আজমীরা শ্যামা
অস্পষ্ট কোন শব্দে হঠাৎ মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল। স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে দরজা খুলে বারান্দায় চলে গেলাম। বারান্দার নীচ দিয়ে বয়ে গেছে হিসনা নদী। যার বুকজুড়ে শহরের আবর্জনা, অসংখ্য ব্রিজ আর কচুরিপানা।
গ্রিল ধরে দাঁড়াতেই আমার চারপাশটা ধুপের ধোঁয়া আর গন্ধে কেমন যেন ঘোলাটে হয়ে গেল। হিসনার উপর হালকা অথচ শান্তির শীতল বাতাস বয়ে চলেছে । ভালো করে চোখ মেলতেই মনে হলো বিদ্যার দেবী সরস্বতী! যাকে সন্ধ্যারাতে অনেক আয়োজন করে ঢাক—ঢোল পিটিয়ে বিসর্জন দিয়ে গেছে। তাঁর হাতের বীণা আর অনিন্দ্য রূপ— মাধুর্য দেখে খানিকক্ষণ তন্ময় হয়ে গিয়েছিলাম!
কিন্তু এখন এই শুক্লপক্ষের গভীর রাতে তার মুখটা দেখলাম। চমক লাগার মতো হয়ে বললাম, দেবী আপনি?
আপনাকে তো ভক্তরা আজকেই বিসর্জন দিলো, এটাই তো নিয়ম তাইনা?
দেবী বললেন, বিসর্জনই বটে।
তুমি কি দেখেছ এই নদীর হাল? এখানে কী কোন শুদ্ধতার আচার চলে?
তাঁর সাথে তাল দিয়ে বললাম, চলেনা। কেন চলবে বলুন? একটা নদীরও যে প্রাণ থাকে, সেটাও যে প্রতি বছর নবযৌবনা হয় তাতো রাষ্ট্রকে বুঝতে হয়। প্রয়োজনে তার ব্যবস্থা করতে হয়। অপরিকল্পিত ব্রিজ নির্মাণ, অবৈধ দখল আর শহরের সকল আবর্জনা বুকে ধারণ করে হিসনা আজ মৃত! চুপসে যাওয়া নারীর বুকের মতো যে জলটুকু এখনো অবশিষ্ট রয়েছে তাও প্রাণের জন্য বিষ স্বরুপ!
দেবীর রঙিন গাল ও মায়াবী চোখ মুখে বিষাক্ত জল—কাদায় মাখামাখি। কাতর স্বরে বললেন, “তোমার কিছু পারনা”?
আমার নীরবতা বুঝতে পেরে তিনি যেভাবে এসেছিলেন ঠিক তেমনি নি:শব্দে হিসনার বিষাক্ত মিশমিশে কালো জলে মুখ লুকালেন।
ব্যথায় আমার বুক টনটন করে উঠল।
ঘরে ফিরব বলে যেই পা বাড়িয়েছি, কে যেন ক্ষীণস্বরে নাম ধরে ডাকলেন। চোখ কচলে তাকিয়ে দেখি, দশভুজা দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর সমস্ত শরীর জড়ে ছেঁড়া পলিথিন, গৃহস্থালি আবর্জনা আর নোংরা কাদাজল।
বিষ্ময়ে বলি, একি অবস্থা দেবী?
তিনি সজল চোখে বললেন, “এমনটা হওয়ায় তো স্বাভাবিক। এখানেই তো ভাসান হয়েছিল”!
তাঁর কথার কোন উত্তর আমার জানা নেই। শুধু মিনমিনে গলায় বললাম, দেবী আপনি তো পুরোটায় কল্পনায় মোড়া, তবুও এ জল আপনাকে অপবিত্র করেছে। কিন্তু,আমরা এমন সমাজে বসবাস করি যেখানে লক্ষকোটি রক্ত মাংসের দেবী এর চেয়েও নোংরা পরিবেশে জীবন যাপন করে। তবুও সে ব্যথা আমাদের মনে বাজে না। আর ‘আপনা’ রচিত দেবীর ব্যাথা বুকে বাজবে কেমন করে বলুন?
উষ্মা নিয়ে আরো বললাম, এই অপবিত্র জলে দেব— দেবী কিংবা অশুর কাউকেই ডোবাতে কসুর করিনি।
খুব আগ্রহভরে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনাদের রাগ হয়না? ইচ্ছে হয়না ভক্তদের দেখে নিতে?
তিনি হাসার চেষ্টা করলেন। তারপর বললেন, ‘হয় তো’! “যখন ঢাকের তালে তালে নেচে—কুদে এখানে ভাসিয়ে দেয় তখন ভাবি তোদের মাঝে আর আসব না। কিন্তু, সময় হতেই ভক্তের জন্য মনটা কেঁদে উঠে। তাই আর ধরে রাখতে পারিনা”। পূর্বের দেবীর মতো তিনিও কিছু করার আবদার করেন।
আমার নীরবতা তাঁকেও ব্যথিত করে। তারপর দশহাতে কচুরিপানা সরিয়ে অনন্তের পথে যাত্রা করেন।
কতক্ষণ পর একজন ভয়ংকর চেহারার পুরুষ সামনে দাঁড়ায়। এসেই বলল, ‘ভয় পেলে নাকি’?
হেসে বললাম, তুমি আর কী ভয়ংকর অসুর? তোমার চেয়ে ঢের ঢের শক্তিশালী অসুর এখন আমাদের চারপাশে খুবলে খাচ্ছে — বন—নদী—সাগর —সম্পদ। দেশের সামগ্রিক চাহিদাকে অবজ্ঞা করে দে্শের সম্পদ তুলে দিচ্ছে বিদেশিদের হাতে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ অসংখ্য নদী আজ মৃতপ্রায়। ভিষণ ভাবে মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। রক্ত মাংসের দেবীরা আজ ঘরে বাইরে হচ্ছে লাঞ্ছিত। সব এখন নষ্টদের হাতে চলে গেছে। সেখানে ‘হিসনা’ তো কোন ছার!
অসুর অবাক হয়ে বলল, “তোমরা তো দেখছি আমার চেয়ে বেশি নিষ্ঠুর”। তারপর রাগে গজগজ করতে করতে ঝাঁপ দিল হিসনার জলে।
আমি হিসনার দিকে তাকিয়ে বললাম, আহা! হিসনা।
আরকি কখনো তোমার বুকে পরিষ্কার জলের ধারা প্রবাহিত হবে? দুরন্ত শিশুরা কি ঝাঁপ দিয়ে তরঙ্গ তুলবে তোমার দুপাড় জুড়ে? কিংবা সমস্ত অভিমান ভুলে ভক্তের ডাকে স্বপ্রাণ সাড়া দিয়ে জেগে উঠবে সকল দেব—দেবী অথবা অবাধ্য অসুর!
আজমীরা শ্যামা, গল্পকার, ভেড়ামারা, কুষ্টিয়া।




