হাফিজ রশিদ খান
উপক্রমণিকা
একটা সময় গেছে আমাদের—— যখন কবিতার চরণে, শব্দের চলনে, কবির উপমা ও উৎপ্রেক্ষা নির্মাণের ঝোঁকে ঝাঁকে-ঝাঁকে রাজনৈতিক স্লোগানচারিতা, বিপ্লবের তাত্ত্বিক ঘোষণা ও ইশারা, অস্বীকারের ধাতব উচ্চারণ ইত্যাদি বেশ ভালো লাগতো। সে শুধু বিগত বিশ শতকের অবিভক্ত ভারতের প্রধানত কলকাতা এবং তার জেরে গৌণত ঢাকা শহরে পঞ্চাশ (অংশত চল্লিশ)-ষাট থেকে আশি’র দশকের তরুণশক্তির অহংকারের বিষয়ই ছিল না শুধু। তারও চেয়ে বেশি সেটি ছিল সমাজবদলের, পরিপার্শ্বের অসাম্যকবলিত জীবনধারার দিকে নবীনের ক্রোধযুক্ত, পবিত্র, স্বচ্ছ দৃষ্টির আলোকস্ফুরণও। এ প্রসঙ্গে ১৯৭৭-২০১১ খ্রি. পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে পশ্চিমবঙ্গে বাম রাজনৈতিক মতাদর্শের সরকার ক্ষমতাসীন থাকার ইতিহাস স্মরণ করা যায়। এই শাসন কায়েমের পশ্চাতের মৌল চালিকাশক্তিটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে নীরবে-সরবে সংশ্লিষ্ট দেশ ও বিদেশের মার্কসবাদী সাহিত্যপাঠ ও তার রাজনৈতিক চর্চার ফলশ্রুতি।
আফ্রো-এশিয়া-লাতিন ভূখণ্ড পেরিয়ে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলের বাংলা ভাষাভাষি জনমানুষের ধমনিতে সেই সময়ে রচিত-উচ্চারিত বিশ্ব-আবেদনযুক্ত কবিতাসমুচ্চয়ের অতুল সম্ভার নিশ্চয় বাংলাভাষি অঞ্চলের শান্ত, নিস্তরঙ্গ তথা অভ্যস্ত জীবনদৃষ্টিভঙ্গির ভেতরে কিছুটা অন্যরকমের স্পন্দন জাগিয়েছিল। সেই স্পন্দন মানুষে-মানুষে, দেশে-দেশে এবং স্বভূমিতে বিরাজমান নানা প্রাকরণিক বৈষম্য, বিপরীতে প্রবল অন্যায্য ধনস্ফীতির বিকট-বীভৎস চিত্রমালা উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। নির্মোহ মন-মনন নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণে গেলে এ একেবারেই ঐতিহাসিক ঘটনা। পাশাপাশি এও স্বীকার করা হয়তো ভালো যে, বৈশ্বিক ও স্থানিক পঠনপাঠন ও দেখনশৈলীজাত সেই শোষণমুক্তির মার্কসীয় মানবিকতা ও কিঞ্চিৎ মৃত্তিকা-সংশ্লিষ্টতা আমাদের চৈতন্যের ভাণ্ডে সঞ্চিত আছে অনেক জ্ঞানের স্তরে আরেকটি স্তর হয়ে। যার ওপরে বাংলা কবিতার প্রগতিশীল অংশটি তথা সার্বিক সাহিত্য-শিল্পকলা ও দর্শনচেতনামূলক লেখালেখি অন্যতম উজ্জ্বল মিনার হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নীরবে। সে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বাংলা ভাষাভাষিদের মধ্যে হোক, উভয়দিকের আদিবাসীদের ভাষা ও সংস্কৃতিচেতনার মধ্যে হোক।
জীবনযাপনের এসব সদর্থকতা ওই কাল পরিক্রমায় বেশ দৃষ্ট হলেও সেখানে এটির খুব দৃঢ় স্থিতি ছিল, এমনটি বলা যায় না। তার ভেতরেও কাঙ্ক্ষিত কি অনাকাঙ্ক্ষিত কিন্তু স্বাভাবিক বিবর্তন-পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে সময়ে-সময়ে। সুতরাং এই অবধারিত বিবর্তন-পরিবর্তনের নিত্য সঞ্চরণশীল কালপ্রবাহ যে-বার্তা আমাদের দিতে চায়, তা হলো, প্রায় অর্ধশতাব্দীর সেই মায়াবিনী প্রপঞ্চে আজও অন্ধ ভ্রমরের মতো অবিরল ঘূর্ণনের আর কোনো আবশ্যিকতা তেমন নেই, যদি বিবর্তন-পরিবর্তনের অনিবার্য নিয়মরীতিকে মান্য করা হয়। আর সেই বদলপ্রয়াসী সময়প্রবাহকে মেনে নিয়ে আমরা এখানে উত্থাপন করতে চাই, বিগত বিশ শতকের নব্বই থেকে একবিংশ শতকের এই প্রায় তৃতীয় দশক পর্যন্ত স্বাধীনতা-উত্তরকালের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সৃজনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্ষণ এবং তজ্জাত আলোড়ন-বিলোড়নের ভেতরে স্নাত কবি ও কবিতার কিছু কথা।
সেই নিরিখ থেকে এ গদ্যের অভিমুখ বিগত শতকের নব্বই থেকে একবিংশ শতকের উল্লিখিত সময়-পরিসরের আলোছায়ায় উদ্ভূত কবিতা-উদ্ভিদের কাহন কিছুটা ধরতে চাইছে, এমনটা বলা যাবে। আর সে-বিষয়ে মোদ্দা কথাটা হলো, সেই ‘বিপ্লবস্পন্দিত’ বা সমাজবদলের কঠিন-কঠোর কাব্যহানা বিগত দিনগুলো আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রবৃক্ষকে সজোর ঝাঁকুনি দিয়ে কিছু পক্ব-অপক্ক ফল খসিয়েছিল, তাতে মোটেও সন্দেহ নেই। দুর্ভাগ্যবশত সেই ফল-ফসলের সম্ভারের বেশির ভাগই বর্ণচোরা ‘বিপ্লবী’ বেনে-বোয়ালেরা যার-যার মতো করে ঝুড়ি ভরে তাদের বাণিজ্যের মোকামে নিয়ে গেছে নিরাপদে অসতর্ক কর্মী ও হা-ভাতে জনসাধারণকে আচ্ছা করে ফাঁকি দিয়ে। আরো গভীরতর বিলাপের বিষয় এই যে, সেই ট্র্যাডিশনের সামাজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বৈষম্য আজও প্রশস্ত রাস্তার ধারের বিজ্ঞাপনের মস্ত হোর্ডিং হয়ে অবজ্ঞার হাসি হেসে চলেছে জনতার মলিন মুখের ওপর কৌতুকোচ্ছল নজর রেখে। তার পাশে অতীতের সেই দায়বদ্ধ রাজনীতির মানসজাত একালের কবি-শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীরা—— বৈশ্বিক সাম্যবাদী সামাজিক বিপ্লবে তৃণমূল জীবনধারার আমূল পরিবর্তনে গভীরভাবে বিশ্বাসী ছিল যারা—— সকরুণভাবে প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকতর হয়ে গেছে আরও। আজ তারা কখনও-কখনও ভারী আক্ষেপ বা অসন্তুষ্টির চরম প্রকাশের পরও সততার মনোবল নিয়ে বঞ্চিত মানুষের নানাধরনের অত্যাবশ্যকীয় নিত্যনৈমিত্তিক অধিকাররক্ষা, জীব ও প্রাণপ্রকৃতিসহ বনভূমি, পাহাড় ও নদীসমূহের স্থিতি ও প্রবহমানতা রক্ষায় নিম্নবর্গীয়দের আঙিনার দুর্লভ প্রাচীনবৃক্ষের তলে চিৎকার বা গর্জনের স্বর নিয়ে নয়— বিনম্র উচ্চারণের কবিতা-গান ও লোকমানবের চিরায়ত জীবনগাথা ও ইতিহাসের সন্ধানে সমবেত হয়েছেন আশার দীপালি জ্বালিয়ে অন্যতর এক নবজীবন গড়ার ধ্যান ও সংগ্রামের স্ফূর্তি নিয়ে। এ অবশ্যই চরম হতাশাকে মাড়াই করে নিয়ে উত্তরণের পথে অন্যরকমের বলিষ্ঠ জীবনসংগ্রামের আরেক নাম বা ডিসকোর্স বটে। যদিও তা কিছুটা করপোরেট সুবিধাপ্রাপ্তি ও আপসের বৃত্তে আত্মপ্রতারণার কালিমা মেখে ঘূর্ণায়মান বলে প্রতিভাত হয় সচেতন মানুষের কাছে। তা সত্ত্বেও এটি কিছুটা সান্ত্বনামূলকভাবে ইতিবাচক এই অর্থে যে, তারা তথাকথিত বৃহৎ-মহতের সেকেলে বৈশ্বিক ইশতিহার ও ঘোষণাপত্রসমূহ হেলাভরে ছুড়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন আত্ম-উপলব্ধির আতসকাচের বীক্ষণে। এবং জীবনের প্রকৃত মাটিগন্ধমাখা নন্দনের সন্ধানে বিনম্রভঙ্গিতে ডেরা গড়েছেন চিরকালের দলিত মানবতার আঙিনায়।
এ দেখে অনেক অভাজনের মতো আমাদের মনেও মাঝেমধ্যে এমন প্রশ্ন উঁকি দিয়ে যায় সহসা, এই-ই কি তবে জীবনের গহন ও সত্যসন্ধ পথ? যা সেকালের ‘রোমান্টিক’ বিপ্লবের আবহাওয়ায় উপলব্ধিত হওয়া সত্ত্বেও এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল কিছুটা আত্মম্ভরিতার কারণে? তাহলে কি ওই ফাঁকি ও ফক্কিকারের ভিড়ে উল্লিখিত চল্লিশ থেকে আশি’র দশক পর্যন্ত সেই বৃহৎ-মহতের সাম্যবাদী আলিঙ্গন পাবার আশাটা ছিল এক প্রতারক বাস্তবতা আসলে? যে-উজানি চঞ্চল স্রোতের অনেক গভীরতর তলদেশে লুক্কায়িত ছিল এদেশের খাঁটি সত্যসন্ধ জীবনতরুর শেকড়বাকড়! যা কেবল পৃথিবীকে নয়, এ অঞ্চলের বঞ্চিত-অবহেলিত মানবমনের ব্যাখ্যার সনিষ্ঠ অধ্যয়নেই কেবল অনুসন্ধানযোগ্য এবং তা আবিষ্কারের পরই কেবল উল্লাসযোগে উদযাপনযোগ্য ছিল? যার প্রাঞ্জল ও চুলচেরা ধুনুরির কাজটা বাকি রয়ে গিয়েছিল!
আমাদের বিবেচনায়, নব্যকালের এই ঝোঁক ও প্রবণতা ছদ্মবেশী বা পরকলাপরা সেই বাস্তবতার মেকি হাসি ও তার সমস্ত তঞ্চকতাকে মাড়িয়ে লোকায়তের রশ্মি হাতে হেঁটে যেতে চাওয়া বিভূষিতা রাজ-রাজেশ্বরী যেন। যে চলেছে তার প্রকৃত উদ্দিষ্টের দিকে চারপাশ রাঙাতে-রাঙাতে ধলপহরের পাকা সোনার আলোর মতো। একেবারেই সহজ ও প্রাতিস্বিক যার উদয়রেখা আর ছড়িয়ে পড়ার লালিমা ছটা। যার ওষ্ঠজুড়ে অভাজনেদের মনে হারানো বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা স্বজনের আশ্বাসের মতো অকপট হাসি। যেখানে জীবন ও জীবনধারার অমোচনীয় উল্কিতে আঁকা আছে মাটিগন্ধি কবি ও কবিতার উতল-উজ্জ্বল উপস্থিতি অধিষ্ঠাত্রী দেবীর অটল ধ্যানের মতো। এই মনোময় সাকার অথচ ভুবনময় নিরাকার বিগ্রহকে একনজর দেখে নিতে চিরবসন্তের আনন্দে ভুবন বিচরণের ব্রত নিয়ে বেরিয়ে পড়েছে যেন আজকের কবি ও কবিতার পঙ্ক্তিমালা। এই কবি ও কবিতাকে তাই খুব উদগ্র কাঙালের মতো মনে হয় কখনো-কখনো। কখনোবা নিঃস্ব, রিক্ত, একদম পথপাশে হেলায় পড়ে থাকা বিরল কোনো পক্ষির পালকের মতো মনে হয়। যে কিনা মানুষের চর্ম ও মর্মের নজরকে বারবার তার দিকে টানছে। এই কবি ও কবিতাকে সর্বহারার সৌন্দর্যে মানব-ঈশ্বরের প্রকৃত প্রতিভূ বলে শনাক্ত করা যায়। শর্ত শুধু এই, তাকে পরিচ্ছন্ন কালজ কবিতাই হতে হবে কোনো উন্নাসিক ডায়লগ নিয়ে নয় বরং তাবৎ তন্ত্রমন্ত্র, ধর্ম-পুরাণ, কর্ম ও লোকায়তের সাংস্কৃতিক সংবিধানের সমন্বয়ে। কবিতায় এটা নয়, ওটা নয়, কবিতা হবে এই ছাঁচে বা ওই ছাঁচে ঢালা— এমনতর তর্জনী নির্দেশ বা তথাকথিত বদ্ধ জ্ঞান বা জ্ঞানীবর্গের দেখানো পথে নয় আর। কেননা সেই দলাদলির দলমাদল, সেই বেগানা, উৎকেন্দ্রিক কামনা-বাসনা এই কবিতার কাছে এখন বিগত, পরিত্যক্ত, দূষিত ও বিরক্তিকর এক প্রোপাগান্ডার বিড়ম্বনা মাত্র। ওইসব উচ্ছিষ্ট উচ্চাশা থেকে আজকের কবি ও কাব্যসাধক বিমুক্ত হয়ে চলেছেন একবিংশের নবতর যজ্ঞের অগ্নিশুদ্ধ হয়ে। তার বা তাদের এই নবীন সময়ের ভুবনদৃষ্টি অতীতের সমস্ত সদর্থক গোপন সঞ্চয় অন্তস্তলে নিয়ে, জ্ঞানবিশ্বের দশদিগন্ত ছুঁয়েছেনে নিজের একান্ত কুটিরে ফিরে আসছে যেন
প্রবাসফেরা হাস্যোজ্জ্বল পিতৃমূর্তিতে এবং থিতু হবে বলে জানিয়ে দিচ্ছে দিকে-দিকে, নিজস্ব আঙিনার ঘাসফুলে আর দূরের কাশফুলে-ফুলে। ফলে একালের কবিকে সেই ওড়াউড়ির চটকদার তথ্যে, বহুলচর্চিত ক্লিশে তত্ত্বে আর বাঁধা যাচ্ছে না খলবচন আর ঠগি জাঁকজমকের ঢক্কানিনাদের মাধুকরী বেশে। কারণ, কবি এখন সেইজন, যার——
আমি সহসা আমারে চিনেছি
আমার খুলিয়া গিয়াছে সব বাঁধ …
এই যে কিঞ্চিৎ ভূমিকাটুকু, এ হলো আসলে প্রচলিত রেওয়াজের বাইরে একটু ভিন্নরকমের সলতে পাকানো বৈকি। উদ্দেশ্যের নিকেতনে পৌঁছানোর আগের দরকারি ঘরোয়া বৈঠকি আলাপচারিতা। দুই আদিবাসী কবি মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা ও চিংলামং চৌধুরীর বাংলা ভাষায় প্রকাশিত দুটি সাম্প্রতিক (২০২৬) কাব্যগ্রন্থ পাঠের অভিব্যক্তি প্রকাশের উপলক্ষ এই উপক্রমণিকায় সমসাময়িক এ প্রসঙ্গ কিছুটা টেনে এনেছে। রবিকবি বলছেন :
আমার এ ধূপ না পোড়ালে
গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে
আমার এ দীপ না জ্বালালে
দেয় না কিছুই আলো …
এই দীপ মানে আত্মদীপ বা দেহ নামক দীপ। সুদূরের হাতছানিভরা অথচ মাটির ওপর দাঁড়িয়ে চারপাশ আলোকিত করার উত্তম দিয়াড়ি এটি। এটাই লোকায়ত জীবনমন্থনের প্রকৃত বন্দনা, যেখানে বিশ্বভুবন তন্ময় হয়ে উঁকি দিয়ে যায় বারবার। ইতঃপূর্বে আমরা দেখেছি, নানা বিদেশি বৈদূর্যমণি আর পরপ্রান্তের চোখধাঁধানো-মনভোলানো ‘আলোকায়ন’ আমাদের সজ্জিত নিজস্ব নীড়ে-নীড়ে কোকিলের মতো আলগোছে পেড়ে গেছে বহু শত রঙিন ডিম। এবং তাতে তা দিতে-দিতে আমরাও খেয়ালের বশে শিখেছি অনর্থক অনাত্মীয় স্বজনতোষণ মন্ত্র এবং ঘেঁটেছি হাতে তুলে দেয়া তাদের অহেতুক যত কাসুন্দিও। উল্লিখিত প্রেক্ষিত নিয়ে মথুরার ‘রাইবতি’ আর চিংলামং-এর ‘চোরাবাঁক’ কাব্য দুটি সেই কবেকার জমে থাকা গাঢ় গাদ সরিয়ে সরোবরের জলস্তর পরিচ্ছন্ন করার দায় নিতে পেরেছে এবং রাজহংস-হংসির অবাধ বিচরণ নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়েছে তাদের এই কাব্যকথা, আমরা তা খানিকটা দেখতে চাইবো এখানে।
এ হলো আমাদের ইতোমধ্যে ব্যক্ত প্রতিপাদ্যের নিকটবর্তী ‘মনের ইতিহাস’ জানার অভিযান আসলে। বিশিষ্ট ভারতীয় ভাবুক ও অধ্যাপক বিমলকৃষ্ণ মতিলাল (১৯৩৫-১৯৯১) বলছেন : ‘সামাজিক বা রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে-সঙ্গেই মানুষের মনের ইতিহাসেরও একটা মূল্য রয়েছে’।
‘রাইবতি’ : মৃত্তিকার গভীরে জীবনের আবাহন
বৈষ্ণব দর্শনে রাধা বা রাধিকাকে ‘রাই’ বলেও সম্বোধন করা হয়। তার সঙ্গে ‘বতি’ বা ‘বতী’ শব্দটি যুক্ত হলে অর্থের অভাবিত সম্প্রসারণ ঘটে সংসারযাপনে। তার মানে দাঁড়ায় ‘রাধার মতো গুণসম্পন্না নারী’— ‘রাইবতি’। এটি প্রধানত নানা অনুভূতিঘেরা একটি প্রাঞ্জল প্রেমপ্রোজ্জ্বল কাব্য। সেই সঙ্গে ইতিহাসচেতনা. শেকড় অন্বেষা, গেরস্ত-জীবন, অতীতমুগ্ধতার নানারৈখিক ফুলঝুরি কাব্যটিকে সুনৃত পাঠের যোগ্য করে তুলেছে। সেই সঙ্গে মথুরার অনুসৃত এসব অনুষঙ্গের অনুরোধে পার্বত্য আদিবাসী জাতিগুলোর ভাষাভাণ্ডার থেকে তার কবিতায় কিছু শব্দের প্রাসঙ্গিক প্রয়োগ বাংলাভাষি পাঠকের অধীত শব্দ-সমুদ্রের কূলে নতুন ঢেউ আনে এবং বোধকে সচকিত করে তোলে সহসাই। যেমন : ‘তায়ুং’ (রাজধনেশ পাখি), ‘খেলাংবার’ (গন্ধহারানো বুনো অর্কিড), ‘ওয়ানসুক’ (ভাবনা বা চিন্তা), ‘এমাং’ (স্বপ্ন), ‘গাইরিং’ (জুমচাষকালে তৈরি অস্থায়ী ঘর), ‘রুয়াং’ (প্রতিধ্বনি), ‘রাজমুয়ানি’ (সম্মোহনী মন্ত্র), ‘সৈ স্লাকজাক’ (দ্রুত বিস্মৃতি), ‘রিসা’ (বক্ষবন্ধনী), ‘কোচপাঙ’ (ভালোাবাসা), ‘আং ন-ন হামজাগো’ (আমি তোমাকে ভালোবাসি), ‘প্লুং’ (বাঁশি), ‘খ্রেখ্রং’ (মাউথ অরগান) প্রভৃতি। এই শব্দগুলোর পরম্পরায় মথুরার কবিতা থেকে উদ্ধৃত এই পংক্তিগুলো পাঠ করা যাক :
ক/ মাথার ওপর ডানা ঝাপটায় স্বপ্ন
আদিম তায়ুং পাখির ছায়ায়
সেই ডানায় চড়ে কি নামা যায়
কোনো আদিম উপত্যকায়
যেখানে প্রতীক্ষায় আছে
বুনো ঝরনার আঁচলে পাতা পাথুরে বিছানা?
তোমার অনুপস্থিতি
আজ পাহাড়ি জীবনের পরতে-পরতে এক বিজন-বিষাদ
আমি সান্ত্বনা খুঁজি নীলপাহাড়ের নিস্তব্ধতায়
কিংবা সাতপাহাড় মাতানো খেলাংবার ঘ্রাণে …
(কুয়াশার চাদরে তুমি-আমি, পৃ. ৭৪-৭৫)।
খ/ এমাংতির পায়ের নীচে ঢেউ ভেসে আসে
প্রতীক্ষা যেন আজ প্রণয়লগনের
ওয়ানসুকতির খোঁজে রাত কাটে নীরবে
ভোরের আলোয় আবার নতুন আকাশ জাগে——
ওয়ানসুকতি, দরোজা খোলো …
(ওয়ানসুকতির খোঁজে, পৃ. ৭২)।
গ/ অষ্টাদশী চাঁদ যেন উঁকি দেয়
গাইরিং-এর জানালা থেকে
সদ্য যৌবনের মৃদু হাসি নিয়ে …
(বেঁচে থাকার গান, পৃ. ৭০)।
ঘ/ হেমন্ত এখানে হলুদ পাতায় আঁকে কান্নার রেখাচিত্র
প্রেমের ডাক এক প্রাচীন ও ধূসর গোলকধাঁধা
যেখানে নিজেকে সঁপে দেওয়া মানে
অন্ধকারে নিজেরই রুয়াং-এর কাছে হেরে যাওয়া …
(স্মৃতির লিংকরোড, পৃ. ৬৩)।
ঙ/ প্রাচীন সম্মোহনলিপি নিয়ে দাঁড়িয়েছি তোমার মহাকর্ষে
যেখানে রাজমুয়ানির আদিম ব্যাকরণও পথ হারায়
বাতাসের ভাঁজে আমি বুনেছিলাম এক অলীক ভ্রমরগুঞ্জন
আর কাঠবিড়ালির চপল পায়ে লিখেছিলাম এক অদৃশ্য ইশারা
ভেবেছিলাম, এই ছায়ার শরীরেই খুঁজে পাবে আমার নিরুদ্দেশ প্রেম …
(শূন্যের জ্যামিতি, পৃ. ৫৬)।
চ/ সৈ স্লাকজাক মন আমার
প্রেসারের ওষুধ ভুলে যাই
ই-মেইলের প্রত্যুত্তর ডুবে যায় অবহেলায়
পৌরকর? আয়কর? সব যায় উবে …
(আত্মার অ্যালবাম, পৃ. ৫০)।
ছ/ বারেবারে ফেঁসে যাই
ভালোবেসে
রিসার ভাঁজে-ভাঁজে
রিসার ভাঁজ তো নয়
যেন ছুঁয়ে না দেওয়া স্পর্শে …
(প্রেম কিংবা প্রহেলিকা, পৃ. ৪৩)
জ/ ‘কোচপাঙ-কোচপাঙ’ করে
কে তুমি শোনাও আমায়
বসন্তের মধুর সংগীত
প্রাণে জাগে পুলক
যেন শীতের শেষে
বয়ে গেলো দখিনা মলয়
কে যেন ফিসফিসিয়ে বলে যায়——
‘আং ন-ন হামজাগো’।
কে তুমি বাজাও প্লুং— খ্রেখ্রং
কলাবন্ধ্যা জুমখেতের নিশ্ছিদ্র নীরবতায়
আনো সুরের ঢেউ?
যেন মৃত্তিকার গভীরে জীবনের আবাহন। …
(বিবর্ণ ক্যানভাসে স্বপ্নের ছায়া, পৃ. ১২)।
সবশেষে পাঠ করি এই কবির মন্ত্রপ্রতিম জোরালো স্ত্রোত্রের মতো একটি স্তবক, মনোভুবনে যা চনমনে শিহরন জাগায় :
আঘাত যে দেয়, সে তো কেবল শিল্পী
বেদনার গভীরতা মাপে শুধু বিদ্ধ হওয়া ক্যানভাস
একবার আমার একাকিত্বের আয়নায় দাঁড়াও
দেখবে, অবহেলার নোনাজল
কীভাবে কুরে-কুরে খায় আস্ত একটা মানুষ …
(একবার তুমি আমি হও, পৃ. ৯)।
‘চোরাবাঁক’ : চিম্বুকের আকাশে ওড়া চিল
চিলামং চৌধুরীর কাব্য ‘চোরাবাঁক’-এ সংকলিত কবিতাগুলো যেন শাস্ত্রীয় সংগীতের বোল—— তারানা’র ধরনে যা নানামাত্রার ভাবুনাবিভূতিতে সমাচ্ছন্ন। এ কাব্য বোধ ও বোধির অদূর-সুদূরের উজ্জয়িনী-সঞ্চালনে নতুন-নতুন অনুভাবনার অলিন্দে ঘিরে রাখে পাঠকসত্তাকে। ‘উ ষা মং’ নামক একটি সাধারণ ‘অবিচুয়ারি’কে ধারণ করে খুব সংযত উচ্চারণে চিংলার শব্দগুলো চলেছে দলবেঁধে যেন ‘মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল মাঝে…। সেই সঙ্গে অপার্থিবতার আকাশপুঞ্জে মিশে যাওয়া একদার একটি উচ্ছল, পার্থিবপ্রাণ তার শারীরীরূপ ধারণ করে যেন সহসা দাঁড়ায় পাঠকের সামনে একেবারে হাস্যমুখে। প্রকৃতপক্ষে, মৃত্যু নামক প্রগাঢ়, সর্বেব অজানা ও পারহীন অন্ধকারে মানুষের চিরতরে হারিয়ে যাওয়া বা মহাপ্রস্থানের সত্যকে চেতনার চাঞ্চল্যে কবি এখানে প্রায় জীবন্তরূপে হাজির করেছেন। যা শুধু অনুভববেদ্য, যার সারবত্তার পক্ষে ভাষ্যরচনা খুব একটা সহজ নয় কারো। কবিতাটির এমনই গতিপথ যে, ওখানে উদ্দিষ্ট মানুষটাকে আমাদের মোটেও অচেনা বা দূরের মানুষ বলে মনে হয় না কদাচ। সে যেন অনুক্ষণ আছে আমাদেরই ঘিরে-ঘিরে, আবার সে-ই যেন কখন উড়াল দিল চির-নিরুদ্দেশের আকাশবিতানে—— এমন দলাবাঁধা বেদনা আছে কবিতাটির শরীজুড়ে। প্রসঙ্গক্রমে পুরো কবিতাটাই এখানে উদ্ধার করা যাক :
ঢল নামে
বৃষ্টি অবিরাম
বন্দি আবেগ যেন এক পাহাড়
ধ্যান ভেঙে হঠাৎ বেরিয়ে আসে ব্যাঙ
দ্রুত নেমে আসে অন্ধকার
সাধ্য মত আলো জ্বলে এখানে-ওখানে
অজস্র পোকার ডাক
নিয়ে যায় অন্য ভাবনায়
অন্য কোথাও …
ঢল নামে ক্ষয়ে
বৃষ্টি অবিরাম
নানান খবরের ভিড়ে
এসে মেশে তোমার মায়াজাগা প্রস্থান——
উ ষা মং …
ঢল নামে ক্ষয়ে
বৃষ্টি অবিরাম। (পৃ. ১৬)।
বস্তুত চিংলার ৬০টি কবিতায় গাঁথা ‘চোরাবাঁক’ থেকে আরও কিছু চুম্বক পঙ্ক্তি পরপর উৎকলন করা যায় স্নিগ্ধ উচ্চারণের নমুনারূপে। যে-পঙ্ক্তিগুলো অবশ, ঘুমন্ত সত্তাকে ধীরে-ধীরে জাগায় দুগ্ধবাটি হাতে মায়ের শিয়রে দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে ডাকার মতো, যেমন :
ক/ অদৃশ্য মাটির গভীরে
একফোঁটা স্বচ্ছ জল
যে জল মুখ নয়, মুখোশ নয়—
শুধু জল …
(মুখ ও মুখোশ, পৃ. ১২)।
খ/ ঠিক কবে যে মরেছি জানি না আমি
আমার গলিত লাশের গন্ধ চারপাশ
অথচ দিব্যি এখনও চলাফেরা এপাশ-ওপাশ
মানুষের ভিড়ে মিশে থাকা
এক মৃতপ্রাণ
হাসি-কাঁদি
চোখে রাখি স্বাভাবিকার আড়াল
কেউ টের পায় না
ভেতরে কতদিন ধরে পচে আছে স্বপ্ন
কতদিন আগে থেমে গেছে হৃদয়ের
নির্ভেজাল স্পন্দন …
(অদৃশ্য ক্ষয়, পৃ. ১৪)।
গ/ ইহজাগতিক তুমি-আমি
সৃষ্টির নেশায় কালে-কালে
মৃত্যু আনি
মৃত্যুই নতুনের আলো জ্বালায়
এই পৃথিবীর …
(মৃত্যৃর আলো, পৃ. ২৩)।
ঘ/ তোমাদের এই পৃথিবী আমার নয়
তা আমি জানি অনেক জন্ম আগে
অনির্বাণ প্রাণ ভালোবাসায় আসে
ভাসে তোমাদের কক্ষ-কক্ষান্তরে——
ঠাঁই নেই জেনে আমার প্রস্থান
অজস্র জলধারে আমি নেই
পাহাড়-পাথরে নির্জন শান্ত পথে—— দেখো …
(জন্ম সুখ অসুখ, পৃ. ৩১)।
ঙ/ খুব গান হতে ইচ্ছে করে
কষ্টে মুচড়ে যাওয়া সুর ভরে
নিভৃত কোনো এক অন্ধকারে
ঝরে অশ্রু, ঝরে যায় নিঃশব্দ নদী …
(অন্ধ কবি, পৃ. ৩৪)।
চ/ চিল উড়ে চিম্বুকে, সঙ্গহীন এ মর্তে
ভেসে-ভেসে ক্ষমাহীন কাম দম্ভে
দূর্বাঘাসে শিশির ছুঁয়ে যাবে—— যাক
থাক না পড়ে হিমশীতল চোরাবাঁক …
(চোরাবাঁক, পৃ. ৩৭)।
ছ/ মুঠো-মুঠো মৃত্যু জমা করি আনন্দে
সঞ্চিত বীর্য ক্ষয়ে চিহ্ন রাখি এ মর্তে
তবুও অতৃপ্ত চিত্তে ফিরবে ঠিক-ঠিক
নরম দেহঘ্রাণে এক কাম-ধার্মিক …
(আগস্ট ১০, ২০২০, পৃ. ৪৬)।
জ/ আমি হলাম দূর গো কন্যা
আমি হলাম দূর
গোপনে বেঁধেছ যারে
প্রভাতে দেখো, সেও দূর
কেঁদে-কেঁদে খুঁজলে দেখো——
নেই গো গলার সুর
অবাক করা দূর
আমি হলাম দূর গো কন্যা
আমি হলাম দূর …
(দূর কন্যা, পৃ. ৫৮)।
মৃত্যুবোধ ও মৃত্যুচেতনা, বৌদ্ধদর্শনে ধৃত অনিত্যতার চকিত উপস্থিতি, প্রাণবন্ত লিরিক্যাল ব্যঞ্জনা, নৈঃসঙ্গ্যের প্রীতম আরাধনা, বিজলিপ্রভার মতো আলব্যেয় কামু’র অ্যাবসার্ডিজমের ঝলক গিয়ে মেশে— এমন সব ত্রস্ত মেঘের মতো ভাবানুষঙ্গ, সুদূর ও অনন্তের প্রতি দারুণ পিপাসা আর সম্বুদ্ধ চিত্তে নিজেকে অতি নগণ্যের প্রদীপ্ত কুটিরে দেখতে পাওয়া এক দ্বান্দ্বিক সুর ও স্বর রয়েছে চিংলামং চৌধুরীর এসব কবিতায়।
কবিতা তার আপনশক্তিতে মানবাত্মাকে জগতজয়ে নিরঙ্কুশ বা অভ্রান্ত অমরতা অর্জনের সনদ দেয় কিনা জানা নেই কারো। তবে সুবেদী শব্দমগ্নতা, সেই শব্দসমূহের বিবস্ত্রক, আকর্ষণীয় ও নিক্ষেপক পারঙ্গমতা মানুষকে স্মিত, সম্পৃক্ত ও পরিব্যাপ্ত করতে সমর্থ বলে মরজগতে স্বীকৃতি পেয়েছে। সেই পরম পথের লক্ষে কবিতার রাঙা পাখা নিয়ে চিংলামং চৌধুরী ভেসে চলেছেন চিম্বুকের আকাশে ওড়া সেই নিঃসঙ্গ চিলটির মতো।
অতঃপর উপসংহার অথবা কবিতার দহলিজে দুই কবি
কবিতা, প্রকৃতপ্রস্তাবে, ব্যক্তিসত্তার প্রমিত অনূভাবনার নিঃশব্দ অথচ বিস্ফোরক বহিঃপ্রকাশের নাম। ধর্ম-দর্শন, লোকমানবের আপাত অলক্ষ সমাজ-পরিপাশ, বৃহত্তর অর্থে পরিবর্তমান কালের খাদে গড়িয়ে-গড়িয়ে চলা মহামানবের মন-গভীরের আকাশ ও প্রোথিত জাগরণ। কবিতা অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যতকে নিবিড় তপস্যায় ধারণ করার সৃজনশীল প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের অবারিত আর্কেডিয়া। এখানে মানুষ, তার পরিবেশ-প্রতিবেশের সকল জীব ও প্রাণপ্রকৃতির বৈচিত্র্য নিয়ে সর্বাঙ্গীণ ভারসাম্য ও সুষমভাবে মিথোজীবিতায় (ঝুসনরড়ংরং) বসবাস করতে সক্ষম।
এও কি সত্য নয়, কবিতা কল্পনাতীত সৌন্দর্যসঙ্গমের বসন ও ভূষণধারীও! স্থানকালপাত্রে তার আবরণ ও আভরণ নানা পরিপ্রেক্ষিতে প্রকাশিত, প্রতিভাসিত, পরিবর্তিত ও উত্থিত হতে সক্ষম। আমাদের এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু কবি মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা ও চিংলামং চৌধুরী তাদের কবিতায় মানবীয় অস্তিত্বের চিরন্তন অথচ জটিল ও সরল বিন্যাসের কথাগুলো বিবৃত করেছেন তাদের দুই কাব্য ‘রাইবতি’ ও ‘চোরাবাঁক’-এ একান্ত ও স্বাধীন অভিভাষের মাধ্যমে।
উভয়ের কাব্যিক স্বতন্ত্রতা ও একই নান্দনিক অভিযাত্রা আরও আনন্দসঞ্চারী হোক জীবনের বাঁকে-বাঁকে।
হাফিজ রশিদ খান: কবি ও প্রাবন্ধিক, চট্টগ্রাম




