এখন সময়:রাত ১:২৭- আজ: মঙ্গলবার-৯ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

এখন সময়:রাত ১:২৭- আজ: মঙ্গলবার
৯ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-২৬শে জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-গ্রীষ্মকাল

আধুনিক ইরানি কবিতা

মহীবুল আজিজ

এডওয়ার্ড জি ব্রাউনে, আর্থার জন র্আবেরি, আর এ নিকলসন এরকম সব প-িতের মতে, পৃথিবীর সর্বকালের সেরা দশজন কবির তালিকায় ফারসি ভাষা-সাহিত্যের কবি থাকবেন অন্তত চারজন। এতেই ফারসি ভাষা-সাহিত্যের গৌরবের দিকটি অনুধাবন করা যায়। আর সর্বকালের সেরা কবি যে জালালুদ্দিন রুমি সেটিও আজ সর্বজনবিদিত। বস্তুত বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন আঙ্গিকে কবিতা রচিত হয়েছে ফারসি ভাষায়। সাসানি, সামানি, গাযনাভি, সালজুকি, ইরাকি প্রভৃতি যুগ পেরিয়ে মধ্যবর্তী বা মাক্তাবে অকু ওয়া ভাসুখ্ত পর্ব অতিক্রম করে অষ্টাদশ শতকে ফারসি ভাষা-সাহিত্য নিজস্ব জাতীয়তা-ঐতিহ্য-পরিচয় এইসবের দৃঢ়তায় স্থিত হয়। লক্ষ করা দরকার, প্রয়োজনে আরবি প্রভাবকেও ইরানি সাহিত্যিকেরা এড়িয়ে গেছেন। আত্মপরিচয়ের সেই আস্থা ছিল ফারসি সাহিত্যের শক্তিশালী ও বিচিত্র সম্পদগর্বের শেকড়ে মূলীভূত। দশম-একাদশ শতকের কবি ফেরদৌসি তাঁর শাহ্নামা’র ভূমিকায় আরবির পরিবর্তে ফারসির গরিমাকেই প্রচার করেছেন। তিনি বলেছেনও, যথাসম্ভব আরবি শব্দকে এড়িয়ে তিনি তাঁর মহাকাব্য রচনা করেছেন। ফেরদৌসির এ-ঘোষণা আত্মভাষা ও সংস্কৃতির গৌরবে গৌরবান্বিত সর্বযুগের কবি-সাহিত্যিকদের জন্যে একটি দিকনির্দেশনাও বটে। ফেরদৌসি তাঁর মহাকাব্যের মাধ্যমে ফারসি সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ আঙ্গিক ‘হামাসে’কে বিশিষ্টতা দিয়ে যান। হামাসে বা বীরত্বগাথাকে এপিক বা মহাকাব্য বলা হয়ে থাকে। এছাড়াও নানা আঙ্গিকে বিকশিত হয়েছে ফারসি সাহিত্য। ক্বাসিদা, মাসনাভি, রোবাঈ, গযল, দোবেইতি, মুসাম্মাৎ, কেতয়া, তারজিবান্দ, তারকিববান্দ, মুস্তাযাদ এসব মাধ্যমে রচিত হয়েছে অসংখ্য রচয়িতার অজস্র রচনা। এটিও স্মরণযোগ্য ফারসি ভাষা-সাহিত্যের বিকাশ কেবল ইরানেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইরাক, তুরস্ক, ভারতবর্ষ, আযারবাইজান, আফগানিস্তানসহ বিভিন্ন স্থানে রচিত হয় ফারসি ভাষার উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্ম।

এত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ফারসি কবির রচনাবলি আমরা পেয়েছি যে একনিঃশ^াসে তাঁদের সকলের নাম করা মুশকিল। একেকজন কবি একেক ধরনের একেক ভাবের কাব্য উপহার দিয়েছেন। আজকের ফারসি সাহিত্যের ভিত্তিমূলটি কাজেই অত্যন্ত মজবুত। দশম/একাদশ শতকের কবি একজন রুদাকি-ই রচনা করেছিলেন দশ হাজারের অধিক মসনভি যেগুলোর মধ্যে সংরক্ষিত করা গেছে মাত্র আটশ’টি। তাঁকেই ফারসি কাব্যের জনক হিসেবে গণ্য করা হয়। পরবর্তীকালে ফেরদৌসি, ফররুখি সিস্তানি, মনুচেহ্রি দামঘানি, আনওয়ারি অভিবার্দি, মাসুদ সাদ সালমান, নাসের খসরু, নিজামি গঞ্জভি দশম/একাদশ শতককে সোনায় বাঁধাই করে রেখে যান। বিষয়-ভাব-চিত্র-গীতিময়তা সবকিছুরই স্ফূরণ ঘটে তাঁদের কাব্যকর্মে। পরবর্তী তিনটি শতাব্দী অবশ্য পূর্ববর্তী দুই শতকের মত প্রভ না হলেও স্মরণীয় হয়ে থাকেন অনেকেই। সানাঈ গযনভি, আত্তার নিশাবুরি, জালালুদ্দিন মোহাম্মদ মৌলভি রচনা করেন অধ্যাত্ম ও সুফি ধারার প্রখর সব কবিতা। বলা যাবে সাদি শিরাযি’র গীতিময় ও দার্শনিক রচনাকর্মের কথা। চতুর্দশ শতকের কবি শামসুদ্দিন হাফিযের অবিস্মরণীয় কীর্তি অবিনশ^র স্তম্ভের মতো দাঁড়ানো। পাঁচ-পাঁচটি শতাব্দীর পরিবৃত্তে প্রতিষ্ঠিত তাঁর সাফল্য। মানব-মানবীর হৃদয়ভুবনের অসাধারণ বিরহ-মিলনোদ্যাপনের মধ্য দিয়ে হাফিয দেখেছেন সমগ্র পৃথিবীর মানবজাতিকে। হাফিয এমন একটা সময়ে কাব্যচর্চায় নিয়োজিত ছিলেন যা ইরানের ইতিহাসে এক ভয়ংকর দুর্যোগের কাল। যুদ্ধ-নিপীড়ন-আগ্রাসন প্রভৃতির নখরে রক্তাক্ত ছিল কবির সমকাল। হাফিয দেখেছেন স্বৈরশাসক মীর মুবারেজুদ্দিনের নিষ্ঠুর শাসন। তাঁর বহু কবিতায় বিধৃত হয় দেশ-জাতির দুর্দশাগ্রস্ত পরিস্থিতির চিত্র। বহু প্রতীকী কবিতা রয়েছে তাঁর যেখানে শাসকদের নির্ভীক সমালোচনায় তিনি দীপ্র।

হাফিযোত্তর সাফাভি যুগে ফারসি কবিতা আবার ভিন্ন ভাবাঙ্গিকের অভিযাত্রিক। প্রশাসনিক ভাবধারা সাফাভিদের শিয়া মতাদর্শে পরিচালিত হওয়ার কারণে এসময়কার সাহিত্য যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত হয়। ঠিক এসময়টাতেই ফারসি সাহিত্য ভিন্ন দিকে মোড় ঘোরায়। ইরান থেকে অনেক ফারসি কবি-সাহিত্যিক অভিবাসী হয়ে পড়েন মুঘল ভারতবর্ষে। এঁদের মধ্যে অনেকেই লাভ করেন কাব্যিক সাফল্য। শাসক তৈমুর লং-এর ভয়ংকর দুর্যোগপূর্ণ সত্তর বছরের কালসীমায় অন্তত আট থেকে দশজন কবি’র প্রয়াণ ঘটে। কবি হাফিযই নক্ষত্রের মত বিরাজমান থাকেন সবার ওপরে। সাফাভি যুগের দুইশ’ কুড়ি বছরের ফসল সে-অর্থে নিষ্প্রভ। তবে, শিরায নগরের কবি উর্ফি (মৃত্যু ১৫৯০ খ্রি:) এবং ইস্পাহানের সায়েব (মৃত্যু ১৬৭০ খ্রি:)-এর নাম করা যাবে যাঁরা পারস্য থেকে ভারতবর্ষে গিয়ে উজ্জ্বলতা ছড়াতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভারতবর্ষের ফারসি কবিতা সমগ্র ফারসি সাহিত্যে এক নতুন ধরনের নান্দনিকতার সূচনা করে। শৈলি এবং বিষয়বস্তুই নয়, ভাবের গভীরতাতেও ভারতীয় ফারসি কবিরা হয়ে ওঠেন অনন্য। প্রবাদ-প্রবচন, জীবনদর্শন প্রভৃতির মধ্য দিয়ে জীবন ও ইতিহাসকে পর্যবেক্ষণ করবার তাঁদের গযলগুলো ভারত ছাড়িয়ে অন্য গোলার্ধেও লাভ করে জনপ্রিয়তা। বিশেষ করে সায়েব তাবরিজি (১৬০৭-১৬৭৫) তাঁর কবিতায় যে-আপাত রহস্যময়তার সন্ধান দেন সেইটিই কালক্রমে ‘ভারতীয় শৈলি’ হিসেবে পরিচিতি পায়। এ-ধারা ভারতে অভিবাস নেওয়া ফারসি কবিদের স্বাতন্ত্র‍্যরে পরিচয়বাহী হয়। ধারাটিকে অনেকে ‘এস্পাহানি’ ধারা বলেও অভিহিত করেন। কারণ সায়েব এবং তাঁর অনুসারীদের অধিকাংশের আগমন ইরানের এস্পাহান অঞ্চল থেকে। আবার, অষ্টাদশ শতকের কবিদের মধ্যে অনেকেই পঞ্চদশ শতক থেকে প্রচলিত কাব্যধারার পুনরুজ্জীবন ঘটান। এমনকি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কবির কথা বলা যাবে যাঁরা একাদশ শতকের নামকরা কবি মনুচেহ্রি, উন্সুরি, ফররুখি, মাসুদ সাদ সালমান এবং আনওয়ারি’র কাব্যরীতির অনুসারী ছিলেন। এ থেকে বোঝা যায় ফারসি কবিতা অনেক সময় পুরনো রীতির আঙ্গিকেও নতুনত্বের সঞ্চার ঘটাতে সক্ষম হয়। এঁদের মধ্যে গনি শিরাযি (১৮০৭-১৮৫৩) ছিলেন অগ্রগণ্য।

১৯০৫ সালে ইরানে সংঘটিত সাংবিধানিক বিপ্লবের প্রভাব পড়ে ফারসি কাব্যেও। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পত্র-পত্রিকার প্রকাশনা কবিতার জন্যে বিশেষ আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেয়। রাজনৈতিক-সামাজিক চিন্তাজগতের প্রভাবে বদলে যায় বা নতুন রূপ নেয় সাহিত্য। এসময়টাতে একটা দ্বান্দ্বিকতাও প্রকট রূপ নিতে থাকে। প্রথাগত ও নবত্বমুখী এই দুই ধারার অনুসারীরা স্ব-স্ব সাহিত্য ও জীবনদর্শনের নিরিখে রচনা করেন তাঁদের সাহিত্য। সমকালীন পত্র-পত্রিকায় প্রতিফলিত হতে থাকে দুই ধারার চিন্তন। একদলের ধারণা, প্রথা থেকে মোড় ঘোরানোই হতে পারে নতুন ধরনের সৃজনশীলতার পরিবাহী। কিন্তু অনেকেই মনে করেন, ফারসি সাহিত্যের প্রাচীন ঐশ^র্যকে বিদায় জানানোটা হবে অশনিস্বরূপ। একাদশ থেকে শুরু করে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত অন্তত চারজন কবিকে তখনকার ফারসি কবিরা প্রাতঃস্মরণীয় জ্ঞান করেন- ফেরদৌসি, নিজামি, সাদি এবং হাফিয। ১৯১৮ সালে দিকে, অর্থাৎ প্রথম বিশ^যুদ্ধ পরবর্তীকালে এই দুই ধারার মধ্যকার দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য রূপ নেয়। সমকালীন পত্র-পত্রিকার আশ্রয়ে উপস্থাপিত হয় উভয় ধারার ভাষ্য। তবে, ফারসি সাহিত্যের নতুন বাঁক যে অবশ্যম্ভাবী সেটির অনিবার্যতাকে কোনভাবেই পাশ কাটানো যায় না। এসময়কার উল্লেখযোগ্য কণ্ঠস্বর ত্বকি রাফাতের শরণ নেওয়া যায়। লেখক রাফাত ছিলেন বিখ্যাত পত্রিকা তাজাদ্দদ  (রেনেসাঁ)-এর সম্পাদক। কেবল ফারসি নয় ইউরোপিয় সাহিত্যেও ব্যুৎপত্তি ছিল কবি রাফাতের। ফরাসি ও তুর্কি সাহিত্যে তাঁর পা-িত্য ছিল অনন্য। নিজের বৈপ্লবিক চিন্তার সপক্ষে তিনি সহযাত্রী হিসেবে পেলেন আরও অনেককেই। ১৯৬১ সালে তেহ্রান থেকে প্রকাশিত ইয়াহিয়া আরিয়ানপুরের গ্রন্থ সাবা থেকে নিমা অনুসরণ করলে তখনকার পরিস্থিতিটা আঁচ করা যায়। কবি নিমা ইউশিযকে সর্বাগ্রগণ্য আধুনিক হিসেবে ধরে কালচেতন কবিরা সাহিত্যে সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিফলন সম্পর্কে যৌক্তিক ও দিগন্ত উন্মোচনকারী বক্তব্য প্রচার করেন। জবানে আযাদ (মুক্ত কণ্ঠ) পত্রিকায় প্রকাশিত ‘সাদি বিদ্যালয়’ শীর্ষক রচনার লেখক প্রথাগতদের সমালোচনা করেন এবং সাদি’র যুগকে পেছনে ফেলে নতুন ধরনের কাব্যচেতনার দিকে মোড় ফেরানোর আহ্বান জানান। প্রবন্ধকার সাদি’র অনুসারীদের অসচেতন বলে আখ্যা দিতেও কুণ্ঠিত হ’ন না।

ত্বকি রাফাত জবানে আযাদ পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধের ভূয়সী প্রশংসা করে জানান, বর্তমানতার যুগের দাবি কালচেতনতার ভাষ্য। প্রসঙ্গক্রমে তিনি তাঁর দাবির পক্ষে তুলে ধরেন ক্ষুরধার যুক্তি। তাঁর বক্তব্যে নতুন প্রজন্মের সাহিত্যের অভিমুখটি চিহ্নিত হয় সুস্পষ্টভাবে। দ্ব্যর্থকণ্ঠে জানান রাফাত, নতুন প্রজন্মের তরুণরা হলো সমকালের সন্তান। যখন চারপাশে বিন্যাস-সৌন্দর্য ধ্বংসকারী গর্জনের প্রাচুর্য তখন নবপ্রজন্মের কবিদের পক্ষে সেই পরিস্থিতিতে নির্বিকার থাকা মানায় না। অদূরে প্রথম বিশ^যুদ্ধের মারণযজ্ঞ বিবিধ বিনাশের হেতু। যে-আলোড়ন কূলপ্লাবী তাকে প্রাচীন, মসৃণ, প্রশান্ত সাঙ্গীতিক দ্যোতনা দিয়ে বিশেষ করে কবি সাদি’র নান্দনিকতা দিয়ে মোকাবেলা করা অসম্ভব। যে-প্রতিকূল পরিস্থিতি দেশে-বিদেশে সর্বত্র বিরাজমান সেটির কল্পনা সাদি কখনই করে যান নি। যেখানে স্কুলগামী ছেলেমেয়েরাও জানে বিজ্ঞান-প্রযুক্তির কী আশীর্বাদ এবং কী অভিশাপ। সাদি, হাফিয, ফেরদৌসিকে পেছনে রেখে এখন তাই প্রয়োজন নতুন ধরনের জাগরণ। জীবনের সকল সমস্যাকে সামগ্রিকভাবে না দেখে আংশিকভাবে দেখলে নতুন বাস্তবতাকে হৃদয়ঙ্গম করা যাবে না। সাহিত্য যেহেতু জীবনের দর্পণ জাতির দর্পণ কাজেই তাতে সে-জাতির সংস্কৃতি সভ্যতা ইতিহাস সমকাল সবই প্রতিফলনযোগ্য হওয়া চাই। একইভাবে আজাদেস্তান (স্বাধীনতার ভূমি) নামক পত্রিকায় ত্বকি রাফাত প্রচার করেন তাঁর ভাবনা। তিনি জানান, ভাষা হচ্ছে মানুষের ভাবনা এবং আবেগের প্রকাশ-বাহন। ভাষা যদি পৃথিবীর পরিবর্তমানতাকে ধারণ ও প্রকাশ করতে না পারে বা একই অবস্থায় থেকে যায় তাহলে সে-ভাষার কোন কার্যকারিতা থকে না। মানব-মননের বিবর্তন-পরিবর্তন তার সাহিত্যের মধ্যেই ফুটে ওঠে। তাছাড়া আঙ্গিক বা শৈলী বা পর্যবেক্ষণকে না বদলে কখনই কোন প্রকারের পরিবর্তন সম্ভব নয়।

আঙ্গিকের বিচারে দেখা যাবে ফারসি কবিতার আদি আঙ্গিকটি বস্তুত আরবি যেটি ক্বাসিদা নামে চিহ্নিত। খ্রিস্টিয় নবম শতকে কবি হানযালা বাদগিসি এই আঙ্গিকে অনেক কবিতা রচনা করেন। পরবর্তীকালে অন্য আঙ্গিকগুলো ফারসি সাহিত্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। শক্তিশালী কবিদের সৃজনফসলের ফলে এসব আঙ্গিক এবং ফারসি সাহিত্যের বিশেষত্ব প্রায় সমান্তরাল ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। যেমন মসনভি বলতেই আমাদের রুমিকে মনে পড়ে কিংবা রোবাঈ বলতেই খৈয়ামকে এবং গযল বললে হাফিযকে। গযল সাধারণত পাশ্চাত্যের সনেট-আঙ্গিকের সঙ্গে তুলনীয়। চার থেকে শুরু করে চৌদ্দটি পর্যন্ত জোড় পংক্তির গযলের সর্বশেষ পঙক্তিতে উপস্থাপিত হয় রচয়িতার নাম বা পরিচয়। ফারসি ভাষায় পঙক্তিটিকে বলা হয় মাকতা। এর একটি পরিভাষাও রয়েছে- তাখাল্লুস। সাদি এবং হাফিযের গযলে বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রতিভাত। মসনভির মিলযুক্ত জোড় পঙক্তিতে প্রকাশিত হয় রোম্যান্টিক, বীরত্বপূর্ণ বা দার্শনিক ভাবসংবলিত কবিত্ব। চার পংক্তির রোবাঈয়ে প্রকাশ পায় দার্শনিক, আধ্যাত্মিক এবং গীতিময় ভাব। ফারসি কবিরা তাঁদের অধিকাংশ কবিতায় এসব আঙ্গিকের স্বচ্ছন্দ ব্যবহার করে গেছেন। আধুনিক ফারসি কবিরা আঙ্গিকের ব্যাপারে বেশকিছু স্বাধীনতার আশ্রয় নেন। বিশেষ করে পাশ্চাত্য কবিতার মুক্ত ছন্দ এবং গদ্য ছন্দকে তাঁরা ব্যবহার করতে শুরু করেন কুশলতার সঙ্গে।

ফারসি কাব্যে নবদিগন্তের সূচনায় সর্বপ্রথম কবি নিমা ইউশিযের (১৮৯৬-১৯৫৯) নামটি উচ্চার্য। এক অসাধারণ জীবন যাপন করা নিমার কবি হয়ে ওঠা যেন প্রকৃতির খেয়ালেই। হাইস্কুলের ছাত্র থাকা অবস্থাতেই তাঁর কবিতা রচনার সূত্রপাত। তাঁর শিক্ষক নিজাম ওয়াফা (১৮৮৩-১৯৬০) স্বয়ং কবি ছিলেন। প্রেমের কবিতা লিখতেন তিনি। বারো বছর বয়স পর্যন্ত নিমা মাজান্দারান প্রদেশের ইউশ গ্রামে বসবাস করেন। ক্যাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী অঞ্চলটি ছিল নিসর্গের নির্বাচিত এক সৌন্দর্য-টুকরো। তাঁর কৃষক পিতার শ্রমশীল জীবনের রোজনামচা দেখে তিনি বয়োপ্রাপ্ত হ’ন। ১৯৪৬ সালে ইরানি লেখকদের প্রথম কংগ্রেসে নিজের সেই বিচিত্র জীবনের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন কবি নিমা ইউশিয। তাঁর জীবনের প্রথমাংশ কেটেছে গোপালক আর ঘোড়সওয়ারদের জীবন  দেখে-দেখে। বেদুঈন সেই মানুষেরা কিছুদিন পরপর একটা জায়গা ছেড়ে চলে যেতো আরেকটা জায়গায়। প্রত্যেক সন্ধ্যায় পাহাড়ের কোলঘেঁষা তাদের আস্তানায় তারা আড্ডা জমাতো আগুনের কু-লিকে ঘিরে। শৈশব থেকেই সেই লোকেদের মধ্যকার অম্লমধুর অদ্ভুতত্বে ভরা জীবনের তিনি সাক্ষী। তাদের মধ্যকার অভব্য ঝগড়া-মারামারি, সংঘাত আর বিচিত্র ঘটনার জীবন ক্যাস্পিয়ানের স্রোতের সমান্তরালে বয়ে যেতো যেন সভ্যতার উজ্জ্বল আলোক থেকে বহু দূরে নির্জন অথচ কোলাহলপূর্ণ আশ্চর্য প্রবাহ। তাঁকে লেখাপড়া শেখান তাঁদেরই গ্রামের শিক্ষক। পাতার ওপর লেখা বর্ণ-শব্দ-বাক্য সারিবদ্ধবাবে সাজিয়ে তিনি শেখান নিমাকে। আর সেটা যে খুব সুখকর ছিল তা-ও নয়। লিখতে পড়তে না পারলে অবধারিত ছিল লাঞ্ছনা। গাছের কা-ের সঙ্গে বেঁধে রেখে সরু ছিপের ধারে প্রহার ছিল ব্যর্থতার অন্তিম পরিণাম। পিতার কাছ থেকে তিনি লাভ করেন এক ধরনের উদ্ধত অহংকারের বোধ। ঘোড়ায় চড়া, শিকার করা কি ম্যান্ডোলিন বাজানো সবেতেই পারদর্শী ছিলেন তাঁর জনক। আর তাঁর মা ছিলেন প্রকৃতই এক মহীয়সী রমণী। লেখাপড়া জানা তাঁর মায়ের অন্তর পরিপূর্ণ ছিল ধ্রুপদি সব গল্পে-কাহিনিতে। মা তাঁকে শোনাতেন নিজামির ‘হফ্ত্ পয়কর’ হাফিযের গযল। শৈশবের সেই মুগ্ধতাবোধের কারণেই হয়তো নিমা’র সারাজীবন প্রিয় ছিল নিজামি এবং হাফিয। তাঁর সুজনশীলতার আরম্ভের দিনগুলিতে তাঁরাই তাঁর কাঁধে সওয়ার হয়েছিলেন। বলা যায় নিজামির কবিতার অনুকরণেই তিনি ‘সেঘরিম দুর্গ’ নামক প্রায় দেড় হাজার জোড়-পঙক্তিবিশিষ্ট কাব্য রচনা করেছিলেন। হাফিযের অনুসরণে লেখেন গযল। এমনকি আবদুর রহমান জামি, জালালুদ্দিন রুমি এবং খৈয়ামের অনুকরণেও রচনা করেন কবিতা।

নিমার সৃষ্টিশীল জীবনের চল্লিশ বছর এভাবেই কাটে। ১৯৩৭ সালের দিকে প্রকাশিত তাঁর দীর্ঘ কবিতা ‘ফিনিক্স’-এ তাঁকে পাওয়া গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে। এবারে তিনি ইউরোপ-মগ্ন। ফরাসি প্রতীকবাদী কবিতা বিশেষ করে বেলজিয় এমিল ভেরহ্যারেন-এর প্রভাব আত্মস্থ করে সেই অভিজ্ঞতাকে নিজের দেশীয় এমনকি প্রাদেশিক সূত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত করলেন তিনি। অবশ্য তাঁর পনেরো বছর বয়সে লেখা কবিতা ‘আফসানেহ্’-কে (অসম্ভব কল্পনা) অনেকেই উচ্চাঙ্গের সৃষ্টি বলে মনে করে থাকেন। কবিতাটিতে হাফিযের আধ্যাত্মিক গীতিময়তা, নিজামি’র নাটকীয় জীবন-পর্যবেক্ষণ, খৈয়ামের জীবনপিপাসু দার্শনিকতা, ফরাসি রোম্যান্টিক কবিদের আত্ম ও সমাজ সমন্বিত মূল্যবোধ এবং প্রতীকবাদীদের উপমা-প্রতীক এরকম বহু কিছুর একত্র সম্মিলন লক্ষ করা যায়। আরেকটি বিষয় অপ্রতিরোধ্যভাবে লক্ষযোগ্য হয়ে ওঠে নিমা ইউশিযের কাব্যে- ভাষা-সংস্কৃতির প্রাদেশিক অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। নিমা তাঁর নিজস্ব প্রদেশের আঞ্চলিক ভাষা তাবারি’র অনেক কিছু ফারসি ভাষায় লেখা কবিতায় প্রয়োগ করেন। মান ভাষার সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষার পারস্পরিকতা নিমা’র কবিতাতেই বিশেষভাবে উঠে এলো। বস্তুত তাঁর সেই আশৈশব বেদুঈন জীবনঘেঁষা বাস্তবতাই রোম্যান্টিক হয়ে আসে পবর্তীকালে রচিত তাঁরই কবিতায়। সে-জীবন এমনই প্রসারিত আর গভীর ছিল যে সেটির অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্রীয় বৃত্তের অন্তর্ভূত করবার একটা বাড়তি অঙ্গীকার বা প্রণোদনা তিনি অনুভব না করে পারেন না। ফারসি কবিতার মধ্যকার অভ্যন্তরীণ সাংস্কৃতিক দৃষ্টির ক্ষেত্রেও এ এক নতুন অভিজ্ঞতা। সমকালীন জীবনের ক্লেদ-দুর্যোগের চিত্র তাঁর কবিতায় আসে প্রতীকী ব্যঞ্জনায়। মনে রাখতে হয়, পহলবি বংশের রেজা শাহ তখন ইরানের শাসক- একনায়কতন্ত্রের তিনি ছিলেন বাস্তব প্রতিকল্প। নিমা’র কবিতায় ঘুরেফিরে আসে রাত্রি আর অন্ধকারের দৃশ্য-চিত্র। সামাজিক অন্ধকার, ন্যায়হীনতা, দারিদ্র‍্য, অজ্ঞতা এসবের বিপরীতে মানুষের কাম্য ছিল সুদিন। সেই সুদিনের চিত্রকল্প নিমা’র কবিতায় আসে সকাল, দিবস আর অন্ধকার উৎক্রান্তির বাণী হয়ে। কখনও-কখনও মোরগের ডাকও চমকে দেয় কবিতার নিস্তব্ধতার জগত ভেঙে। যেন স্তব্ধ রাত্রির গর্ভে ঘুমন্ত লোকেদের জাগাবার জন্যে সে-ডাক। পরবর্তীকালে নিমা’র উত্তরসূরি অনেক কবির কবিতায় তাঁর এইসব চিত্রকল্প ব্যবহৃত হয়। উত্তরপ্রজন্মের কবিদের নিমা প্রভাবিত করেন তাঁর শৈলি ও ভাবের দ্বারা। ফারসি কবিতায় নিমা ইউশিযের প্রভাবই সর্বাধিক পরিলক্ষিত হয় তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের ক্ষেত্রে।

উত্তরপ্রজন্মের কবিদের মধ্যে নিমা’র পরেই যাঁর কথা উঠবে তিনি ফরিদুন তাবাল্লালি (১৯১৯-১৯৮৫)। আঙ্গিক, ভাব, পটভূমি ইত্যাকার নানা দিক দিয়ে তিনি পূর্বজ নিমা’র নিকটে ঋণী। প্রথম দিকে তিনি সাদি’র ‘গোলেস্তাঁ’র অনুসারী ছিলেন। পেশায় প্রতœতাত্ত্বিক শিরাযের অধিবাসী ফরিদুন ছিলেন ধ্রুপদী ফারসি সাহিত্যে সুপ-িত। তিনিও ত্বকি রাফাত, নিমা ইউশিয এবং অন্য অনেকের মত প্রগতির পরিবর্তনশীলতাকে গ্রহণ করেন মনেপ্রাণে। শিরায ছেড়ে তিনি তেহ্রান চলে যান তাঁর প্রিয় কবি নিমা’র নৈকট্যে। তবে নিমা’র আঙ্গিকের পরিবর্তে নতুনতর আঙ্গিকেরও যে প্রয়োজনীয়তা ছিল সেটি ভোলেন না ফরিদুন। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত তাঁর সুগন্ধির থলে (নাফেহ্) কাব্যগ্রন্থে তিনি স্পষ্ট স্বরে আক্রমণ করেন নিমা’র অকারণ অনুকারীদের। তিনি আসলে ফারসি কবিতার ধ্রুপদাঙ্গকে আশ্রয় করেই নতুনত্বের সঞ্চার ঘটান। ধ্রুপদী গযলকে মোচড় দিয়ে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করেন তিনি। সালংকার ও সাঙ্গীতিক গীতিময়তাকেও তিনি সমকালের পরিস্থিতি বর্ণনায় ব্যবহার করতে সক্ষম হ’ন। ১৯৫৩ সাল ইরানের ইতিহাসে এক উথালপাথালের অধ্যায়ের সূচনালগ্ন। গণতন্ত্রী মোসাদ্দেক সরকারের বিরুদ্ধে সংঘটিত রেজা শাহ’র সামরিক অভ্যুত্থানের পরিণতিতে সেখানে নামে প্রবল বিপর্যয়-দুর্যোগ এবং হতাশা। বিশেষ করে ইরানের শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মধ্যে এর প্রতিক্রিয়া হয় চরম। ফরিদুনের কবিতায় সেই পরিস্থিতির নানামাত্রিক প্রতিফলন লক্ষ করা যাবে। অদৃষ্ট বাদ, পলায়নপরতা, পরাভবানুভব এসব ব্যক্ত হয় তাঁর অন্তরের বিক্ষুব্ধতার বাণীবন্ধে। একটা প্রদীপ্ত ঘোষণার মত উচ্চারিত হয় ফরিদুনের কণ্ঠস্বর। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের শিরোনাম মুক্তশৃঙ্খল (রাহা, ১৯৫০) এবং সে-গ্রন্থের শুরুর কবিতাটার শিরোনামটিও লক্ষযোগ্য- ‘বিপ্লবের আগামিকাল’। পরবর্তী গ্রন্থে তাঁর কাব্যে প্রগাঢ় হয় বেদনাবোধ, গভীর গভীরতর হয় বিষণœতা। শিরোনামগুলো হতে থাকে আরও প্রত্যক্ষ ও আক্রমণাত্মক- ‘ঘষটানো জীবনের গ্লানি’। কবিতাও শেষ হয় কবির আত্মগত কিন্তু সমষ্টির জীবনকে ছুঁয়ে-

“ঘষটানো জীবনের অসম্মানে ডুবে যাই ভয়ংকর লজ্জায়,

কী যে আশীর্বাদ মরে যাওয়া, উপশম পাওয়া।”

গীতিময়তাকে মোচড় দিয়ে ধ্রুপদী আঙ্গিকের সীমাবদ্ধতার মধ্যেও অসীমের ব্যঞ্জনা সৃষ্টিতে দক্ষ শব্দশিল্পী ফরিদুন তাবাল্লালি। বস্তুত ফরিদুনের পরিপূর্ণ কাব্যবিকাশের পর থেকে ফারসি কাব্যে দু’টি সমান্তরাল ধারা গতি পায়- একটি নিমা ইউশিয এবং অন্যটি ফরিদুন তাবাল্লালি প্রভাবিত। নিমা একটি মুখ্য কারণে গুরুত্বপূর্ণ পূর্বসূরিরূপে চিহ্নিত হ’ন। সেটি হলো তাঁর মুক্ত ছন্দের ব্যবহার। প্রায় সকল আঙ্গিকের ছন্দোময় ভুবনে তাঁর এই ছন্দছুট চলাটাই ছিল এক অভিনব পদক্ষেপ। এটা যে কেবল গতির সঞ্চার করলো তা-ই নয়, বক্তব্য প্রকাশের ক্ষেত্রে হয়ে দাঁড়াল স্বাধীনতার বাহনও। অন্যদিকে প্রগতিবাদী চেতনা দ্বারা কবিতার মর্মমূল স্পর্শ করবার প্রণোদনা দেখালেন ফরিদুন। তাই নতুন ভঙ্গির উদ্ভাবক না হয়েও কবিতার অন্তরশায়ী উপজীব্য, পর্যবেক্ষণ এবং জীবনদর্শনের সমন্বিত চেতনার গুণে উত্তরপ্রজন্মের নিকটে প্রবলভাবে গৃহীত হ’ন তিনি। সেই ধারা আরও মজবুত হয় একঝাঁক টগবগে জায়মানদের সম্মিলনে- যেমন, ফরিদুন মশিরি, সিয়াভাশ কাস্রায়ি, যোহরি, হাসান হোনারমান্দি, হুসাঙ্ এব্তেহায, নাদের নাদেরপুর, মনুচেহ্র আতাশি, মাহমুদ মশাররফ আযাদ তেহ্রানি, ফরোগ ফরোগজাদ, মোহাম্মদ রেজা শাফিয়ি কদ্কনি। এটিও লক্ষ করবার বিষয়, নিমা ইউশিযের উত্তরাধিকার তাঁর অনুসারীদের মধ্যে ভিন্নভাবে উদ্গম ঘটায়। বিশেষ করে তাঁরাও নিমা’র অভিনবত্বের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে নিজেরাও কবিতার শৈলী, শব্দ, উপমা এসব নিয়ে চালান ইতিবাচক পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তাঁদের দলটাও কম উল্লেখযোগ্য নয়। প্রসঙ্গত আহমদ শামলু,  নসরৎ রাহ্মানি, বিযন জালালি, সোহরাব সেপেহ্রি, মেহ্দি আখাভান সালেস, ইয়াদোল্লা র’বাবি, মাহমুদ কিয়ানুুশ, এসমাইল খোয়ি, আহমদ রেজা আহমদি প্রমুখ কবির নাম করা যাবে।

আহমদ শামলুকে বলা যায় যুদ্ধ প্রজন্মের কবি। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স কেবল চৌদ্দ। যুদ্ধের পরে ইরান তখন মিত্রশক্তি অধিকৃত। বাইরের সঙ্গে ঘরের এই যুদ্ধ-যোগাযোগ শামলু’র জন্যে ছিল নতুন অভিজ্ঞতা। তবে বাইরের রাজনৈতিক আলোকের সঙ্গে তাঁর তরুণ মন গ্রহণ করে শিল্পান্বেষাকেও। তারই ফলস্বরূপ তাঁর মননে ঘটে ইউরোপিয় ও বিশ^সাহিত্যের অংকুরোদ্গম। যুদ্ধোত্তর তরুণ বয়সে তিনি হাত পাকান বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে গদ্য রচনা করে। সমকালীন আলোড়নের ছাপ এড়াতে পারে না তাঁর দেশপ্রেমিক চেতনা। প্রেম-প্রকৃতির পাশাপাশি দেশ-জাতির পরিস্থিতিও তখন তাঁর নিকটে বিবেচ্য। তাছাড়া রাজনৈতিক সচেতনতার বিশেষ ঝোঁকের কারণে যুদ্ধোত্তর ইরানের নবগঠিত তুদেহ্ পার্টির প্রতি আকৃষ্ট হ’ন তিনি। একা শামলুই নন কম্যুনিস্ট মতাদর্শের দলটির প্রতি প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে আনুগত্য বোধ করেন অনেক শিল্পী-সাহিত্যিক। বলা যায়, ফারসি কবিতার নবচেতনার নকিব হয়ে আসে তুদেহ্ পার্টির সাংগঠনিকতা। নিমা ইউশিয তাঁকে আকর্ষণ করলেও নিমা’র আঙ্গিকমনস্কতাকে এড়িয়ে শামলু মনোযোগী হয়ে পড়েন ভাবসম্পদ ও বাণীভঙ্গির দিকে। তিনি ছিলেন প্রত্যক্ষ বাস্তবতার কাব্যিক প্রতিফলে বিশ^াসী। আর ফরাসি এবং বিশ^সাহিত্যের গোগ্রাসী পাঠক শামলুর নিকটে বৈশি^ক প্রেরণা ছিল লক্ষ করবার মতো। ফরাসি, স্পেনীয় এবং অপরাপর কাব্যজগতের কবিদের কবিতায় বিশেষভাবে প্রভাবিত হ’ন শামলু। পল এলুয়ার, লুই আরাগঁ, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোর্কা, ভøাদিমির মায়াকভস্কি, নাজিম হিকমত তাঁর কবিতায় নিয়ে আসে বিশেষ ধরনের দার্ঢ্য। তাঁর ‘সতেজ হাওয়া’ (‘হাবায়ে তাজেহ্’) কবিতা থেকে খানিকটা অনুসরণ করা যেতে পারে যেখানে নারীর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ প্রচলবিরোধী-

“তোমার নক্ষত্রের আশা দিয়ে তুমি

বেহেশ্তের হতাশাকে করেছো আলোকিত;

তুমিই গড়েছো বছর এবং শতাব্দী;

জন্ম দিয়েছো পুরুষদের যারা ফাঁসিকাঠে

গেঁথে রেখে গেছে তাদের নাম;

ভবিতব্যের মহান ইতিহাসের তুমি পরিচর্যা করেছো

তোমার ছোট্ট জরায়ুর অভ্যন্তরে।”

আহমদ শামলু’র প্রত্যক্ষতা ও জীবননিষ্ঠতার ছাপ তাঁর পরবর্তী কবিদেরও করে অনুপ্রাণিত। ফারসি সাহিত্যের একজন মুখ্য কবি হিসেবে তিনি পরিগণিত হ’ন। ভাষাকে প্রয়োজনে নিরেট গদ্যময় এবং প্রয়োজনে সাংগীতিক করবার দক্ষতা তাঁর ছিল সহজায়ত্ত। পরবর্তীকালে বিযন জালালি, তাহেরেহ্ সফরযাদেহ্, এসমাইল নুরি-আলা, আহমদ রেজা আহমদি, মিনা আসাদি, ঝিলা মোসায়েদ, মির্জা আগা আস্কারি, হামিদ রেজা রাহিমি শামলু’র দ্বারা প্রভাবিত কবি হিসেবে নিজেরাও উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিশীলতার স্বাক্ষর রাখেন। বিশেষ করে, এসমাইল নুরি-আলা কিংবা আহমদ রেজা আহমদিও ফারসি সাহিত্যের অগ্রগণ্য কাতারে অধিষ্ঠিত হ’ন। অনেক সমালোচক শামলু ও তাঁর পরবর্তী ধারাটিকে নবতরঙ্গ নামে চিহ্নিত করেন।

আপন আলোকপ্রভায় স্বতন্ত্র আহমদ রেজা আহমদি অল্প বয়সেই নজর কাড়েন। অনতি তরুণ রেজার কবিতা প্রকাশ পেতে থাকে বিভিন্ন সাহিত্য-পত্রিকায়। প্রথাগত কাব্যকৌশলকে ভেঙেচুরে স্বতঃস্ফূর্ত কবিতা নির্মাণ করেন তিনি। ভাব এবং ছন্দ দুই-ই বদলে যায় রেজার কবিতায়। তাঁর সমকালীন কবিদের চাইতে তিনি এমনই এক পথে চলতে শুরু করেন যেটি অনেকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত। খানিকটা উদ্ধৃতি ধরা যাক-

“আমি সবগুলো সিঁড়ির নীল অবধি পৌঁছালাম;

আমাদের ঘরের আকাশ আমাদের প্রতিবেশিদের ঘরের আকাশ এক নয়

ক্ষুধার্ত হৃদয়ে নেমে এলাম সবগুলো সিঁড়ি পেরিয়ে

গমের দানার গভীরতা অবধি।

খুঁজে চললাম ঘোড়ার সফেদতা,

চষে ফিরলাম সমস্ত গমের ক্ষেত, দেখলাম কেবল একটাই পথ

যে-পথ বেয়ে গিয়েছিলেন শে^তকেশ আমার বাবা।

 

আমি একাই পেরোলাম গমের ক্ষেতটা

দেখতে পেলাম গমের শস্য

কিন্তু তখনও বলতে পারলাম না ঃ আমার ঘোড়া!

ওরা কেটে ফেলেছে আমার ঘোড়াটাকে!”

(‘আমার কান্না শুধু ঘোড়াটার সফেদতা’)

 

রেজা আহমদি তাঁর সব কবিতাই লিখে গেছেন তারুণ্যের বিষণœতা নিয়ে। প্রথম দিককার ভাবভঙ্গি পরের দিকে বদলালেও মূল বিষাদগ্রস্ততার সুরটি ঠিকই থেকে যায় কোন না কোনভাবে। তাঁর অধিকাংশ কবিতার সমাপ্তিই বিষাদময়তায়। যে-বিপন্ন বিষাদময় পৃথিবীর তিনি বাসিন্দা সেখানে উপশম সুদূরপরাহত, সেখানে আনন্দের ঘটেছে মৃত্যু। মিথ্যে জ্বলজ্বল করে সত্যের নির্মোক পরে। ১৯৬৭ সালে রেজা একটি প্রবন্ধ রচনা করেন যেটির শিরোনাম হতে পারে তাঁর মানস-প্রচ্ছদ- ‘মিথ্যে, সত্য এবং আমি’। সেখানে তিনি স্পষ্টই বলেন, পাঠককে আনন্দ দেওয়ার চাইতেও বড় তাঁর কাছে সততা। সেই সততা যদি তাঁর কবিতার অঙ্গহানিও ঘটায় তবু সততাই তাঁর মূল অন্বিষ্ট। তাঁর এই প্রচলবিরোধিতার কারণে প্রথাগত সমালোচকদের নিকটে তিনি ততটা ইতিবাচকভাবে গৃহীত না হলেও পাঠকের হৃদয়ে তিনি ঠিকই নাড়া দেন। এমনকি পরবর্তী অন্তত তিনজন কবির কথা বলা যাবে যাঁরা তাঁরই মত সত্যান্বেষী- ইয়াদোল্লা র’বাবি, সোহরাব সেপেহ্রি এবং ফরোগ ফরোখ্যাদ।

ইয়াদোল্লা র’বাবি প্রথম দিকে ফরিদুন তাবাল্লালি’র প্রভাবিত হলেও পরবর্তীতে নবতরঙ্গের কবিতায় মনোনিবিষ্ট হ’ন। আবার, আরেকটি বিষয়ে তিনি অনেকের চাইতে পৃথক। কবিতায় মতাদর্শ বা ভাবাদর্শের প্রভাব তাঁর নিকটে প্রচারণার নামান্তর বলে গণ্য হয়। ফলে, সমকালীন অনেকের সঙ্গেই তিনি কাব্যিক মতবিরোধে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬১ সালে তিনি ও তাঁর সমমনারা নিজেদের পরিচয়চিহ্নিত একটি দল গড়ে তোলেন যাঁদের নিকটে ভাব-মতাদর্শের চাইতেও কবিতার অন্তর্গত নান্দনিকতা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের ধারণা যে-বাস্তব আপাত অবস্থায় বিরাজমান তারও রয়েছে একটি অন্যতর মাত্রা। কখনও-কখনও তাঁরা বাস্তবকে খোঁজেন পরাবাস্তব বা অধিবাস্তবের মধ্যে। বাস্তব এবং অধিবাস্তবের মাঝখানকার একটা ‘স্থান’ বা ‘তলে’র ওপরেই তাঁরা জোর দেন। ইয়াদোল্লা’র একটি কবিতায় তাই তিনি বলছেন, তিনি অসীম পেরিয়েও ছূঁতে পারছেন না সেটিকে। আর সেই অসীমকে পেরিয়ে গেলে দূরত্বের চকিত সৌন্দর্য অনুভূত হয় কবির সত্তায়। কিন্তু অন্য কোথাও অন্য কোন অসীমের ব্যঞ্জনা হয়তো রয়ে যায় যা পেরোনো যায় না বা যা কেউ কখনও পেরিয়েই যায় না। কিন্তু যাঁরা বস্তুজগতের বাস্তব অবভাসে বিশ^াসী এবং যাঁরা সমকালের প্রচ-তায় আলোড়িত তাঁরা ইয়াদোল্লা’র কাব্যদর্শনে একাত্ম হ’ন না। ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত কবি এসমাইল নুরি-আলা’র কবিতার তত্ত্ব নামক গ্রন্থে বিষয়টি সম্পর্কে অনেকখানি ধারণা মেলে। বরং সেদিক থেকে ফরোগ ফরোখযাদ অনেক বেশি প্রত্যক্ষ এবং অনেক বেশি সংবেদনময়ও। অনেকেই তাঁর কবিতায় পূর্বসুরি ফরিদুন, নাদেরপুর, নসরাৎ রাহ্মানি কিংবা ইয়াদোল্লা’র প্রভাব লক্ষ করে থাকেন কিন্তু ফরোগ তাঁর নারীসচেতনতায় এবং মানববাধিকার-অনুভূতির তীক্ষ্মতায় নিজস্বতার বলয় সৃষ্টি করেন অচিরে। তাঁর প্রথম দিককার কবিতায় আঙ্গিকের দুর্বলতা থাকলেও ভাবের ওজস্বিতায় তিনি অনেকখানি অগ্রবর্তী থাকেন। ইরানি সমাজের উঠতি নারীদের জীবন-পরিস্থিতিকে তিনি পর্যবেক্ষণ করেন গভীরভাবে। বর্তমানতা ও প্রথা এই দুইয়ের চাপে নিমজ্জমান নারীসত্তার বাস্তবতার ব্যবচ্ছেদ ঘটে ফরোগের কবিতায়। তাঁর কবিতার শিরোনাম ‘বন্দি’ এবং তাতে বিম্বিত হয় এক প্রতীকী বন্দিত্বের চিত্র-

“আমি চাই তোমাকে, এবং আমি জানি

আমি কখনও তোমাকে পাবো না আমার বাহুবন্ধনে;

তুমি সেই স্বচ্ছ উজ্জ্বল আকাশের মত,

আর আমি এই যে খাঁচায় বন্দি এক পাখি।”

অনেক সমালোচক তাঁর কাব্যের ধূসর জগতকে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখেছেন। মাত্র ষোলো বছর বয়সে তিনি বাধ্য হ’ন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে। ইচ্ছের বিরুদ্ধে পিতামাতার জোরপ্রয়োগের পরিণাম সে-বিবাহ সুখকর হয় না। চৌদ্দ বছর বয়সে বেয়ে এবং উনিশে বিচ্ছেদ- তারও অধিক বেদনার, সন্তান রয়েছে কিন্তু ফরোগ সন্তানবিচ্ছিন্ন। ‘রাত্রির দানব’ নামক কবিতায় সেই বেদনার ছায়াপাত দেখি যেখানে কবি শিকার হচ্ছেন এমন এক দানবের ধিক্কারের যে কবিকে তার চাইতেও দানবিক বলে ঘৃণা ছিটোয়। সন্তানবিচ্ছিন্নতার বেদনা তাঁর একাধিক কবিতার বিষয়বস্তু। তবু যন্ত্রণাকর বিবাহের চাইতে মুক্ত থাকাটা তাঁর নিকটে প্রিয়। আর কবিতায়ও তাঁর দ্বান্দ্বিকতার পরিস্থিতি বিদ্যমান থাকে অনেকটা কাল। নিমা ইউশিযের ভঙ্গি এবং তাঁর নিজের পথ এই দুইয়ের মধ্যে অনেকটা সময় টানাহ্যাঁচড়ার পর ফরোগ বেরিয়ে আসেন নিজের অভিমুখে। আর সেই অভিমুখ কখনও-কখনও চরমভাবাপন্নতাকেও ছুঁয়ে যায়। বিশেষ করে স্বাধীনতার ভাব এবং ইন্দ্রিপরায়ণতার ভাবকে তিনি এক করে ফেলেন। ‘সৌন্দর্যের সঙ্গীত’ শীর্ষক কবিতায় লিখছেন তিনি-

“উত্তুঙ্গ কামনার নিরবতার মধ্যে

শুয়ে আছি তোমার আবেগমথিত দেহের পাশে;

আমার চুম্বন তোমার কাঁধে এঁকে দিয়েছে ছাপ

ঠিক যেন সাপের তীক্ষ্ম দংশন।”

তাঁর সমকালীন কবিদের চাইতে ভাষায় ও ভাষ্যে এবং চলাফেরায় ফরোগ ছিলেন আধুনিকতার অগ্রবর্তী মানুষ। সমকালীন পুরুষ কবিদের সঙ্গে বন্ধুত্বে কিংবা নিজের কাব্য সম্পর্কে সাক্ষাৎকারে তাঁর প্রকাশ অবাধ। জীবনকে তিনি ছুঁয়ে-ছেনে দেখতে চেয়েছেন সংস্কারমুক্ত দৃষ্টিতে। হয়তো তাঁর দেশ ইরানে তাঁর মত স্বাধীনতাকামী মানুষকে জায়গা দেওয়ার মতো প্রসন্নতা তখনও ছিল সুদূরপরাহত। ১৯৬৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুবরণ করেন ফরোখযাদ। ১৯৭৫ সালে তাঁর মৃত্যুর আট বছর পরে বেরোয় তাঁর চলো বিশ^াস রাখি হিম ঋতুর অভিষেকে কাব্যগ্রন্থ। তাঁর কবিতা এবং সেগুলোর শিল্পমূল্য নিয়ে সকলেই একমত ছিলেন এমন নয়। অনেকেই তাঁর কবিতার অতিসারল্য এবং খোলামেলা ভাবকে মনেপ্রাণে মেনে নিতে পারেন না। তথাপি বলা যায় ফরোখযাদ তাঁর উত্তরসূরি অনেক নারী কবিকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন- যেমন, শাদাব ভ্যাযদি, ম্যায়মানাৎ মির-সাদেগি, ঝিলা মোসায়েদ, মিনা আসাদি। একটি রচনায় তিনি বলেছিলেন- আমার কাছে কবিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার। এটা এমনই একটা দায়বোধ যা আমি অনুভব করি আমার নিজের সত্তার প্রতি। এটা এক ধরনের উত্তর যেটা আমি দিতে পারি জীবনকে। কখনও-কখনও ফরোগের কবিতা দার্শনিকতার প্রান্ত ছুঁয়ে যায়-

“তারা ডুবে ছিল তাদের নিজেরই ভীতির মধ্যে

আর পাপের ভীতিকর সংবেদন

তাদের অন্ধ বধির সত্তাকে

পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে দিয়েছিল। … …

 

হয়তোবা; কিন্তু কী অনন্ত শূন্যতা!

সূর্য ছিল মৃত,

এবং কেউই জানতো না

বিষণœ যে ঘুঘু পাখিটা হৃদয় ছেড়ে চলে গিয়েছিল

তার নাম বিশ^াস।” (‘জাগতিক কবিতা’, পুনর্জন্ম)

মূলত মৃত্যুর চার বছর আগে প্রকাশিত পুনর্জন্ম এবং মৃত্যুর আট বছর পরে প্রকাশিত চলো বিশ^াস রাখি হিম ঋতুর অভিষেকে এই দু’টি কাব্যগ্রন্থই ফরোগ ফরোখযাদকে মজবুত আসন গড়ে দেয় ফারসি কাব্যসাহিত্যে।

মেহ্দি আখাভান সালেস কেবল কবিই ছিলেন না, ছিলেন কবিতাবিষয়ক বেশ ক’টি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থেরও লেখক। তিনি নিজে ছিলেন নিমা ইউশিযের অনুসারী এবং তাঁর নিজের শহর মাশাদ ফারসি সাহিত্যের আঁতুড়ঘর বলে খ্যাত খোরাসান প্রদেশের অন্তর্গত। আর আখাভান নিজেও একাদশ-দ্বাদশ শতকী শৈলিতে গযল-ক্বাসিদা রচনা করেন। মূল ধারার ফারসি ভাষিকতার সঙ্গে খোরাসানি আঞ্চলিক ভাষাকে মেলান তিনি কবিতায়। তাঁর এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা স্বাগত হয় অনেকের দ্বারা। কেউ-কেউ একে নব্য-ধ্রুপদী ধারার রচনা বলে অভিহিত করেছিলেন। আঞ্চলিক কথকতার উপাদান তাঁর কবিতায় ব্যবহৃত হয় তির্যকতায় কিংবা ব্যঙ্গের কটাক্ষে। ১৯৬৮ সালে দাফর্তাহায়ে জমানেহ্ পত্রিকার সম্পাদক সাইরাস তাহ্বায এবং কবি সাফিয়ি কদ্কনি ও ইসমাইল খোয়ি’র সঙ্গে এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে মেহ্দি নিজের সম্পর্কে অনেক কথা বলেন। তিনি বলেন যে, ভাষার প্রবহমানতা ভাষার জীবন্ত চলিষ্ণুতাই তাঁর অন্বিষ্ট। ভাষার এই কারুকাযের ফলে জীবন্ত হয়ে উঠতে পারে অতীতটাও। অতীতের যেসব উপাদান গ্রহণযোগ্য এবং ভাল, যেসব উপাদানের এখনও বর্তমানের সঙ্গে সংযোগের সম্ভাব্যতা রয়েছে সেসবকে পরখ করে দেখা দরকার। হাজার বছরের ফারসি ভাষা-সাহিত্যের সবটাই বর্তমানের কবির অবলম্বন। তাঁর কবিতা সম্পর্কে অনেক সমালোচকের ধারণা আখাভান বর্তমানের হতাশ-ধূসর পরিস্থিতিকে সামলানোর জন্যে অতীতমুখী হ’ন। অতীতের স্মৃতি-কিংবদন্তী তাই বর্তমানের কবির আশ্রয়-

“এই যে! কোথায় এটা?

এই বিশৃঙ্খল হিংসাকাতর শতাব্দীর রাজধানী কোথায়; … …

রক্তপিপাসু শতাব্দী,

সবচাইতে ভয়াবহ সংবাদের শতাব্দী,

যে-শতাব্দীতে বহু উঁচু দিয়ে উড়ে যাওয়া এক অবাস্তব পাখির মল

ছুড়ে দিয়ে তারা ‘বিধাতার সাত আসমানের চার স্তম্ভ’কে ধ্বংসে

 

পরিণত করে মুহূর্তেই …”

(‘শাহ্নামা’র সমাপ্তি’)

আখাভানের দৃষ্টিতে এসিরিয় শাসক সাইরাস, দারায়ুস কিংবা মিথ্রা-মতবাদ, জরথুস্ট্র-মতবাদ, যেরভান-মতবাদ, ম্যানিখ-মতবাদ, মাজদাক-মতবাদ এগুলোর সবই বর্তমানের ভয়ংকর অবস্থার নিরিখে বিবেচনাযোগ্য। কেননা, প্রবহমান ফারসি চেতনা গড়ে উঠেছে এই বিপুল সম্ভারের ধারাবাহিকতায়।

আধুনিক ফারসি কাব্যে খোরাসান অঞ্চলের এক উজ্জ্বল উত্তরাধিকার এসমাইল খোয়ি। উচ্চশিক্ষায় বিদেশ গমন থেকে শুরু করে বিশ^সাহিত্য বিশ^দর্শন প্রভৃতির পাঠ তাঁকে পরিণিত করে নবমননের সার্থক প্রতিনিধিতে। দর্শনশাস্ত্রে তাঁর উচ্চশিক্ষা হয় ইংল্যান্ডে। ইউরোপিয় দার্শনিকদের মধ্যে তাঁকে সবচাইতে প্রভাবিত করেন ফ্রিডরিশ নিৎশে। প্রকৃতি এবং আত্মসত্তার পর্যবেক্ষণ তাঁর মধ্যে জাগায় বেদনা, তাঁকে করে ক্ষুব্ধ-ক্রুদ্ধ। মায়াকভস্কি এবং হোল্ডার্লিনের উদ্দামতা-রোম্যান্টিকতার একত্র সম্মিলন ঝংকার তোলে খোয়ি’র কাব্যে। খানিকটা উদ্ধৃতি লক্ষ করা যাক-

“রক্তিম মুহূর্ত

– যা অবশ্যই তোমার জানা –

এখন রয়েছে পথে।

আগে কিংবা পরে

নরকের ক্রোধ এসে হাঁকবে:

“চালাও গুলি!” (‘রাজপথের খাকি কুচকাওয়াজের পাশাপাশি’)

এরকম বৈরি পরিস্থিতিতে প্রকৃতির পাখিরা হয়তো গাইছে নিজ-নিজ গান কিন্তু কবির ঠোঁটে কুলুপ-আঁটা। তাঁর সেই নির্জনতায় হয়তো পাঠক নয় নিজেকেই শুনিয়ে বলেন কবি-

“আমি যা দেখতে পাই

সমুদ্রের স্থায়িত্ব;

দিবসের অভিমুখে রাত্রির পর্যটন;

এ নয় ক্ষণস্থায়ী ঢেউ, ফুল এবং শিশিরবিন্দু।

আমরা বিদায় নিলেও,

পথ থেকে যাবে;

দুঃখের কোন কারণ নেই।” (‘পথে’)

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামি বিপ্লব সংগঠিত হওয়ার পর ক্ষুব্ধ কবি আরও অনেকের মত দেশত্যাগ করেন। নিজের সৃষ্টিশীলতাকে তিনি কাজে লাগান ইরানের গোঁড়া-রক্ষণশীল শাসকদের সঙ্গে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে। এতে করে তাঁর কবিতার বাণীভঙ্গি খানিকটা বিচ্যুতির দিকে গেলেও তাঁর কবিতার শক্তি ঠিকই অনুভূত হয়। উচ্চকিত কণ্ঠকে তিনি মানবাধিকারের সপক্ষে প্রত্যয়িত করেন এবং আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে পরচিত হ’ন নির্ভীক শব্দযোদ্ধারূপে। এসমাইল খোয়ির শক্তির প্রাবল্য দেশত্যাগের প্রাক্কালে রচিত তাঁর সাতটি কাব্যগ্রন্থে রয়ে যায় যা থেকে তাঁর স্বদেশবাসী চিনে নেন স্বতন্ত্র এ-কবিকে।

বস্তুত ইরানি কবিতা বিষয় ও প্রকরণে সমৃদ্ধ থেকে সমৃদ্ধতর হয়েছে। এসমাইল খোয়ি’র পর আমরা উল্লেখ করতে পারি মোহাম্মদ রেজা সাফিয়ি কদ্কনি, হুসাঙ্ এব্তেহায, সিয়াভাশ কাস্রায়ি, নাদের নাদেরপুর, ফরিদুন মশিরি, সিমিন বেহ্বাহানি এঁদের কবিতা নিয়ে সমালোচকেরা এরিমধ্যে অনেক কথা বলেছেন। কবিতার আলোকে তাঁদের কেউ-কেউ সামাজিক চেতনার কবি আবার কেউবা তীব্র রোম্যান্টিক কবি হিসেবে স্বীকৃত হচ্ছেন। অনেকেই ইরানের প্রথাগত কাব্যচেতনার ধারায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে ফুটে উঠছেন আবার কেউবা ইউরোপিয় বা বিশ^সাহিত্যের উত্তরাধিকার হিসেবে নিজেদের সংযুক্ত করছেন বৃহত্তর পরিম-লে। বলা যায় সোহরাব সেপেহ্রির কথা। অনেকেই তাঁকে অসাধারণ এক কবি হিসেবে চিহ্নিত করেন যদিও তাঁর কবিতার শক্তি নিহিত তাঁর ব্যক্তিনির্যাসিত চেতনার ঔজ্জ্বল্যে। বিশেষভাবে যেটিকে সামাজিক চেতনা বলা হয়ে থাকে তার অনেকটাই সোহরাবের কবিতায় অনুপস্থিত কিন্তু তবু সোহরাব বিশেষ ধরনের কাব্যনির্মাণে অগ্রগণ্য। তাঁর দীর্ঘ কবিতা সেদয়ি পয়ি অ’ব এরিমধ্যে ধ্রুপদি কাব্যে পরিণত হয়েছে। চিত্রকর এ-কবি তাঁর ব্যক্তিসত্তা, প্রকৃতি-স্বদেশ, মানবজীবন প্রভৃতি বিষয়ে এক বিপুলায়তন অবলোকন করেন কবিতাটিতে। সত্য, আলো, অধ্যাত্ম, প্রকৃতি সবকিছুকে তিনি বিশাল জীবনের পক্ষে বিবেচনা করেন। কবিতাকে জীবনজিজ্ঞাসা ও ইতিহাসের ধারাবাহিকতার মধ্যে এনে এবং তার সঙ্গে চিত্রময়তার সংযোগ ঘটিয়ে নতুন শিল্পচেতনার উৎসার ঘটান সোহরাব সেপেহ্রি। তাঁর দীর্ঘ কবিতা থেকে-

“কাশানের অধিবাসী আমি।

আমার বংশের সূচনা হয়তো ভারতবর্ষের কোনো লতাগুল্ম থেকে,

হয়তো সিয়াল্ক-এর পাহাড়ে হারিয়ে যাওয়া কোনো মৃৎপাত্র থেকে

হয়তোবা বুখারা শহরের কোনো এক বারবণিতা থেকে।”

চিত্র এবং শব্দের এক গতিময় ওঠানামা তাঁর কবিতায় লক্ষ করা যায়-

“দেখা যাচ্ছিল জল, এবং জলের অন্তরে বস্তুসমূহের আভাস।

জীবনের প্লাবনের মধ্যে

রক্তের চাদরে মোড়ানো কোষেদের ছায়াময় অবস্থিতি।

এবং মানবাত্মার প্রভাতকাল

এবং অযুত নারীর অলিন্দে ভেসে যাওয়ার ঋতু

অন্তিমে, নিঃসঙ্গতার সুঘ্রাণের গ্রাস।

ছিল আশা,

দেখতে পেতে তুমি গ্রীষ্মের গহ্বর থেকে ওগরানো

হাওয়ার প্রতিটি আছড়ে পড়ার মধ্যে আশাকে।”

ইসলামি বিপ্লবের পর সবকিছুর মত সাহিত্য এবং কবিতার জগতেও প্রভাব পড়েছে বিপ্লবের। বিপ্লবের চার দশককাল পেরিয়ে এসে এখন হয়তো দেখতে পাওয়া যাবে, বিপ্লবোত্তর ফারসি সাহিত্য ক্ষেত্রবিশেষে অভ্যন্তরীণ কবিদের চাইতেও অভিবাসী কবিদের দ্বারা অনেক বেশি বৈচিত্র‍্যময় হয়েছে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, বিপ্লবের পরিস্থিতি সর্বক্ষেত্রে কবিতার সহায়ক হয়ে ওঠে নি। অনেক কবিকেই পোহাতে হয়েছে খোমেনি-যুগের বৈরিতা। কবিতার ওপর নিয়ন্ত্রণের তীক্ষ্ম দৃষ্টি পড়েছে সেখানে ক্রমাগতভাবে। ফলে, অভিবাসী কবিদের কবিতা সেই নিয়ন্ত্রণ এবং নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে জ্বলে উঠেছে স্বতঃস্ফূর্ত শক্তি নিয়ে। কখনও-কখনও তা প্রচারণায়ও গিয়ে ঠেকেছে কিন্তু তাতে ফারসি কবিদের জীবনসংলগ্নতার বিষয়টাই প্রতিফলিত হয়েছে। আবার, বিপ্লব-পরবর্তীকাল থেকে বিপ্লবকে সমর্থনকারী কবিতাও রচিত হয়েছে অসংখ্য। এই ধারার কবিরা ইরানের প্রাচীন উত্তরাধিকারের খাতে নিজেদের দেখতে ভালবাসেন। সামাজিক অঙ্গীকারজাতীয় বিশেষত্বের চাইতেও তাঁরা বড় করে দেখেন মতাদর্শ কিংবা প্রথাগত দৃষ্টিভঙ্গিকে। ফলে, অভিবাসী ইরানি কবিদের বিপরীত মেরুতে তাদের অবস্থান। এঁদের অধিকাংশই গযল, ক্বাসিদা, মসনভি এসব রচনা করেন যেগুলো মূলত অধ্যাত্মবাদ, ধর্ম এবং রাজনীতিনির্ভরতায় পরিকীর্ণ। আবার জীবনযাপনের শাদামাঠা কাহিনি বা জটিল রাজনীতির বিপরীতে নারীনির্ভর একখানা কবিতাও হয়ে উঠতে পারে দুর্দান্ত ধ্রুপদী। ধরা যাক, আলি-রেজা নুরিজাদেহ্-র ‘হাসিবা বুর্ল্মেকা’ নামক কবিতাটির কথা। আলজেরিয়ার দৌড়বিদ হাসিবা অলিম্পিকে পদক অর্জন করলে সেটির প্রতিক্রিয়ায় ফারসি ভাষার কবি আলি-রেজা কবিতাটি রচনা করেন। কবিতাটিকে বলা যায় পৃথিবীর নারী-স্বাধীনতা এবং প্রগতির সপক্ষে একটি অনন্যসাধারণ সৃজনশীল সৃষ্টি। গোঁড়া-রক্ষণশীল হাসিবা’র দৌড়ময় পায়ের চিত্রকল্পকে তিনি এঁকে দেন চিরন্তনতার প্রেক্ষাপটে-

“এখন ইতিহাসের সবচাইতে সুন্দর পরীটি

তার পা দিয়ে

রাত্রির কাঁচের ওপর এঁকে দেয়

স্বাধীনতার প্রভাতের ছবি।”

এসমাইল খোয়ি’র ‘ধনি উত্তরাঞ্চলও’ কবিতাটি এক তীব্র তেজি ক্ষুব্ধ আত্মার প্রতিফলন যে-কবিতায় কবি পৃথিবীজুড়ে চলতে থাকা বৈষম্য ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে সর্বজনীন করে তোলেন। মনুচেহ্র শেয়বানি’র ‘দাসী-কন্যা’ কবিতাটিতে নারীর সামাজিক অবস্থানের বাস্তব প্রতিচিত্র অঙ্কিত হয় তির্যক দৃষ্টিতে। বলা যায় নিমা ইউশিযের ‘তুষার’ কিংবা ‘অদূরের তীর থেকে একটি শুঁয়োপোকা’ কবিতার কথা যেসব কবিতায় প্রকৃতি, ব্যক্তি, নির্জনতা, সমকাল সবকিছুর প্রতীকী প্রক্ষেপন গভীর সংবেদনসঞ্চারী। আহমদ শামলু’কে দেখি সামাজিক বক্তব্যকে শিল্পস্পৃষ্ট করে তুলতে- তাঁর ‘রায় কার্যকরের প্রহর’ এবং অন্যান্য কবিতায় তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠটি পাঠককে সহজে স্পর্শ করে। শাহনাজ আলামি’র ‘জাদুর স্যুটকেস’ কবিতাটিতে বাস্তব-পরাবাস্তবের দোলা ভিন্ন এক স্বাদ জাগায়। সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যঞ্জনাময় কবিতার ঝাঁকুনি টের পাই নসরৎ রাহ্মানি’র ‘ব্লাসফেমি’ নামক কবিতাটিতে। এভাবে প্রায় সব কবিতাতেই অনুভূত হয় অশেষের ব্যঞ্জনা।

 

মহীবুল আজিজ : কবি ও প্রাবন্ধিক, চট্টগ্রাম

হাসনাত আবদুল হাই: নবতিতম জন্মদিনের শ্রদ্ধাঞ্জলি

আলম খোরশেদ তাঁর কথা প্রথম শুনি স্বয়ং পিতৃদেবের মুখে। একই এলাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ দুজনেই, তদুপরি লতায় পাতায় কীরকম যেন আত্মীয়ও। এই নিয়ে একধরনের চাপা গর্বও

ডা. চন্দন দাশ ছিলেন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও প্রগতিশীল আন্দোলনের এক নিবেদিতপ্রাণ

শোয়েব নাঈম চন্দন দা’ (ডা. চন্দন দাশ) অভূতপূর্ব মানসিক অনুরণনে আমার মধ্যে বহু বছর আগেই বসন্তের এক রেশ রেখে গেছেন। তাঁর বসন্তের এই রেশ ছিল

তেজোদীপ্ত তোফায়েল আহমেদ বোধশূন্যতায় তুমি শোকসভা

কামরুল হাসান বাদল   বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে একাত্তর একবারই এসেছিল, সে একাত্তর গৌরবের, সে একাত্তর অহংকারের। সে একাত্তর আর কখনও বাঙালির জীবনে আসবে না।

পান্থজনের কথা

সুমন বনিক মহেড়া জমিদার বাড়ির নামটি অনেক আগেই জানা ছিল, কিন্তু দেখা হয়নি। ইতিহাসের মাটি খুঁড়ে খুঁড়ে এর মানিকরতœ উদঘাটন করা ঊর্মিলা (আমার স্ত্রী)’র স্বভাবজাত

পরিশেষে সেই তুমি

সৈয়দ মনজুর কবির এমনিতেই সরু গলি, কি বুঝে ফায়ার ব্রিগেড এর মাঝারি সাইজের পেট মোটা ওয়াটার ওয়াগনটা ঢ়–কলো তা দামালের বোধগম্য হচ্ছে না। অফিসের গাড়ি