এখন সময়:রাত ১:৫৭- আজ: মঙ্গলবার-৯ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

এখন সময়:রাত ১:৫৭- আজ: মঙ্গলবার
৯ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

শিখা গোষ্ঠী : জ্ঞানমগ্ন চৈতন্যের উৎস সন্ধানে

ইউসুফ মুহম্মদ

মানুষ নিজেকে প্রকৃতিতে ছেড়ে দিয়ে নতুন চিন্তা-চেতনা লাভের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। তাছাড়া অর্জিত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে শূন্যতার স্তর থেকে বৌদ্ধিক আলোয় পৌঁছুতে সক্ষম হয়। ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে এই আলো লাভ করার মাধ্যমে মানুষ প্রকৃত মানুষের ও শঙ্করের চেতনায় পৌঁছে। জ্ঞানানুশীলনের বন্ধুর পথে হেঁটে বুদ্ধি, চিন্তা, চেতনা ও যুক্তিকে শাণিত করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এই বিবেচনা ও সমাজে বিরাজমান ধর্মীয় কুসংস্কার, অন্যায়, অন্ধত্ব, ও কূপম-ুকতা ঘোচানোর লক্ষ্যে বিশ শতকের প্রথমার্ধে কিছু মুসলিম যুবক সংগঠিত হন। তাঁরা “মুসলিম সাহিত্য সমাজ” প্রতিষ্ঠা করেন। এর অধীনে ‘শিখা’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করা হতো। তাঁদের কর্মকা-ের কোথাও “শিখা গোষ্ঠী” কথাটি লেখা ছিল না। তবে তাঁরা এই নামেই পরিচিতি লাভ করেন।

আত্মনিয়ন্ত্রণে মানুষকে জ্ঞানের কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়। তাতে মানুষ ভাবপ্রবণতা ও যুক্তিহীনতার কাছে হার মানে না। এভাবে মনের মুক্তি ঘটাতে পারলে যে কেউ সমাজিক ভ্রান্ত নীতি, ধর্মীয় কুসংস্কারসহ যাবতীয় অন্ধতার বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে, তৈরি করতে পারে পাথর ভেঙে পথ। এই পথ তৈরির মাধ্যমে আলোর ফোয়ারা উজ্জীবনের লক্ষ্যে ইউরোপীয় চিন্তাবিদ ও দার্শনিকরা ষোড়শ শতকে নতুন চিন্তার সূত্রপাত ঘটান। তাতে সূচনা হয় ‘এনলাইটমেন্ট’ যুগের।

ইউরোপের এই জাগরণের ঢেউ বহু পরে হলেও ভারতবর্ষে এসে লাগে। ফুটে ওঠে আলো, স্ফুরণ ঘটে নতুন চিন্তার, শুরু হয় প্রগতির বিস্তার। ধর্মের কঠিন বেড়া ডিঙিয়ে এই পথ তৈরি হওয়া খুব একটা অনায়াসসাধ্য ছিলো না। সে অন্যপ্রসঙ্গ, তবে উনিশ শতকে কলকাতায় এই কর্মকা- দৃঢ়তার সাথে চালিয়ে যেতে উদ্যমী হয়েছিলেন কিছু তরুণ সাহিত্যিক। তাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিও। তাঁর উদ্যম ও প্রচেষ্টায় শুরু হয় ইয়ং বেঙ্গল মুভমেন্ট (Young Bengal Movement)। এই আন্দোলন নব্যবঙ্গ আন্দোলন নামেও পরিচিত এবং এটি ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতে সামাজিক ও ধর্মীয় কুসংস্কারের বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।

ডিরোজিও ছিলেন একজন ইউরেশীয় কবি, যুক্তিবাদী চিন্তাবিদ ও শিক্ষক। তরুণ হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিয়ো মাত্র সতেরো বছর বয়সে কলকাতা হিন্দু কলেজের শিক্ষক নিযুক্ত হন। তিনি ইংরেজি সাহিত্য ও ইতিহাস পড়াতেন এবং পাঠদানের পদ্ধতি ছিল তাঁর ধ্যান-ধারণার মতোই গতানুগতিকতামুক্ত। তিনি হিন্দু কলেজে শিক্ষকতা করার সময় তাঁর ছাত্রদেরকে জীবন ও সমাজের প্রতি যুক্তিসঙ্গত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরির ক্ষেত্রে উদ্দীপ্ত করে তোলেন এবং ধর্মীয় ও রাজনৈতিক সংস্কারের দৃষ্টিভঙ্গীতে দীক্ষিা দেন। সে সময় ডিরোজিওর চিন্তা চর্চাকে শাণিত করেছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়, বঙ্কিমচন্দ্র প্রমুখ। প্রাজ্ঞ ও যুক্তিবাদী মানুষ তৈরির তীব্র আগ্রহ এবং এর নিরিখে ছাত্রদের সাথে তাঁর মিথস্ক্রিয়া হিন্দু কলেজে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল । তাঁর আয়োজিত বিতর্ক সভায় ধারণা এবং সামাজিক রীতিনীতি নিয়ে অবাধে কথা বলা যেতো। তিনি শিক্ষার্থীদের সমম্বয়ে ‘একাডেমিক অ্যাসোসিয়েশন’ নামে একটি সাহিত্য এবং বিতর্ক ক্লাব প্রতিষ্ঠায়ও তাদের উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। সে সময় নানা বিতর্ক নিয়ে হিন্দু সমাজের অস্থিরতা চরমে পৌঁছে ছিলো। খুবই স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি কলেজের চৌকস একদল ছাত্রকে তাঁর পাশে পেয়ে যান। তিনি তাদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে এবং অন্ধভাবে কিছু গ্রহণ না করার পরামর্শ দিতেন। তাঁর শিক্ষা, স্বাধীনতা, সাম্য এবং স্বাধীনতার চেতনা বিকাশে ক্রমাগত মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছিল। তাঁরা সামাজিক কুসংস্কার দূর করা, নারী ও কৃষকদের অবস্থার উন্নতি সাধনে এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে প্রচার-প্রচারণা চালাতেন। বলা যায় তাঁদের কার্যক্রম বাংলায় বৌদ্ধিক বিপ্লব এনেছিল।
এই আন্দোলন ছিলো খ-িত, কেননা তৎকালে একে উপমহাদেশীয় নবজাগরণ ও প্রগতির বিস্তার হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বৃহত্তর মুসলিম সমাজকে এর বাইরে রাখা হয়েছিলো। মূলত এই আন্দোলনের স্রোত বিকশিত বা আবর্তিত হয়েছিল হিন্দু মধ্যবিত্তের হাত ধরে। এই ধারা থেকে ছিটকে যাওয়া বাঙালি মুসলিম সমাজের কিছু শুভবুদ্ধি ও প্রাজ্ঞজন ক্রমে অনুধাবন করেছিলেন যে, তাঁদেরকেও স্বতন্ত্র জাগরণী কণ্ঠ সৃষ্টি করতে হবে। তাঁরা ভাবলেন, বিদ্বৎসমাজকেই অনেক সময় লোক-গুরুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয়। ফলে ঢাকার কিছু তরুণ একত্রিত হয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ।’ মুসলিমরা এই প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন করলেও তাঁদের আমন্ত্রণে তৎকালে হিন্দু সমাজের বহু চিন্তক ঢাকায় অনুষ্ঠিত বিভিন্ন অধিবেশনে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, মোহিতলাল মজুমদার, সুরেন্দ্রনাথ মৈত্র, হেমন্ত কুমার সরকার, রমেশচন্দ্র মজুমদার, সুশীল কুমার দে প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। তবে মুসলিম সাহিত্য সমাজ-এর প্রথম বাৎসরিক সভায় যোগদানের জন্য ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে কাজী নজরুল ইসলাম সর্বপ্রথম ঢাকায় এসেছিলেন।

যুক্তিবাদ, অনুসন্ধিৎসা, বৈজ্ঞানিক চেতনায় মানুষকে উদ্বুদ্ধ, জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে পূর্ববাংলার শিক্ষার্থী নির্বিশেষে সকলকে যুক্ত করতে না পারলে সমাজ ঢেউ ভাঙা জলের বুদবুদ হয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে সম্পাদক আবুল হোসেন ‘বার্ষিক বিবরণী’-তে উল্লেখ করেছেন, “যে জাতির সাহিত্য নাইÑআবার যে জাতির প্রাণের অভাব সে জাতির ভিতর সত্যিকার সাহিত্য জন্মলাভ করতে পারে না। এ কথাটি ভাল করে বুঝবার মতো শক্তি বোধ হয় বাঙালি মুসলমানের এখনো হয় নাই।”

এই পিছিয়ে পড়া ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কহীন তৎকালীন পূর্ববাংলার বাঙালিদের বুদ্ধিকে শাণিত করার লক্ষ্যে ১৯২৬ সালে ঢাকায় এই প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন হয়। প্রথম সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন অধ্যাপক মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সে সময় তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক। এই সভায় ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ পরিচালনার ভার পড়ে এ. এফ. এম. আবদুল হক, আবদুল কাদির, আনোয়ার হোসেন ও আবুয়্যোহা নূর আহমেদের ওপর। সম্পাদক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিভাগের অধ্যাপক আবুল হোসেন। অপরদিকে, কাজী আবদুল ওদুদ, কাজী আনোয়ারুল কাদীর, কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখ নেপথ্যে থেকে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতেন। স্মর্তব্য যে, প্রতিষ্ঠানের কোনো সভাপতি ছিলেন না। এই সমাজের সাথে পরবর্তীতে আবুল ফজল ও মোতাহের হোসেন চৌধুরীও যুক্ত হয়েছিলেন।
‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ বিভিন্ন সময় অধিবেশনের আয়োজন করতেন। এসব সম্মেলনে আরো যাঁরা যোগদান করতেন, তাঁরা ছিলেন… আহমদ ফজলুর রহমান, খান বাহাদুর তসদ্দুক আহমদ, মমতাজ উদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ আবদুর রশীদ, আবদুস সালাম খা, আতাউর রহমান খান, মাহমুদ হাসান, খান বাহাদুর আবদুর রহমান খান, আবুল মোজাফফর আহমদ, নাজির উদ্দিন আহমদ, আবদুর রব চোধুরী, হাকিম হাবিবুর রহমান, মোহাম্মদ কাশেম, দিদারুল আলম, মোহাম্মদ ইব্রাহিম, মোহাম্মদ ওয়াজেদ আলী, মোহাম্মদ বরকতুল্লাহ, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন, আকবর উদ্দীন, কামাল উদ্দীন খা, শামসুল হুদা প্রমুখ।
মুসলিম সাহিত্য সমাজের মূল মন্ত্র ছিলো, “জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আড়ষ্ট, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।” মানবতার উজ্জীবনে সভ্যতার অভিষেক থেকে কালে কালে পৃথিবীতে বহু মনীষী বৌদ্ধিক অনুভবের সংযোগ রচনা করেছিলেন। তাঁদের প্রয়াস ও চর্চায় উদ্বুদ্ধ হয়ে সংগঠকরা এই মহত্তম কাজে পা বাড়িয়েছিলেন। এখানে স্মর্তব্য যে, তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা মুস্তফা কামাল পাশার আদর্শ ও ভারতের নবজাগরণে সম্পৃক্ত লেখকদের প্রয়াস এইক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। এই সমাজের সাথে সম্পৃক্ত লেখকরা তাঁদের কর্ম-চিন্তা পূর্ববাংলার বাঙালিসহ সবার কাছে পৌঁছে দেবার জন্য আয়োজন করেন সাময়িক অধিবেশন ও বার্ষিক সম্মেলনের। তাছাড়া ব্রতী হন ‘শিখা’পত্রিকা প্রকাশ ও গ্রন্থ রচনায়। তাঁদের মুখপত্র ‘শিখা’-র প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয় ১৩৩৩ বঙ্গাব্দের চৈত্র মাসে। এই পত্রিকার মোট পাঁচটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল, যা ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত টানা প্রকাশিত হয়। প্রথম সংখ্যার সম্পাদক ছিলেন আবুল হুসেন। তিনি তাঁর এক প্রবন্ধে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, “কেহ হয়ত মনে করবেন এ সমাজের নাম মুসলিম সাহিত্য সমাজ হওয়ায় হিন্দু সাহিত্যিকগণের কোন সম্পর্ক এত নেই। কিন্তু, এই বার্ষিক রিপোর্ট হতে আপনারা বুঝবেন যে এ সমাজ কোন একটি নির্দিষ্ট গ-ির মধ্যে আবদ্ধ নয় কিংবা এ কোন এক বিশেষ সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য গঠিত হয়নি। সাহিত্য সৃষ্টি এর উদ্দেশ্য, আর সেই সাহিত্যে মুসলমানের প্রাণ ও জীবন ফুটিয়ে তোলাই ইহার অন্যতম উদ্দেশ্য।” তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, “চিন্তাচর্চা ও জ্ঞানের জন্য আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি এবং আবহমানকালের চিন্তা ও জ্ঞানের সঙ্গে সংযোগ সাধনই প্রধান লক্ষ্য”। কাজী মোতাহার হোসেন-দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যার, মোহাম্মদ আবদুর রশীদ- চতুর্থ সংখ্যার এবং আবুল ফজল ছিলেন সর্বশেষ সংখ্যার সম্পাদক ছিলেন। আবুল ফজল তাঁর লেখায় উল্লেখ করেছেন, শিখায় সম্পাদক হিসেবে যাঁর নামই আসুক না কেন, সম্পাদনার মূল কাজটি আবুল হুসেনই করতেন।

বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্টরা নারী স্বাধীনতার বিষয়েও সোচ্চার ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯২৩ সালে ‘এন্টি পর্দা লিগ’ বা ‘পর্দা বিরোধী সংসদ’নামে একটি সংগঠনের গোড়াপত্তন হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম ছাত্রী ফজিলাতুন্নেসা জোহা। তিনি ক্লাসে আসতেন শাড়ি পরে। তখন ১৯২৭-২৮ সাল। তাঁকে প্রায়ই ইট-পাটকেল ছুড়ে হেনস্তা করা হতো। এই ফজিলা গণিতে এমএ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। তাঁর এমন কৃতিত্বে ‘এন্টি পর্দা লিগ’এর আয়োজনে ‘শিখা গোষ্ঠী’ তাঁকে সংবর্ধনা প্রদান করে।

কাজী আবদুল ওদুদ ও আবুল হুসেন ছিলেন এই সংগঠনের অন্যতম চিন্তক । তাঁদেরকে যথাক্রমে সংগঠনটির মস্তক ও হস্ত এবং কাজী মোতাহার হোসেনকে সংগঠনটির হৃদয় হিসেবে দেখা হতো।

‘শিখা গোষ্ঠী’-র সাথে স্বল্প সংখ্যক তরুণ লেখক সংশ্লিষ্ট হলেও কিছুদিনের মধ্যেই তৎকালীন পূর্ব বাংলায় এই সংগঠন প্রবল উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। সাম্প্রদায়িক ভেদ-বুদ্ধি, চিন্তার সংকীর্ণতা ও জড়তার মূলে এই সংগঠন কুঠারাঘাত করতে সক্ষম হয়েছিল। কাজী মোতাহার হোসেন সেই সময় একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন, ‘আনন্দ ও মুসলমান গৃহ’ শিরোনামের এই লেখা প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। মুসলিম সমাজের সাংস্কৃতিক বিমুখতা লক্ষ্য করে এতে তিনি তাতে উল্লেখ করেছিলেন, “মুসলমান গান গাইবে না, ছবি আঁকবে না, এক কথায় মনোরঞ্জনকর ললিতকলার কোনো সংশ্রবেই থাকবে না। মুসলমান পুরুষেরা কেবল কাজ করবে, আর ঘর শাসন করবে; মেয়েরা কেবল রাঁধবে, বাড়বে, আর বসে বসে স্বামীর পা টিপে দিবে; তাছাড়া খেলাধুলা, হাসি-তামাশা বা কোনও প্রকার আনন্দ তারা করবে না। সব সময় আদব-কায়দা নিয়ে দুরস্ত হয়ে থাকবে। আনন্দ? কোথায় আনন্দ? কি হবে আনন্দে? মুসলমান তো বেঁচে থাকতে আনন্দ করে না, সে মরে গিয়ে বেহেশতে প্রবেশ করে পেট ভরে খাবে, আর হুরপরিদের নিয়ে অনন্তকাল ধরে আনন্দ করবে। ব্যস! এই তার সান্ত¡না!

গৃহে যখন আমাদের থাকতেই হবে, তখন আমরা এর সংস্কারে লেগে যাই না কেন? সমাজকে যখন আমরা বাদ দিতে পারি না, তখন একে সরস শোভন এবং আনন্দময় করেই গড়ে তুলি না কেন?”

আবুল হুসেন ‘বাঙালি মুসলমানের শিক্ষা সমস্যা’প্রবন্ধে লিখেছেন, “কেন মুসলমানের এই দুর্গতি? এই প্রশ্নের উত্তর এককথায় দিতে গেলে বলতে হবে আমাদের শিক্ষা নাই- জ্ঞানের সঙ্গে বহুদূর ক্ষতি ও বিরোধ করে বসেছি এবং বিজ্ঞান ও আর্টকে আমাদের শিক্ষা কেন্দ্র হতে গলাধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিÑএই ভয়ে, পাছে তাতে আমাদের ধর্ম নষ্ট হয়। ধর্ম আমাদের এতই নাজুক!”

শাস্ত্রনিরপেক্ষ এই সংগঠনের বক্তব্য, লেখা ও ঘোষণায় ইসলাম বা মুসলমানদের বিরুদ্ধে কিছু উচ্চারিত হয়নি। এতদসত্ত্বেও ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ অচিরেই প্রথানুগতদের বিরক্তির কারণ হয়ে ওঠে। তাঁরা ভেবে নিয়েছিলেন এই সংগঠন ইসলামের বিরুদ্ধাচরণ করছে এবং বৈরীতা সৃষ্টি করছে। ফলে নিষিদ্ধের কারণে স্থগিত হয়ে যায় মুসলিম হলে আয়োজিত সভা। এটি ছিল এই প্রতিষ্ঠানের তৃতীয় সভা। তবে পরবর্তীতে এই সভা অনুষ্ঠিত হয় জগন্নাথ হল ও লিটন হলে।

এক সময় ঢাকার নবাব বাড়ির ছিল দোর্দ- প্রতাপ। কালের পরিক্রমায় ওই সময় সে প্রতাপ স্তিমিত হয়ে এলেও ঢাকায় সংগঠিত যে কোনো বিষয়ে তাঁরা অনভিপ্রেতভাবে প্রভাবক হিসেবে হস্তক্ষেপ করায় প্রয়াসী ছিলেন। এই ক্ষেত্রেও তাঁরা ধর্মদ্রোহিতার অপবাদ তুলে আহসান মঞ্জিলের এক বিচার সভায় ডেকে পাঠান ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’-এর সম্পাদক আবুল হুসেনকে। সেখানে তাঁকে কৈফিয়ত দিতে হয়েছিল এবং লিখিতভাবে ক্ষমা চাইতেও তাঁরা বাধ্য করেছিলেন। এরপর তিনি মুসলিম সাহিত্য সমাজের সম্পাদক, এমন কি সাধারণ সদস্য পদ থেকেও ইস্তফা দেন। আবুল হুসেন ১৯৩২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে কলকাতায় পাড়ি জমাতে বাধ্য হয়েছিলেন। তাঁর ঢাকা ত্যাগ ও অন্যান্য কুশীলবদের বিভিন্ন ব্যস্ততা ও তাঁরা নানা দিকে ছড়িয়ে যাওয়ায় ১৯৩৮ সালে সংগঠনটির সমাপ্তি ঘটে।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রতিষ্ঠিত এই সাহিত্য সমাজ বাঙালি মুসলমানের জাগরণে সে সময় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। কুসংস্কার, রক্ষণশীলতা, অশিক্ষা ও গোঁড়ামির বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার ক্ষেত্রে বাঙালি মুসলমানকে দীক্ষা দিয়েছিল এই সংগঠন। জ্ঞানের সীমবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে মুক্ত চিন্তার বীজমন্ত্রে উদ্দীপ্ত হয়ে সাহিত্য সমাজের যাত্রা শুরু হয়েছিল সে কথা আগেই বলেছি। সংগঠনের নামের আগে ‘মুসলিম’ শব্দটি থাকলেও এখানে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কোনো সুযোগ ছিলো না। ফলে হিন্দু-মুসলমান উভয়েই স্বচ্ছন্দে এতে অংশ নিয়েছিলেন। সংগঠনের কর্মযজ্ঞে উদার ও মুক্তচিন্তার সঙ্গে সম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, মানবকল্যাণ, শিল্পচর্চা, নারীশিক্ষা ও অর্থনীতি প্রসঙ্গে মুসলমানদের প্রত্যক্ষণ পরিবর্তনে তাঁরা বিস্তৃত এক আবহও তৈরি করেছিল, যার আলোড়ন এখনো স্মর্তব্য ও অনুকরণীয় হতে পারে।

জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা, ইতিহাস, ও শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার সংকট এখন আমরা আরো প্রকট করে তুলেছি। হীন ব্যক্তি স্বার্থে ও নানা দলীয় দ্বন্দ্বে আমরা ছাত্রদের ব্যবহার করে তাদের অন্ধকূপে ঠেলে দিচ্ছি। এই স্বার্থবুদ্ধিতাড়িত রাজনীতিক, ছাত্র ও শিক্ষকদের কারণেই শিক্ষাঙ্গনকে আজও মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্রে পরিণত করা যায়নি। আমাদের দেশে মুসলিমের সংখ্যা সর্বাধিক। তবু ইসলাম ধর্ম নিয়ে ধর্মান্ধ মুসলমানদের ভয় নদী ভাঙা গৃহস্থের মতো। ফলে তারা মুক্তবুদ্ধিচর্চাকে ইসলামের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করাতে সর্বদা সক্রিয়। এতে আমাদের সমাজের বর্তমান দৈন্যদশা ও মানবিক অস্বচ্ছতা ক্রমশঃ প্রকট হচ্ছে। ফলে মূল্যবোধসমৃদ্ধ, বুদ্ধি, যুক্তি-তর্ক ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে। আমাদেরকে বুঝতে হবে যেÑআত্মসমালোচনা, জিজ্ঞাসা, যুক্তি-তর্ক, জ্ঞানের অনুসন্ধান ব্যতীত বাঙালির অগ্রযাত্রা ইন্দ্রজালের ছায়ায় হারিয়ে যাবে।

সহায়ক গ্রন্থ:
১. বিদ্রোহী ডিরোজিও, বিনয় ঘোষ, প্রকাশক: বাক-সাহিত্য, কলকাতা, প্রথম প্রকাশ: মার্চ, ১৯৬১
২. নির্বাচিত প্রবন্ধ: আবুল ফজল, সম্পাদনা: মাহবুবুল হক, প্রকাশক: সময় প্রকাশন, ঢাকা, প্রকাশকাল: ২০০১
৩. মুস্তাফা নূর-উল ইসলাম সংকলিত ও সম্পাদিত শিখা সমগ্র, প্রকাশক: বাংলা একাডেমি, ঢাকা, প্রকাশকাল: ২০০৩
৪. প্রবন্ধ সংগ্রহ, কাজী মোতাহার হোসেন, সম্পাদনা: আবুল আহসান চৌধুরী, প্রকাশক: নবযুগ প্রকাশনী, ঢাকা, প্রকাশকাল: ২০০৭
৫. বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন ও উত্তরকাল, আবুল কাসেম ফজলুল হক প্রকাশক: জাগৃতি প্রকাশনী, ঢাকা, প্রকাশকাল: ২০০৮
৬. খন্দকার সিরাজুল হক, মুসলিম সাহিত্য-সমাজ: সমাজচিন্তা ও সাহিত্যকর্ম, কথা প্রকাশ, ঢাকা, প্রকাশকাল: ২০১৫
৭. আবুল আহসান চৌধুরী সংকলিত ও সম্পাদিত মুসলিম সাহিত্য-সমাজ: সভার সংক্ষিপ্ত কার্যবিবরণী ১৯২৬-১৯৩৮,
প্রকাশক: পাঠক সমাবেশ, ঢাকা, প্রকাশকাল: ২০১৫

ইউসুফ মুহম্মদ: কবি ও প্রাবন্ধিক, চট্টগ্রাম

 

হাসনাত আবদুল হাই: নবতিতম জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

আলম খোরশেদ তাঁর কথা প্রথম শুনি স্বয়ং পিতৃদেবের মুখে। একই এলাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ দুজনেই, তদুপরি লতায় পাতায় কীরকম যেন আত্মীয়ও। এই নিয়ে একধরনের চাপা গর্বও

ডা. চন্দন দাশ ছিলেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের এক নিবেদিতপ্রাণ

শোয়েব নাঈম চন্দন দা’ (ডা. চন্দন দাশ) অভূতপূর্ব মানসিক অনুরণনে আমার মধ্যে বহু বছর আগেই বসন্তের এক রেশ রেখে গেছেন। তাঁর বসন্তের এই রেশ ছিল

তেজোদীপ্ত তোফায়েল আহমেদ বোধশূন্যতায় তুমি শোকসভা

কামরুল হাসান বাদল   বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে একাত্তর একবারই এসেছিল, সে একাত্তর গৌরবের, সে একাত্তর অহংকারের। সে একাত্তর আর কখনও বাঙালির জীবনে আসবে না।

পান্থজনের কথা

সুমন বনিক মহেড়া জমিদার বাড়ির নামটি অনেক আগেই জানা ছিল, কিন্তু দেখা হয়নি। ইতিহাসের মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে এর মানিকরতœ উদঘাটন করা ঊর্মিলা (আমার স্ত্রী)’র স্বভাবজাত

পরিশেষে সেই তুমি

সৈয়দ মনজুর কবির এমনিতেই সরু গলি, কি বুঝে ফায়ার ব্রিগেড এর মাঝারি সাইজের পেট মোটা ওয়াটার ওয়াগনটা ঢ়–কলো তা দামালের বোধগম্য হচ্ছে না। অফিসের গাড়ি