আঞ্জুমান রোজী
“মানুষ হও”—বাংলা ভাষার এই সহজ উচ্চারণের মধ্যে লুকিয়ে আছে গভীর নৈতিক ও দার্শনিক প্রত্যাশা। মানুষ হওয়া মানে কেবল জৈবিক অস্তিত্ব নয়; বরং আত্মসচেতনতা, বিবেকবোধ, স্বাধীন সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতা এবং জ্ঞান-মননের বিকাশ। এই মানুষ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা। কিন্তু দক্ষিণ এশীয়, বিশেষত বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় “মানুষ” হওয়ার কারিগরি প্রায়শই পুরুষের জন্য সংরক্ষিত থাকে; নারীর জন্য বরাদ্দ থাকে “নারী” পরিচয়ের সীমাবদ্ধ পরিসর। এখানে আলোচনা করা হবে, নারী লেখক কিভাবে “নারী” পরিচয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে “মানুষ” সত্তায় বিকশিত হতে পারেন, এবং কেন এই বিকাশ সৃষ্টিশীলতার জন্য অপরিহার্য।
মানুষ সত্তা, একটি তাত্ত্বিক কাঠামো। মানুষ সত্তা বলতে বোঝায়—স্বাধীন চেতনা, আত্মনির্ভরতা, নৈতিক জবাবদিহি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা। এখানে লিঙ্গগত পরিচয় গৌণ; প্রধান হলো চেতনার স্বাতন্ত্র্য। অস্তিত্ববাদী চিন্তক ঝরসড়হব ফব ইবধাঁড়রৎ বলেছিলেন, ‘ঙহব রং হড়ঃ নড়ৎহ, নঁঃ ৎধঃযবৎ নবপড়সবং, ধ ড়িসধহ.” অর্থাৎ নারী জন্মগত পরিচয় নয়, হয় একটি সামাজিক নির্মাণ। তিনি বলেছিলেন, নারী যদি নিজের স্বাধীন সত্তা নির্মাণ না করে, তবে সে ‘অন্যের সংজ্ঞাফডত সত্তা’ হয়েই থাকবে। সমাজ যে পরিচয় আরোপ করে, তা অতিক্রম করে ব্যক্তি নিজের অস্তিত্ব নির্মাণ করে। এই নির্মাণই মানুষ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া।
বাংলা ভাষায় এই চেতনার প্রথম সুস্পষ্ট প্রকাশ পাওয়া যায় বেগম রোকেয়ার লেখায়। তিনি দেখিয়েছিলেন, শিক্ষাহীনতা ও অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা নারীর মনুষ্যত্ব বিকাশের অন্তরায়। তার ইউটোপিয়ান কল্পকাহিনি “সুলতানার স্বপ্ন” মূলত পিতৃতন্ত্রের বিপরীত এক বুদ্ধিবৃত্তিক পরীক্ষা। অতএব, মানুষ সত্তা কোনো প্রাকৃতিক দান নয়; এটি অর্জনযোগ্য চেতনা।
পরনির্ভরতা ও সৃষ্টিশীলতার সংকট-
সৃষ্টিশীলতার মৌলিক উপাদান হলো স্বাধীনতা—চিন্তার স্বাধীনতা, অভিজ্ঞতার স্বাধীনতা এবং অবস্থান নেওয়ার সাহস । যখন একজন নারী সামাজিক, পারিবারিক কিংবা অর্থনৈতিকভাবে পরনির্ভরশীল থাকেন, তখন তার চিন্তায় এক ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণ কাজ করে। এই নিয়ন্ত্রণ অনেক সময় অচেতন; যা তার লেখায় প্রতিফলিত হয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠে, সাহিত্য কি কেবল আত্মপ্রকাশের মাধ্যম, নাকি সামাজিক দায়বদ্ধতার ক্ষেত্র? যদি সাহিত্য কেবল “ভালো লাগে তাই লিখি” মানসিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা ব্যক্তিগত ডায়েরির পর্যায়ে রয়ে যেতে পারে। কিন্তু সাহিত্য যখন সামাজিক পরিসরে প্রবেশ করে, তখন তা পাঠকের মননে প্রভাব ফেলে। লেখালেখি একটি নৈতিক কর্মকাণ্ড; এটি সামাজিক চেতনা নির্মাণে ভূমিকা রাখে। এই দায়বদ্ধতার উজ্জ্বল উদাহরণ মহাশ্বেতা দেবী। তিনি কেবল লেখেননি; সংগ্রাম করেছেন। তাঁর লেখায় প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর উঠে এসেছে প্রতিবাদের ভাষায়। এখানে লেখক মানে শুধু শিল্পী নয়, সামাজিক মানুষ।
নারীবাদ ক্লিশে নাকি মানবিক শর্ত?
বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে নারীবাদ এক অস্বস্তির নাম। এমনকি অনেক নারী লেখক নারীবাদকে “ক্লিশে বলেন। কারণ, ঘরের ভেতরের নীরবতা নিয়ে, ধর্মীয় অনুশাসনের ক্ষমতা নিয়ে, পরিবারের ভেতরের অসমতা নিয়ে নারীবাদ প্রশ্ন তোলে। নারীবাদ মানে পুরুষবিদ্বেষ নয়; বরং অসমতার বিরুদ্ধে অবস্থান। হুমায়ুন আজাদ পিতৃতন্ত্রকে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন, ক্ষমতার কাঠামো কিভাবে নারীর মনোজগৎকে নিয়ন্ত্রণ করে, যেখানে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থাকে না। সেই কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে নারীর মুক্তি কল্পনা করা আত্মপ্রবঞ্চনা। নারীবাদ আসলে মানুষ হওয়ার প্রথম শর্ত, কারণ এটি মর্যাদার প্রশ্ন।
প্রতিনিধিত্বের সংকট-
যেসব নারী লেখক পুরুষের আনুকূল্যে বড় হয়েছেন, তারা কি সংগ্রামী নারীর অভিজ্ঞতা বুঝতে পারেন? এখানে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, অভিজ্ঞতার ভিন্নতা স্বাভাবিক। কিন্তু প্রতিনিধিত্বের দাবি তখনই বৈধ, যখন লেখক প্রান্তিক অভিজ্ঞতার প্রতি সংবেদনশীল হন। অন্যথায় সাহিত্য কেবল অভিজাত শ্রেণির প্রতিধ্বনি হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে নারীর অবস্থান শ্রেণিভেদে বিভক্ত। শহুরে মধ্যবিত্ত নারীর অভিজ্ঞতা গ্রামীণ শ্রমজীবী নারীর অভিজ্ঞতা থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে সাহিত্যেও বিভাজন তৈরি হয়।
মানুষ সত্তা ও সৃষ্টিশীলতার সম্পর্ক-
মানুষ হয়ে ওঠা মানে নিজের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হওয়া। যখন নারী লেখক নিজের অস্তিত্বকে প্রশ্ন করেন, নিজের সীমাবদ্ধতা চিনতে পারেন এবং তা অতিক্রমের প্রয়াস নেন, তখন তার লেখায় দৃঢ় প্রত্যয় জন্ম নেয়। কিন্তু এখানে একটি সতর্কতা জরুরি, সব সাহিত্য সরাসরি রাজনৈতিক হবে এমন নয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও রাজনৈতিক হয়ে উঠতে পারে, যদি তা বৃহত্তর সামাজিক প্রেক্ষাপটে সংযুক্ত হয়। মানুষ সত্তা মানে একরৈখিক মতাদর্শ নয়; বরং স্বাধীন চিন্তার অধিকার।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা-
বাংলাদেশে নারীর অগ্রগতি দৃশ্যমান হলেও তা অসম। রাষ্ট্রীয় কাঠামো, ধর্মীয় অনুশাসন এবং পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ, সব মিলিয়ে নারীর স্বাধীন বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়। তবে পরিবর্তন অসম্ভব নয়। শিক্ষা, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা, এই তিনটি স্তম্ভ নারী লেখককে মানুষ সত্তায় বিকশিত করতে পারে। যদি নারী লেখকরা আত্মসমালোচনার সাহস দেখান, সামাজিক প্রথা ভাঙার ইচ্ছা পোষণ করেন এবং লেখাকে কেবল বিনোদন নয়, জাগরণের মাধ্যম হিসেবে দেখেন—তবে পরিবর্তন সম্ভব।
সবশেষে-
নারী লেখক তখনই পূর্ণতা পান, যখন তিনি নিজেকে “নারী” পরিচয়ের খাঁচায় বন্দী রাখেন না, আবার সেটিকে অস্বীকারও করেন না। তিনি তা অতিক্রম করেন—অভিজ্ঞতাকে শক্তিতে রূপান্তর করে। মানুষ সত্তা কোনো উপাধি নয়; এটি অনবরত নির্মাণ। প্রতিদিন, প্রতিটি বাক্যে, প্রতিটি সিদ্ধান্তে। যে নারী এই নির্মাণে প্রবেশ করেন—তিনি কেবল লেখক নন; তিনি সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক জাগ্রত মানুষ।
নারী লেখক যদি কেবল “নারী” পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকেন, তবে তার সৃষ্টিশীলতা আংশিক থেকে যায়। কিন্তু যখন তিনি “মানুষ” হয়ে ওঠেন অর্থাৎ আত্মনির্ভর, সচেতন এবং দায়বদ্ধ সত্তায় বিকশিত হন তখন তার সাহিত্য লিঙ্গসীমা অতিক্রম করে সর্বজনীন হয়ে ওঠে। মানুষ সত্তা অর্জন একদিনে সম্ভব নয়; এটি দীর্ঘ সংগ্রামের ফল। কিন্তু সেই সংগ্রামই সাহিত্যকে গভীরতা দেয়।।অতএব, নারী লেখকের সামনে দ্বৈত দায়িত্ব, নিজেকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং সেই মনুষ্যত্বের আলোকবর্তিকা সমাজে ছড়িয়ে দেওয়া।
আঞ্জুমান রোজী, কবি ও প্রাবন্ধিক
কানাডা প্রবাসী

