আবু মকসুদ
আমাদের দেশে এক বিতর্কিত ব্যক্তি বিশেষের আবির্ভাব ঘটেছিল। বাইরে থেকে সে ছিল মানুষের আদলের, কিন্তু সেই আদলের আড়ালে বাস করত এক হিংস্র, বর্বর এবং নির্মম মানসিকতা। তার মুখ দেখে আমরা বুঝতে পারিনি, তার ভেতরে কী ভয়ংকর অন্ধকার লুকিয়ে আছে। মনে হতো যেন শয়তানেরই কোনো উত্তরাধিকার সে বহন করছে। এমনকি যে মা তাকে জন্ম দিয়েছিলেন, তিনিও হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি যে তিনি এমন এক সত্তাকে পৃথিবীতে আনছেন, যে মানবিকতার সীমা অতিক্রম করে নিষ্ঠুরতার প্রতীকে পরিণত হবে।
এই ব্যক্তিবিশেষ ছিল ভয়ংকর সূক্ষ্ম পরিকল্পনার অধিকারী। আমরা ইবলিশকে জ্ঞানে ও কূটচালে শয়তানের শ্রেষ্ঠ প্রতীক হিসেবে জানি, কিন্তু তার শয়তানির তুলনায় ইবলিশকেও কখনো কখনো দুগ্ধপোষ্য শিশুর মতো নিরীহ মনে হয়। কারণ সে শুধু মানুষকে বিভ্রান্ত করেনি, সে ধ্বংস করেছে মানুষের স্বপ্ন, সমাজের ভারসাম্য, একটি জাতির ভবিষ্যৎ।
আমাদের একটি দেশ ছিল। দেশ যেমন হয়, তেমনই। সেখানে শান্তি ছিল, আবার অশান্তিও ছিল। রাজনীতি ছিল, বিরাজনীতিও ছিল। আইনের শাসনের আকাঙ্ক্ষা ছিল, আবার স্বেচ্ছাচারিতার বাস্তবতাও ছিল। সুখ ও দুঃখ পাশাপাশি চলত। তবু সেই দেশকে নিয়ে আমরা মোটামুটি সুখী ছিলাম। আমাদের অসুখ ছিল, সংকট ছিল, হতাশাও ছিল, কিন্তু তা এমন পর্যায়ে পৌঁছেনি যে মানুষ বাঁচার আশা হারিয়ে ফেলবে কিংবা আত্মহত্যার কথা ভাববে।
আমাদের রাজনীতিবিদরাও পৃথিবীর অন্য দশটি দেশের রাজনীতিবিদদের মতোই ছিল। সম্পূর্ণ ফেরেশতা নয়, আবার পুরোপুরি শয়তানও নয়। সৎ ও অসতের মাঝামাঝি এক বাস্তব মানবিক অবস্থানে তারা দাঁড়িয়ে ছিল। কখনো আমরা তাদের প্রশংসা করেছি, কখনো ঘৃণায় প্রত্যাখ্যান করেছি। কখনো ফুলের মালা পরিয়েছি, আবার কখনো তীব্র ব্যঙ্গ, অপমান এবং ক্ষোভে তাদের মাটিতে নামিয়ে এনেছি। এই ছিল আমাদের সমাজের স্বাভাবিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি।
আমাদের দেশ সমস্যা ও সম্ভাবনার মাঝামাঝি এক সংগ্রামী বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা ধীরে ধীরে উত্তরণের পথ খুঁজছিলাম। ভুল করছিলাম, আবার শিখছিলামও। কিন্তু এই ব্যক্তির মনে ছিল অন্য পরিকল্পনা। আমাদের সামান্য সুখও তার সহ্য হচ্ছিল না। আমরা মাথা তুলে দাঁড়াই, আমরা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ি, আমরা ধীরে ধীরে এগিয়ে যাই, সে তা চাইছিল না।
তাই সে এলো এক ভয়ংকর পরিকল্পনা নিয়ে। এবং আমাদের ভালো-মন্দ মিলিয়ে গড়ে ওঠা দেশটাকে ভেতর থেকে তছনছ করে দিল। আমরা যখন ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠছিলাম, সে এসে সেই সিঁড়িটাই গুঁড়িয়ে দিল। হয়তো আমরা একদিন কোথাও পৌঁছাতে পারতাম, হয়তো আমাদের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হতে পারত, কিন্তু তার কারণে আমরা যেন হাজার বছর পিছিয়ে গেলাম।
আমাদের দেশের বিপরীতে যে গোলামশ্রেষ্ঠ দাঁড়িয়েছিল, তাকে হয়তো কোনো একদিন ক্ষমা করা সম্ভব। কারণ সে অন্তত তার পিতৃপুরুষের দেশের দালালি করছিল। কিন্তু এই ব্যক্তি নিজের নাজায়েজ প্রভুদের সন্তুষ্ট করতে গিয়ে নিজের দেশকেই ধ্বংস করেছে। সে শুধু বিশ্বাসঘাতকতা করেনি, সে একটি জাতির সম্ভাবনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিল।
ইউনুস নামের এই ব্যক্তির কারণে প্রায় পাঁচশো অবোধ শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। যে শিশুদের পৃথিবী দেখার কথা ছিল, স্কুলে যাওয়ার কথা ছিল, মায়ের আঁচল ধরে বড় হওয়ার কথা ছিল, তারা কবরের নীরবতায় হারিয়ে গেছে। কোনো শিশুই রাষ্ট্র, ক্ষমতা কিংবা ষড়যন্ত্র বোঝে না। তারা শুধু বাঁচতে চায়। খেলতে চায়। হাসতে চায়। অথচ তাদের ছোট ছোট নিথর দেহ ইতিহাসের ওপর এক অমোচনীয় অভিশাপ হয়ে পড়ে আছে।
এই মৃত্যুগুলো কোনো সংখ্যা নয়। প্রতিটি শিশুর আলাদা নাম ছিল, আলাদা মুখ ছিল, আলাদা স্বপ্ন ছিল। কোনো শিশুর হাতের মুঠোয় হয়তো এখনো রয়ে গেছে অসমাপ্ত খেলনা, কোনো শিশুর বইয়ের পাতায় শুকিয়ে আছে অদেখা ভবিষ্যৎ। আর সেই প্রতিটি লাশের দায় শেষ পর্যন্ত এই মোটা হারামজাদাকেই বহন করতে হবে।
সময়ের আদালত অনেক ধীর হতে পারে, কিন্তু ইতিহাসের বিচার সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায় না। আজ না হোক, কাল না হোক, পাঁচশো বছর পর হলেও এই দায় তার নামের সাথেই উচ্চারিত হবে। কারণ নিরপরাধ শিশুর রক্ত পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী সাক্ষ্য। সেই সাক্ষ্য মুছে ফেলার ক্ষমতা কোনো ক্ষমতাবান মানুষের নেই।
এই মহা হারামজাদাকে ক্ষমা করার চিন্তা যারা করবে, তারা শেষ পর্যন্ত সেই একই অন্ধকার উত্তরাধিকারের অংশ হয়ে যাবে। কারণ কিছু অপরাধ শুধু রাজনৈতিক নয়, কিছু অপরাধ ইতিহাসের বিরুদ্ধে, মানুষের বিরুদ্ধে, ভবিষ্যতের বিরুদ্ধে।
আমি চাই না সে শুধু মৃত্যুর পরে শাস্তি পাক। আমি চাই, সে জীবিত অবস্থাতেই হাবিয়া দোজখের আগুন অনুভব করুক। তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে সে উপলব্ধি করুক, একটি জাতির আর্তনাদ কত ভয়ংকর হতে পারে।
আবু মকসুদ: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট, যুক্তরাজ্য




