্ব ৮০০০-খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দ) সূচনা ঘটে। নব্যপ্রস্তর যুগের বিপ্লবে উদ্ভিদ ও পশুর গৃহপালন এবং নিয়মানুগ কৃষিপদ্ধতি রপ্ত করা মানব সভ্যতার একটি অনন্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত। কৃষির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বেশির ভাগ মানুষ যাযাবর জীবনযাত্রা ত্যাগ করে স্থায়ীভাবে কৃষকের জীবন গ্রহণ করে। কৃষি থেকে প্রাপ্ত খাদ্য নিরাপত্তা ও উদ্বৃত্ত উৎপাদনের ফলে গোষ্ঠীগুলি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে আরও বড় সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নও এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। কৃষির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে শস্য উৎপাদন ব্যবস্থারও বিকাশ ঘটে, যা সমাজে শ্রমবিভাগকে ত্বরান্বিত করে। শ্রমবিভাগের পথ ধরে সমাজে সুবিধাপ্রাপ্ত উচ্চশ্রেণীর উন্মেষ ঘটে ও শহরগুলো গড়ে ওঠে। সমাজে জটিলতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে লিখন ও হিসাব পদ্ধতির ব্যবহার জরুরি হয়ে পড়ে। আর এই কৃষির ওপর নদীকেন্দ্রিক নগরসভ্যতার গোড়াপত্তন হয়। হ্রদ ও নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের মধ্যে অনেক শহর গড়ে উঠে। এদের মধ্যে উন্নতি ও উৎকর্ষতার দিক দিয়ে মেসোপটেমিয়ার সভ্যতা, মিশরের নীল নদ তীরবর্তী সভ্যতা ও সিন্ধু সভ্যতা অন্যতম। আবিষ্কৃত সীল ও নিদর্শনের ভিত্তিতে সিন্ধু সভ্যতার সময়কাল ২৮০০-১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বলে ধরে নেন অনেকেই। তবে এ সভ্যতার সময়কাল ৩৩০০-১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ মতান্তরে ৩৩০০-১৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ বলে অনুমান করা হয়। সুমেরীয় সভ্যতা (আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০-৪০০০) ও মিশরীয় সভ্যতার (খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০০-৩০০০ অব্দ) প্রায় সমসাময়িক সময়ে সিন্ধু সভ্যতার সূচনা ঘটে। সিন্ধু সভ্যতার পতনের পর গড়ে উঠে আর্যসভ্যতা। আর্যরা প্রথম সভ্যতা গড়ে তোলে আনুমানিক ১৮০০-১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শতদ্রু, বিপাশা, ইরাবতী, চন্দ্রভাগা, ঝিলান, সিন্ধু ও সরস্বতী নদীর অববাহিকা অঞ্চলে। পরবর্তীতে তারা উত্তর-ভারত অধিকার করে নিজেদের নামানুসারে এ অঞ্চলের নামকরণ করে আর্যাবর্ত। ধীরে ধীরে তারা মধ্য ও দক্ষিণ-ভারত এমনকি বঙ্গদেশ পর্যন্ত তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলো। এই সব সভ্যতা মূলত কৃষিভিত্তিক জীবন ও জীবিকার বদৌলতে গড়ে ওঠেছিল। আর কৃষিভিত্তিক এই সব সভ্যতার আচার-অনুষ্ঠান, উৎসব, পার্বণ ছিল কৃষিকে কেন্দ্র করে। কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন পার্বণ ও উৎসবের মতো ‘হলকর্ষণ’ উৎসবেরও শুভসূচনা নগর সভ্যতার সমসাময়িক সময়কাল থেকে অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দে।
সেকালে প্রতিবছর নিয়মিত বপপু মঙ্গল অনুষ্ঠিত হতো। বপপু মঙ্গল মানে হলো ‘হলকর্ষণ’। ‘হল’ অর্থ লাঙল আর ‘কর্ষণ’ শব্দের মূল অর্থ কৃষি, চাষ ভূমি কর্ষণ বা হালচাষ। লাঙল বা ‘হল’ দিয়ে জমি ‘কর্ষণ’ বা চাষ করার মাধ্যমে চাষাবাদের সূচনা করার উৎসব হলো হলকর্ষণ উৎসব। হলকর্ষণ উৎসব ছিল একটি বিশেষ ধবনেব উৎসব। বৎসরের প্রথম দিন, অর্থাৎ বৈশাখ মাসেব প্রথম দিনটিতে এই হলকর্ষণ উৎসব অনুষ্ঠিত হত। রাজা প্রজা সকলেই সমানভাবে এই উৎসবে যোগদান করতেন এবং অংশগ্রহণ করতেন। উৎসবের দিনে আবাদযোগ্য ভূমিতে হলকর্ষণ অনুষ্ঠান পালন করার নিয়ম ছিল। সে সময়ে রাজ্যেব সাধারণ নাগরিক থেকে আরম্ভ করে বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ, এমন কি স্বয়ং সম্রাটও উপস্থিত থেকে সকলের সঙ্গে সমানভাবে হলকর্ষণে যোগদান করতেন। এমন এক ‘হলকর্ষণ’ উৎসবের কাহিনি বিধৃত আছে গৌতম বুদ্ধের জীবনী কথায়। সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব ৫৫৮ অব্দ। গৌতমের তখন সবেমাত্র পাঁচ বৎসব পূর্ণ হয়েছে। প্রাচীন রাজ্য কপিলাবস্তুতে হলকর্ষণ উৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই হলকর্ষণ অনুষ্ঠানে রাজা শুদ্ধোদন বালক গৌতমকে
সঙ্গে নিষে উৎসবে যোগদান করেন। ভূমিতে হলকর্ষণ আরম্ভ হলে, কুমার প্রত্যক্ষ করলেন, হলকর্ষণে ভেজা মাটি থেকে বেরিয়ে পড়া পোকামাকড়গুলোকে পাখিরা খেয়ে যাচ্ছে, ব্যাঙ এসে খাচ্ছে। একটা সাপ এসে ব্যাঙটিকে গিলে ফেলল। আবার কোথা থেকে একটা চিল উড়ে এসে সাপটিকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল। লাঙলের ফালে উৎপাটিত এবং উৎক্ষিপ্ত কেচোগুলির এবং অন্যান্য কীট পতঙ্গের নিতান্ত অসহায় অবস্থা এবং অশেষ দুঃখ যন্ত্রণা সচক্ষে দর্শন করার পর সেই শিশু বয়সেই বালক গৌতমের অন্তঃকরণে দারুণ আঘাতেব সঞ্চার করে।
চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো সিদ্ধার্থকে উদ্বিগ্ন করে তুলল। বেঁচে থাকার জন্যে মানুষ ও প্রাণিকুলের এ নিষ্ঠুরতার কথা ভাবতে ভাবতে ভবিষ্যৎ বুদ্ধের বিশ্বব্যাপী করুণার উষ্ণ প্রস্রবণেব উৎপত্তি সেখান থেকেই। উৎসবের আয়োজন, উপাচার প্রভৃতি সবকিছুই বালক গৌতমের নিকট তখন নিতান্তই অসার বলে বোধ হতে লাগল। কী করে জগতের সমগ্র জীবকুলকে ধ¦ংসের হাত থেকে, দুঃখ দুর্দশার হাত থেকে, রক্ষা করা সম্ভব হতে পারে, এই একটিই মাত্র চিন্তা এসে শিশুর সমস্ত অন্তঃকরণ অধিকার করে নিল। উৎসবের উপাচার এবং আনন্দ কোলাহল প্রভৃতি থেকে দূরে সরে গিয়ে নিভৃত স্থানে, এক বিশালাকার জম্বু বৃক্ষের ছায়ায় বসে শিশু গৌতম ধ্যানে একেবারে বিভোর হয়ে গেলেন। তখন মধ্যাহ্নকাল, সূর্যদেব ক্রমে মধ্য গমন অতিক্রম করে পশ্চিম গগনে হেলে পড়লেন, তখনও শিশুর ধ্যানভঙ্গ হয়নি। জ্যোতির্ময় আভায় উদ্ভাসিত কুমারের অবয়ব। পাঁচ বৎসরের শিশুর এই অদ্ভুত ধ্যানভঙ্গিমা দর্শনে রাজা শুদ্ধোদন সেদিন বিস্ময়ে একেবারে অভিভূত হয়ে পড়েছিলেন। তাঁব বিস্ময়ের মাত্রা চরমে গিয়ে পৌঁছাল যখন তিনি লক্ষ করলেন যে সূর্যদেব পশ্চিম গগনে হেলে পড়া সত্ত্বেও বৃক্ষের সুর্শীতল ছায়াটি মধ্য গগনের স্থির ছত্রছায়ার ন্যায়ই শিশুটির চারপাশ বেষ্টন করে রেখেছে। রাজা ও অন্যেরা এ দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে পড়েন। অভাবিত এ ঘটনায় রাজাসহ সকলে বিহ্বল হলেন। এতবড় অত্যাশ্চর্য ব্যাপার এতগুলো লোকেব দৃষ্টিব সমক্ষে সংঘটিত হতে দেখে রাজা শুদ্ধোদন সেদিন নিজেকে আর স্থির রাখতে পারেন নি। শিশু গৌতমেব সম্মুখে নতজানু হয়ে তিনি পুত্রকে প্রণিপাত জ্ঞাপন করেন। নিজের পুত্রকে এই নিয়ে দ্বিতীয় বার প্রণিপাত জ্ঞাপন করলেন রাজা শুদ্ধোদন। রাজা শুদ্ধোদন পুনরায় স্মরণ করলেন ঋষি অসিতের ভবিষ্যদ্বাণী। ধ্যানভঙ্গ হলে রাজা পুত্রকে নিয়ে প্রাসাদে ফিরে এলেন।
১৯২৮ সালে শ্রীনিকেতনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলকর্ষণ উৎসবের পুনর্প্রবর্তন করেন। এই উৎসবের মূল উদ্দেশ্য ছিল মাটির সাথে মানুষের সম্পর্ক স্থাপন এবং কৃষিকাজকে মর্যাদার আসনে বসানো। এটি সাধারণত বর্ষাকালে (২৩শে শ্রাবণ) আয়োজিত হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক পুনর্প্রবর্তিত হলকর্ষণ উৎসব গ্রামীণ পুনর্গঠন, কৃষি ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য উৎসব। তিনি ‘হলকর্ষণ’ নামে একটি প্রবন্ধ রচনা করেছিলেন। ‘শিল্পায়ন, নগরায়নের নামে ফসলি জমির যে ক্ষতি হচ্ছে কবিগুরু তা দেখে বিচলিত হন। লেখেন একের পর এক প্রবন্ধ- ‘পল্লী-প্রকৃতি’ ‘ভূমিলক্ষ্মী’, ‘দেশের কাজ’, ‘শ্রীনিকেতন’,‘পল্লী সেবা’ ও ‘উপেক্ষিতা পল্লী’। একটি শিমুল গাছের প্রতি প্রেম থেকে লেখেন ‘বলাই’ গল্পটি। একাধিক লেখায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বুঝিয়েছেন তিনি একজন প্রথম সারির পরিবেশ সচেতন দার্শনিক। রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে তাই প্রকৃতির উপস্থিতি অবাধ। তাঁর গান, গল্প, নাটক, উপন্যাস, কাব্য সর্বত্রই প্রকৃতিকে ঘিরে। ‘ছিন্নপত্র’ পাঠ করলে বুঝা যায় তিনি কতখানি প্রকৃতি প্রেমিক মানুষ ছিলেন। আধুনিককালে হলকর্ষণ উৎসবকে বাঙালির কাছে জনপ্রিয় করে তুলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ‘হলকর্ষণ’ নিয়ে ১৯২২ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন একটি গান-
ফিরে চল, ফিরে চল, ফিরে চল মাটির টানে–
যে মাটি আঁচল পেতে চেয়ে আছে মুখের পানে।।
যার বুক ফেটে এই প্রাণ উঠেছে, হাসিতে যার ফুল ফুটেছে রে,
ডাক দিল যে গানে গানে।।
দিক হতে ওই দিগন্তরে কোল রয়েছে পাতা,
জন্মমরণ তারি হাতের অলক সুতোয় গাঁথা।
ওর হৃদয়-গলা জলের ধারা সাগর-পানে আত্মহারা রে
প্রাণের বাণী বয়ে আনে।।
কবি ছিলেন প্রকৃতি দরদি উদার বৃক্ষপ্রেমি ও সবুজ-শ্যামলিমার বিধুর দার্শনিক। তিনি প্রকৃতি-সবুজ বৃক্ষরাজির মাঝে নিজেকে খোঁজে পেতেন অপার মুগ্ধতায়। বর্ষার মেঘমাল্লার দীঘল দ্রাঘিমায় তিনি বুনে যেতেন বৃক্ষরাজি। আর লিখতেন গান-কবিতা। ১৯২৫ সালের ২৫ বৈশাখ কবির জন্মোৎসব পালিত হয় শান্তিনিকেতনে। সেই উৎসবে ‘বৃক্ষরোপণ’ উপলক্ষে কবির সদ্য রচিত গানও গাওয়া হয়-
‘হে তরু, এ ধরাতলে রহিব না যবে
সেদিন বসন্তে নব পল্লবে পল্লবে
তোমার মর্মরধ্বনি পথিকেরে কবে
‘ভালোবেসেছিল কবি বেঁচেছিল যবে’।।
কেন এই বৃক্ষরোপণ উৎসব সে বিষয়ে কবি তাঁর মনোভাব স্পষ্ট করে জানিয়েছেন ১৯৩৯ সালে। তিনি বলেন: ‘পৃথিবীর দান গ্রহণ করবার সময় মানুষের লোভ বেড়ে উঠল। অরণ্যের হাত থেকে কৃষিক্ষেত্রকে সে জয় করে নিলে, অবশেষে কৃষিক্ষেত্রের একাধিপত্য অরণ্যকে হটিয়ে দিতে লাগল। নানা প্রয়োজনে গাছ কেটে কেটে পৃথিবীর ছায়াবস্ত্র হরণ করে তাকে নগ্ন করে দিতে লাগল। তার বাতাস হল উত্তপ্ত, মাটির উর্বরতার ভার নিঃস্ব হল। এই কথা মনে রেখে কিছুদিন পূর্বে আমরা যে অনুষ্ঠান করেছিলুম সে হচ্ছে বৃক্ষরোপণ, অপব্যয়ী সন্তান কর্তৃক মাতৃভার পূরণ করবার কল্যাণ-উৎসব।’ রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন, অন্ন বা খাদ্য শস্যের জন্য মানুষের প্রতি কর্তব্যের একটি বড় অংশ হলো হলকর্ষণ বা চাষাবাদ করা।
পৃথিবীর সকল সভ্যতার গোড়াপত্তন কৃষিকে কেন্দ্র করে। বর্তমান প্রযুক্তির উর্বর সময়েও মানবজাতি এখনো পুরোপুরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। মানবসভ্যতার বিকাশ, অগ্রগতি ও উন্নতি এবং সর্বোপরি মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে কৃষির কোনো বিকল্প নেই। কৃষিনির্ভর প্রকৃতির সাথে মানুষের নিবিড় সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে উৎসাহ জোগাতে এবং ভূ-প্রকৃতির সুরক্ষায় সচেতনতা বাড়াতে হলকর্ষণ উৎসবই হতে পারে প্রদীপ্ত পথপ্রদর্শক।
অমল বড়ুয়া : প্রাবন্ধিক ও গবেষক, চট্টগ্রাম




