গাজী গিয়াস উদ্দিন
আদর্শ গৃহবধূর চিন্তা গৃহবান্ধব চিরদিন করেছে। অথচ আদর্শ গৃহস্বামীর সম্পর্কে ভেবেছে কতটুকু?
সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে – এ আপ্তবাক্যের সারকথা হতে পারে- ” খাওয়া দাওয়া, আরাম আয়েশ সুখের হয় রমণীর গুণে “। এ কথাটাও যুক্তিসিদ্ধ নয়।রান্নাঘর, বাচ্চাকাচ্চা থেকে অফিস আদালত পর্যন্ত সব সামলাবে নারী, এতো স্বার্থের কথা পুরুষ কেন ভাববে? এ যে রীতিমতো অন্ধ জুলুম।অত্যাচারী রাজার প্রজা নিপীড়নের মতো গৃহকোণে নারী শাসিত শোষিত, লাঞ্ছিত-বঞ্চিত ও অপমানিত হয়ে আসছে সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে পুরুষের একচেটিয়া রাজত্বের কারণে।
নারী আজো রাজত্ব সৃষ্টির কথা পুরোপুরি ভাবে নাই। যদিও বেগম রোকেয়ার নারীস্থানের নাট্যরূপ (ইংরেজিতে ‘ সুলতানাস ড্রিম’ অবলম্বনে) দেখলে পুরুষ জনম আতংক অনুভব করবে।
নারী পুরুষ মিলেমিশে সুখের সংসারে সহাবস্থানের ফর্মুলা কি? একহাতে তালি বাজবেনা।আদর্শ গৃহস্বামী লাগবে।
একজন সম্মানিত নারী যদি আমাকে প্রশ্ন করেন, লেখক বলুনতো আদর্শ গৃহস্বামী কাকে বলে। প্রত্যুত্তরে আমি যা বলবো,নারী হয়তো তা বিশ্বাস করতে চাইবেনা, তবুও পুরুষ সমাজের জ্ঞাতার্থে বলি,আদর্শ গৃহস্বামীর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তিনি নারীর অধিকার, সম্মান, সমতা রক্ষায় এবং গুণ ও কর্মের স্বাভাবিক বিকাশে পূর্ণ সচেষ্ট থাকবেন। জানি,ধারণাটি প্রচুর বিতর্কের।
সে শৌখিন পাখি পোষকের কথা আমরা ভাবতে পারি।যিনি মন ভালো থাকলে খাঁচার পাখিটিকে পছন্দের খাবার দাবার দেয়,আর পাখির ব্যবহারে নাখোশ হলে পিটায়,নইলে উপোস মারে,কিন্তু বন্দিত্ব থেকে মুক্তি দেয়না।তেমনি বহু গৃহবধূ খাঁচার পাখির মতো মুক্তির আশায় দিনরাত ছটফট করে,বন্দিত্বের শৃঙ্খল ভাঙতে পারেনা।রবীন্দ্রনাথের ” অপরিচিতা” ছোটগল্পের কল্যাণী কজন নারী হতে পারবে? কজন পিতা শম্ভুনাথ সেন হয়ে কন্যার পাশে দাঁড়াতে পারবে?
জীবনের প্রতিচ্ছবি হয়তো আমরা রবীন্দ্রনাথের ” শেষের কবিতা ” উপন্যাসের কাহিনি থেকে নিতে পারি।শেষের কবিতার প্রেম, জীবনের তাৎপর্য এবং ব্যক্তিত্বের সংঘাত লক্ষ্যণীয়। অমিত- লাবণ্য প্রেম শুধু রোমান্টিক আকর্ষণ নয়, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গভীর সম্পর্কের প্রতিফলন। অমিত- কেতকী আর লাবণ্য – শোভনলাল সমাপ্তিতে মনে হয়, এ প্রেমে ব্যথা থাকলেও যন্ত্রণা নেই। আকর্ষণ থাকলেও কাহিনি সংঘাতময় নয়।
” ভালোবাসা অনেকটা অত্যাচার চায়,অত্যাচার করেও।” – নায়ক নায়িকা উভয়ে এ সত্যকে মেনে নিতে পেরেছে বলেই শেষ পর্যন্ত তাদের জীবনে বিরহ এলেও প্রেমে ব্যর্থতা আসেনি।
অমিতের এ ভাষ্য নিতান্ত ব্যতিক্রম :
” কেতকীর সাথে আমার সম্বন্ধ ভালোবাসারই।কিন্তু সে যেন ঘড়ায় তোলা জল- প্রতিদিনই তুলব – প্রতিদিন ব্যবহার করব।আর লাবণ্যের সঙ্গে আমার যে ভালোবাসা সে রইলো দীঘি, সে ঘরে আনবার নয়,আমার মন তাতে সাঁতার দেবে “।
এ যেন ক্ষুদ্রতা থেকে পূর্ণতা। রসপিপাসু পাঠকের কাছে এক সার্থক গল্প। কিন্তু বাস্তব জীবনের জন্যেও কি সার্থক?
বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাস ” তিথি ডোর” এর রাজেন বাবুর কথা শুনুন।রাজেন প্রথম সন্তান মেয়ে চেয়েছে। নাম দিয়েছে শ্বেতা।সংসারী রাজেন অসাধারণ মানুষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী মধ্যবিত্ত সমাজের চিত্র ” তিথি ডোর “। গল্পে স্বাতী – সত্যেন। সত্যেনের অতি সংযমী প্রেম,পুরো উপন্যাস জুড়ে নিঃসঙ্গতার ছাপ।মহাকাব্যিক এক কোমল উপন্যাসের অংশ।
এক চিঠিতে স্বাতী সত্যেনকে লেখে,
মন খারাপ মানুষের কখন লাগে আর কেন লাগে- তার কি কোনো নিয়ম আছে? কিছুর মধ্যে কিছু না- সব ঠিক- সব ভালৃ হঠাৎ শ্রীযুক্ত মন খারাপ এসে হাজির হলেন, যেন আর নড়বেন না এখান থেকে। তা লোক কিন্তু উনি তত খারাপ নন, মানে- মন খারাপ হওয়াটাই যে খারাপ তা কিন্তু ঠিক না- আমার তো বেশ ভালই লাগে একেক সময়।
আর মন খারাপের ভাল লাগাটা বলতে হয়- মানে, বলতে চায় মানুষ, কিন্তু বলতে পারে না। আর পারে না বলেই কি গান বানায়, কবিতা লেখে?”
মানুষের হৃদয়ের গহীন অনুভূতির কী সাবলীল আর প্রাণবন্ত স্ফূরণ! মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এর ‘ পুতুল নাচের ইতিকথা ‘ উপন্যাসের শশীর চরিত্র।
শশীর চরিত্রে দুই সুস্পষ্ট ভাগ আছে। একদিকে তাহার মধ্যে যেমন কল্পনা, ভাবাবেগ ও রসবোধের অভাব নাই, অন্যদিকে তেমনি সাধারণ সাংসারিক বুদ্ধি ও ধনসম্পত্তির প্রতি মমতাও তাহার যথেষ্ট। তাহার কল্পনাময় অংশটুকু গোপন ও মূক। অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে তাহার সঙ্গে না মিশিলে একথা কেহ টের পাইবে না যে তার ভিতরেও জীবনের সৌন্দর্য ও শ্রীহীনতার একটা গভীর সহানুভূতিমূলক বিচার-পদ্ধতি আছে। তাহার বুদ্ধি, সংযম ও হিসাবি প্রকৃতির পরিচয় মানুষ সাধারণত পায়। সংসারে টিকিবার জন্য দরকারি এই গুণগুলির জন্য শশীকে সকলে ভয় ও খাতির করিয়া চলে।
শশীর চরিত্রের এই দিকটা গড়িয়া তুলিয়াছে তাহার বাবা গোপাল দাস।
গোপাল দাসের কারবার লোকে বলে গলায় ছুরি দেওয়া। আসলে সে করে সম্পত্তি কেনাবেচা ও টাকা ধার দেওয়া। অর্থাৎ দালালি ও মহাজনি। শোনা যায়, এককালে সে নাকি বার-তিনেক জীবন্ত মামুষের কেনাবেচার ব্যাপারেও দালালি করিয়াছে—তিনটি বৃদ্ধের বউ জুটাইয়া দেওয়া। সে আজকের কথা নয়। বৃদ্ধ তিনজনের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হইয়াছে। এখন যামিনী করিরাজের মরণ হইলেই ব্যাপারটা পুরোপুরি ইতিহাসের গর্ভে তলাইয়া যাইতে পারে। কিন্তু যামিনী কবিরাজের বউ, শশী যাহাকে সেনদিদি বলিয়া ডাকে এবং শশীকে যে অপুত্রবতী রমণী গভীরভাবে স্নেহ করে, স্বামীকে সে এত যত্নে এত সাবধানে বাঁচাইয়া রাখিয়াছে যে শীঘ্র যামিনী কবিরাজের মরিবার সম্ভাবনা নাই। যামিনী কিন্তু মরিতে চায়। গ্রামের কলঙ্ক রটানোর কাজে উৎসাহী নিষ্ক্মা ব্যক্তির সংখ্যা এত বেশি যে, এতটুকু এদিক ওদিক হইলে গ্রামের বউ-ঝিদের কলঙ্ক দিগদিগন্তে রটিয়া যায়। কেহ বিশ্বাস করে, কেহ করে না। যে বিশ্বাস করে সেও সত্যামিথ্যা যাচাই করে না, যে অবিশ্বাস করে, সেও নয়। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্নটা নির্ভর করে মানুষের খুশির ওপর। গ্রামের কলঙ্কিনীদের মধ্যে শশীর সেনদিদির প্রসিদ্ধিই বেশি। গোপালের সঙ্গেই তার নামটা জড়ানো হয় বেশি সময়। লোকে নানা কথা বলাবলি করে। শশী বিশ্বাস করে না। যামিনী করে। সে খুড়খুড়ে বুড়া। সন্দেহের তীব্র বিষে সে দগ্ধ হইয়া যায়। স্ত্রী পাড়ার কারো বাড়ি গেলে রাগে-দুঃখে এক-একদিন সে কাঁদিয়াও ফেলে। স্ত্রীর কায়েতবাড়ি কাসুন্দি বানাইয়া আসার কৈফিয়তটা সে বিশ্বাস করে না। অথচ শশীর সেনদিদি সত্য কৈফিয়তই দেয়। অতীতে কখনও সে যদি কোনো অন্যায় করিয়া থাকে, তাহা অতীতের সত্যমিথ্যা পাপপুণ্যে মিশিয়া আছে। উন্মাদ ছাড়া আজ শশীর সেনদিদিকে কেহ অবিশ্বাস করিবে না। বুড়া হইয়া যামিনীর মাথাটা খারাপ হইয়া গিয়াছে।
মুজতবা আলীর ভ্রমণ কাহিনির ঘ্রাণ ‘শবনম’ উপন্যাসে পাওয়া যাবে, আফগানিস্তানের কাবুল, পাগমান, মাজার-ই-শরীফ তো আছেই, সাথে আছে বাংলাদেশের সিলেট। উপন্যাসটি আত্মবর্ণনায় লেখা বলে, পাঠকের বারবার মনে হবে, সত্যিই কি মুজতবা আলীর সাথে শবনম নামের কোনো নারীর প্রণয় ছিল? সে জিজ্ঞাসার উত্তর তিনি নিজেই দিয়েছেন, তার ভ্রাতুষ্পুত্র, বাংলাদেশ সরকারের সাবেক রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীর প্রশ্নে,
বাঘে মানুষ খায়, এটা সত্যি তো, না কি? হ্যাঁ, তা তো বটেই।’ তা হলে এই বাঘে মানুষ খেয়েছে কি না তা দিয়ে কম্মটা কী? কী আর বলব, বোকার মতো মুখ করে বসে রইলাম। চাচা বললেন, “শোনো, যুবক-যুবতী প্রেম করে, সেটা যেমন সত্যি, এই গপ্পও তেমনই সত্যি! তবে তুমি যেহেতু গাড়ল, তাই খোলসা করে বলছি। কাবুলে থাকাকালীন একজন কাবুলি নারীর সঙ্গেই আমার পরিচয় হয়েছিল। সে আমার বাড়ি রোজ সকালে দুধ দিয়ে যেত। তার বয়স ৮০!” আমার বিস্ময় কাটানোর জন্যই বোধহয় আরও একটু যোগ করেছিলেন চাচা, “ভাতিজা, বাড়াও, বাড়াও! কল্পনাশক্তিটা আর একটু বাড়াও হে!”
উপন্যাসটি সৈয়দ মুজতবা আলী তার স্বভাবসুলভ বেশ কিছু চমৎকার উক্তি উপস্থাপনে ভোলেননি; তার কয়েকটি তুলে দিচ্ছি,
“আমি শ্রীকৃষ্ণ নই; জাত ধম্মো বাঁচাবার ভার আমার স্কন্ধে নয়।”
“ধারের বইয়ে নাকি বিদ্যার্জন হয় না।”
“শত্রু বেদনা দেয় মিলনে, মিত্র দেয় বিরহে”
শবনম তার প্রেমিক মজনূনের প্রতি আবেদন জানিয়েছিল, “আমার মিলনে তুমি অভ্যস্ত হয়ে যেও না।” বোধকরি সে কারণে তাদের সুখের দিনগুলো বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। আবার বিপরীত আকুতিও ছিল শবনমের, “আমার বিরহে তুমি অভ্যস্ত হয়ে যেও না”। উপন্যাস পড়া শেষ করেও পাঠকের মনে হবে, শেষ হয়েও হইল না শেষ। এ আক্ষেপের উত্তরও দিয়েছে শবনম তার প্রেমিক মজনূনের কাছে,
“গোড়া আর শেষ, এই সৃষ্টির জানা আছে, বল কার?
প্রাচীন এ পুঁথি, গোড়া আর শেষ পাতা কটি ঝরা তার?”
কবে কোথায় আমরা আদর্শ গৃহস্বামী এবং আদর্শ গৃহলক্ষ্মীও পাবো।বাংলার ঘরে ঘরে এদের সদর্প সুন্দর আদর্শিক বিচরণে জগৎ আলোকিত হয়ে উঠবে।প্রতি জোড়া নরনারীর সংসার সুখের নীড়ে পরিণত হবে।মর্ত্যে স্বর্গ স্বপ্ন রচনা মানুষের পক্ষেই সম্ভব।
গাজী গিয়াস উদ্দিন, কবি ও প্রাবন্ধিক
নোয়াখালী

