এখন সময়:রাত ৩:৪৪- আজ: শুক্রবার-২০শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৬ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-বসন্তকাল

এখন সময়:রাত ৩:৪৪- আজ: শুক্রবার
২০শে মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-৬ই চৈত্র, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ-বসন্তকাল

কাজী নজরুল ইসলামের নারীবাদীচেতনা ও সাম্যবাদ

লুৎফা শাহিন

 

কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) বাংলাসাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি শুধু বিদ্রোহী কবি নন, মানবতাবাদ, সাম্যবাদ ও নারী মূর্তির কণ্ঠস্বরও তাঁর সৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু। ঔপনিবেশিক শাসন, সাম্প্রদায়িক বিভাজন ও সামাজিক বৈষম্যের প্রেক্ষাপটে নজরুল একদিকে যেমন শোষণবিরোধী সংগ্রামের ডাক দিয়েছেন, অন্যদিকে নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে অসাধারণ ¯পষ্টভাষিতা প্রদর্শন করেছেন। তাঁর সাহিত্যকীর্তি আধুনিক বাংলাসাহিত্যে নারীবাদ ও সাম্যবাদের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে মূল্যায়িত হয়ে আসছে। কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) বাংলাসাহিত্যের আধুনিক যুগের অন্যতম প্রধান কবি। তাঁর কাব্যে যে তিনটি মূল দিক ¯পষ্ট হয়ে ওঠে, তা হলো—

১. বিদ্রোহী চেতনা,

২. সাম্যবাদী মানবতাবাদ,

৩. নারী-পুরুষ সমতার ঘোষণা।

 

নজরুলের নারীবাদীচেতনা ও মূলভিত্তি

কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাসাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় নাম। তার সৃষ্টিকর্মের বিশাল ভান্ডার বাংলা সাহিত্যকে করেছে সমৃদ্ধ। তিনি শুধু কবি বা সাহিত্যিক নন, তিনি ছিলেন একাধারে বিদ্রোহী, সাম্যের প্রবক্তা এবং সর্বোপরি একজন নারীবাদী। তার লেখায় নারীবাদীচেতনা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুগভীর। নজরুল তার সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে সমাজের প্রচলিত প্রথা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং নারী-পুরুষের সম-অধিকারের পক্ষে জোরালোভাবে কথা বলেছেন। নজরুলের নারীবাদীচেতনার মূলভিত্তি ছিল সাম্য, প্রেম ও বিদ্রোহ। তিনি নারীকে শুধুমাত্র ভোগ্যপণ্য বা গৃহস্থালির কাজে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখেছেন। তার কবিতায় নারী শুধুমাত্র জননী, জায়া বা ভগিনী নয়, বরং তিনি সংগ্রামী, বিদ্রোহী এবং পুরুষের সহযোদ্ধা। সাম্যে নজরুল বিশ্বাস করতেন যে মানব সমাজ নারী ও পুরুষ উভয়ের সমান অবদানে গঠিত। তার বিখ্যাত ‘নারী’ কবিতায় তিনি ¯পষ্ট ভাষায় বলেছেন- ‘বিশ্বে যা কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি অর্ধেক তার আনিয়াছে নর অর্ধেক তার নারী।’ এই পঙক্তিগুলোর মাধ্যমে তিনি মানব সভ্যতার সকল ভালো-মন্দ কাজে নারী-পুরুষ উভয়ের সমান অবদানের কথা  তুলে ধরেছেন। প্রেম ও বিদ্রোহে নজরুলের কবিতায় প্রেমের এক ভিন্নরূপ দেখা যায়। তার প্রেম কোনো সাধারণ রোমান্টিক প্রেম নয়, বরং তা ছিল সাম্য ও বিদ্রোহের প্রেম। তিনি নারীকে প্রেমিকা হিসেবে যেমন বর্ণনা করেছেন, তেমনি পুরুষের মতোই তাকে বিদ্রোহের সঙ্গি হিসেবেও দেখেছেন।

 

নজরুলের সাহিত্যকর্মে নারীবাদীচেতনার প্রকাশ

নজরুলের সাম্যবাদিচেতনা অত্যন্ত ব্যাপক ও বৈচিত্র্যময়। তার কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস এবং প্রবন্ধে এই চেতনা সু¯পষ্ট—

১. কবিতা- তার নারীবাদীচেতনার সবচেয়ে শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে ‘নারী’ কবিতায়। এই কবিতায় তিনি নারীকে পুরুষের সমান মর্যাদায় আসীন করেছেন এবং নারী-পুরুষের পার¯পরিক নির্ভরশীলতার কথা বলেছেন। এছাড়া ‘বারাঙ্গনা’ কবিতায় তিনি সমাজের তথাকথিত পতিতা নারীদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন এবং সমাজের দ্বিচারিতার তীব্র সমালোচনা করেছেন।

২. গল্প ও উপন্যাস- তার ‘ব্যথার দান’, ‘রিক্তের বেদন’ বা ‘মৃত্যুক্ষুধা’র মতো গল্প ও উপন্যাসে তিনি নারী চরিত্রের মাধ্যমে তাদের দুঃখ, কষ্ট, সংগ্রাম এবং প্রতিরোধের চিত্র তুলে ধরেছেন। এই চরিত্রগুলো ছিল স্বাধীনচেতা ও সংগ্রামী।

৩. গান- নজরুলের অসংখ্য গানেও নারীবাদীচেতনার প্রতিফলন দেখা যায়। যেমন, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রানী’ গানে তিনি নারীকে শুধু প্রেমিকা হিসেবে নয়, বরং জীবনের সকল ক্ষেত্রে পুরুষের সমান সঙ্গি হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। নজরুল ও অন্যান্য সাহিত্যিকের নারীবাদীচেতনার পার্থক্য নজরুলের নারীবাদীচেতনার প্রধান পার্থক্য হলো তার বিদ্রোহী ও বিপ্লবী মনোভাব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা অন্যান্য সাহিত্যিকদের রচনায় নারীবাদীচেতনা থাকলেও তা ছিল মূলত সীমাবদ্ধ। তারা নারীকে শ্রদ্ধার চোখে দেখলেও নজরুলের মতো সরাসরি সমাজের বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেননি। নজরুল নারী-পুরুষের বৈষম্যকে কোনোভাবেই মেনে নেননি, বরং এটিকে অন্যায় বলে চিহ্নিত করে এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন যেমন-

১. নারী-পুরুষ সমতার ঘোষণা নজরুল প্রথমদিকের কবিদের একজন যিনি সরাসরি নারী-পুরুষ সমতা দাবি করেন। তাঁর প্রবন্ধ ‘নারী’ (ধূমকেতু, ১৯২০)-তে তিনি লেখেন ‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ এখানে নারীর সৃষ্টিশীল শক্তিকে তিনি পুরুষের সমান মর্যাদা দিয়েছেন।

২. সামাজিক কুসংস্কার ভাঙার প্রচেষ্টা তৎকালীন সমাজে নারীকে শুধু সংসারবন্দি ও গৃহিণীরূপে দেখা হতো। নজরুল এ ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন নারী কেবল সংসারের সামগ্রী নয়; নারী হলো সৃষ্টির সহধর্মিণী (প্রবন্ধসংগ্রহ, ১৯২৬)

৩. নারীকে সংগ্রামীরূপে কল্পনা নজরুল নারীর রূপকল্প তৈরি করেন শক্তিশালী ও সংগ্রামী চরিত্রে। যেমন বিদ্রোহী কবিতায় তিনি নারীর প্রতিমা এঁকেছেন যুদ্ধদেবী, অগ্নিকন্যা, দুর্জয়িনীরূপে। ‘আমি রণচন্ডী, আমি ধ্বংসের নেশায় মাতি।’

৪. নারীর স্বাধীনসত্তা তিনি নারীর আত্নপ্রকাশ ও স্বশাসনের কথা বলেন। তাঁর মতে, নারীকে কেবল মাতৃত্ব বা সৌন্দর্যের গন্ডিতে আবদ্ধ না রেখে পূর্ণ মানবসত্তায় মূল্যায়ন করতে হবে।

নজরুলের এই নারীবাদীচেতনা ছিল তার মানবতাবাদী দর্শনেরই একটি অংশ। তিনি সমাজের সকল প্রকার অন্যায়, অবিচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তার লেখায় নারী স্বাধীনতার যে বার্তা পাওয়া যায়, তা আজও আমাদের সমাজে প্রাসঙ্গিক। নজরুল নারী-পুরুষের জন্য একটি সমতাপূর্ণ সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে নারী তার যোগ্যতা ও স্বাতন্ত্র্য নিয়ে স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারবে। আসলে নজরুলের সাম্যবাদীচেতনা কোনো তাত্ত্বিক ধারণা নয়, বরং তা তার জীবনের এক বাস্তব প্রতিফলন। তিনি নিজে শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের কষ্ট অনুভব করেছিলেন এবং সেই অনুভব থেকেই তার লেখা থেকে উৎসারিত হয়েছিল সাম্য ও মুক্তির বাণী। তার এই দর্শন আজও আমাদের সমাজে প্রাসঙ্গিক, কারণ সমাজে এখনো ধনি-দরিদ্রের বৈষম্য, সাম্প্রদায়িকতা এবং লিঙ্গ বৈষম্য বিদ্যমান। নজরুল তার সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে আমাদের মনে করিয়ে দেন যে মানবতা এবং সাম্যই হলো জীবনের সবচেয়ে বড় ধর্ম। আমরা জানি- রবীন্দ্রনাথের কাব্যে নারী চিত্রণ প্রধানত রোমান্টিক ও নান্দনিকতায় সীমাবদ্ধ থাকলেও নজরুল নারীকে দেখেছেন সংগ্রামী, সৃষ্টিশীল ও সমঅধিকারের অংশীদাররূপে। একইসঙ্গে তিনি শ্রেণি, বর্ণ, ধর্ম ও লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাম্যের কণ্ঠস্বর উঁচু করেছেন। এই আলোচনায় দুটি তাত্ত্বিক ধারা ব্যবহৃত হয়েছে-

১. নারীবাদী সাহিত্য সমালোচনা — যেখানে নারী-পুরুষের ক্ষমতার অসমতা ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য বিশ্লেষণ করা হয়।

২. সাম্যবাদী/মার্কসবাদী সাহিত্যতত্ত্ব- যেখানে অর্থনৈতিক শ্রেণি, শ্রমজীবী মানুষ ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন আলোচিত হয়।

 

নজরুলের নারীবাদীচেতনা

নজরুলের নারীবাদিচেতনার সমতাবিধানের বিশ্লেষনে আমরা পাই —

১. নারী-পুরুষ সমতার ঘোষণা নজরুলের প্রবন্ধ নারী (১৯২০)- তে তিনি লেখেন ‘বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।’ এটি কেবল কাব্যিক উর্মি নয়; বরং নারীকে সৃষ্টির সমঅংশীদার ঘোষণা।

২. নারীকে সংগ্রামীরূপে কল্পনা বিদ্রোহী কবিতায় নারীকে কেবল প্রেমিকা নয়, বরং যুদ্ধদেবীরূপে দেখা যায় ‘আমি রণচন্ডী, আমি ধ্বংসের নেশায় মাতি।’

৩. কুসংস্কার ও বদ্ধধারার বিরুদ্ধে অবস্থান তৎকালীন সমাজে নারীর অবস্থান ছিল সংসারকেন্দ্রিক। নজরুল বলেন ‘নারী কেবল সংসারের সামগ্রী নয়; নারী হলো সৃষ্টির সহধর্মিণী।’ (প্রবন্ধসংগ্রহ,১৯২৬)

৪. নারীর আত্মমর্যাদা তিনি নারীকে শুধুমাত্র মাতৃত্ব বা সৌন্দর্যের প্রতীক না ভেবে স্বশাসিত সত্তা হিসেবে চিত্রিত করেছেন। নজরুলের নারীবাদীচেতনা কেবল তাত্ত্বিক নয়; তাঁর কাব্য ও প্রবন্ধে তা জীবনঘনিষ্ঠ অভিজ্ঞতায় রূপ নিয়েছে। নারীর প্রতি সমাজের বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি ভাঙতে তিনি চেয়েছেন নারীকে সংগ্রামী, সমঅধিকারী ও মানবতার সহযাত্রী হিসেবে দেখতে।

অন্যদিকে, সাম্যবাদীচেতনায় তিনি সকল শ্রেণি-বর্ণ-ধর্মকে সমান মর্যাদা দিতে চেয়েছেন। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে এবং অর্থনৈতিক শোষণ-বৈষম্যের প্রতিবাদে তিনি বাংলার জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন। আন্তর্জাতিক বা বিদেশি গবেষণায় নজরুলের নারীচেতনা সম্পর্কে কিছু ভাবনা নজরুলের নারীপ্রেম এবং নারীবাদিচেতনার আন্তর্জাতিক মহলে বিশ্ব বরেণ্য সাহিত্যিকদের বিভিন্ন মন্তব্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে দেখি—

১. ‘ঈড়সঢ়ধৎধঃরাব অহধষুংরং ড়ভ জবঢ়ৎবংবহঃধঃরড়হং ড়ভ ডড়সবহ রহ ঘধুৎঁষ’ং ‘ডড়সধহ’, ‘গধহ,’ ‘চড়াবৎঃু’ ধহফ ঝযধশবংঢ়বধৎব’ং ঐধসষবঃ ধহফ ঞযব ঞবসঢ়বংঃ’ — বিদেশি গবেষকরা (ঘঁৎ ঘধযধৎ ঊসধ ও ঝধষসধ ঐধয়ঁব) বিশ্লেষণ করেছেন যে নজরুলের কবিতা ‘ডড়সধহ’, ‘গধহ’, ‘চড়াবৎঃ’ ইত্যাদিতে নারীর দুঃখ, দমন ও সামাজিক কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কথা বলা হয়েছে; নারীদেরকে কেবল নির্ভরশীল বা চরিত্রহীন মানুষ হিসেবে দেখা হয়নি, বরং তিনি তাঁদেরকে জীবন্ত ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন যারা সামাজিক বাধা ও পুরুষতান্ত্রিক কায়দার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে চায়।

২. ‘ছধুর ঘধুৎঁষ ওংষধস ঋড়ৎ ডড়সবহ’ং ঊসধহপরঢ়ধঃরড়হ’ পাকিন্তানের একটি জেন্ডার স্টাডিজ জার্নালে ড. মোহাম্মদ আবু তৈয়্যব খান লিখেছেন, নজরুল নারী মুক্তির দাবি করেছেন এবং নারী-পুরুষের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে কথা বলেছেন; তিনি শুধু ব্যতিক্রমী ক্ষেত্রে নয়, সামগ্রিকভাবে পুরুষ-নারীর সমানতার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন।

৩. ‘ঊফঁপধঃরড়হধষ ঞযড়ঁমযঃং ড়ভ কধুর ঘধুৎঁষ ওংষধস ধহফ ওঃং জবষবাধহপব রহ ঈড়হঃবসঢ়ড়ৎধৎু ঊৎধ’ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক/বিনিময়মূলক গবেষণায় বলা হয়েছে, নজরুল শিক্ষার প্রসারে নারীর ভূমিকার উপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন এবং শিক্ষাকে নারীর অধিকার ও সবার সমতার একটি অন্যতম উপাদান হিসেবে দেখতেন।

৪. ‘টহরাবৎংধষ ঐঁসধহরংঃ ধহফ ঊমধষরঃধৎরধহ চড়বঃ ঘধুৎঁষ: অ জবারবি রহ ঃযব ষরমযঃ ড়ভ ঘধুৎঁষ চড়বঃৎু’ মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক একটি ইংরেজি ভাষার সাময়িকীতে লেখা একটি রিভিউতে তাঁকে মানবতাবাদী ও সমতার কবি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; তাঁর লেখায় সামাজিক অন্যায়, উপনিবেশবাদ, দারিদ্র ও লিঙ্গবৈষম্য যে সব বিষয়ে সাধারণত রাজনীতি ও সাহিত্য মিলিতভাবে কাজ করে সে সব বিষয়ে নজরুল ব্যাপকভাবে শব্দ বলেছিলেন। আমরা ¯পষ্ট কোনো ‘বিদেশি ব্যক্তির সরাসরি উদ্ধৃতি’ (যেমন কোনও ইংরেজি বক্তার বক্তৃতা যা ঘধুৎঁষ ধংংবৎঃবফ ড়িসবহ’ং ৎরমযঃং…’নামে) খুব বেশি খুঁজে পাইনি যা নির্ধারিতভাবে নারীচেতনার প্রসঙ্গে বলেছে, তবে অনেক গবেষকদের মুখোওল বক্তব্য আছে। যেমন- ‘ঘধুৎঁষ ঢ়ৎড়ভবংংবফ ভধরঃয রহ ধনংড়ষঁঃব মবহফবৎ বয়ঁধষরঃু, ধ ারবি যরং পড়হঃবসঢ়ড়ৎধৎরবং পড়হংরফবৎবফ ৎবাড়ষঁঃরড়হধৎু.’  এই রকম একটি মন্তব্য দেখা গেছে ইংরেজি ভাষার প্রবন্ধে চোখে পড়ে। ‘ডযধঃবাবৎ মৎবধঃ ধহফ নবহবাড়ষবহঃ ধপযরবাবসবহঃং ঃযধঃ ধৎব রহ ঃযরং ড়িৎষফ, যধষভ নবষড়হমং ঃড় ড়িসধহ, যধষভ ঃড় সধহ’ নজরুলের ঝধসুধনধফর (ঊয়ঁধষরঃু) কবিতা থেকে উদ্ধৃত এই পংক্তি। এটি সমতার দার্শনিকভিত্তি হিসেবে তার ভাবনাকে প্রতিফলিত করে।

 

সাহিত্যে নজরুলের সাম্যবাদীচেতনার প্রতিফলন

নজরুলের সাম্যবাদীচেতনা ছিল তার সৃষ্টিকর্মের এক মৌলিকভিত্তি। তিনি শুধু একজন কবি বা সাহিত্যিক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সাম্যের প্রবক্তা, যিনি সমাজের বৈষম্য, শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তার লেখায়, তিনি ধর্ম, বর্ণ, জাতি, পেশা বা লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদার কথা তুলে ধরেছেন। সাম্যবাদের মূলভিত্তি নজরুলের সাম্যবাদীচেতনার মূলভিত্তি ছিল মানবিকতা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মানুষ হিসেবে  সবারই সমান মর্যাদা প্রাপ্য। তার লেখায় এই বিশ্বাস বিভিন্নভাবে ফুটে উঠেছে-

১. ধর্মীয় সাম্য- নজরুল কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারী ছিলেন না, বরং তিনি সকল ধর্মের মূল বাণী ভালোবাসা ও মানবতাকে গ্রহণ করেছিলেন। তার বিখ্যাত কবিতা ‘সাম্যবাদী’- তে তিনি বলেন- ‘গাহি সাম্যের গান/যেখানে আসিয়া এক হয়েছে সব বাধা-ব্যবধান।’ তিনি মসজিদ, মন্দির, গির্জা বা প্যাগোডার কোনোটিকেই আলাদা করে দেখেননি, বরং সকল ধর্মীয় স্থানের পবিত্রতাকে সমান মর্যাদা দিয়েছেন।

২. সামাজিক সাম্য- নজরুল তার লেখায় সমাজের উচ্চ-নীচ, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তিনি শোষিত, বঞ্চিত ও নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। তার ‘কুলি-মজুর’ কবিতায় তিনি শোষক শ্রেণির প্রতি তীব্র ধিক্কার জানিয়েছেন এবং শ্রমজীবী মানুষের শ্রমের মর্যাদা তুলে ধরেছেন। ‘এসেছে নতুন মানুষ, এসেছে নতুন গান/শ্রমিক-মজুরের জয়গান।’

৩. লিঙ্গ সাম্য- নজরুল বিশ্বাস করতেন যে নারী ও পুরুষ উভয়ই সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং তাদের উভয়েরই সমান অধিকার থাকা উচিত। তার ‘নারী’ কবিতায় তিনি ¯পষ্ট ভাষায় বলেছেন।

৪. ‘বিশ্বে যা কিছু এল পাপ-তাপ বেদনা অশ্রুবারি/অর্ধেক তার আনিয়াছে নর অর্ধেক তার নারী।’

৫. এই পঙক্তিগুলোর মাধ্যমে তিনি মানব সভ্যতার সকল ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অবদানের কথা তুলে ধরেছেন। নজরুলের সাহিত্যে সাম্যবাদীচেতনার প্রতিফলন নজরুলের কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস এবং প্রবন্ধে সাম্যবাদী চেতনার ব্যাপক প্রতিফলন ঘটেছে।

৬. কবিতা- তার ‘কুলি-মজুর’, ‘ফাঁসি’, ‘বারাঙ্গনা’ এবং ‘মানুষ’-এর মতো কবিতায় তিনি সমাজের শোষিত, নিপীড়িত ও অবহেলিত মানুষের কথা তুলে ধরেছেন। এই কবিতাগুলো ছিল সাধারণ মানুষের প্রতি তার ভালোবাসার এক জ্বলরু উদাহরণ।

৭. গান- নজরুল তার গানেও সাম্যবাদী বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন। তার গানে তিনি শ্রমজীবী, কৃষক, জেলে, মজুরসকল শ্রেণির মানুষের দুঃখ-দুর্দশা ও সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন।

৮. প্রবন্ধ- তার ‘যুগবাণী’ ও ‘দুর্দিনের যাত্রী’-র মতো প্রবন্ধে তিনি সমাজের শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে জোরালো বক্তব্য রেখেছেন এবং সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন।

 

এ পর্যায়ে নজরুলের সাম্যবাদিচেতনার বাংলাদেশি লেখকদের অভিমত ও মন্তব্য তুলে ধরা হলো-

১. ড. আনিসুজ্জামান- ‘নজরুল নারী-পুরুষ সমতার প্রশ্নে সাহসী কণ্ঠ। তাঁর প্রবন্ধ নারী তৎকালীন পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে এক ধ্বনিত প্রতিবাদ।’

২. হুমায়ুন আজাদ- ‘নজরুলের সাম্যবাদীচেতনা কেবল কবিতার অলঙ্কার নয়; বরং তা রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার দাবি।’

৩. গোলাম মুরশিদ- ‘নজরুল মুসলিম সমাজে নারী-অধিকারের যে দাবি তুলেছিলেন, তা ছিল সময়ের বহু আগের উচ্চারণ।’

৪. আবদুল মান্নান সৈয়দ —‘নজরুলের সাহিত্য মানবমুক্তির কাব্য; সেখানে নারী ও শ্রমজীবী মানুষ প্রধানতম শক্তি।’

 

কাজী নজরুল ইসলামের নারীচেতনা বা নারীর অধিকার বিষয়ে বিদেশি বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সরাসরি মন্তব্য, উদ্ধৃতি বা বিশ্লেষণ পাওয়া প্রায় কমই যায়, কারণ নজরুলের কাজ বাংলাভাষী হলেও বাংলাদেশ ও ভারত ছাড়াও অনেক দেশে তেমনটা প্রচুর আলোচিত নয়। তবুও বিভিন্ন গবেষণা, তুলনামূলক সাহিত্যবিচার ও সামগ্রিক মানবতাবাদী মূল্যায়নে তার নারীচেতনা এবং সমতার চিন্তাধারা কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বিদেশি এবং আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা হয়েছে। নজরুল তার যুগে (২০শ শতকের প্রথমার্ধ, বিশেষ করে ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীনে) লিঙ্গভিত্তিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছিলেন। নারীর শিক্ষা, স্বাধীনতা, পুরুষ-ভিত্তিক পিতৃতান্ত্রিক নিয়ম, নারীকে পোশাকি বা সামাজিকভাবে নিম্নমানের দেখায় তার প্রতিবাদ করেছেন। তার কবিতা ও গল্প-রচনায় নারীর অভ্যন্তরীণ অনুভূতি, সংগ্রাম ও স্বপ্ন-সবকিছুকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে; তিনি নারীদের ‘নির্জন মন’ বা ‘বনদেশী মেয়ে’ এর মতো ক্লিশে থেকে গিয়েও নতুন করে তাদের ভেতরের সংঘর্ষ ও অধিকার-প্রত্যাশাকে আলোচনায় নিয়ে এসেছেন। যদিও নজরুলের লেখায় কিছু পুরুষচেতনার সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে (সমাজের প্রচলিত চিন্তার সঙ্গে আপোষ, কিছু ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক ধারণা), তথাপি তার যুগে তার নারীর প্রতি মূল্যবোধ ও সমতার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি অনেক অগ্রগামী ছিল। আলোচনার খাতিরে এখানে আমরা এই প্রবন্ধে আন্তর্জাতিক লেখক ও গবেষকদের মন্তব্য ও বিশ্লেষণ তুলে ধরছি-

১. খরবংষ ঝপযধিনব — ‘ঈবষবনৎধঃরহম কধুর ঘধুৎঁষ ওংষধস, জবনবষ চড়বঃ ড়ভ ইবহমধষ” শীর্ষক লেখায় ঝপযধিনব লিখেছেন, ‘ঘধুৎঁষ’ং ংরমহরভরপধহপব বীঃবহফং ভধৎ নবুড়হফ ঃযব ধপধফবসরপ ংঢ়যবৎব.’ তিনি নজরুলকে বর্ণনা করেছেন ‘ঃযব ভরৎংঃ ‘ইবহমধষর াড়রপব ঃড় ঢ়ড়ঢ়ঁষধৎরুব হড়ঃরড়হং ড়ভ ঢ়ড়বঃৎু নবুড়হফ নড়ৎফবৎং,’ অর্থাৎ নজরুল শুধু বাংলাসাহিত্য বা মুসলিম-হিন্দু প্রেক্ষাপটে নয়, বিশ্বময় মানবতার ও সমতার বাণী ছড়িয়ে দিয়েছিলেন।

২. অহধহুধ ঔধযধহধৎধ কধনরৎ (করহম’ং ঈড়ষষবমব খড়হফড়হ) — একই লেখায় কধনরৎ বলেছেন নজরুলের ‘ষধহমঁধমব ড়ভ ৎবংরংঃধহপব’ যা ব্যবহার করেছেন ঐতিহ্যগত হিন্দু ও পারসি / আরবি ভাষার মিলিত উপাদান নিয়ে, যা হিন্দু ও মুসলিম বাঙালির মধ্যে ‘রহংবঢ়ধৎধনষব’ একটি প্রেক্ষাপটে বসান। এই ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক মিল নজরুলের সাম্যবাদী ও সাংঘাতিক বন্ধুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গাকে প্রমাণ করে।

৩. গফ. ওয়নধষ ঐড়ংধরহ — ‘ঐঁসধহরংস ধহফ ঊমধষরঃধৎরধহরংস রহ ঘধুৎঁষ’ং চড়বঃৎু’ (ছঁবংঃ ঔড়ঁৎহধষং, ২০১৮) তাঁর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নজরুল ‘ফরংপৎরসরহধঃরড়হ ধহফ ফরংঢ়ধৎরঃু নবঃবিবহ যঁসধহ নবরহমং’ এর বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে কথা বলেছেন এবং তাঁর অনেক কবিতায় শ্রমিক, কৃষক, নিম্নবিত্ত মানুষের কষ্ট-দুর্দশা ও তাদের অধিকার-প্রয়াসকে কেন্দ্র করে রেখেছেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি ‘ঞযব ঝড়হম ড়ভ খধনড়ঁৎবৎ’, ‘ঈড়ড়ষরব-গধুফড়ড়ৎ’ ইত্যাদি কবিতার উদ্ধৃতি দিয়েছেন যেখানে নজরুল পুরুষ, শ্রমজীবী-কুলীন ও নিম্নবিত্তের অধিকার, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সাম্যের কথা বলেছেন।

৪. ঞধংষরসধ ইবমঁস — টহরাবৎংধষ ঐঁসধহরংঃ ধহফ ঊমধষরঃধৎরধহ চড়বঃ ঘধুৎঁষ: অ জবারবি রহ ঃযব ষরমযঃ ড়ভ ঘধুৎঁষ চড়বঃৎু (ঝপযড়ষধৎং ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঔড়ঁৎহধষ ড়ভ খরহমঁরংঃরপং ধহফ খরঃবৎধঃঁৎব, ২০২৪) ইবমঁস লিখেছেন, নজরুল ছিলেন ‘ধহ ঁহপড়সঢ়ৎড়সরংরহম ভরমযঃবৎ ভড়ৎ বয়ঁধষরঃু, ঔঁংঃরপব, ধহঃর-রসঢ়বৎরধষরংস, যঁসধহরঃু ধহফ ড়ঢ়ঢ়ৎবংংরড়হ.’ তার কাজের ভাষা-ভঙ্গি, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (হিন্দু ও মুসলিম উভয় দৃষ্টিতে) গ্রহণ করা, সমাজের নিম্নবিত্ত ও শ্রমজীবীদের চিন্তা-অভিব্যক্তি সব মিলিয়ে তাঁর সাহিত্য সামাজিক সাম্যবাদের একটি জীবন্ত দৃষ্টান্ত হিসাবে বিবেচিত হয়েছে।

৫.‘ঘধুৎঁষ’ং ঈড়হঃৎরনঁঃরড়হং রহ ঊয়ঁধষরঃু ধহফ ঊমধষরঃধৎরধহরংস: ঞবিহঃু ঋরৎংঃ ঈবহঃঁৎু চবৎংঢ়বপঃরাব’ (উৎ. ঘধুৎঁষ ওংষধস ্ গফ. ঝযধসংঁষ অৎবভরহ, ২০১৭) এ গবেষণায় বলা হয়েছে, নজরুল কেবল অবিচার, অসমতা ও শোষণের বিরোধিতা করেন নি, বরং তাঁর কবিতা ও সংগীতে ‘মবহফবৎ-বমধষরঃধৎরধহরংস, পড়সসঁহধষ যধৎসড়হু ধহফ ঃড়ষবৎধহপব’ এর মতো বিষয়গুলোও প্রচার করেছেন। উভয় লিঙ্গের মানুষের ভূমিকার সমানত্ব, ধর্মীয় বেড়াজালের বাইরে গিয়ে মানবতার বোধ, স্বাধীনতার প্রতি আকাঙ্ক্ষা ও মর্যাদার দাবি এসব বিষয় তার সাম্যবাদী চেতনার মূল উপাদান।

৬. ইৎরঃরংয এড়াবৎহসবহঃ (ারধ এঙঠ.টক) — নজরুলের জন্মবার্ষিকীতে একটি স্টেটমেন্টে বলা হয় যে নজরুল টহরাবৎংধষ উবপষধৎধঃরড়হ ড়ভ ঐঁসধহ জরমযঃং-এর ধারায় মানবাধিকারের অধিকার ও মর্যাদার কথা বলেছিলেন, এবং একজন মানুষের পূর্ণ সম্ভাবনা রচনা ও বাস্তবায়নের অধিকার থাকা উচিত, যে কোনো ধরনের বৈষম্য থেকে অবাধ থাকতে।

 

নজরুলের সাম্যবাদী দর্শন

কাজী নজরুল ইসলামের ‘সাম্যবাদী’ দর্শন ছিল একটি সমতার ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের ধারণা। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষ জন্মসূত্রে সমান এবং কোনো ধর্ম, বর্ণ, জাতি বা শ্রেণিভেদে তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা উচিত নয়। তিনি তাঁর লেখায় এই ভেদাভেদের তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং এক বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছেন। সাম্যবাদী দর্শনের মূল দিক নজরুলের সাম্যবাদী দর্শনের কয়েকটি প্রধান দিক নিচে আলোচনা করা হলো-

মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতা— নজরুল সকল ধর্মের ঊর্ধ্বে মানুষের পরিচয়কে স্থান দিয়েছিলেন। তাঁর কাছে মানবতাই ছিল সবচেয়ে বড় ধর্ম। তিনি লিখেছেন, ‘গাহি সাম্যের গান— যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা, ব্যবধান…।’ তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামি ও সাম্প্রদায়িকতার ঘোর বিরোধী ছিলেন। তিনি হিন্দু-মুসলিম উভয়কেই ভাই হিসেবে দেখেছেন এবং তাদের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপনের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন।

শ্রমজীবী মানুষের অধিকার- তিনি সমাজের নিপীড়িত ও বঞ্চিত মানুষের, বিশেষ করে কৃষক ও শ্রমজীবী শ্রেণির পক্ষে কথা বলেছেন। তাঁর সাম্যবাদী ধারণায় শ্রমের মর্যাদা ছিল সর্বোচ্চ। তিনি সমাজের উচ্চবিত্তের শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন এবং শ্রমের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন।

নারীর অধিকার— নজরুল তাঁর সাম্যবাদী দর্শনে নারী-পুরুষের সমতার ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি তাঁর ‘নারী’ কবিতায় লিখেছেন, ‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।’ তিনি নারীদের সমাজের অর্ধেক শক্তি হিসেবে দেখেছেন এবং তাদের প্রাপ্য মর্যাদা ও অধিকারের জন্য কলম ধরেছেন।

জাতীয়তাবাদ ও ঔপনিবেশিকতাবিরোধিতা— যদিও তাঁর সাম্যবাদী দর্শন আন্তর্জাতিকতাবাদী ছিল, এটি ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তির আন্দোলনেও অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। তিনি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছেন এবং তাঁর লেখায় দেশপ্রেম ও স্বাধিকারের বার্তা দিয়েছেন। নজরুলের সাম্যবাদী দর্শন কেবল একটি রাজনৈতিক মতবাদ ছিল না, বরং এটি ছিল এক মানবিক আবেদন, যা তৎকালীন সমাজের সব ধরনের বৈষম্য দূর করে এক সুস্থ ও সুন্দর সমাজ গঠনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। তাঁর এই দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক এবং সমাজে সমতা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার অনুপ্রেরণা জোগায়। শ্রেণিবৈষম্য ও সমতা সম্পর্কে নজরুলের সাম্যবাদীচেতনা বিশ্লেষন নিচে তুলে ধরা হলো-

১. শ্রেণি ও বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নজরুল সাম্যের কবি। তিনি অভিজাত-অভিমান ভাঙতে চান, শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বরকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। তাঁর কবিতা ‘সমতা’ (১৯২৫) – তে বলেন ‘আমার চক্ষুতে পুরুষ-নারী কোনো ভেদাভেদ নাই, সমান সমান তারা, সমান সমান হোক সবাই।’

২. ধর্মীয় সাম্য তিনি ছিলেন হিন্দু-মুসলমান উভয় সংস্কৃতির সমন্বয়ক। তাঁর রচনা ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’ (১৯২৬)-এ তিনি বলেন ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম ওই জিজ্ঞাসে কোন জন? কান্ডারী! বল, ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার।’ এখানে তিনি ধর্মীয় বিভেদ অস্বীকার করে মানবতার ঐক্যরক্ষা করেছেন।

৩. অর্থনৈতিক সাম্য তিনি শ্রমিক, কৃষক ও প্রান্তিক মানুষের মুক্তির কথা বলেন। তাঁর গান কারার ঐ লৌহকপাট’ শোষণবিরোধী সংগ্রামের প্রতীক।

৪. ঔপনিবেশিক বিরোধিতা ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নজরুলের সাম্যবাদী কণ্ঠ শক্তিশালী প্রেরণা জুগিয়েছে। ধূমকেতু পত্রিকার মাধ্যমে তিনি ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন।

এ পর্যায়ে আমরা নজরুলের  সাম্যবাদীচেতনার মূল উপাদান নিয়ে বিশ্লেষণ করতে চেষ্টা করি- শ্রমিক, কৃষক, সাধারণ মানুষের প্রতি সহানুভূতি বহু কবিতা-রচনায় নজরুল নিম্নবিত্ত, শ্রমজীবী, গরিবের ওপরে শোষণ ও অবিচারকে সামনে এনেছেন (‘ঈড়ড়ষরব-গধুফড়ড়ৎ, খধনড়ঁৎবৎ’ং ঝড়হম’ ইত্যাদি)। ধর্ম ও সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে বৈষম্যবিরোধী মনোভাব ধর্মের গন্ডি পার করে হিন্দু-মুসলিম উভয় সংস্কৃতিকে গ্রহণ ও সম্মান, ধর্মীয় উস্কানি ও হিংসার বিরুদ্ধে কথা বলা। যেমন ‘ডব ধৎব ঃড়ি ভষড়বিৎং ড়হ ঃযব ংধসব ংঃধষশ — ঐরহফঁ ধহফ গঁংষরসৃ’ ধরনের কবিতা। লিঙ্গ সমতা নারী ও পুরুষের মধ্যে সমান অধিকার ও সামাজিক মর্যাদার কথা বলা হয়েছে; নারীর অবদানের স্বীকৃতি ও তাদের প্রতি বৈষম্যবাদী মনোভাবের বিরোধিতা।  অধিকার ভিত্তিক ও বর্ণবাদ-বিরোধীভাবনা কেবল শ্রেণি বা অর্থনৈতিক অবস্থা নয়, সাম্প্রদায়িক, ধর্মীয় বা সামাজিক রূঢ় ধারণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ; মানুষের মৌলিক মর্যাদা ও সাম্যের প্রতি গুরুত্ব। সেক্যুলার ও মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ধর্মীয় উভয় ঐতিহ্যকে গ্রহণ করে, কিন্তু ধর্মকে মানুষ ক্ষুণ্ন করার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেননি; মানবতার উপর তাঁর লেখার কেন্দ্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। আমরা সাম্যবাদীচেতনার কিছু সীমাবদ্ধতা ও বিবেচনা এ পর্যায়ে আলোচনা করতে চাই নজরুলের কাজ প্রায় সব সময় সরাসরি রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনায় লেখা ছিল, তাই কখনও কখনও তার ‘আন্দোলনমূলক’ দৃষ্টিভঙ্গি প্রথমে শে্িরণ, শ্রম, উপনিবেশবাদ ইত্যাদিতে বেশি ছিল; সম্পূর্ণ তত্ত্বগত সাম্যবাদের অর্থাৎ রাজনৈতিক পার্টি বা কমিউনিজমের দৃষ্টিতে তার কাজ সবখানেই সমতুল নয়। অনুবাদ ও আন্তর্জাতিক প্রচার সীমিত হওয়ায় সরাসরি ‘বিদেশি কবি’ বা বিদেশি লেখকের দীর্ঘ উদ্ধৃতি পাওয়া কম। অধিকাংশ বিশ্লেষণ গবেষক-লেখকদের প্রবন্ধে পাওয়া যায়, বিজ্ঞাপিত সাহিত্য সমালোচনায় নয়।

বাংলাসাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলাম এক অনন্য প্রতিভা, যিনি একই সঙ্গে বিদ্রোহী কবি, সাম্যের কণ্ঠস্বর এবং নারী-অধিকারের অগ্রদূত। ঔপনিবেশিক সমাজে নারীর অবদমন ও ধর্মীয়-সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তিনি সাহসিকতার সঙ্গে উচ্চারণ করেছেন সমতা ও মুক্তির বাণী। এই গবেষণাপত্রে নজরুলের নারীবাদীচেতনা ও সাম্যবাদকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে সাহিত্যিক উদাহরণ ও গবেষকদের মতামতের আলোকে। কাজী নজরুল ইসলাম কেবল বিদ্রোহী কবি নন, বরং নারীবাদী ও সাম্যবাদী সাহিত্যের অন্যতম পথিকৃৎ। তাঁর কাব্যে নারী মুক্তির দাবি এবং সাম্যের বাণী আজও প্রাসঙ্গিক। সমকালীন সমাজে নারীর প্রতি বৈষম্য ও শ্রেণি-বৈষম্য রয়ে গেছে; তাই নজরুলের সাহিত্য আজও সংগ্রামের পথনির্দেশক। তিনি আধুনিক মানবতাবাদী সাহিত্যচিন্তার সঙ্গে বাংলা সাহিত্যে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন । কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাসাহিত্যে নারীবাদ ও সাম্যবাদের এক অনন্য উচ্চারণ। তিনি নারীকে মানবতার সমঅধিকারীরূপে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন এবং ধর্ম, বর্ণ ও শ্রেণির বিভাজন ভেঙে সমতা ও সাম্যের সমাজ গড়তে চেয়েছেন। তাঁর এই অবস্থান শুধু সাহিত্যিক নয়, বরং সমাজবিপ্লবী কণ্ঠস্বরও বটে। আজও নারীর মুক্তি ও মানবিক সাম্যের আলোচনায় নজরুল প্রাসঙ্গিক ও অনিবার্য।

 

গ্রন্থতালিকা ও তথ্যনির্দেশ

১. আনিসুজ্জামান- আধুনিক বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস। ঢাকা: বাংলা একাডেমি, ১৯৮৪

২. হুমায়ুন আজাদ–নারীবাদ ও নজরুল। ঢাকা: আগমনী প্রকাশনী, ১৯৯০

৩. গোলাম মুরশিদ- কাজী নজরুল ইসলাম: জীবনী ও সাহিত্যকীর্তি। ঢাকা: প্রকাশনা সংস্থা, ২০০৪

৪. আবদুল মান্নান সৈয়দ- কবিতার কথা। ঢাকা: নওরোজ প্রকাশনী, ১৯৮১

৫. কাজী নজরুল ইসলাম- প্রবন্ধসংগ্রহ। কলকাতা: ধূমকেতু প্রকাশনী, ১৯২৬

৬. বিদ্রোহী- কলকাতা: ১৯২২

৭. সমতা- কলকাতা: ১৯২৫

৮. কান্ডারী হুঁশিয়ার। কলকাতা: ১৯২৬

৯. কবিতা: ‘নারী’, ‘বীরাঙ্গনা’, ‘কোরবানি’, ‘সর্বহারা’

১০. উপন্যাস: ‘মৃত্যুক্ষুধা’, ‘কুহেলিকা’

১১. গল্প: ‘ব্যথার দান’, ‘রিক্তের বেদন’

১২.প্রবন্ধ:  ‘যুগবাণী’, ‘দুর্দিনের যাত্রী’

১৩. গবেষণা গ্রন্থ: ‘নজরুলের নারীভাবনা’ – ড. রফিকুল ইসলাম

১৪. কবিতা: ‘সাম্যবাদী’, ‘মানুষ’, ‘কুলি-মজুর’, ‘নারী’, ‘ফাঁসি’

১৫.গবেষণা গ্রন্থ: ‘নজরুল চরিতমানস’ – ড. রফিকুল ইসলাম

১৬. কবিতার কথা, ১৯৮১

 

লুৎফা শাহিন, কবি ও প্রাবন্ধিক

চকরিয়া, কক্সবাজার

বিশ্ব নারী দিবসের পুনর্পাঠ : বহুমাত্রিক নারীর নতুন ভাষ্য

শাহেদ কায়েস   নারীর ইতিহাস কোনো একরৈখিক অগ্রযাত্রা নয়—তা বহু পথে বয়ে চলা নদীর মতো, যেখানে সংগ্রাম, প্রেম, প্রতিরোধ, রাজনীতি, শ্রম, মাতৃত্ব, শিল্প, দর্শন ও

আন্দরকিল্লার ইফতার অনুষ্ঠানে সুধীজনদের অভিমত বাঙালি জাতিসত্তা ও মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনার চিহ্নটিই অনির্বাণ অস্তিত্বের প্রতীক

আন্দরকিল্লা ডেক্স : শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সমাজভাবনামূলক কাগজ ‘আন্দরকিল্লা’র ইফতার আয়োজনে সম্পাদক মুহম্মদ নুরুল আবসার তাঁর স্বাগত বক্তব্যে এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, আন্দরকিল্লা কোনো বলয়বদ্ধ সীমানায়

প্রথা ভেঙে বেরিয়ে এসো নারী  

গৌতম কুমার রায় বিংশ শতাব্দী বিদায় হওয়ার পরে এসেছে একবিংশ শতাব্দী। বিজ্ঞান এগিয়েছে। সাথে পাল্লা দিয়ে এগিয়েছে পুরুষ। কিন্তু নারী ! শুধু পিছিয়েছে নারী। কেন

আদিবাসী নারী

কুমার প্রীতীশ বল   ‘হৈ হৈ হৈ জুমত  যেবং. জুমে যেইনে গচ্ছা সুদা তুলিবং. গচ্ছা সুদা তুলি নেই টেঙ্গা কামেবং।’ চাকমা এই গানটির বাংলা অনুবাদ

মহাশ্বেতা দেবী: দর্শন, সাহিত্য ও সমাজচেতনার প্রতিফলন

রওশন রুবী   মহাশ্বেতা দেবী উপমহাদেশের একজন শক্তিমান ও প্রখ্যাত লেখক। তাঁর শতবর্ষ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সাহিত্য শব্দের সীমা অতিক্রম করে মানবতার গভীর নৈতিক শক্তিতে