কুমার প্রীতীশ বল
রূপসাগরে ডুব
এক-সন্ধ্যায় রবীন্দ্র সরোবরে সুনীল কফি খাচ্ছিল। সামনে এক বোতল ঠান্ডা পানি। একটা মেয়ে এসে একটুকু ঠান্ডা পানি চাইল। মেয়েটি রবীন্দ্র সরোবরে প্রতিসন্ধ্যার হল্লাদলের সদস্য। সুনীলকে দেখে। সুনীল পানির বোতল এগিয়ে দিল। তারপর মেয়েটিকে কফি অফার করল। মেয়েটি হেসে সুনীলের সামনের চেয়ারে বসল। কারণ তখনও মেয়েটির হল্লাদলের বন্ধুরা আসেনি। এভাবে আলাপ নীরার সঙ্গে সুনীলের।
ফ্যাশান সচেতন সুুনীল। টিপটপ চলাতে জুড়ি নেই। রূপের পূজারী। সুন্দরী মুখ, মায়াবী চোখ, আর আকর্ষণী হাসি দিয়ে সুুনীলকে মুহূর্তেই পিষে ফেলা যায়। রূপসীদের সঙ্গে সুনীলের অন্তরঙ্গতা যে-কোনো পুরুষের মনে ঈর্ষার জন্ম দেয়। মেয়েদের প্রতি তমালের কোনো উদাসীনতা নেই। হাই-হ্যালো করে। ইচ্ছে করে বাজিতে হারে। পানীয়ের গ্লাসটা এগিয়ে দেয়। অ-প্রয়োজনে পোষাকের প্রশংসা করে। বেসুরো গলায় গাইছে জেনেও সাধু…সাধু করে ওয়ানমোর বলে। গল্পে-আড্ডায় মেয়েদের পক্ষ নিয়ে তর্ক করে।
সপ্তাহের দুই-তিনটা সন্ধ্যা সুুনীল রবীন্দ্র সরোবরে কাটায়। সরোবরে যায়, কারণ ওখানে মেয়েরা বন্ধনহীন উন্মত্ত পদ্মার মতো কল-কল করে। হুল্লা করে। সিগারেটের ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার করে দেয়। গুনীল কোনার একটা টেবিলে বসে কফিতে চুমুক দিতে দিতে ও-সব হল্লা উপভোগ করে।
হল্লাদলের একজন নীরা, দেখতে সাধারণের চেয়ে ব্যতিক্রমী। রূপবতী। গায়ের রঙে জোছনা পড়লে ঝিকমিক করে। চোখে গভীর রহস্য। কথাবার্তায় অসাধারণ কৌশলী। চমৎকার ইংরেজি বলে। বাংলাও বলে প্রতিম উচ্চারণে। সিগারেট খায় খাণিকক্ষণ পর-পর। যাকে বলে চেইন স্মোকার। সুনীল মুগ্ধ হয়ে যায়। মুগ্ধতা ছড়ানোর মতোই মেয়ে নীরা। ওর দিকে তাকালে ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়। মনে হয়, এই মেয়েই যেন ওর জীবনের স্বপ্ন। যতসব অপূর্ণতা পূরণের একমাত্র ঠিকানা।
নীরা কারণে-অকারণে ফোন করে, ‘সুনীল ভাই, একটু হেল্প করবেন?’
সুনীল ‘না’ বলতে পারে না।
ধীরে ধীরে সুনীল হেল্পিংহ্যান্ড হয়ে ওঠে ইীরার। কখনো টাকা ধার, কখনো গিফট, কখনো ধানমন্ডির নামী-সব বুফেতে লাঞ্চ কিংবা ডিনার। সুনীলের বিশ্বাস ছিল, প্রেম এভাবেই ধীরে ধীরে রূপ-নারায়ণের কূলে জেগে ওঠবে একদিন। নীরা একদিন সত্যিই তাকে বুঝবে।
এক-সন্ধ্যায় ওরা সরোবরে কফি খাচ্ছিল। এক ফুলকুমারী এসে ফুলের ঢালা নিয়ে সামনে দাঁড়ালে নীরা ক’খানা বেলিফুলের মালা আর গোলাপ নিয়ে খোঁপায় পড়ে। সুনীল ফুলকুমারীকে বিদায় করে খাণিকক্ষণ নীরার দিকে তাকিয়ে থাকে। নীরা হাসতে হাসতে সিগারেটে আগুন ধরায়। নীরার রূপের চ্ছটা সুনীলের ধৈয্যের বাঁধ ভেঙ্গে দেয়।
সে বলে ফেলল, ‘নীরা, আই লাভ ইউ।’
নীরা সদ্য-জ্বালানো সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে হাসতে হাসতে খুবই ক্যাজুয়াল ভঙ্গীতে বলল, ‘সুনীল ভাই, আপনি অ-সম্ভব ভালো মানুষ! খুব সহজ-সরল!! কিন্তু আমি আপনাকে কখনো সে-ভাবে ভাবিনি। আমার বয়ফ্রেন্ড আছে। সে দেশে ফিরলে আমরা বিয়ে করব।’
নিমিষে সুনীলের পায়ের নিচের মাটি সরে গেল। হোঁচট খেল নিজেরই বিশ্বাসে। বুঝে নিল, এ জগৎ স্বপ্ন নয়।
ধবল দুধের মতো জোছনা যখন ঢালিতেছে চাঁদ- পূর্ণিমার, সুনীল ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সে-রূপ দেখছিল আর ভাবছিল, বার-বার কেন সে রূপ-সাগরে ডুব দিতে যায়! রূপ মুগ্ধতা ছড়ায় ঠিকই, কিন্তু রূপের আড়ালে হৃদয় থাকে না।
আজকের রাতটা অন্যরকম
খানিকক্ষণ আগে রাত্রি নেমেছে নগরের বুক জুড়ে। ব্যালকনির দোলনায় দুলতে দুলতে মনোযোগ দিয়ে নীরা ফাগুনের আকাশ দেখছেন। আকাশে তারারা জ্বল-জ্বল করছে। আইফোনের পাশে টি-টেবিলে অর্ধেকটা কফি তখনও বর্তমান। চারপাশ ঘিরে আছে এক নির্জনতা। ঘরের আলো, সংসারের কোলাহল– সবই একঘেয়েমি লাগছে। আলোর রহস্যময়ী সহোদরার মতো এই অন্ধকার আকাশ ঘন হয়ে উঠছে। নীরার ভেতরের নির্জনতাটাও রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে।
আজকের রাতটা কেন জানি অন্যরকম লাগছে তাঁর। মনে হয়, কোনো এক বিলুপ্ত নগরীর মতো। সেই নগরীর এক ধূসর প্রাসাদের রূপ জেগে ওঠছে হৃদয়ে।
নির্জনতাটা যখন স্বৈরাচারের হিংস্র থাবার মতো জাঁকিয়ে বসছে, তখন মিউট আইফোনের আলোটা জ্বলে ওঠে। ওয়াটসআপে অমিত লিখেছে, ‘ছাদে কেউ নেই। একবার আসবেন?’
এ-সময় নীরার ছাদে যেতে ইচ্ছে করছিল না। তাই লিখলেন, ‘রাত্রি অনেক।’
সুনীল একটা ‘হাসির লিমুজি’ পাঠিয়ে লিখল, ‘কী করেন?’
‘নগ্ন-নির্জন আঁধারের রূপ দেখি।’
সুনীল আবার ‘হাসির লিমুজি’ পাঠাল।
নীরা পাল্টা ‘হাসির লিমুজি’ পাঠিয়ে লিখলেন, ‘বলছ যখন আসছি।’
সুনীল-নীরার নিঃশব্দে ছাদে উঠে।
সুনীলের প্রশ্ন, ‘শরৎবাবু নাকি জীবনানন্দ দাশ? কে দায়িত্ব দিয়ে গেল নগ্ন-নির্জন আঁধারের রূপ বর্ণনার?
নারী মৃদু হেসে জবাব দিলেন, ‘দু’জনের একজনও না।’
‘তবে?’
‘সুনীল গাঙ্গুলি।’
সুনীল হা…হা করে হেসে উঠল। সুনীলের হাসিটা রাতের নির্জনতাকে ছিন্ন করে অনেক দূরে চলে গেল।
‘আপনি একসময় গভীরভাবে ভালোবাসতেন!’
নীরা চমকে ওঠেন।
ক্ষণিকের নীরবতা ভেঙে নীরা প্রশ্ন করলেন,‘কি করে জানলে?’
‘আপনার চোখ দেখে।’
‘এমন নিকষ নির্জন আধাঁরে আমার চোখ পড়তে পারলে!’ নীরার এ-এক মহাবিস্ময়।
‘কারণ আমি কবি। আপনিও কবিতা লিখতেন একসময়।’
নীরা বাংলার এম.এ। কলেজে পড়তে কবিতা লিখতেন। ছাপাও হয়। নাম কুড়িয়েছিলেন কিছু।
স্বামীর পছন্দ হলো না। যুক্তি দিল, ‘কবিরা অসুখি হয়।’
ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিলেন। চার দেয়ালে বন্দি করে নিলেন নিজেকে।
‘এখন আমার পরিচয় শুধু একজন মানুষ কিংবা অমানুষের স্ত্রী। সন্তানের মা। আর কিছু না।’
সুনীল বলল, ‘সবাই বাঁচে। কিন্তু, খুব কম মানুষ জীবনের আঁধারে আলোর রোশনাই খুঁজে পায়। আপনি পাবেন। কারণ আপনি কবি। আপনি অন্যরকম।’
ফাগুনের হাওয়া তখন ধীর ধীর করে বইছিল। নীরার শাড়ির আঁচল উড়ে অন্যছাদে অমিতের কাঁধ ছুঁয়ে দিল।
চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু লুকিয়ে ফেললেন নীরা। তাঁর মনে হলো, কেউ যেন জীবনের আঁধারে একফালি আলোর রোশনি ছুঁয়ে দিয়ে গেল…। মনে হলো, আজকের রাতটা সত্যি অন্যরকম!
নীরার ফেরা
নীরার নগরবাসী জীবন তিন দশক হয়ে গেল। এ-সময়ে নীরা দেখল রাস্তাগুলো পাশে বেড়েছে তিন থেকে চারগুণ। চারপাশের দালানগুলো আরও-আরও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে। গাড়ির কালো ধোঁয়া বেড়েছে। শব্দদূষণ বেড়েছে। হয়ত যখন এ-নগরবাস অর্ধশত বছর হবে, তখন আরও আরও বাড়বে। নোংরামি, বেঁচে থাকার অনিশ্চয়তা চিরকাল এমনই ছিল। নীরা তবুও নগর ছাড়েনি। ভেবে নিয়েছিল, যেভাবে বিপ্লব আসে, দিন পাল্টায়; নীরা সেভাবেই ভেতরে ভেতরে একদিন নিজেকে পাল্টে নেবে।
নীরার ছোটবেলাটা কাটেনি বাড়ির চার দেয়ালে। কেটেছে মধ্যবিত্তের ছকে বাঁধা জীবন থেকে অনেক দূরে। সে-ই নীরার ইনবক্সে একদিন হঠাৎ একটা টেক্সট আসে সুনীলের কাছ থেকে। সুনীল ইউনির্ভাসিটিতে নীরার কবিতা আবৃত্তি করত। এখন সে নিজেই নামকরা কবি। নীরা উত্তর দেয়নি। কিন্তু কোনো এক নিঃসঙ্গ সন্ধ্যায় লিখে দিল, ‘হুঁ…। ভালো আছো?’
সুনীল লিখেছিল, ‘তোমার দিন কেমন কাটছে?’
কতদিন পর কেউ নীরার কাছে ‘দিন কেমন কাটছে’ জানতে চেয়েছে! এতকালের অনিশ্চিত জীবন নীরাকে টেনেছে নানা দিকে। অনিশ্চয়তায় ভেসেছে নিজের মতো করে। নিশ্চিত কিছুই হয় না। তাই চিরকাল অনিশ্চিত থাকে। সাদার মতোই থাকে কালো। ছাই রঙটাও থাকে।
কথাগুলো এগোতে থাকে।
সুনীল জানালো, ‘আপনার কবিতা এখনো অনেকে পড়ে। আপনাকে খোঁজে। আপনি চাইলে আবার ফিরে আসতে পারেন।’
নীরার জীবনে আলোর মতো ফিরে আসে সেই পুরোনো খাতা, কলম, ছন্দ। ছাই চাপা জীবনটাকে আড়াল করে নীরা আবার শুরু করে লেখা- গল্প, কবিতা, গান। ঠিক কুড়ি-বাইশ বছরের যুবক-যুবতীরা যে-করে সমাজের নীতি-নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে, আড়ালে-আবডালে লুকিয়ে প্রেমে পড়ে।
কুমার প্রীতীশ বল : প্রাবন্ধিক, চট্টগ্রাম




