মোহীত উল আলম
আমার বাবা-মা’র পরিবারে সন্তানাদি বেশি ছিল। ভাইদের চেয়ে বোনদের সংখ্যা ছিল বেশি। আমার মা সংসার চালাতেন সম্রাজ্ঞীর মতো। তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে গাছের পাতা ও পুকুরের মাছ নড়তো না। আমার বাবা গ্রিক ধারণা অনুযায়ী ছিলেন দেবতা হার্মিসের মতো। বহি:বিশ্ব তিনি দেখতেন, আর মা গ্রিক ধারণা অনুযায়ী দেবী হেস্টিয়ার মতো চুলা আগলে রাখতেন। মায়ের এই চুলা আগলানোর প্রক্রিয়া থেকে মায়ের প্রশাসনের কিছু গার্হস্থ্য রূপ আমি লক্ষ করি। মা করতেন কি, খাওয়া দাওয়ার সময় আমরা ভাইদের জন্য পুরো ডিম আর বোনদের জন্য অর্ধেক ডিম দিতেন। সে ডিমের বিভাজন থেকে ছোটবেলা থেকে আমার মনে এই সচেতনতা তৈরী হয় যে পরিবারে ছেলেরা মেয়েদের চেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করে।
কোন মানুষই ভূঁইফোঁড় আচরণ করেন না। আমার মা-ও করতেন না। তাঁর আচরণের নিশ্চয় একটা প্রাক-শিক্ষা ছিল। তিনি মুসলিম রমণী ছিলেন। পবিত্র কোরানের সুরা আল নিসার ১১ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে, তোমাদের সন্তানদের ব্যাপারে অছিয়ত করছি: ছেলেরা সম্পত্তির যা পাবে, মেয়েরা তার অর্ধৈক পাবে। ওপরে আমার মায়ের ডিম-বিভাজন নীতি ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের আলোকে প্রতীকী ব্যবহার হিসেবে ধরা যায়।
ধর্মীয় তত্ত্বের আলোকে আরেকটি অস্বস্তিকর কথার উল্লেখ করা যায়। পবিত্র বাইবেলের জেনেসিস গ্রন্থের ২ নম্বর বচনের ২১-২২ ছত্রে বলা হচ্ছে, আদম যখন ঘুমাচ্ছিলেন গড তখন তাঁর পাঁজর থেকে একটি হাড় খুলে নিয়ে সেটি মাংস দিয়ে ভ’রে দিলেন, আর বিচ্ছিন্নকৃত হাড় থেকে আদমের সঙ্গিনী ঈভকে সৃষ্টি করলেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী স্ত্রীলোক মাত্রই শারীরিকভাবে পুরুষ থেকে সৃষ্ট। নারী পুরুষের ওপর কেন নির্ভরশীল থাকবে তার আদি চিত্র। পবিত্র কোরানের সুরা আল নিসা, ৪.১., সুরা আল আরাফ, ৭, ১৮৯, সুরা আল-জুমার ৩৯.৬-এ বলা হচ্ছে, আল্লাহ্ তোমাকে একটি একক আত্মা থেকে সৃষ্টি করেছেন, তারপর সেই আত্মা থেকে তাঁর সঙ্গীকে সৃষ্টি করেছেন। বাইবেলে সরাসরি শারীরিক সম্প্রসারণের কথা বলা হলেও, কোরানে সম্প্রসারণটি এসেছে ধারণাগত, জৈবিকভাবে নয়।
এই দুটো মধ্যপ্রাচ্যে উদ্ভূত ধর্মের বিপরীতে কিন্তু ভারতীয় ধর্মীয় সংস্কৃতিতে দেবীদের জয়জয়কার। দূর্গা, কালী এই দেবীগণ মানব সমাজের সকল কিছুর নিয়ন্ত্রক।
এর আগের সভ্যতায়, অর্থাৎ প্রাচীন গ্রিক সমাজে রাজনৈতিক আর রাষ্ট্রীয় অর্থে নারী ছিল একান্ত পরাধীন। তাদের জীবন ছিল চুলাকেন্দ্রিক, যার দেবী, ওপরেই বলেছি, ছিলেন হেস্টিয়া। তবে গ্রিক সাহিত্যে এর কিছু ব্যতিক্রম লক্ষ করা যায়। যেমন আ›িতগোনে, মিডিয়া, ক্লাইটেমেনেস্ট্রা প্রভূত ট্যাজিক নারী চরিত্র কেন্দ্রিয়ভাবে বিরাজ করছে। তারপরও তাদের চরিত্র চিত্রায়নে এই গ্রিক ধারণা জায়গা পেয়েছে যে নারী হচ্ছে সমাজের জন্য বিনষ্টকারী একটি উপাদান।
মধ্য যুগে এসে যখন ইতিহাসকে বস্তুবাদী চেতনার ভিত্তিতে পুন:নিরীক্ষণের কাজ শুরু হলো, তখন অন্যতম নারীবাদী লেখিকা ভার্জিনিয়া উলফ “শেক্সপিয়ারস সিস্টার” নামক একটি সাড়া জাগানো প্রবন্ধ লিখলেন, যেটি ১৯২৯ সালে প্রকাশিত তাঁর গ্রন্থ আ রুম অব ওয়ানস ঔন-এ অর্ন্তভুক্ত ছিল। সে প্রবন্ধের মূল কথা হলো, শেক্সপিয়ারের আপন কোন বোন যদি শেক্সপিয়ারের মতো প্রতিভাসম্পন্ন হতেন তারপরও তিনি শেক্সপিয়ারের মতো বিখ্যাত হতেন না, যেহেতু তিনি ছিলেন নারী, এবং শেক্সপিয়ারের এলিজাবেথিয় ইংল্যান্ড ছিল একান্তভাবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ। উলফ এটিও বললেন যে প্রতিভা বিকাশের জন্য বস্তুগত ও পার্থিব উপকরণের প্রয়োজন আছে। আমার মায়ের ডিমতত্ত্ব থেকে উলফের এই বস্তুবাদী ধারণা খুব দূরের নয়। অর্থাৎ, এলিজাবেথের সময় ইংল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে নারীর শিক্ষাগ্রহণ ও প্রতিভা বিকাশের কোন জায়গা ছিল না। শেক্সপিয়ারের স্ত্রী আন হাথাওয়ে, আর তাঁর দুই মেয়ে যথাক্রমে সুসানা আর জুডিথ শেক্সপিয়ার ছিলেন নিরক্ষর।
উলফের আরও অনেক পরে আরেক নারীবাদী লেখিকা ক্যাথারিন বেলসে ১৯৮৫ সালে দ্য সাবজেক্ট অব ট্র্যাজেডি শীর্ষক একটি গ্রন্থ লিখলেন, সেখানে অন্তর্ভুক্ত “ফাইন্ডিং আ প্লেস” শীর্ষক প্রবন্ধে ১৬০৭ সালে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার কর্র্তৃক রচিত তাঁর অন্যতম বিখ্যাত ট্র্যাজেডি অ্যান্টনি এ্যান্ড ক্লিওপেট্রার সঙ্গে এর সত্তর বছর পর, অর্থাৎ ১৬৭৭ সালে জন ড্রাইডেন রচিত একই কাহিনির অনুবর্তনে রচিত অল ফর লাভ বা দ্য ওয়ার্লড ওয়েল লস্ট নাটক দুটির মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করলেন। করে বললেন যে ক্লিওপেট্রা মিশরের প্রতাপশালী রানি বা সম্রাজ্ঞী ছিলেন (খ্রীষ্টপূর্ব ৫১ থেকে ৩০ সাল পর্যন্ত)। অত্যন্ত কুশলী ও রণকৌশল-দক্ষতায় পরিপূর্ণ ছিল তাঁর শাসনামল। ক্লিওপেট্রার এই অসামান্য ব্যক্তিত্বসম্পন্ন চরিত্র শেক্সপিয়ার তাঁর রচিত কাল্পনিক চরিত্র ক্লিওপেট্রার মধ্যে অক্ষুণ্ন রাখলেন। অর্থাৎ ক্লিওপেট্রা একজন পুরুষ নৃপতির মতো সাম্রাজ্য চালালেন, মিশরে আগত রোমান বীরদের সঙ্গে বিবাহের সম্পর্ক গড়ে রাজ্য নিরাপদ রাখতে চেষ্টা করলেন। শেক্সপিয়ারের রচিত ক্লিওপেট্রা তাই আধুনিক সমালোচনা সাহিত্যে পরিচিত হলেন স্বয়ংসম্পূর্ণ একজন নারী চরিত্র হিসেবে, যাকে ফরাসী নারীবাদী তাত্ত্বিক এলেন সিকসু বললেন, “এক্রিটার ফেমিনিন,” অর্থাৎ অসামান্য নারী।
বেলসে বললেন যে শেক্সপিয়ারের নাটকে ক্লিওপেট্রার চরিত্র আর ড্রাইডেনের রচিত ক্লিওপেট্রার মধে একটি বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। যেখানে শেক্সপিয়ারের ক্লিওপ্রেট্রা ছিলেন রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, সেখানে ড্রাইডেনের ক্লিওপেট্রা কেবলমাত্র গৃহবধূর পর্যায়ে উপনীত হলেন। যেখানে প্রথম ক্লিওপেট্রার চরিত্র ছিল ধূর্ততা, শঠতা, কিন্তু অমিত ভালোবাসায় পূর্ণ একটি বহুমাত্রিক আকর্ষণীয় চরিত্র সেখানে ড্রাইডেনের ক্লিওপেট্রা হয়ে পড়লেন একান্ত বাধ্য, নমনীয়, ক্রুরতাবিহীন, রাজ্যলক্ষ্মী, কিংবা আদর্শ গৃহবধূ। অর্থাৎ শেক্সপিয়ারের ক্লিওপেট্রাকে রাজনৈতিক পরিমন্ডল থেকে বের করে নিয়ে ্এস তাঁকে ড্রাইডেন অন্ত:পুরবাসিনী করলেন। শেক্সপিয়ারের যুগ পুরুষতািন্ত্রক হলেও নারীদের জন্য একটি বাতায়ন খোলা ছিলো, কিন্তু ড্রাইডেনের রেস্টোরেশন যুগে নারীর জন্য যে বাতায়ন খোলা থাকলো সেটি বহি:বিশ্ব অবলোকন করার জন্য নয়, বরঞ্চ রান্নাঘরের জানলা দিয়ে খড়ের গাদা দেখার মতো। নারীর জন্য রাজনৈতিক অর্থনৈতিক জীবনগুলো অবরুদ্ধ করে দেবার ব্যবস্থা হলো। নারীকে গৃহবন্দি রাখার কৌশলটি কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক সমাজে খুব দৃশ্যমানভাবে সরাসরি করা হয় তা নয়। এ জন্য প্রথমে প্রয়োজন পড়ে একটি মন্ত্র সৃষ্টি করা, যার উদ্দেশ্য হচ্ছে দ্বি-বিধ। এক, নারীকে মহীয়সী করার একটা ভাব বা ধারণা তৈরী করা হবে, যেটি আসলে বাস্তব কিছু নয়, মায়া মাত্র। দুই, মহীয়সীকরণের তলায় তলায় নারীকে কব্জা করা বা গৃহায়িত করার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত হয়।
এই প্রসঙ্গে আমি আমাদের সমাজের একটি বহুল জনপ্রিয় মন্ত্র বা প্রবচনের উল্লেখ করতে চাই। আর সেটি হলো, “সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে।” এই প্রবচনটি নারীর চোখে ধুলা দেবার প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। ব¯‘ত সংসারে সুখ বজায় রাখার সমস্ত দায়িত্ব নারীর ওপর অর্পণের অর্থ হলো, সংসারের সমস্ত অনর্থের জন্য নারী দায়ী। ছেলেমেয়েরা লেখাপড়ায় ভালো না করলে, নারী দায়ী; সংসারের অর্থকরির অবস্থা ভালো না চললে, নারী দায়ী; সংসারে অসুখ-বিসুখ চললে, নারী দায়ী; এমনকি স্বামী যদি মদ-জুয়া-বা পরনারীর প্রতি আসক্ত হয়, তার জন্যও নারী দায়ী। “স্ত্রীর পত্র” গল্পে রবীন্দ্রনাথ কম ঘৃণা ভরে (সম্ভবত শরৎচন্দ্রের দেবদাস জাতীয় উপন্যাসগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে বলা) এর মূল চরিত্র মৃণালকে দিয়ে এই কথা বলেন নি যে ভারতীয় সংস্কৃতিতে অসুস্থ স্বামীকে বারবণিতার দুয়ারে পৌঁছে দেয়া স্ত্রীর জন্য মহৎ কার্য সম্পাদন হয়েছে বলে ধরা হয়। অর্থাৎ, এই প্রবচনটির মোদ্দা কথা হলো সংসারের সমস্ত‘ অশান্তির উৎপত্তি হয় নারীর ব্যর্থতা থেকে। কবি জন ডানের একটি বিখ্যাত কবিতা “ভ্যালেডিকশন ফরবিডিং মোর্নিং” (১৬১১)-এ একটি চমৎকার উপমা আছে। তিনি বলছেন স্বামী স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা হলো কাঁটা কম্পাসের দুটো হাতের মতো। এই দুটো হাত যেমন ওপরে মাথার মাধ্যমে সংযুক্ত, ঠিক তেমনি স্বামী-স্ত্রী পরস্পর ভালোবাসার মাধ্যমে সংযুক্ত। অর্থাৎ, কম্পাসের মাথা আর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরাজিত ভালোবাসা সংযুক্তির কাজ করছে। এ পর্যন্ত উপমাটি ব্রিলিয়ান্ট। কিন্তু পরবর্তী চরণগুলোতে যেয়ে থমকে যেতে হয়। ডান বলছেন, কম্পাসের একটি হাত স্থির থাকলে যেমন বৃত্ত আঁকা সম্ভব হয়, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সে স্থির হাতটি হলো স্ত্রী। স্ত্রী ঠিক থাকলে সংসার ঠিক। অর্থাৎ, “সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে”-এই কথাটিরই একটি কাব্যিক সংযোজন হচ্ছে ডানের কবিতা।
নারী মাত্রই দুশ্চরিত্রা, নারী মাত্রই খল, নারী মাত্রই ব্যক্তিত্বহীন, নারী মাত্রই দুর্বল (হ্যামলেট বলছেন: “ফ্রেইলিটি. দাই নেইম ইজ উওম্যান” নারী হলো দুর্বলতার আরেক নাম।) বলা বাহুল্য এই দুর্বলতা শারীরিক নয়, চারিত্রিক। এইসব কথা পুরুষেরই সৃষ্টি।
ভারতীয় সভ্যতায় বিশেষ করে বৈদিক সমাজে যে সতীদাহ প্রথা চালু ছিল তাতে বোঝা যায় নারীকে সকল সভ্যতায় বিসর্জনযোগ্য ব্যক্তি মনে করা হয়েছিলো। এমনকি ১৯৮৭ সালে এসেও রূপ কানোয়ার নামে রাজস্থানের এক অষ্টাদশীর স্বামীর মৃত্যুর পর সতীদাহ প্রথা গ্রহণ করে বিশ্ববিবেককে চরম ক্ষুব্ধ করে। রাজা রামমোহন রায়ের প্রচেষ্টায় এবং উইলিয়াম লর্ড বেন্টিংয়ের উদ্যোগে ১৮২৯ সালে সতীদাহ বেআইনি ঘোষণা করা হলেও সমাজ থেকে এটি সহসা অবলুপ্ত হয়নি।
রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পগুলির মূল বার্তা হলো যে সমাজে নারীর কোন শক্তিশালী অবস্থান নেই। তিনি সতীদাহ প্রথা সহ সকল নারী অবনমনের ্িবপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর ছোট কন্যা মীরার স্বামী নগেনকে তিনি যতো চিঠি লিখেছেন, তার প্রতিপাদ্য বিষয় হলো মীরা নারী বলেই তার যে কোন মানসিক স্বাধীনতা থাকবে না তা নয়। আমরা “হৈমন্তী”র ট্র্যাজিক জীবনের কথা সবাই জানি।
নারীবিদ্বেষী আরেকটি প্রচলন ছিল পশ্চিমা দেশগুলোতে যেখানে নারীকে ডাইনি হিসেবে দেখা হতো। স্কটল্যান্ডের রাজা ষ্ষ্ঠ জেইমস, যিনি পরে ইংল্যান্ডে রাজা প্রথম জেইমস হিসেবে ১৬০৩ সালে সিংহাসন আরোহন করবেন, তিনি ডাইনিতত্ত্বে বিশ্বাস করতেন এবং ১৫৯০-৯২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি নর্থ বারউইক উইচ ট্রায়াল নিজেই পরিচালনা করেন, এবং ১৫ থেকে ২০জন রমণীকে ডাইনি খেতাব দিয়ে মৃত্যুদণ্ড করান। ঝুলিয়ে অথবা পুড়িয়ে। তাঁর এ অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে তিনি ১৫৯৭ সালে ডিমোনোলোজি নামক একটি বই লিখেন, যেখানে ডাইনিতত্ত্বে তাঁর বিশ্বাস তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
অনুরূপভাবে আমেরিকায়, অর্থাৎ নিউ ইংল্যান্ডে, রমণীদেরকে ডাইনি সন্দেহে ঝোলানো, লিঞ্চিং কিংবা পোড়ানো হতো। সেরকম ঘটনার মধ্যে বিখ্যাত হয়ে আছে ১৬৫৬ সালে অনুষ্ঠিত এ্যান হিবিনসের ট্রায়াল, যিনি উচ্চ ঘরানার রমনী ছিলেন, কিন্তু ডাইনি হিসেবে কথিত হবার পর তাঁর মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। নাথানিয়েল হর্থনের বিখ্যাত উপন্যাস দ্য স্কারলেট লেটার-এ মিসট্রেস হিবিনস নামে তিনি অংকিত হোন। অনুরূপভাবে ১৬৯২ সালে সালেম উইচ ট্রায়ালে ২০ জন রমণীকে ডাইনি কথিত করে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়। কথাসাহিত্যিক শার্লি জ্যাকসনের একটি বিখ্যাত গল্প “দ্য লটারি”-র বিষয় হলো আ্যান হাচিনসনকে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলার বর্ণনা।
এবার আমি শেষ প্রসঙ্গে আসতে চাই। বাংলা বাগ্ধারায় “অসুর্যম্পশ্যা নারী” কথাটির প্রচলিত আছে, যার অর্থ হলো যে নারী সূর্যের আলো দেখে না। আমি একটা শক্ত কথা বলতে চাই: আমাদের নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি, নারীর শিক্ষাগ্রহণ ও ক্ষমতায়নও বহুগুণ বেড়েছে, এবং বলা যায় বাংলাদেশ নারী জাগরণের ক্ষেত্রে অনন্য বৈশিষ্ট্যের দাবিদার। কিন্তু মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে যে নারী মাত্রই অসূর্যম্পশ্যা থাকবে, নারী মাত্রই থাকবে ঘরের আসবাবপত্রের মতো জড় বস্তু হিসেবে।
শিক্ষিত সমাজে আমি একটি প্রকরণ লক্ষ করেছি। দুটো পরিবারের মধ্যে ভালো সামাজিক অবস্থান ও আর্থিক সম্পন্নতা দেখে বিয়ে হলো। স্বামীও শিক্ষিত, স্ত্রীও শিক্ষিত। কিন্তু বিয়ের সপ্তাহখানিক যেতে না যেতেই স্ত্রীকে ঘরে বান্ধার ব্যবস্থা শুরু হয়। রান্নাঘরে, এবং সন্তানাদি পালনে। চাইল্ড বেয়ারিং এবং চাইল্ড রেয়ারিং শুধু হয় তাদের কাজ। আর যেটি সবচেয়ে বড় অপরাধ, যেটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ তাঁর জামাতা নগেনকে বারবার সচেতন করার প্রয়াস নিয়েছিলেন সেটি হলো তাঁর স্বাধীনতা হরণ করা। আমি খুব কাছে থেকে অনেক পরিবারকে জানি যাঁদের স্ত্রীদের সামান্য স্বাধীনতার ক্ষেত্রে–শপিং, বেড়ানো, পড়াশুনা সকল বিষয়ে স্বামীর মতামত নিতে হয়। ফলে হয় কি, এসব নারীরা যুগক্রমে নিজেদের কাছেই নিজেরাই অচেনা হয়ে যায়, তাদের সকল রকমের প্রাণচাঞ্চল্যের কবর হয়, আর তখন জিইয়ে থাকে তাদের শুধু ক্ষয়প্রাপ্ত শরীরের অস্তিত্ব। তখন একটা মজার ব্যাপার আমি লক্ষ করেছি। যে সব পরিবারে শিক্ষিত স্বামী কর্র্তৃক শিক্ষিত রমণীকে রান্নাঘরের আর সন্তানাদির দোহাই পেড়ে রজ্জু দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়, সে সব নারীর কালক্রমে বন্দিদশায় থাকতে থাকতে শরীরে নানান অসুখ জট বাঁধতে থাকে, এবং বার্ধক্যে পৌঁছালে সেসব রোগ মহিলাদেরকে প্রায় চলৎশক্তি রহিতকরণের দিকে নিয়ে যায়। তখন আরেকটা মজার ব্যাপার ঘটে। যখন এই সব পরিবারের স্বামীদেরকে তাঁদের স্ত্রীদের কথা জিজ্ঞেস করি, তখন তাঁরা মুখে ঝোল টেনে কী বলে জানেন? বলেন, ওর তো হাঁটুর ব্যথা, বা পিঠের ব্যথা, প্রেশারের সমস্যা, ডায়াবেটিসের সমস্যা, কয়েকবার ইন্ডিয়া নিয়ে গেছি, সিঙ্গাপুর নিয়ে গেছি, ব্যাংকক নিয়ে গেছি, বা আমেরিকায় চিকিৎসা করিয়েছি, কোন কাজ হচ্ছে না। একটু দোয়া করবেন ভাই। আমি হাসি, কেননা স্ত্রীর অসুখের জন্য বিরাট টাকা খরচ করছেন এগুলি বলে স্বামীরা আত্মসন্তুষ্টি পেতে চান যে তাঁদের স্ত্রীদের প্রতি বহু মহব্বত, তাই এত খরচ করছেন। কিন্তু এই কথা একবারও ভাবেন না যে স্ত্রীর এই শারীরিক বৈকল্যের পেছনেতো স্বামীরাই সম্পূর্ণ দায়ী। স্বামীদের চরিত্রের এই অস্বাভাবিক বৈপরীত্য আমাদেরকে জানিয়ে দেয় যে কতোটা মেকী চরিত্র ধারণ করে আমার জীবনযাপন করি। এইদিক থেকে আমাদের নারীরা অসূর্যস্পশ্যা।
নারীর মুক্তি ও স্বাধীনতার ব্যাপারে আমাদের সমাজ এখনও বেগম রোকেয়ার যুগে আছে।
মোহীত উল আলম, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও প্রাবন্ধিক
চট্টগ্রাম

