এখন সময়:রাত ৩:৪১- আজ: শুক্রবার-২০শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৬ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-বসন্তকাল

এখন সময়:রাত ৩:৪১- আজ: শুক্রবার
২০শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৬ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-বসন্তকাল

নারী : সৃষ্টির প্রেরণা ও শক্তি

কমল কুজুর

 

‘বিশ্বের যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর

অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’

-কাজী নজরুল ইসলাম

নারী মনুষ্য সভ্যতার মূল সত্তা। সে পরিবারিক বন্ধনের হৃদস্পন্দন এবং সমাজের অন্যতম স্থপতি। নারীর দৃঢ় উপস্থিতি দৃশ্যমান ও অদৃশ্য উভয় উপায়ে পৃথিবীকে গঠন করে। মানবসন্তানের জন্মদান, লালন পালন থেকে শুরু করে জাতির পরিচালনা, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি সৃষ্টি থেকে বিজ্ঞানের অগ্রগতি—মানব সভ্যতার প্রতিটি পর্যায়ে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। নারীকে মা, বোন, কন্যা, স্ত্রী, বন্ধু—প্রতিটি ভূমিকায় ভালোবাসা, মায়া-মমতা, ত্যাগ, সহানুভূতি ও শক্তির প্রতীক বলা হয়। অথচ ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় নারীরা নানা বাধা, বৈষম্য ও অবমূল্যায়নের শিকার হয়ে আসছে। নারীদের পথচলা এখনো সংগ্রাম, সহনশীলতা, পরিশ্রম এবং বিজয়ের গল্প। আর নারীর ইতিহাস কেবল লিঙ্গভিত্তিক পরিচয়ের কথকতা নয়—এটি মানবতার গল্প, যেখানে নারী তার সহানুভূতি, শক্তি, দৃঢ়তা, প্রেম ও ভালোবাসা দিয়ে পৃথিবীকে আবশ্যকীয়ভাবে পরিবর্তন করেছে।

 

‘পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ শহীদের নাম মা’

-হুমায়ূন আজাদ

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নারীরা গৃহস্থালির সীমাবদ্ধ পরিসরে আবদ্ধ ছিল। তাদের নিয়তি ছিল চার দেয়ালের মধ্যে আটকে থাকা। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় তাদের ভূমিকাকে সীমিত করা হয়েছিল গৃহকর্ম ও যত্নশীলতার মধ্যে। বহু সমাজ ও সংস্কৃতিতে নারীদের শিক্ষা, সম্পত্তির অধিকার এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা হতো। প্রাচীন সমাজে নারীদের পুরুষের অধীনস্থ হিসেবে দেখা হতো, তাদের মূল্যায়ন করা হতো পরিবারের সেবা দিয়ে, বুদ্ধি বা ব্যক্তিত্বে নয়। তবু এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নারীরা জ্ঞান, সৃজনশীলতা এবং নীরব শক্তি ও সংগ্রামের মাধ্যমে সমাজে প্রভাব বিস্তার করেছে।

প্রাচীন মিশর, গ্রিস ও ভারতের মতো সভ্যতায় মাঝে মাঝে নারীরা নেতৃত্বের আসনে উঠে এসেছেন। যেমন- মিশরের ক্লিওপেট্রা ও হাইপেশিয়া, ভারতের গার্গী ও মৈত্রেয়ী, ইউরোপের জোয়ান অব আর্ক, বাংলার রানি রাসমণি বা বেগম রোকেয়া।  তারা প্রমাণ করেছেন যে, বুদ্ধিমত্তা ও নেতৃত্ব কোনো এক লিঙ্গের একচেটিয়া নয়। প্রত্যেক লিঙ্গের অধিকারীরাই সুযোগ পেলে সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে অনায়াসে ভূমিকা রাখতে পারেন। অবশ্য এগুলো ছিল ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়। অধিকাংশ নারীই পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে স্বাধীনতা হারিয়ে নীরব ও অসহায় জীবন যাপন করেছেন।

উনবিংশ ও বিংশ শতকে  নারীর অধিকার আন্দোলনের সূচনা ঘটে। রেনেসাঁর  যুগে সমতা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার ধারণা নারীদের অনুপ্রাণিত করে নিজেদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে। ১৭৯২ সালে মেরি উলস্টোনক্রাফট তাঁর ‘অ ঠরহফরপধঃরড়হ ড়ভ ঃযব জরমযঃং ড়ভ ডড়সধহ’ গ্রন্থে যুক্তি দেন যে, নারীদেরও পুরুষদের মতো শিক্ষা ও সামাজিক সুযোগ পাওয়া উচিত। উনবিংশ ও বিংশ শতকের শুরুতে ভোটাধিকারের আন্দোলন নারীর ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ইউরোপ, আমেরিকা ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে নারীরা সংগঠিত হয়ে ভোটাধিকারের দাবি তোলে। তাদের আন্দোলনের তীব্রতা সরকারকে তাদের পক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। তাদের অধ্যবসায়ের ফলে ১৮৯৩ সালে নিউজিল্যান্ড প্রথম দেশ হিসেবে নারীদের ভোটাধিকার দেয়। পরে আরও বহু দেশ সেই পথ অনুসরণ করে নারীদের তাদের প্রাপ্যতা বুঝিয়ে দিতে বাধ্য হয়।

 

‘তুমি আমাকে শিক্ষিত মা দাও, আমি তোমাকে শিক্ষিত জাতি দিবো’

– নেপোলিয়ন বোনাপার্ট

নারীর ক্ষমতায়নের মূল ভিত্তি হচ্ছে শিক্ষা। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শিক্ষা ছিল পুরুষদের বিশেষাধিকার, আর নারীদের শেখানো হতো গৃহস্থালির কাজ। মূলত শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা ছিল নারীদের নিয়ন্ত্রণে রাখার একটি বিশেষ উপায়। কিন্তু সমাজের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে নারী শিক্ষার গুরুত্ব অস্বীকার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমতা ও ন্যায়বিচারের আন্দোলন এই সীমাবদ্ধতাগুলো ভেঙে দিয়েছে।

শিক্ষিত নারী কেবল নিজের উন্নতিই করেন না, বরং পরিবার ও সমাজের উন্নতিতেও অবদান রাখেন। শিক্ষিত নারীরা স্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক অগ্রগতি নিশ্চিত করে। তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে ও প্রচলিত সীমা বা বিধি নিষেধ অতিক্রম করতে অনুপ্রাণিত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা শিক্ষিত হলে শিশুমৃত্যু কমে, পারিবারিক আয় বৃদ্ধি পায় এবং দ্রুতগতিতে সামাজিক কল্যাণ সাধিত হয়। শিক্ষা নারীদের সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে, শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করতে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে সক্ষম করে তোলে। বিংশ ও উনবিংশ শতকে নারীরা শিক্ষাক্ষেত্রে অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। আজ নারীরা প্রতিটি ক্ষেত্রে নেতা, উদ্ভাবক, শিক্ষক ও পেশাজীবী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। আজ নারীরা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিতের মতো ক্ষেত্রেও সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছে। তারা গবেষক, অধ্যাপক ও উদ্ভাবক হিসেবে ভবিষ্যৎ গড়ছে। মহাকাশ গবেষণার মতো জটিল ক্ষেত্রেও সফলতার সাথে কাজ করে চলেছে নারীরা। তারা প্রমাণ করেছে যে লিঙ্গ নয়, যোগ্যতা ও সম্ভাবনাই মানুষের সক্ষমতা নির্ধারণ করে। অবশ্য এরপরেও, বিশ্বের বহু স্থানে দারিদ্র্য, সংস্কার বা সংঘাতের কারণে লক্ষ লক্ষ কন্যাসন্তান এখনো শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত। তাই সর্বজনীন শিক্ষার জন্য সংগ্রাম আজও বর্তমান সময়ের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

 

‘কোনকালে একা হয়নিকো জয়ী, পূরুষের তরবারি; প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়েছে, বিজয়ালক্ষী নারী’।

-কাজী নজরুল ইসলাম

একটা সময় ছিল যখন পুরুষরাই শুধুমাত্র কর্মক্ষেত্রে ছিল। বর্তমানে নারীর কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ অর্থনীতি ও সমাজকাঠামোকে আমূলে বদলে দিয়েছে। শিল্পবিপ্লবের সময় নারীরা কারখানায় কাজ শুরু করে, প্রায়ই কঠিন পরিবেশে এবং পুরুষদের তুলনায় কম মজুরিতে। তবুও, এই সময়টিতে নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার সূচনা ঘটে। দুইটি বিশ্বযুদ্ধের সময় পুরুষরা যুদ্ধে গেলে নারীরা তাদের জায়গায় কাজ করে, নার্স হিসেবে সেবা দেয় এবং পরিবার পরিচালনা করে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করে। এই ঘটনার পর কর্মক্ষেত্রে নারীদের গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। আধুনিক যুগে নারীরা ব্যবসা, রাজনীতি, চিকিৎসা, প্রকৌশলসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। তারা এখন উদ্যোক্তা, নির্বাহী ও উদ্ভাবক হিসেবে বৈশ্বিক অগ্রগতির চালিকাশক্তি। অবশ্য মজুরি বৈষম্য, নেতৃত্বের সীমিত সুযোগ এবং কর্মক্ষেত্রে নারী-পুরুষ বৈষম্য এখনো রয়ে গেছে। অনেক নারী ‘গ্লাস সিলিং’ (একটি অদৃশ্য এবং অলিখিত সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক বাধা, যা সাধারণত যোগ্য নারী এবং সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোকে প্রতিষ্ঠানের উচ্চতর বা শীর্ষ ব্যবস্থাপনা পদে উন্নীত হতে বাধা দেয়)-এর মুখোমুখি হন। কর্মজীবন ও পারিবারিক দায়িত্বের ভারসাম্য রক্ষা করাও একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। সমাজ এখনো নারীদের উপর গৃহ ও যত্নশীলতার দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়। ফলে অনেক নারীকে নিজের ক্যারিয়ার বা পেশাগত উন্নতি ও পারিবারিক জীবনের মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হয় অথবা তাকে বেছে নিতে বাধ্য করা হয়। এক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় নারীকে তার ক্যারিয়ার বিসর্জন দিতে হয়। মাতৃত্বকালীন ছুটি, নমনীয় কর্মঘণ্টা এবং সাশ্রয়ী শিশু যত্নের মতো যৌক্তিক নীতিমালা একটি ন্যায়সঙ্গত কর্মপরিবেশ গড়তে অপরিহার্য। সমাজে প্রকৃত সমতা তখনই আসবে যখন শুধুমাত্র নারীদের শ্রম নয়, নেতৃত্ব, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গিকেও সমানভাবে মূল্য দেওয়া হবে।

 

‘সব বড় মানুষই তার সাফল্যের জন্য কোনো অসাধারণ নারীর সহযোগিতা এবং উৎসাহের ঋণের কথা বলেছেন।’   -ও হেনরি

পুরুষের সঙ্গে নেতৃত্বের সখ্য বহু যুগের। নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে পুরুষত্বের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু ইতিহাস ও বর্তমান সমাজ প্রমাণ করেছে যে নারীরাও সমানভাবে শক্তি, সহানুভূতি ও বুদ্ধিমত্তা দিয়ে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। নারী নেতৃত্ব সাধারণত শাসন ব্যবস্থায় সহযোগিতা, সামাজিক কল্যাণ ও অন্তর্ভুক্তির ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। ইন্দিরা গান্ধী, মার্গারেট থ্যাচার, অ্যাঞ্জেলা মার্কেল ও জাসিন্ডা আর্ডার্নের মতো নেত্রীরা সংকট ও পরিবর্তনের সময়ে জাতিকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁদের নেতৃত্বে দৃঢ়তা ও সহানুভূতি একসঙ্গে কাজ করেছে, যা প্রমাণ করে ক্ষমতা ও মানবিকতা পাশাপাশি চলতে পারে। স্থানীয় সরকারেও নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে, যা গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করছে। স্থানীয় পর্যায়ে নারী নেত্রীরা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সমাজ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তবুও গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, বিশ্বব্যাপী রাজনীতিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব এখনো কম। সাংস্কৃতিক পক্ষপাত, সহায়তার অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধা তাদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে অংশগ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এছাড়া সামাজিক কুসংস্কার, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা ও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা তাদের অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করে। নারীদের রাজনীতিতে উৎসাহিত করা, পরামর্শ ও পর্যাপ্ত সম্পদ প্রদান এই ব্যবধান কমাতে সাহায্য করতে পারে। তাই নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য প্রয়োজন সমান মজুরি, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং মাতৃত্বকালীন সুবিধা।

নারীরা বহুকাল ধরে ঘর কন্যা যেভাবে সামলেছে, তেমনি নারীরা সবসময় সামাজিক আন্দোলনের অগ্রভাগে থেকেছে—ন্যায়, সমতা ও মানবাধিকারের জন্য লড়েছে। বিংশ শতকের শুরুতে ভোটাধিকারের আন্দোলন থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের কর্মী আন্দোলন পর্যন্ত, নারীরা নিরলসভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। রোজা পার্কস ও কোরেটা স্কট কিং নাগরিক অধিকার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। পরিবেশ আন্দোলনে ওয়াঙ্গারি মাথাই ও গ্রেটা থুনবার্গের মতো নারীরা বিশ্বব্যাপী অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। ২০১৭ সালে শুরু হওয়া #গবঞড়ড় আন্দোলন যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এটি লক্ষ লক্ষ নারীকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস দেয়। সাম্প্রতিক কালের বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংঘটিত গণঅভ্যূত্থানে নারীরা বেশ সাফল্যের সাথে অংশগ্রহণ করেছে। শ্রীলংকা, নেপাল, বাংলাদেশ, ইরাক প্রভৃতি দেশের গণঅভ্যূত্থানে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।

 

‘নারী হচ্ছে গ্রন্থ, শিল্প এবং একাডেমি, সমগ্র পৃথিবী যা ধারণ ও লালন করে’।

-শেকসপিয়ার

মানব সভ্যতার সবচেয়ে প্রাচীনতম সংগঠন হচ্ছে পরিবার। পরিবারে নারীর ভূমিকা তাদের পরিচয়ের অন্যতম গভীর দিক। মাতা, কন্যা, বোন ও স্ত্রী হিসেবে নারীরা পরিবারকে লালনপালন, দিকনির্দেশনা, স্থিতিশীলতা ও সঠিক পরামর্শ প্রদান করে। তাদের আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা ও সহানুভূতি ভালোবাসা ও নিরাপত্তার ভিত্তি গড়ে তোলে। তবে, যত্নশীলতার প্রধান দায়িত্ব নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়ায় প্রায়ই তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। এমন অনেক সংসার দেখা যায়, যেখানে পরিবারের শিশু সন্তানদের পরিপূর্ণভাবে লালনপালনের কথা বলে নারীদের তাদের কর্মক্ষেত্র থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে আশার কথা হচ্ছে আধুনিক পরিবারে নারী-পুরুষের মধ্যে দায়িত্ব ভাগাভাগি ক্রমেই বাড়ছে। পুরুষরাও এখন শিশু যত্ন ও গৃহস্থালির কাজে বেশ ভালোভাবেই অংশ নিচ্ছে। তারা ক্রমশঃ বুঝতে পারছে যে সমতার শুরু হয় ঘর থেকেই। নারী তিনি কর্মজীবী, সিদ্ধান্তগ্রহণকারী ও সমাজ পরিবর্তনের অংশীদার। পরিবারে সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় থাকলে নারী আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে পরিবার ও সমাজে সাফল্যের সঙ্গে অবদান রাখতে পারে।

নারীর স্বাস্থ্য বৈশ্বিক কল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ইতিহাসে নারীর স্বাস্থ্য প্রায়ই উপেক্ষিত হয়েছে বা ভুলভাবে বোঝা হয়েছে। এখনো গ্রামীণ এলাকায় অনেক নারী পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি নারীর মানসিক স্বাস্থ্যের দিকেও গুরুত্ব দিতে হবে, কারণ কর্মজীবন, পরিবার ও সামাজিক চাপ প্রায়ই নারীদের মানসিকভাবে ক্লান্ত করে তোলে। বর্তমান সময়ে নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিশেষ চাহিদা সম্পর্কে সচেতনতা বেড়েছে। মাতৃস্বাস্থ্য, প্রসূতি ও শিশু চিকিৎসার স্বল্পতা এখনো অনেক ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হয়। ফলে নারীরা না চাইলেও অনেকটা পিছিয়ে পড়ে। বিশ্বের অনেক অঞ্চলে এখনো নারীরা মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। মাতৃমৃত্যুর হার বেশি, প্রজনন অধিকার সীমিত। স্বাস্থ্যসেবা, পরিবার পরিকল্পনা ও মাতৃস্বাস্থ্য, প্রজনন স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও মানসিক সুস্থতা—সব ক্ষেত্রেই নারীর যত্ন নেওয়া জরুরি। এসব প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে শিক্ষা নিশ্চিত করা নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য।

 

‘প্রাণকে নারী পূর্ণতা দেয়, এই জন্যই নারী মৃত্যুকেও মহীয়ান করতে পারে’

-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সংস্কৃতি ও শিল্পকলায় নারীর অবদান অপরিসীম। নারী সাহিত্য, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র ও চিত্রকলায় তার সৃজনশীলতা, আবেগ ও প্রতিভা দিয়ে সমাজ ও বিশ্ব সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। জেন অস্টেন, মায়া অ্যাঞ্জেলু, টনি মরিসন, মতো লেখিকারা নারীর মনোজগতকে কণ্ঠ দিয়েছেন, স্বপ্ন দেখিয়েছেন। ফ্রিদা কাহলো ও জর্জিয়া ও’কিফের মতো শিল্পীরা শিল্পের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ‘চিত্রাঙ্গদা’ থেকে শুরু করে সুফিয়া কামাল, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, তসলিমা নাসরিন, সেলিনা হোসেন, রুনা লায়লা—সবাই তাদের নিজ নিজ ক্ষেত্রে নারীর শক্তি ও সৃজনশীলতার প্রতীক। বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে সুরের মায়া ছড়িয়ে অসামান্য অবদান রেখেছেন লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, সাবিনা ইয়াসমিন, টেলর সুইফট, অ্যাডেল এবং ম্যাডোনা প্রমুখ। সংস্কৃতিতে নারীর অংশগ্রহণ সমাজে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনে। তারা কেবল শিল্প সৃষ্টি করে না, বরং সমাজের অন্যায়, বৈষম্য ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা তৈরি করে। নারীরা যখন নিজেদের গল্প নিজেরাই বলেন, তখন তারা প্রচলিত ধ্যানধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং বাস্তবতা, বৈচিত্র্যময় ও শক্তিশালী উপস্থাপনা তৈরি করেন।

অসাধারণ অগ্রগতি সত্ত্বেও নারীরা এখনো বৈষম্য, সহিংসতা ও অসমতার মুখোমুখি। অনেক স্থানে তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও চলাচলের স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত। অর্থনৈতিক বৈষম্যও এখানে বড় একটা সমস্যা। নারীরা বিপুল পরিমাণ অবৈতনিক শ্রম দেন, যা সমাজে প্রায়ই অদৃশ্য থেকে যায়। তারা সাংসারিক গৃহস্থালি কাজের জন্য কোনরকম পারিশ্রমিক পায় না। তাই অর্থনৈতিক হিসেব থেকে তাদের ভূমিকা বাদ পড়ে যায়। বিশ্বের বহু নারী এখনো বৈষম্য, সহিংসতা ও অসম সুযোগের মুখোমুখি। লিঙ্গ বৈষম্য এখনো উন্নয়ন ও ন্যায়বিচারের পথে বাধা সৃষ্টি করে। এই সমস্যাগুলোর সমাধানে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সচেতনতা এবং এমন নীতিমালা যা সবার জন্য ন্যায় ও সম্মান নিশ্চিত করে। সমতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন নীতিগত পরিবর্তন, সচেতনতা ও মানসিকতার পরিবর্তন। শিক্ষা ও সংলাপই পারে এই বাধাগুলো ভাঙতে।

 

‘আদর্শ পুরুষের চেয়ে আদর্শ নারী মানবজাতির উচ্চস্তরের বিকাশ’

-ফ্রেডরিক নিৎসে

প্রতিটি নারীর মধ্যেই পৃথিবী বদলে দেওয়ার ক্ষমতা নিহিত রয়েছে। ক্ষমতায়ন মানে কেবল সুযোগ দেওয়া নয়—এটি এমন পরিবেশ তৈরি করা যেখানে নারীরা ভয় বা সীমাবদ্ধতা ছাড়াই বিকশিত হতে পারে। নারীর ক্ষমতায়ন অর্থ কেবল অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নয়; এটি সামাজিক, রাজনৈতিক, মানসিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার সমন্বয়। ক্ষমতায়িত নারী নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে, অন্যদের অনুপ্রাণিত করে, সমাজকে শক্তিশালী করে, উদ্ভাবনকে ত্বরান্বিত করে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। ইতিহাসে দেখা যায়, নারীরা ক্ষমতাপ্রাপ্ত হয়ে নেতৃত্ব দিয়ে সমাজ পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান, রাজনীতি ও প্রশাসনে নারীদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর উদ্যোগে নারীরা আজ আত্মনির্ভরশীল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও নারী মুক্তিযোদ্ধাদের ভূমিকা ছিল অনন্য, যা আমরা আজো কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করি। অবশ্য নারীদের প্রকৃত ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব, যখন সমাজ নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করবে এবং তাকে পুরুষের সমান মর্যাদা দেবে।

নারীর ভবিষ্যৎ মানবতার ভবিষ্যতের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একুশ শতকের প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে নারীর অংশগ্রহণ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সমাজ যত বেশি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও ন্যায়সঙ্গত হবে, অগ্রগতির সম্ভাবনাও তত বাড়বে। তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, শিক্ষা ও বৈশ্বিক সংযোগ—সব ক্ষেত্রেই নারীরা নিজেদের দক্ষতা প্রমাণ করছে। বাংলাদেশে নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা যেমন ই-কমার্স, অনলাইন শিক্ষা ও ডিজিটাল মার্কেটিং জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। এই অগ্রগতি ধরে রাখতে অবিরাম প্রচেষ্টা প্রয়োজন। তবে প্রযুক্তি ব্যবহারে নারীরা এখনো কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি—যেমন ডিজিটাল নিরাপত্তা, অনলাইন হয়রানি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের অভাব। তাই নারীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। মনে রাখতে হবে সমতা কোনো গন্তব্য নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।

 

নারীরা শক্তির স্তম্ভ, প্রজ্ঞার ধারক এবং জীবনের স্রষ্টা। তাদের সংগ্রাম থেকে ক্ষমতায়নের যাত্রা মানবতার স্থিতিস্থাপকতা ও আশার প্রতীক। নারীরা মায়া-মমতা, সাহস, সহানুভূতি ও দৃঢ়তার প্রতীক। মা হিসেবে পরিবারের দেখাশোনা ও সন্তানের লালন পালন থেকে শুরু করে নেতা হিসেবে জাতিকে পরিচালনা করা পর্যন্ত তাদের অবদান অমূল্য। নারীর অধিকারকে স্বীকৃতি ও সমর্থন দেওয়া একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও উন্নত সমাজ গঠনের জন্য অপরিহার্য। যখন নারীরা উন্নতি করে, তখন তাদের সাথে সাথে সমগ্র মানবজাতি এগিয়ে যায়। একটি সমতা ও ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়তে নারী-পুরুষ উভয়ের সমান অংশগ্রহণ প্রয়োজন। নারীকে সম্মান করা মানে মানবতাকে সম্মান করা। নারীকে সম্মান করা মানে মানবজীবনকে সম্মান করা। যে সমাজ নারীদের উন্নত করে, সেই সমাজই প্রকৃত অর্থে উন্নত হয়। নারী শিক্ষিত, ক্ষমতায়িত ও সম্মানিত হলে জাতি সমৃদ্ধ হয়। নারীর গল্প মানব অগ্রগতির গল্প—সমতা, ন্যায়, মায়া-মমতা ও অসীম সম্ভাবনার গল্প।

 

 

কমল কুজুর, কবি ও শিক্ষক

দিনাজপুর

বিশ্ব নারী দিবসের পুনর্পাঠ : বহুমাত্রিক নারীর নতুন ভাষ্য

শাহেদ কায়েস   নারীর ইতিহাস কোনো একরৈখিক অগ্রযাত্রা নয়—তা বহু পথে বয়ে চলা নদীর মতো, যেখানে সংগ্রাম, প্রেম, প্রতিরোধ, রাজনীতি, শ্রম, মাতৃত্ব, শিল্প, দর্শন ও

আন্দরকিল্লার ইফতার অনুষ্ঠানে সুধীজনদের অভিমত বাঙালি জাতিসত্তা ও মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনার চিহ্নটিই অনির্বাণ অস্তিত্বের প্রতীক

আন্দরকিল্লা ডেক্স : শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সমাজভাবনামূলক কাগজ ‘আন্দরকিল্লা’র ইফতার আয়োজনে সম্পাদক মুহম্মদ নুরুল আবসার তাঁর স্বাগত বক্তব্যে এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, আন্দরকিল্লা কোনো বলয়বদ্ধ সীমানায়

প্রথা ভেঙে বেরিয়ে এসো নারী  

গৌতম কুমার রায় বিংশ শতাব্দী বিদায় হওয়ার পরে এসেছে একবিংশ শতাব্দী। বিজ্ঞান এগিয়েছে। সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়েছে পুরুষ। কিন্তু নারী ! শুধু পিছিয়েছে নারী। কেন

আদিবাসী নারী

কুমার প্রীতীশ বল   ‘হৈ হৈ হৈ জুমত  যেবং. জুমে যেইনে গচ্ছা সুদা তুলিবং. গচ্ছা সুদা তুলি নেই টেঙ্গা কামেবং।’ চাকমা এই গানটির বাংলা অনুবাদ

মহাশ্বেতা দেবী: দর্শন, সাহিত্য ও সমাজচেতনার প্রতিফলন

রওশন রুবী   মহাশ্বেতা দেবী উপমহাদেশের একজন শক্তিমান ও প্রখ্যাত লেখক। তাঁর শতবর্ষ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সাহিত্য শব্দের সীমা অতিক্রম করে মানবতার গভীর নৈতিক শক্তিতে