এখন সময়:রাত ১:৩০- আজ: শুক্রবার-৩রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৯শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ১:৩০- আজ: শুক্রবার
৩রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৯শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর: অরুন্ধতী রায়ের সাহিত্য-জীবন ও সামাজিক-রাজনৈতিক সক্রিয়তা

শাহেদ কায়েস

অরুন্ধতী রায় সমকালীন বিশ্বসাহিত্যের এক অনন্য ও ব্যতিক্রমী কণ্ঠস্বর। তিনি একাধারে যেমন কথাসাহিত্যের জাদুকর, ঠিক তেমনি আবার শোষিত, নিপীড়িত ও প্রান্তিক মানুষের অধিকার রক্ষার আপসহীন যোদ্ধা। ১৯৯৭ সালে তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ প্রকাশের পর তিনি বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেন এবং মর্যাদাপূর্ণ ‘বুকার পুরস্কার’ লাভ করেন। কিন্তু সাহিত্যিক খ্যাতির চূড়ায় আরোহণ করার পর তিনি কেবল সৃজনশীল লেখালেখির বৃত্তে নিজেকে আটকে রাখেননি। বরং তিনি তাঁর তীক্ষ্ম লেখা ও দৃঢ় কণ্ঠস্বরকে কাজে লাগিয়েছেন রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, উগ্র জাতীয়তাবাদ, করপোরেট স্বার্থের লালসা, পরিবেশ ধ্বংস এবং বিশ্বায়নের নেতিবাচক প্রভাবের বিরুদ্ধে। অরুন্ধতী রায়ের লেখক জীবন এবং তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিজম একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি মনে করেন, একজন লেখকের সামাজিক দায়বদ্ধতা এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

সুজানা অরুন্ধতী রায় ১৯৬১ সালের ২৪ নভেম্বর ভারতের মেঘালয়ের শিলঙে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মা মেরি রায় ছিলেন কেরালার একজন শিক্ষাবিদ ও নারী অধিকার আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী এবং বাবা রঞ্জিত রায় ছিলেন চা-বাগানের একজন ব্যবস্থাপক। অরুন্ধতীর বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখন তাঁর বাবা-মায়ের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। এরপর তিনি মায়ের সাথে কেরালায় চলে আসেন। কেরালা ও তামিলনাড়ুর গ্রামীণ ও সামাজিক পরিবেশ তাঁর শৈশবকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল, যা পরবর্তীতে তাঁর প্রথম উপন্যাসে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে।

 

১৬ বছর বয়সে তিনি কেরালা ছেড়ে দিল্লির ‘স্কুল অব প্ল্যানিং অ্যান্ড আর্কিটেকচার’-এ স্থাপত্যবিদ্যায় ভর্তি হন। স্থাপত্যবিদ্যায় পড়াশোনা করলেও তাঁর ভেতরের মূল সত্তাটি ছিল একজন শিল্পীর। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি দিল্লির ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব আরবান অ্যাফেয়ার্সে কাজ করেন এবং পরবর্তীতে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে পা রাখেন। তিনি চিত্রনাট্যকার হিসেবে বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রে কাজ করেন, যার মধ্যে ‘ইন হুইচ অ্যানি গিভস ইট দোজ ওয়ানস’ এবং ‘ইলেকট্রিক মুন’ উল্লেখযোগ্য। চলচ্চিত্রে এই কাজের অভিজ্ঞতা তাঁর গদ্যরীতি ও দৃশ্যমান বর্ণনার ভঙ্গি তৈরিতে দারুণ সাহায্য করেছিল।

 

অরুন্ধতী রায়ের সাহিত্য-জীবন

 

১৯৯২ সালে অরুন্ধতী রায় তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’ লেখা শুরু করেন এবং এটি শেষ করতে তাঁর প্রায় চার বছর সময় লাগে। ১৯৯৭ সালে প্রকাশিত এই একটিমাত্র উপন্যাসের মাধ্যমেই ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্য বিশ্বমঞ্চে এক নতুন পরিচয় ও মর্যাদা লাভ করে। দক্ষিণ ভারতের কেরালার আয়মেনেম গ্রামের পটভূমিতে রচিত এই উপন্যাসে রাহেল এবং এস্তা নামের যমজ ভাই-বোনের চোখ দিয়ে ভারতীয় সমাজের জটিল ও নির্মম বাস্তবতাকে দেখানো হয়েছে। উপন্যাসটি মূলত ছোট ছোট বিষয় এবং মানুষের জীবনের ওপর বড় বড় সামাজিক নিয়ম ও ইতিহাসের নির্মম আঘাতের গল্প বলে।উপন্যাসে ভারতের সনাতন জাতিভেদ প্রথা বা ‘কাস্ট সিস্টেম’ এবং এর নিষ্ঠুরতাকে তুলে ধরা হয়েছে। উচ্চবর্ণের সিরিয়ান খ্রিস্টান নারী আম্মু এবং নিম্নবর্ণের (অস্পৃশ্য বা পরাভান) পুরুষ ভেলুথার মধ্যকার নিষিদ্ধ প্রেম এবং এর পরিণতি ভারতীয় সমাজের অন্ধকার দিকটি উন্মোচন করে।

 

উপন্যাসটি প্রকাশের সাথে সাথে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রশংসা পায়। ১৯৯৭ সালে এটি বুকার পুরস্কার লাভ করে। বইটি বিশ্বজুড়ে লাখ লাখ কপি বিক্রি হয় এবং অরুন্ধতী রায়কে রাতারাতি একজন আন্তর্জাতিক সেলিব্রিটিতে পরিণত করে। তবে এই অভাবনীয় স্বীকৃতি তাঁকে আত্মতুষ্ট করে তোলেনি, বরং মানুষের প্রতি এবং সমাজের প্রতি তাঁর কর্তব্যবোধকে আরও তীব্র করে তুলেছিল। ‘দ্য গড অব স্মল থিংস’-এর সাফল্যের পর সবাই যখন তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাসের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল, অরুন্ধতী তখন কথাসাহিত্য থেকে দীর্ঘ ২০ বছরের বিরতি নেন। এই সময়ে তিনি ফিকশন বা গল্প ছেড়ে সরাসরি বাস্তব পৃথিবীর রূঢ় সত্যের মুখোমুখি হন। তিনি উপলব্ধি করেন যে, কেবল সুন্দর গল্প, উপন্যাস লেখার চেয়ে ভারতের ও বিশ্বের কোটি কোটি বিপন্ন মানুষের কণ্ঠস্বর হওয়াটা তাঁর জন্য বেশি জরুরি।

 

তিনি একের পর এক রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ে দীর্ঘ প্রবন্ধ এবং বই লিখতে শুরু করেন। তাঁর এই নন-ফিকশন বা প্রবন্ধগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় ভণ্ডামি, পারমাণবিক আগ্রাসন এবং করপোরেট পুঁজিবাদের মুখোশ খুলে

 

 

দেওয়া। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রবন্ধের সংকলন হলো— ‘দ্য গ্রেটার কমন গুড’, ‘দ্য অ্যালজেবরা অব ইনফিনিট জাস্টিস’, ‘অ্যান অর্ডিনারি পারসনস গাইড টু এম্পায়ার’ এবং ‘লিসেনিং টু গ্রাসহপারস’।

 

‘দ্য গ্রেটার কমন গুড’ (১৯৯৯) নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের সমর্থনে লেখা। এই প্রবন্ধ গ্রন্থে তিনি দেখান কীভাবে উন্নয়নের নামে লাখ লাখ দরিদ্র ও আদিবাসীকে তাদের জমি থেকে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। ২০০১ সালে প্রকাশিত ‘দ্য অ্যালজেবরা অব ইনফিনিট জাস্টিস’ হলো অরুন্ধতী রায়ের একটি বহুল আলোচিত প্রবন্ধ সংকলন। বইটিতে তিনি বিশ্বায়ন, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, পারমাণবিক অস্ত্র, সন্ত্রাসবাদ, আফগানিস্তান যুদ্ধ, কাশ্মীর এবং ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে তীক্ষ্ম ও সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন। ১৯৯৮ সালে লেখা তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ ‘দ্য এন্ড অব ইমাজিনেশন’-সহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা এই গ্রন্থে সংকলিত হয়েছে। ১৯৯৮ সালে ভারত যখন পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়, তখন অরুন্ধতী এর তীব্র বিরোধিতা করে এই ঐতিহাসিক প্রবন্ধটি লেখেন। তিনি পারমাণবিক বোমাকে ‘মানব কল্পনার শেষ’ এবং পরিবেশ ও মানবজাতির জন্য এক চরম হুমকি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। যুক্তরাষ্ট্রে ২০০১ সালের  ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রতিক্রিয়া এবং ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’-এরও তিনি কঠোর সমালোচনা করেন। সংক্ষেপে, ‘দ্য অ্যালজেবরা অব ইনফিনিট জাস্টিস’ কেবল একটি প্রবন্ধ সংকলন নয়; এটি সমকালীন বিশ্বরাজনীতি, ক্ষমতার কাঠামো এবং ন্যায়বিচার সম্পর্কে অরুন্ধতী রায়ের গভীর রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

 

‘অ্যান অর্ডিনারি পারসনস গাইড টু এম্পায়ার’ (২০০৩) গ্রন্থে  তিনি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, ইরাক আক্রমণ এবং বিশ্বায়নের আড়ালে থাকা নয়া-উপনিবেশবাদের তীব্র সমালোচনা করেন। ‘লিসেনিং টু গ্রাসহপারস’ (২০০৯) গ্রন্থে তিনি ভারতীয় গণতন্ত্রের ভেতরের ভঙ্গুরতা এবং কীভাবে রাষ্ট্র নিজের নাগরিকদের ওপরই যুদ্ধ চাপিয়ে দিচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা করেন।

 

দীর্ঘ ২০ বছর পর, ২০১৭ সালে অরুন্ধতী রায়ের দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস’  প্রকাশিত হয়। প্রথম উপন্যাসের মতো এটি শুধু একটি পরিবারের কাহিনিতে সীমাবদ্ধ ছিল না, উপন্যাসটি আধুনিক ভারতের জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার এক বিস্তৃত প্রতিচ্ছবি নির্মাণ করেছে। এই উপন্যাসে তিনি দিল্লির এক হিজড়া বা ট্রান্সজেন্ডার নারী আঞ্জুম এবং কাশ্মীর উপত্যকার স্বাধীনতার লড়াইয়ের সাথে জড়িয়ে যাওয়া স্থাপত্যবিদ তিলোত্তমা’র জীবনকে কেন্দ্র করে এক বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক আখ্যান নির্মাণ করেছেন। এখানে দিল্লির কবরস্থান থেকে শুরু করে কাশ্মীরের রক্তাক্ত উপত্যকা, মাওবাদী আন্দোলন এবং ভারতের বর্তমান উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির বাস্তব চিত্র উঠে এসেছে। অরুন্ধতীর দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কীভাবে তাঁর কল্পনাশক্তি ও আখ্যান নির্মাণকে সমৃদ্ধ করেছে, এই বই তারই এক উজ্জ্বল সাক্ষ্য।

 

২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত অরুন্ধতী রায়ের স্মৃতিকথা ‘মাদার মেরি কামস টু মি’ মূলত তাঁর মা মেরি রায়কে ঘিরে রচিত। বইটিতে মা-মেয়ের জটিল সম্পর্ক, সংঘাত, ভালোবাসা এবং একজন লেখক হিসেবে অরুন্ধতী রায়ের আত্মগঠনের গল্প উঠে এসেছে। সমালোচকদের কাছে বইটি ব্যাপক প্রশংসা লাভ করে এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর ২০২৫ সালের সেরা দশটি বইয়ের তালিকায় স্থান পায়। এই গ্রন্থের জন্য অরুন্ধতী রায় ২০২৫ সালের ‘ন্যাশনাল বুক ক্রিটিকস সার্কেল অ্যাওয়ার্ড’ (জীবনী বিভাগ) এবং ২০২৬ সালের ‘মাথ্রুভূমি বুক অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার অর্জন করেন। বইটি ২০২৬ সালের ‘উইমেন’স প্রাইজ ফর নন-ফিকশন’-এর সংক্ষিপ্ত তালিকাতেও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

 

সামাজিক ও রাজনৈতিক সক্রিয়তা

 

অরুন্ধতী রায়ের অ্যাক্টিভিজম কোনো ড্রয়িংরুমের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা নয়। তিনি সরাসরি মাঠে নেমে, আদিবাসীদের সাথে বনে-জঙ্গলে ঘুরে, কিংবা রাজপথে পুলিশের লাঠির সামনে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁর সামাজিক-রাজনৈতিক সক্রিয়তার বিস্তৃত পরিসরকে বোঝার সুবিধার্থে বিষয়গুলোকে নিচে কয়েকটি

ভাগে বিন্যস্ত করা হয়েছে— নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন ও পরিবেশ রক্ষা; কাশ্মীর সংকট ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার; মাওবাদী বা নকশাল আন্দোলন এবং অপারেশন গ্রিন হান্ট; বিশ্বায়ন, পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অবস্থান; এবং ভারতে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই।

 

১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে ভারতের নর্মদা নদীর ওপর বিশাল ‘সরদার সরোবর বাঁধ’ নির্মাণের বিরুদ্ধে মেধা পাটেকরের নেতৃত্বে যে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, অরুন্ধতী রায় তাতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। সরকার দাবি করেছিল এই বাঁধের ফলে লাখ লাখ মানুষ পানি ও বিদ্যুৎ পাবে। কিন্তু অরুন্ধতী তাঁর ক্ষুরধার লেখার মাধ্যমে প্রমাণ করেন যে, এই বিশাল বাঁধের ফলে মূলত আড়াই লাখেরও বেশি দরিদ্র আদিবাসী তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হবে এবং কোনো পুনর্বাসন ছাড়াই তারা চরম দারিদ্র্যের মুখে পড়বে। এছাড়া পরিবেশ ও প্রাণ-প্রকৃতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও পরিবেশের এই অপূরণীয় ক্ষতি এবং বড় বড় করপোরেটের স্বার্থে পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে জনমত গড়ে তোলেন। এই আন্দোলনের কারণে তাঁকে আদালত অবমাননার দায়েও পড়তে হয়েছিল।

 

কাশ্মীর ইস্যুতে অরুন্ধতী রায়ের অবস্থান ভারতের মূলধারার রাজনীতি ও গণমাধ্যমের সম্পূর্ণ বিপরীত। তিনি বহু বছর ধরে কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মানবাধিকার লঙ্ঘন, আফস্পা (অঋঝচঅ)-র মতো কালো আইনের অপব্যবহার এবং সাধারণ কাশ্মীরি জনগণের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে কথা বলে আসছেন। ২০১০ সালে একটি সেমিনারে তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে— “কাশ্মীর কখনোই ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল না।” এই মন্তব্যের পর ভারতে তাঁর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করার দাবি ওঠে এবং উগ্র জাতীয়তাবাদীরা তাঁর দিল্লির বাড়িতে হামলা চালায়। তবুও তিনি নিজের অবস্থান থেকে এক চুলও নড়েননি এবং কাশ্মীরের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার ও শান্তির পক্ষে বারবার আওয়াজ তুলেছেন।

 

ভারতের ছত্তিশগড়, ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ডের খনিজসমৃদ্ধ বনাঞ্চলগুলোতে আদিবাসীদের জমি কেড়ে নিয়ে বহুজাতিক করপোরেট কোম্পানিগুলোর হাতে তুলে দেওয়ার সরকারি নীতির তীব্র বিরোধী তিনি। ২০১০ সালে ভারত সরকার যখন এই অঞ্চলের মাওবাদী বিদ্রোহীদের দমনের নামে ‘অপারেশন গ্রিন হান্ট’ নামের আধা-সামরিক অভিযান শুরু করে, তখন অরুন্ধতী সরাসরি ছত্তিশগড়ের গভীর জঙ্গলে চলে যান। তিনি মাওবাদী গেরিলাদের সাথে কয়েকদিন কাটান এবং সাধারণ আদিবাসীদের জীবনযাত্রা ও তাদের ক্ষোভের কারণগুলো প্রত্যক্ষ করেন। জঙ্গল থেকে ফিরে এসে তিনি তাঁর বিখ্যাত দীর্ঘ নিবন্ধ ‘ওয়াকিং উইথ দ্য কমরেডস’ লেখেন। এখানে তিনি স্পষ্ট করেন যে, তথাকথিত মাওবাদী বিদ্রোহ আসলে কোনো বাইরের সন্ত্রাসবাদ নয়, বরং করপোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের জমি ও বেঁচে থাকার অধিকার রক্ষার জন্য আদিবাসীদের বাঁচা-মরার লড়াই।

 

অরুন্ধতী রায় বিশ্বায়নের নামে গরিব দেশগুলোর ওপর ধনী দেশ ও বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফ-এর চাপিয়ে দেওয়া মুক্তবাজার অর্থনীতির ঘোর বিরোধী। তিনি মনে করেন, এই ব্যবস্থা ধনীকে আরও ধনী এবং গরিবকে আরও নিঃস্ব করে তোলে। ২০০৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন অন্যায়ভাবে ইরাক আক্রমণ করে, তখন তিনি নোম চমস্কি বা নেলসন ম্যান্ডেলার মতো বৈশ্বিক নেতাদের সাথে সুর মিলিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তীব্র নিন্দা জানান। তিনি ২০০৪ সালে ‘ওয়ার্ল্ড সোশ্যাল ফোরাম’-এ মার্কিন যুদ্ধের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক বক্তব্য প্রদান করেন।

 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতে ধর্মীয় মেরুকরণ, দলিত ও মুসলিমদের ওপর নির্যাতন এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থানের বিরুদ্ধে অরুন্ধতী রায় সবচেয়ে সোচ্চার কণ্ঠস্বরগুলোর একজন।

 

তিনি বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর কর্তৃত্ববাদী নীতি, গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ এবং ভিন্নমতাবলম্বী লেখক, সাংবাদিক ও সমাজকর্মীদের জেলে বন্দি করার তীব্র সমালোচনা করে আসছেন। তিনি ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থাকে ফ্যাসিবাদের সাথে তুলনা করেছেন এবং এর বিরুদ্ধে সাধারণ

 

মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

 

অরুন্ধতী রায়ের এই আপসহীন রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে তাঁকে প্রতিনিয়ত রাষ্ট্র, বিচার বিভাগ এবং উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর তীব্র আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। ২০০২ সালে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন এবং সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়ের সমালোচনা করার কারণে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত তাঁকে ‘আদালত অবমাননা’র দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে। আদালত তাঁকে প্রতীকী হিসেবে একদিনের জেল এবং দুই হাজার টাকা জরিমানা করে। তিনি আনন্দের সাথে সেই সাজা মাথা পেতে নেন, কিন্তু নিজের বক্তব্য প্রত্যাহার করেননি। ২০১০ সালে কাশ্মীর প্রশ্নে তাঁর উচ্চারিত মতামতকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিতর্কের রেশ বহু বছর পরও থামেনি। অবশেষে ২০২৪ সালে সেই পুরোনো মামলায় দিল্লির লেফটেন্যান্ট গভর্নর অরুন্ধতীর বিরুদ্ধে ইউএপিএ (টঅচঅ), বা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে বিচার চালানোর অনুমোদন দেন। আন্তর্জাতিক মহল মনে করে, এটি মূলত তাঁর সমালোচনামূলক কণ্ঠকে স্তব্ধ করার একটি রাজনৈতিক প্রচেষ্টা। ভারতবর্ষের মূলধারার মধ্যবিত্ত সমাজ ও গণমাধ্যম অনেক সময়ই তাঁকে দেশবিরোধী বা উগ্রপন্থী হিসেবে চিত্রায়িত করার চেষ্টা করে। কিন্তু বিশ্বদরবারে তিনি একজন পরম সম্মানিত মানবতাবাদী হিসেবে স্বীকৃত। অরুন্ধতী তাঁর নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে কতটা কঠোর, তা বোঝা যায় তাঁর পুরস্কার বর্জনের সিদ্ধান্তগুলো দেখলে। ২০০৫ সালে ভারতের সাহিত্য একাডেমি তাঁকে তাঁর প্রবন্ধ সংকলন ‘দ্য অ্যালজেবরা অব ইনফিনিট জাস্টিস’-এর জন্য পুরস্কৃত করতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর যুক্তি ছিল, যে ভারত সরকার সাধারণ মানুষের ওপর সামরিক নিপীড়ন চালাচ্ছে এবং করপোরেটদের স্বার্থ রক্ষা করছে, সেই সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তিনি পুরস্কার নিতে পারেন না।

 

তবে আন্তর্জাতিকভাবে তিনি অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। অরুন্ধতী রায় ২০০২ সালে ‘লানান কালচারাল ফ্রিডম অ্যাওয়ার্ড’ অর্জন করেন।  বিশ্বজুড়ে মুক্তচিন্তা ও মানুষের অধিকারের পক্ষে কথা বলার জন্য তিনি এই বড় পুরস্কারটি পান। পুরস্কারের পুরো অর্থ (প্রায় ৩,৫০,০০০ মার্কিন ডলার) তিনি ভারতের ৫০টি সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের মধ্যে বিলিয়ে দেন। অহিংসা ও বিশ্ব শান্তির পক্ষে লড়াইয়ের জন্য ২০০৪ সালে অরুন্ধতী ‘সিডনি শান্তি পুরস্কার’  লাভ করেন। ২০২৪ সালে অরুন্ধতী ‘পেন সেন্টেনারি কারেজ প্রাইজ’ অর্জন করেন। তাঁর অকুতোভয় লেখালেখি ও আজীবন মানবাধিকার রক্ষার লড়াইয়ের জন্য এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পান।

অরুন্ধতী রায়ের লেখক জীবনকে তাঁর অ্যাক্টিভিজম থেকে আলাদা করা অসম্ভব। তাঁর ফিকশন বা উপন্যাসগুলো যেমন মানবিক অনুভূতি, প্রেম ও আবেগের জটিল বুননে তৈরি, তাঁর প্রবন্ধ বা নন-ফিকশনগুলো তেমনি ধারালো যুক্তি, তথ্য ও প্রতিবাদের বারুদে ঠাসা। তিনি কেবল একজন সফল ঔপন্যাসিক হয়ে নিরাপদ জীবন বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছেন এক কাঁটাভরা পথ। যেখানে প্রতিনিয়ত আছে মামলার ভয়, জেলের হুমকি এবং উগ্রবাদীদের আক্রমণ। তিনি ক্ষমতার অলিন্দে বসে থাকা মানুষদের তুষ্ট করার সাহিত্য করেননি, বরং ক্ষমতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে সত্য বলার যে অদম্য সাহস, তা তিনি  দেখিয়েছেন। আজকের এই করপোরেট-নিয়ন্ত্রিত পৃথিবীতে, যেখানে গণমাধ্যম এবং বুদ্ধিজীবীদের বড় একটা অংশ ক্ষমতার সামনে নতজানু, সেখানে অরুন্ধতী রায় এক ব্যতিক্রমী বাতিঘর। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, পৃথিবীর সমস্ত বড় বড় অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছোট ছোট বিষয় এবং প্রান্তিক মানুষের প্রতিরোধই শেষ পর্যন্ত মানবতাকে টিকিয়ে রাখে। তাঁর জীবন ও সাহিত্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের লেখকদের জন্য অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করার এক অনন্ত অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

 

শাহেদ কায়েস : কবি, লেখক ও অধিকার কর্মী, নারায়ণগঞ্জ

আবুল ফজল : বাঙালি মুসলমান সমাজের বিবেকের কণ্ঠস্বর

ইসরাইল খান বাংলার নবজাগরণের সার্থক উত্তর-সাধক মনস্বী আবুল ফজল ছিলেন বাঙালি মুসলমান সমাজের বিকাশের এবং বিবেকের এক অন্যতম প্রধান কারিগর। বিশ শতকে মুসলমান সমাজকে যতোগুলো

মেরিল্যান্ড ডিসি বই মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তসলিমা নাসরিন : যতদিন বেঁচে থাকি-  প্রগতিশীলের পক্ষে, ধর্মান্ধ মৌলবাদের বিপক্ষে আমার লেখা ও লড়াই চলবে

সাইয়িদ মাহমুদ তসলিম : নির্বাসিত লেখিকা ও  কবি তসলিমা নাসরিন বলেছেন, যতদিন বেঁচে থাকি , আমার লড়াই ও প্রতিবাদ থাকবে ধর্মান্ধ মৌলবাদের বিরুদ্ধে। অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল

‘কবিতার কথা’ চট্টগ্রাম আড্ডায় বক্তারা : ‘শুদ্ধতাই হোক কবিতার বুনিয়াদি রূপ’

রুহু রুহেল : ২৮ জুন ২০২৬ রবিবার সন্ধ্যায় অনাড়ম্বররূপে মুগ্ধতার কবিতা পাঠের আসর অনুষ্ঠিত হলো ‘কবিতার কথা চট্টগ্রাম আড্ডা’র ব্যানারে, মহিলা অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপ-পরিচালকের কার্যালয়ে।

বাংলা আমার প্রণোদনা পুরস্কার-২০২৬ পেলেন সংস্কৃতিকর্মী

চিংলামং চৌধুরী “শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চায় বিকশিত হউক নতুন প্রজন্ম” প্রতিপাদ্যে দিনব্যাপী বর্ণিল আয়োজনে রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি-এর জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হলো বাংলা আমার উৎসব-২০২৬।

শুদ্ধ সংগীতের সুরে মুখর সীতাকুণ্ড সুরনন্দনের ১ম বার্ষিক সঙ্গীত সম্মিলন অনুষ্ঠিত

দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য : সীতাকুণ্ডে শুদ্ধ সংগীতচর্চার এক অনন্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে সুরনন্দনের ১ম বার্ষিক শাস্ত্রীয় ও উপ-শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সম্মিলন। গত ২ জুন ২০২৬