সৈয়দ মনজুর কবির
সকাল সকাল একি বিপত্তি! এতো সুন্দর ঝাঁ চকচকে ট্রেনটা অথর্বের মতো দাঁড়িয়ে আছে। নির্বিকার, অসহায় ভাবে — যেন ওর কিচ্ছু করার নেই। আসলেই তাই, ওর মানে এইতো মাস ছয়েক আগে সেই জার্মান থেকে আসা লোকোমটিভ ইঞ্জিনটার। ইনি্জনটা ঘন্টা খানেক আগেও ভালোই চললো। নির্দিষ্ট প্ল্যাটফর্মে ঠিক সময়েই এলো। আবার ঠিকঠাক ইঞ্জিন ঘুরে গিয়েও লম্বা বগিগুলোর পিছনে গিয়ে যুক্ত হলো। ট্রেনের গতিপথের দিক পরিবর্তিত হলো — প্রস্তুত ঢাকা ছাড়বে নির্দিষ্ট সময় সকাল ৬.৩০ এ। সবই যখন ঠিক তখনি হলো বিপত্তিটা ৬টা ১৫ মিনিটে। ইঞ্জিন বন্ধ করা হয়েছে, তা এখনো পূনরায় চালু হচ্ছে না। বেশ কিছু কর্মকর্তাকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটোছুটি করতে দেখছে মিতু। চোখে মুখে স্পষ্ট ভয়ার্ত লক্ষণগুলো ফুটে উঠেছে। ও মনে মনে শক্তি সঞ্চয় করে সামনে হেঁটে যাওয়া এক লোককে জিজ্ঞাসা করলো, ভাই, কি হয়েছে? ট্রেন ছাড়ছে না কেনো?
লোকটির চোখে মুখে স্পষ্ট বিরক্তির ছাপ। ওভাবেই বললো, আর কি ঝামেলার শেষ আছে। এই কমলাপুর স্টেশনে আসবার সময় কুড়িল বিশ^রোডের রেল ক্রসিংয়ে এ ট্রেন একজনকে কেটে দু’টুকরো করে এসেছে। তাই হাজারো ঝামেলা এসে হাজির। এখন যতসব অফিশিয়াল ঝামেলা দূর হবে তারপর ট্রেন ছাড়বে।
মিতু আরেকটু ভয় পেয়ে যায়। মুখ হঠাৎই শুকিয়ে যাচ্ছে। কোনোমতে বলে, তা ভাই, কতক্ষণ লাগতে পারে?
লোকটি সেই বিরক্তির ছাপ নিয়েই বলে, একজন বড় অফিসারের সিগনেচার এর অপেক্ষায় আছে। উনি এলেই হয়তো ট্রেন ছাড়বে। হয়তো কথাটা শুনে মিতু ভয়ে চুপ মেরে যায়। মনে এলোমেলো ভাবনা ছুটতে থাকে। হয়তো তো একটা অনিশ্চয়তা!
মিতু সেই ভোরের আলো ফুটতেই স্টেশনে এসে হাজির। উদ্দেশ্য যত দ্রুত এই ঢাকা শহর ত্যাগ করা যায়। ভোর থেকেই গ্রীষ্মের ভ্যাপসা গরম শুরু হয়ে গেছে। স্টেশনে অপেক্ষমাণ যাত্রীরা বসে বসে মৃদু ঘামের উপস্থিতি টের পাচ্ছে। কিন্তু, মিতুই একমাত্র ব্যাতিক্রম। ওর শরীর ঠান্ডায় হিম শীতল। আসলে তার এই শীতলতা এসেছে চার ঘন্টা আগে ঘটে যাওয়া সেই বিবর্ণ ঘটনার জন্যই। এর জন্য ও ইদানীং নিজেকেই দায়ী করে। কলেজে পড়ার শুরুতেই কলেজ গেটে দাঁড়িয়ে থাকা সুদর্শন তরুণটিকে নিজের অজান্তেই এক টুকরো মিষ্টি হাসি উপহার দিয়েছিলো। সেই হাসিই পরিশেষে ওর বর্তমান বিবর্ণ পরিস্থিতির জন্য দায়ী। কারন ওই হাসি উপহার দেয়ার ব্যাপারটা ও আরো দিন আটেক দিয়েছে উচ্ছ্বসিত হয়ে।
আর ছেলেটির সাহসও কম ছিলো না। সে নবম দিনে মিতুকে উপহার দেয় একটা রক্ত রঙা গোলাপ আর বলে, এটা আপনার জন্য। মিতুর সেদিন প্রথম হৃদয় কাঁপলো অজানা শিহরণে। বড় বড় চাহনিতে কাঁপাকাঁপা কন্ঠে বলে, কি? কি আমার জন্যে?
এই যে, এই ফুলটা। ছেলেটির সলজ্জ উত্তর।
ছেলেটির সে এক মন ভুলানো মিষ্টি হাসিতে মিতুর মন আঁটকে যায়। মনে হয় এমন হাসিমুখ ও অনেক বার স্বপ্নে দেখেছে। হঠাৎ মনের গভীরে এক প্রচন্ড আবেগ সাগরের ঢেউয়ের মতো উথলে উঠে। ও খুব স্বাভাবিক ভাবেই ডান হাত বাড়িয়ে দেয়।
আর এই হাত বাড়িয়ে দেয়াই মিতুকে নিয়ে যায় হাসি মুখের ওই ছেলেটির সাথে রেজিস্ট্রি অফিসে বিয়ের আইনানুগ ব্যবস্থা পর্যন্ত। ছেলেটির নাম অনিক। প্রথম মাস চারেক চলে ভালোলাগা আর বিভিন্ন উপহার দেয়া নেয়া। তবে মিতু ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারেনি যে অনিক ড্রাগ এডিক্টেড। সে নিজে বাবার অমতে বিয়ে করে ফেললেও অনিকের বাবা মা কিন্তু ভীষণ খুশি হন। মিতু প্রথমে সেটা বুঝতে না পারলেও পরে বুঝতে পারে তার কারণ। অনিক শাহজালাল বিশ^বিদ্যালয়ে কম্পিউটার সাইন্সে সেকেন্ড ইয়ারের পরপরই হঠাৎ ঢাকার বাসায় ফিরে আসে। দু দিনেই বাবা মা দুজনেই বুঝে ফেলেন ছেলের মধ্যে পরিবর্তন এসেছে, সে আর আগের অনিক নয়। সারাক্ষণ অস্থির থাকে। দশ বারো দিন পর বলে — সে আর পড়ালেখা করবে না। সারাদিন কোথায় কোথায় ঘুরেফিরে অনেক রাতে ঘরে ফিরে। মাস পাঁচেক পরে একদিন মাকে বলে, আম্মু আমি একটা মেয়েকে বিয়ে করেছি। তোমরা এ্যালাও করলে কাল ওকে বাসায় নিয়ে আসবো। আর না করলে আমি এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাবো।
প্রথম কথাটা শুনে মা মনে মনে ভীষণ খুশি হয়ে যান। কেননা এই সিদ্ধান্ত তারা অনিকের অগোচরে পারিবারিক ভাবে আগেই নিয়েছে যে ওকে বিয়ে দিতে হবে। অনিক তাদের একমাত্র ছেলে। সিলেটে যাবার আগ পর্যন্তও ও ছিলো তাদের শান্ত, একান্ত বাধ্য। আর ওখান গিয়ে হঠাৎ পরিবর্তন। বাজে সঙ্গের সাথে মিশে বাজে জিনিসে আসক্ত হয়ে গেছে। হঠাৎ রেগে যায় আর ভাঙাচোরা শুরু করে সামান্য কথায়। কোথায় কোথায় চলে যায়, ওর খেয়াল খুশি মতো চলে — কেমন যেনো ছন্নছাড়া জীবন।
মা ভাবেন, ওকে যেভাবেই হোক স্বাভাবিক করতেই হবে। এ বিয়েতে হয়তো সে বিপথ থেকে ফিরে আসবে। মনের খুশির কথা প্রকাশ করলেন না মা। শুধু বললেন, এটা কি বলছিস? বলা নেই কওয়া নেই হুটকরে বিয়ে করলেই কি হলো? মেয়ে কে? কেমন দেখতে? আচার ব্যবহার, পরিবার পরিজন কেমন?
এ কথায় অনিক হঠাৎ রেগে যায়। বলে, আম্মু, শোনো, মেয়েকে আমার পছন্দ হয়েছে। এটাই শেষ কথা। অন্য কোনো ইনফরমেশন জানার প্রয়োজন নাই। এক্ষুণি বলো তোমরা রাজি কিনা?
বাবা আমিতো তোকে না বলি নি। শুধু একটু জানা থাকলে ভালো হতো এই আর কি। আচ্ছা, আচ্ছা। তুই কালই বউমাকে নিয়ে আয়, আমি তোর বাবাকে বলছি।
মিতুকে পরের দিনই অনিক ওদের বাসায় নিয়ে আসে। মিতু ওর মহিলা হোস্টেল থেকে একবারে বিদায় নিয়ে নেয়। বাবা ভীষণ রেগে গেছেন। উনি মানতে পারছেন না তার আদরের বড় মেয়েটার এমন বিয়েটা। মা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু বাবা না মানা পর্যন্ত মেয়ের আনন্দে ঢাকা আসতে পারছেন না। তাই মিতু স্বামীর হাত ধরে ওদের বাসায় আসতেই অনিকের মা বাবা আর আরো পনেরো ষোল জন আত্মীয় ওদের সানন্দে গ্রহন করে। মিতুর মা বাবাকে না জানিয়ে বিয়ে করাতে মনের অনেকটা অনুশোচনা কেটে যায়। অনিকের প্রতি ভালোবাসার অনুভূতি আরেকটু বেড়ে যায় মিতুর। কিন্তু সপ্তাহ যেতেই এ অনুভব হঠাৎ মুষড়ে পরে। অনিক প্রথম ওর ড্রাগের অভ্যস্ততার পরিচয় প্রকাশ করে। একটা অতি তুচ্ছ ঘটনায় তুলকালাম কান্ড ঘটিয়ে দেয়। হাতে ধরা পোরসেলিনের মগটা মিতুর দিকে ছুঁড়ে মারে। কপালে লাগে প্রচন্ড গতিতে, অল্পের জন্য বাঁ চোখটা রক্ষা পায়। কেটে গলগল করে রক্ত বেড় হতে থাকে। সেটা দেখে অনিকে কি হলো যেনো, দ্রুত ঘর থেকে বেড়িয়ে গেলো।
অনিকের মা তো কিছু ভাঙার শব্দ শুনেই ওদের ঘরে দৌড়ে আসেন। মিতুকে রক্তাক্ত দেখে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। কপালে চারটা সেলাই নিয়ে বাসায় ফিরে মিতু। ওই প্রথম মিতু অনিকের অদ্ভুত আচরণে অবাক হয় আর মনের ভিতরে ডুকরে কেঁদে ওঠে। মনের অজান্তেই বাবাকে ফোন করে কাঁদতে থাকে। আদরের মেয়ের এমন কান্না শুনে বাবাও বিচলিত হয়ে পড়েন। মেয়ের দোষের কথাগুলো ভুলে সঙ্গে সঙ্গেই মিতুর মাকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। তারা অনেক অনুরোধ করেন বাড়ি ফিরে যেতে। কিন্তু অনিকের প্রতি এক আলাদ অনুভব মিতুকে তাদের সাথে যেতে দিলো না। অনিকের মা মিতুকে আবেগে বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন, মা, আমি জানি তুমি আমাদের অনিককে পূনরায় স্বাভাবিক করে তুলতে পারবে। আমি কথা দিচ্ছি — আমি বেঁচে থাকতে এমন ঘটনা আবারও ঘটতে দিবো না।
অনিকের মায়ের দেয়া ওয়াদা আর মিতুর অসম্ভব ভালবাসায় তারপর প্রায় বছর দেড়েক কেটে যায়। চিকিৎসকের নিবিড় পরামর্শে চলতে থাকে ড্রাগ এডিকশন থেকে মুক্ত হওয়ার চিকিৎসা। মিতুর কোল জুড়ে আসে আদনান, ছোট্ট ফুটফুটে পুত্র। দেখতে দেখতে আড়াই মাস বয়স হয়ে যায় আদনানের। এতদিনের মাঝে অনিক আরো কয়েকবার নিজের ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছিলো। সে মুহুর্তে মিতুর স্নিগ্ধ ছোঁয়া আর ব্যবহারে অনিককে স্বাভাবিক করা গেছে। কিন্তু আজকের ঘটনা মিতুকে বিস্মিত, পাথর করে দেয়। রাত প্রায় দুটো। হঠাৎ অনিক ঘুম থেকে জেগে অস্থির হয়ে উঠে। প্রচন্ড চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুমন্ত আদনানও জেগে উঠে কাঁদতে থাকে। কোলে আদনানকে নিয়ে মিতু অনিককে আগের মতো নিয়ন্ত্রনে আনতে হয় ব্যর্থ। আবারো হাত তোলে অনিক। মিতু চিৎকার দিয়ে অনিকের মাকে ডাক দেয়। নিজেকে কোনমতে বাঁচিয়ে আদনানকে বুকের সাথে লেপ্টে দরজার দিকে দৌড় দেয়। প্রায় উন্মত্ত অনিক নিজেকে আরো নিয়ন্ত্রণহীন করে তোলে। বিছানার পাশের সাইড ড্রয়ারের উপর রাখা ফ্লাওয়ার ভাসটা দিয়ে মিতু ডান হাতের পাশ দিয়ে ঝড়ের গতিতে আঘাত করে। হঠাৎ কান্নারত আদনান কান্না দেয় থামিয়ে। মিতু ডান হাতের মাঝ বরাবর তীব্র ব্যথা পেলেও সে ব্যথা ওকে ছুঁতেও পারলো না। সে শুধু বুকের মাঝে ছোট্ট আদনানের শরীরের শেষ ঝাঁকুনি অনুভব করে। বিস্ফোরিত চোখে বারবার নিশ্চুপ ছেলেকে দুহাতে ঝাঁকায়। ডান হাতের মাঝ বরাবর দিয়ে উষ্ণ তরলের বন্যা বয়ে যায়। অনিকের আঘাতটা মিতুর ডান হাতের বাহিরে বেরিয়ে থাকা আদনানের ছোট্ট মাথায় লেগেছে আর সে মুহুর্তেই ওদের বুকের মানিক এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে। মিতু দরজা কাছে গিয়েও দরজাটা খুলতে পারলো না। ওখানেই ধ্বপাস করে ফ্লোরে পড়ে যায়। তখনো আদনানকে পাগলের মতো ঝাঁকাচ্ছেই। অনিকের মাঝে আগেও যেমন প্রতিক্রিয়া হয় ঠিক তেমনি আজকেও হলো তাই। সেও হঠাৎ চুপচাপ হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপরই মিতুকে সরিয়ে দরজা খুলে ওদের ঘর থেকে বেড়িয়ে যায়।
ওদিকে দরজা খুলে অনিক বেরিয়ে যেতেই অনিকের মা ওদের ঘরে প্রবেশ করে। আর উনিও মিতুর মতো নির্বাক হয়ে পড়েন। অনিকের বাবাও এসে এ দৃশ্য দেখে বিচলিত হয়ে যান। প্রচন্ড ক্ষোভে ফেটে পড়েন। ঘর থেকে বেরিয়ে অনিকের খোঁজ করতে থাকেন। না, ওকে ঘরের ভিতরে এবং ছাদে কোথাও পাওয়া গেলো না। বিয়ের আগেও একদিন ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। পরে পাশের মহল্লার গলিতে এককোনে ঘুমন্ত অবস্থায় পাওয়া যায় তাকে। বাবা ভাবলেন কিছু সময় পরে গিয়ে ওকে খুঁজে আনবেন।
উনি মিতুর কাছে ফিরে আসেন। অনেটা সময় কেউ কেনো কথা বলে না। মিতুর মা—ই প্রথম কথা বলেন, বৌমা, নানুকে আমার কোলে দাও।
এই প্রথম মিতুর গলায় ঝড় বয়ে যায়। চিৎকার দিয়ে বলে, না , আমি দেবো না। আমি আমার মানিককে দিবো না। ও আমার বুকেই থাকবে। ও আমার বুকেই থাকবে। মিতুর বুক ভেঙে কান্নার ঢেউ উথলে ওঠে। হাউমাউ করে করে কেঁদে ওঠে। অনিকের মা—ও মেঝেতে বসে পড়ে মিতুকে জড়িয়ে কাঁদতে থাকেন। সময় গড়িয়ে চলে। এক সময় মিতু অনিকের মায়ার হাতের বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে দাঁড়িয়ে যায়। পাগলের মতো এদিকে ওদিকে খুঁজে মোবাইলটা হাতে নেয়। কাঁপাকাঁপা হাতে রাত সাড়ে তিনটায় ময়মনসিংহে ওর বাবাকে ফোন দেয়। অনেক সময় ধরে বাবাকে শুধু মাত্র কয়েকটা কথাই বলতে পারে যে ও বাড়ি ফিরছে। ওদিক থেকে হতভম্ব বাবা শুধুই একটা কথাই বললেন, হাঁ মা, আয়। আমি স্টেশনে থাকছি তোর অপেক্ষায়।
মিতু রক্তাক্ত আদনানকে বুকে নিয়েই বাথরুমে যায়। সাথে নিজের আর সোনা মানিকের পোশাক নিয়ে নেয়। বেশ সময় নিয়েই পরম যত্নে সোনা মানিকের শরীরে লেগে থাকা রক্ত পরিষ্কার করে নতুন পোশাক পরায়। নিজেকেও পরিষ্কার করে জামা কাপড় পরে বেরিয়ে আসে। ছোট কালো রঙের হ্যান্ড লাগেজের ভিতর বুকের ধনকে ঢ়ুকায়। ফ্রীজ থেকে বরফের সব টুকরা বের করে বড় পলিথিনে ভরে নেয়। তারপর ব্যাগে রাখা ছোট্ট মানিকের দেহটা ঢেকে চেইন আটকে দেয়। প্রয়োজনীয় টাকা পয়সা আার ফোনটা সহ ভ্যানিটি ব্যগ হাতে নিয়ে অনিকের বাবা মাকে বলে, মা, বাবা, আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আমি যাচ্ছি। আমার সোনা মানিক আমার সাথেই থাকবে।
অনিকের বাবা কথা বললেন, মা, আমরা তোমাকে বিন্দু মাত্র বাধা দিবো না। তুমি এতোদিন তোমার হৃদয় উজাড় করে অনিকের জন্য যা করেছো তাতে আমরা দুজন তোমার কাছে চিরকৃতজ্ঞ। ছেলেটা তো আর ভালো হলো না। তুমি অনুমতি দিলে ওকে আমরা আইনের হাতে তুলে দিবো।
মিতুর চোখ আবারো কেঁদে ওঠে। বলে, না, বাবা, না। আমি ওকে অসম্ভব ভালোবাসি। আপনারা ওকে কিছুই করবেন না। ও যদি এরপরও ভালো হয়ে আমার কাছে ফিরে আসে, আমি ওকে আগের মতোই ভালোবাসবো। আমি চলে যাচ্ছি, বাবা আমার মানিককে নিয়ে।
অনিকের মা প্রথমে মিতুকে জড়িয়ে তারপর ওর হাতের ট্রাভেল ব্যগটা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। মিতু অনেক চেষ্টায় মাকে ছাড়িয়ে বাড়ির বাহিরে বের হয়ে আসে।
ভোরের সূর্য উঠেছে উঠছে ভাব। মিতু এক অচেনা ভোরে ঘোরের মধ্যে একাকী রিক্সা করে কমলাপুর রেল স্টেশনে এসেছে সেই কখন। ময়মনসিংহ যাবার টিকিট কেটেছে, ট্রেনও যথাসময়ে এসে হাজির। কিন্তু এখনো পর্যন্ত ট্রেনে কাউকে উঠতে দিচ্ছে না। হাতের ব্যাগের মোটা কাপড়ের ওপর ঠান্ডা ভাব বাড়ছে। মিতুর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হতে শুরু করেছে। হঠাৎই অপেক্ষমাণ যাত্রীরা আনন্দে হই হই করে ওঠে। কারণ জানতে জানা গেলো ট্রেনে সবাইকে যার যার আসনে বসতে বলা হয়েছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন চালু হবে।
মিতুও তাড়াহুড়ো করে ওর শীতাতপ কামরায় উঠে বসে। পায়ের হাঁটুর উপর মানিককে ভরা ব্যাগটা রেখে বুকের সাথে লেপ্টে রাখে। একটা ছোট্ট ঝাঁকুনি দিয়ে ট্রেন চলতে থাকে। এমন সময় ওর ভ্যানিটি ব্যাগে রাখা মোবাইল ফোনটি বেজে উঠে। দ্রুত মোবাইল বের করে রিসিভ করে। ওপাশে অনিকের বাবার কন্ঠ ভেসে ওঠে, বৌমা, শুনতে পাচ্ছো?
হাঁ, বাবা, শুনতে পারছি। ট্রেন এই মাত্র চলা শুরু করেছে।
মা, ঠিক আছে, ঠিক আছে। মা, একটা কথা……..
কি কথা বাবা?
আচ্ছা, ঠিক আছে, ঠিক আছে। তোমরা যাও। পরে বলি…….
বাবা, কি পরে বলবেন? এখনি বলেন। আপনিতো জানেন কেউ কিছু বলতে গিয়ে না বললে আমার মধ্যে কি রকম ওলটপালট লাগে। বাবা, বলেন। কি বলবেন?
আসলে ব্যাপারটা হয়েছে কি…. । বলতে গিয়ে বাবার গলা কান্নায় ফুসে ওঠে। কথা যায় আটকে।
কি হলো বাবা? আপনি কাঁদছেন? মিতুর উৎকন্ঠা বেড়ে যায়।
না, এই তো। না, মানে। মানে হয়েছে কি। ওই যে অনিক বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলো। আমি তো আশে পাশে কত জায়গায় খুঁজে ওকে না পেয়ে বাসায় ফিরে এসে এক অজানা নাম্বার থেকে ফোন পেলাম। লোকটা নাকি অনিকের প্যান্টের পকেটে রাখা মানি ব্যাগে আমার নাম্বার পেয়েছে। তো উনি, উনি বললেন…….। আবার অনিকের বাবার কন্ঠ থেমে যায়।
মিতু উৎকন্ঠা আর চেপে রাখতে পারে না। একটু চেঁচিয়েই বলে, বাবা, বলেন, কি বললো লোকটা? প্লিজ বাবা, প্লিজ।
ও হাঁ। মা, উনি বললেন যে, আজ ভোরে কুড়িল বিশ^রোডে একজন যুবক ট্রেনের সামনে ঝাঁপ দেয়। আর ওরই পকেটে আমার ফোন নাম্বারসহ ঠিকানাও নাকি আছে। বলোতো মা, আমি কি বিশ^াস করবো?
তো আমি মা, ওনার সাথে কথা শেষ করার সাথেই খিলখেত থানার ওসি ফোন করে বলে অনিক নাকি আত্মহত্যা করেছে ট্রেনের নীচে ঝাঁপ দিয়ে। তো, মা, আমি এখন কি করবো? হ্যালো, মা! হ্যালো! কি কথা বলছো না কেনো? মা, হ্যালো!
মিতু বাকরুদ্ধ হয়ে গেছে। মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের করতে পারছে না। মোবাইল ফোনটা কানেই চেপে রাখা। হঠাৎ করেই মিতুর কাছে মনে হলো সে এই বর্তমান সময়ের মাঝে নেই। এই সময়টা স্তব্ধ আর ভীষণ অচেনা লাগছে তার।
মিতুর বুকের সাথে ছুয়ে রাখা সোনা মানিকের শীতল দেহ আর লোহার চাকায় লেগে থাকা ভালোবাসার মানুষটির রক্ত নিয়ে এক অচেনা সময়ে ছুটে চলেছে মিতুকে নিয়ে বহু প্রতীক্ষিত ট্রেনটি।
সৈয়দ মনজুর কবির, গল্পকার




