ফারজানা নাজ শম্পা
নারীবাদ বা ফেমিনিজমকে ঘিরে সামাজিক বিতর্ক ও ভুল বোঝাবুঝি আজও আমাদের চারপাশে প্রকট ভাবে বিদ্যমান। এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং সংস্কৃতিভেদে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। আধুনিক নারীবাদকে বোঝার জন্য এর তাত্ত্বিক ভিত্তি, বিভিন্ন সময়ের চিন্তাবিদদের অবদান এবং বিশ্ব ও উপমহাদেশের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে একসাথে দেখতে হয়। এই আলোচনায় আধুনিক নারীবাদের সূচনা থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এর ধারাবাহিকতা সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ নারীবাদী চিন্তাবিদদের দর্শন ও গ্রন্থের আলোকে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে।নারীবাদ কোনো একক মতবাদ নয়; বরং সময়, সমাজ ও অভিজ্ঞতার ভিন্নতায় গড়ে ওঠা বহু ধারার সমন্বিত একটি চিন্তাপ্রবাহ।
নারীবাদের প্রধান ধারাগুলো
উদারপন্থী নারীবাদ (খরনবৎধষ ঋবসরহরংস)
উদারপন্থী নারীবাদকে নারীবাদের প্রাচীন ও মূলধারার ধারা বলা হয়। এর লক্ষ্য আইনি ও সামাজিক সমতা নিশ্চিত করা। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ভোটাধিকার এবং আইনের দৃষ্টিতে সমান মর্যাদা এই ধারার মূল বিষয়। ব্রিটিশ দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল উনবিংশ শতকে এই ভাবনাকে শক্তিশালী করেন। পরবর্তীতে আমেরিকান লেখক বেটি ফ্রিডান বিশ শতকে একই ধারাকে নতুন গতি দেন। এই ধারা বিশ্বাস করে বিদ্যমান সামাজিক কাঠামোর ভেতরেই সংস্কারের মাধ্যমে সমতা প্রতিষ্ঠা সম্ভব।
র্যাডিকাল নারীবাদ (জধফরপধষ ঋবসরহরংস)
র্যাডিকাল নারীবাদ পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোকে বৈষম্যের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে। আমেরিকান লেখক কেট মিলেট ও তাত্ত্বিক শুলামিথ ফায়ারস্টোন দেখিয়েছেন যে নারীর দমন কেবল আইনি বা অর্থনৈতিক নয়; বরং সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ক্ষমতার গভীর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। পরিবার, যৌনতা ও সামাজিক ভূমিকা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার কথা এই ধারা তুলে ধরে।
মার্কসবাদী ও সমাজতান্ত্রিক নারীবাদ গধৎীরংঃ ঋবসরহরংস
এই ধারা নারীর শোষণকে অর্থনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করে ব্যাখ্যা করে। জার্মান দার্শনিক ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস পরিবার ও সম্পত্তির ইতিহাস বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখান কীভাবে অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে নারীর অবস্থান সম্পর্কিত। পরবর্তীতে রাশিয়ান বিপ্লবী আলেকজান্দ্রা কোলোন্টাই এবং ইতালীয়-আমেরিকান চিন্তাবিদ সিলভিয়া ফেদেরিচি এই ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করেন। অর্থনৈতিক সমতা ছাড়া প্রকৃত লিঙ্গসমতা সম্ভব নয় এই ধারণাই এখানে কেন্দ্রীয়।
ব্ল্যাক ও উপনিবেশ-পরবর্তী নারীবাদ
আমেরিকান চিন্তাবিদ ইবষষ ঐড়ড়শং ও অ্যাঞ্জেলা ডেভিস দেখিয়েছেন যে জাতি, শ্রেণি ও লিঙ্গ একসাথে কাজ করে বৈষম্য তৈরি করে। উপনিবেশ-পরবর্তী নারীবাদ দেখায় যে পশ্চিমা অভিজ্ঞতা দিয়ে সব সমাজকে ব্যাখ্যা করা যায় না।
ইকোফেমিনিজম ঊপড়ভবসরহরংস
ভারতীয় চিন্তাবিদ বন্দনা শিবা প্রকৃতি ও নারীর ওপর শোষণের মধ্যে সম্পর্ক তুলে ধরেছেন। পরিবেশ ধ্বংস ও সামাজিক বৈষম্যের প্রশ্ন এখানে একসাথে আলোচিত হয়।
ইন্টারসেকশনাল নারীবাদ ওহঃবৎংবপঃরড়হধষ ঋবসরহরংস
১৯৮৯ সালে আমেরিকান আইনবিদ কিম্বার্লে ক্রেনশ “ওহঃবৎংবপঃরড়হধষরঃু” শব্দটি প্রবর্তন করেন। একজন নারীর অভিজ্ঞতা কেবল লিঙ্গ দ্বারা নির্ধারিত হয় না; বরং জাতি, শ্রেণি, ধর্ম, অভিবাসন ও সংস্কৃতি একসাথে কাজ করে। কানাডার বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতা ও বাংলাদেশের সামাজিক বৈচিত্র্য বোঝার ক্ষেত্রে এই ধারণা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
নারীবাদী চিন্তার তাত্ত্বিক ভিত্তি
আধুনিক পাশ্চাত্য নারীবাদী দর্শনের সূচনা স্তম্ভ হিসেবে বিবেচিত হয় ব্রিটিশ দার্শনিক মেরি উলস্টোনক্রাফট-এর অ ঠরহফরপধঃরড়হ ড়ভ ঃযব জরমযঃং ড়ভ ডড়সধহ গ্রন্থ । তিনি যুক্তি দেন, নারীদের দুর্বল বলা হয় কারণ তাদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে।ব্রিটিশ দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল-এর ঞযব ঝঁনলবপঃরড়হ ড়ভ ডড়সবহ আইনি ও সামাজিক সমতার দাবি আরও শক্তিশালী করে।ফরাসি দার্শনিক সিমোন দ্য বোভোয়ার ঞযব ঝবপড়হফ ঝবী গ্রন্থে লিখেছিলেন:
“মানুষ নারী হয়ে জন্মায় না, বরং নারী হয়ে ওঠে।”
এই ধারণা সামাজিক নির্মাণবাদী নারীবাদের ভিত্তি গড়ে তোলে। আমেরিকান লেখক বেটি ফ্রিডান-এর ঞযব ঋবসরহরহব গুংঃরয়ঁব গৃহবন্দী মধ্যবিত্ত নারীর অসন্তোষের বিষয়টি সামনে আনে। কেট মিলেট-এর ঝবীঁধষ চড়ষরঃরপং পিতৃতন্ত্রকে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে বিশ্লেষণ করে। ইবষষ যড়ড়শং নারীবাদকে অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপ দেন।
কিম্বার্লে ক্রেনশ রহঃবৎংবপঃরড়হধষরঃু ধারণাকে জনপ্রিয় করেন। আমেরিকান দার্শনিক জুডিথ বাটলার এবহফবৎ ঞৎড়ঁনষব গ্রন্থে মবহফবৎ ঢ়বৎভড়ৎসধঃরারঃু ধারণা তুলে ধরেন।
নারীবাদ সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণা
নারীবাদ পুরুষবিদ্বেষী
বেল হুকস দেখিয়েছেন নারীবাদ পুরুষের বিরুদ্ধে নয়; এটি পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। পিতৃতন্ত্র পুরুষদের ওপরও কঠোর সামাজিক প্রত্যাশা চাপিয়ে দেয়, যদিও নারীরা কাঠামোগতভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত।
নারীবাদ পশ্চিমা সংস্কৃতির আমদানি
নারীবাদ শুধুমাত্র পশ্চিমা সংস্কৃতির অবদান নয় উপমহাদেশে নারীর অধিকার আন্দোলনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।বাংলাদেশের বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন নারীশিক্ষা ও সমতার পথিকৃৎ। ভারতের কমলা ভাসিন, মহাশ্বেতা দেবী, উর্বশী বুটালিয়া, ফ্লাভিয়া অ্যাগনেস, বন্দনা শিবা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।পাকিস্তানের আসমা জাহাঙ্গীর, মালালা ইউসুফজাই, নিগার আহমেদ, ফারিদা শাহিদ নারীর অধিকার আন্দোলনে ভূমিকা রেখেছেন।শ্রীলঙ্কার কুমারী জয়াবর্ধনা ও সুনীলা আবেয়সেকেরা উল্লেখযোগ্য।
নারীবাদ পরিবারবিরোধী
আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী ন্যান্সি চোডোরো দেখিয়েছেন পরিবারে সমতা প্রতিষ্ঠা করলে সম্পর্ক আরও স্বাস্থ্যকর হয়। নারীবাদ পরিবার ভাঙতে নয়; বরং সম্পর্ককে ন্যায্য করতে চায়।
নারীবাদ শহুরে উচ্চবিত্তের বিষয়
নারীবাদ শুধুমাত্র সমাজের উচ্চবিত্তের বিষয় নয় ষ বাংলাদেশি-ব্রিটিশ অর্থনীতিবিদ নায়লা কবীর দেখিয়েছেন উন্নয়ন ও অর্থনীতিতে নারী কর্মীদের অক্লান্ত শ্রম কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প নারীর সম্পৃক্ত তা অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের বড় উদাহরণ।
নারীবাদ ধর্মবিরোধী
আমেরিকান ইসলামি চিন্তাবিদ আমিনা ওয়াদুদ ও মরোক্কান সমাজবিজ্ঞানী ফাতিমা মেরনিসি ধর্মীয় পাঠের নারীবাদী পুনর্ব্যাখ্যার মাধ্যমে নারীর অধিকার নিয়ে আলোচনা করেছেন।
সমসাময়িক বাস্তবতা ও ভবিষ্যৎ
কানাডায় নারীবাদ বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। এবহফবৎ ঢ়ধু মধঢ় এবং নেতৃত্বে নারীর কম উপস্থিতি এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। ডিজিটাল যুগ নারীবাদকে নতুন গতি দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অভিজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ তৈরি করেছে, যদিও অনলাইন সহিংসতাও বেড়েছে।পুরুষদের অংশগ্রহণ নারীবাদের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। লিঙ্গসমতা পুরুষদের জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। শিক্ষা নারীবাদী সচেতনতা তৈরির প্রধান মাধ্যম। পাঠ্যক্রম, গবেষণা ও সাহিত্য এই আলোচনাকে এগিয়ে নিতে পারে।
নারীবাদ সংঘাত তৈরি করে না; বরং বিদ্যমান বৈষম্যকে দৃশ্যমান করে। নারী ও পুরুষ উভয়ের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও সুযোগ নিশ্চিত করাই এর লক্ষ্য। সমতা তখনই বাস্তব হবে, যখন তা কেবল স্লোগান নয়, দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠবে।
নারীবাদ সেই মানবিক সমাজ নির্মাণের পথ নির্দেশ করে। বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে সকল মানুষের সমান মর্যাদা ও অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। নারীবাদ সেই ঘোষণার বাস্তব প্রয়োগের দাবি জানায়। কারণ বাস্তব সমাজে দেখা যায়, আইনগত স্বীকৃতি থাকলেও নারীরা এখনও সহিংসতা, বৈষম্য, বেতন বৈষম্য, শিক্ষা থেকে বঞ্চনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে পিছিয়ে থাকার মতো সমস্যার মুখোমুখি হন।
তাই নারীবাদ আইনের কাগুজে সমতা নয়, বাস্তব জীবনের সমতা প্রতিষ্ঠার কথা বলে।নারীবাদ পুরুষের বিরুদ্ধে নয়; বরং এমন একটি সামাজিক কাঠামোর বিরুদ্ধে, যা মানুষকে লিঙ্গভিত্তিক নির্দিষ্ট ভূমিকায় সীমাবদ্ধ করে। এই কাঠামো পুরুষদের ওপরও কঠোর সামাজিক প্রত্যাশা চাপিয়ে দেয়। ফলে নারীবাদ এমন এক মানবিক সমাজের কথা বলে যেখানে যত্ন, সহমর্মিতা, সহযোগিতা ও ন্যায্যতা সামাজিক মূল্যবোধ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
ফারজানা নাজ শম্পা, কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক
কানাডা প্রবাসী

