কাজী নাজরিন
অনিমা সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছে ভার্সিটি যাওয়ার উদ্দেশ্যে কারণ অনিমা শাটল ট্রেনে যাবে।রোজ রোজ অনিমা ট্রেনে করে যাওয়া আসা করে। এতো চতুর মেয়ে কখনো ট্রেন মিস করে না। বর্তমানে অনিমা অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। বাসা হতে বের হয়ে দশ মিনিট পায়ে হেঁটেই ট্রেন স্টেশন। আজ সকাল হতে আকাশ খুব মেঘলা,ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে। ছাতা মাথায় দিয়ে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে অনিমা দ্রুত গতিতে হেঁটে যাচ্ছে। হঠাৎ শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। অনিমা বৃষ্টিতে ভিজে ছুপছুপ হয়ে গেছে।
এতক্ষণে অনিমা স্টেশনে এসে পৌঁছেছে।এদিকে ট্রেনে উঠতে যাবে এই মুহূর্তে অনিমাকে নিয়ে কয়েকটা ছেলে হাসাহাসি করছে।একদিকে ভিজে সপাসপ অনিমার মাথা ধরে আছে অন্যদিকে লম্পট ছেলেদের হাসাহাসিতে অনিমার প্রচুর জেদ ধরেছে। হঠাৎ এক হ্যান্ডসাম ছেলে পাশ থেকে লম্পট ছেলেদের উদ্দেশ্যে বলতে লাগলো, এটা কোনো হাসাহাসির বিষয় হলো? মেয়েদের নিয়ে এইভাবে হাসতে কি মজা পাও? যা ইচ্ছে তাই বলে তাদেরকে থামিয়ে দিয়ে অনিমাকে বলতে লাগলো, প্লিজ ওদের কথায় কিছু মনে করবেন না।এদের কাজই এসব করা।
তখন লম্পটগুলো একদম চুপ হয়ে সরে গেলো। অনিমাকে ট্রেনে উঠতে সাহায্য করে নিজে দাঁড়িয়ে একটা খালি সিটে অনিমা কে বসতে দিল। অনিমা বসতে রাজি হচ্ছিল না কিন্তু খুব অনুরোধ করার পর অনিমা বসতে বাধ্য হলো।
কতক্ষণ ট্রেন চলার পর অনিমা খেয়াল করলো সেই ছেলেটা ও বৃষ্টিতে কিছুটা ভিজে গিয়েছে। অনিমা চিন্তা করতে লাগলো, আহা! বেচারারও দেখি আমার অবস্থা। আরো ভাবতে লাগলো হয়তো আমার মতো ট্রেন ধরতে গিয়ে বেচারার এই অবস্থা। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ অনিমার চোখে চোখ পড়লো সেই হ্যান্ডসাম ভদ্র নম্র ছেলেটার। অনিমা লজ্জিত হয়ে চোখ সরিয়ে নিলো। ছেলেটা কিন্তু অপলক দৃষ্টিতে অনিমার দিকে তাকিয়েই আছে।অনিমা টের পেয়েও না জানার ভান করে অন্য পানে চেয়ে আছে। ট্রেন ছুটে চলছে নিজের গতিতে।
অনিমার চোখে ঘুমঘুম ভাব। হঠাৎ অনিমার কানে শব্দ এলো,আপনি কোন ইয়ারে, কোন ডিপার্টমেন্ট? অনিমা নিজের পরিচয় দিলো। তখন ছেলেটা বলল আমি মাস্টার্স, রসায়ন। অনিমা তখন বলতে লাগলো এই ট্রেনে এতো এতো যাওয়া আসা করেছি আপনাকে তো কখনো দেখিনি। তখন ছেলেটা বলল আমি ভার্সিটি হলেই থাকি। আরো বলতে লাগলো আমার এক বন্ধু অসুস্থ তাই গত রাতে তাকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছি আর শহরে আমার মামার বাসায় রাতে ছিলাম। আজ একটা পরীক্ষা আছে তাই ভার্সিটির উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম।
এতক্ষণে দুজন দুজনের সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারলো। হলো অনেক কথার আদান-প্রদান। ছেলেটার নাম ও জানা হয়ে গেলো অনিমার।ছেলেটার নাম ‘হাসিব’।
এক ঘন্টা পর ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছল। দুজনে কাঁটা পাহাড়ের রাস্তা ধরে একসাথে হাঁটা শুরু করলো।আরো অনেক ভাব বিনিময় হলো দুজনের মধ্যে। এরপর বিদায়ের পর্বে মেয়েটা ভদ্র বেশে হাসিবকে সালাম দিয়ে বিদায় নিলো।দুজনেই যে যার ডিপার্টমেন্টে চলে গেল। সারাদিন ক্লাস ব্যস্ততা শেষে বাসায় ফিরে অনিমা ছেলেটার কথা ভাবতে লাগলো। অনিমার মনে বারেবারে হাসিবের চেহারা ঘুরপাক খাচ্ছে। কোন ক্রমেই হাসিবকে ভুলতে পারছে না অনিমা। আর মনে মনে নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করছে, ইহজগতে এতো এতো ভদ্র আচরণ, ভদ্র ছেলে কি হয়?
ওদিকে হাসিব ও অনিমাকে নিয়ে ভাবতে লাগলো। এত সুন্দর ভদ্র নম্র মিষ্টি মেয়েটার ছবি বারবার হাসিবের চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো। আর হাসিব ভাবছে আহা! ফোন নাম্বার তো নেয়াই হলো না। আবার নিজেকে নিজেই বলতে লাগলো, এইভাবে একদিনের পরিচয়ে কারো থেকে মানে একটা মেয়ের কাছে নাম্বার চাওয়া অনুচিত। কিন্তু মনের মধ্যে মেয়েটা যেনো ঘর বেঁধে ফেলেছে সেরকমটা অনুভব করতে লাগলো হাসিব। পরদিন হাসিব মেয়েটার ডিপার্টমেন্টে চলে গেলো। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও অনিমার দেখা পেলো না। এইভাবে রোজ রোজ অনিমার ডিপার্টমেন্টে গিয়ে ও অনিমার দেখা পেলোনা হাসিব।
বেশ কয়েকদিন পর হাসিব ক্যাফেটেরিয়াতে নাস্তা করার জন্য গেলে হঠাৎ চোখে পড়লো অনিমা ভেতরের দিকে আসছে। হাসিব আবেগাপ্লুত হয়ে একটু নড়েচড়ে বসলো। হাসিবের গলা শুকিয়ে যেনো কাঠ হয়ে যাচ্ছে। কি বলবে, কি দিয়ে কথা শুরু করবে এই নিয়ে ইতস্তত বোধ করছে।
হঠাৎ অনিমার চোখে চোখ পড়লো হাসিবের। অনিমা সালাম দিয়ে স্বাভাবিকভাবে কুশল বিনিময় করলো। অনিমা খাবারের অর্ডার করলো দুইজনের জন্য। হাসিব তড়িঘড়ি করে দুজনের বিল পে করলো। এরপর দুজন বসে আরো অনেক কথাবার্তা হলো। দুজনের পরিবার, ঠিকানা সবকিছু জানা হয়ে গেলো। হাসিব মাথা নত করে বলতে লাগলো, নাম্বার দেয়া যাবে কি? অনিমা মুহুর্তের মধ্যে নাম্বার দিয়ে দিলো কোনো বিলম্ব না করে। হাসিব ও তার নাম্বার অনিমাকে দিয়ে দিলো।
এই ভাবে মাঝেমধ্যে দেখা এবং মোবাইল ফোনে দুজনের আলাপ হতে থাকে। এদিকে হাসিবের মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল। হাসিব ভার্সিটির হলে আরো কিছুদিন থাকতে লাগলো। এই ফ্রি সময়ে চাকরির জন্য চেষ্টা করার পাশাপাশি হাসিব বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতিও নিচ্ছে। আর মাঝেমধ্যে সময় করে অনিমার সাথে দেখা ও করতো। আগামীকাল হাসিব ঢাকা যাচ্ছে চাকুরীর ইন্টারভিউ দিতে। অনিমাকে বলে গেল বেশ কয়েকদিন ঢাকায় থাকবো আমার এক আত্মীয়ের বাসায়। অনিমা হাসিবকে কয়েকদিন দেখতে পারবে না ভেবে মনে মনে খুব দুঃখ পেলো।
তখন রাত এগারোটা, হঠাৎ অনিমার মোবাইলে হাসিবের ফোন।অনিমা ওয়াশরুমে থাকাতে অনিমার আম্মু ফোন রিসিভ করলো। অনিমার আম্মু শুনতে পারলেন, ওপাশ থেকে খুব আনন্দিত হয়ে একটা ছেলে বলতে লাগলো, অনি,,,মা,,আমার একটা চাকুরী হয়েছে। আরো বলতে লাগলো জানো অনিমা,বেতন ও কিন্তু তেমন খারাপ হবে না।মোটামুটি চলা যাবে। এমন সময় অনিমার আম্মু বলতে লাগলেন, আমি অনিমার আম্মু বলছি,অনিমা ওয়াশরুমে তাই আমি কল ধরেছি।অনিমার আম্মু এবার প্রশ্ন করলেন,বাবা তুমি কে?তখন হাসিব লজ্জায় এবং খুব নম্র সুরে সালাম দিয়ে নিজের পরিচয় দিলো।অনিমা ওয়াশরুম হতে বের হয়ে দেখতে পেলো, অনিমার আম্মু হাসিবের সাথে অনেক আগ্রহ নিয়ে কথা বলছেন। এমন কি অনিমার আম্মু হাসিবকে বলছেন, আচ্ছা বাবা একদিন সময় করে আমাদের বাসায় এসো কিন্তু!!
এখন অনিমার পরিবার ও হাসিব আর অনিমার বিষয়ে সব জানে। তবে অনিমার বাবা খুব রাগী স্বভাবের মানুষ।
অনিমার বাবা হাসিবের ব্যপারে সব খোঁজ খবর নিতে থাকে। হাসিব সম্পর্কে অনিমার বাবা জানতে পারেন, হাসিব গ্রামের এক কৃষকের সন্তান। হাসিবকে হাসিবের বাবা অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া করিয়েছেন।
হাসিবদের অর্থবিত্ত বলতে তেমন কিছু নেই। হাসিবের বাবা হাসিবের আরো তিন ভাই বোনের পড়ালেখাও চালিয়ে যাচ্ছেন অনেক কষ্ট করে। অপরদিকে অনিমার বাবা সরকারি চাকরিজীবী অনিমাদের অবস্থাও ভালো।
অনিমার মা হাসিবের সাথে কথা বলার পর হতে অনিমার মা ও বাবা দুজনেই অনিমাকে নিয়ে সব সময় একটু বেশি আলাপ আলোচনা করে থাকে। অনিমার ছোট আরো দুটো বোন রয়েছে। একটা ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছে আরেকটা ক্লাস এইটে পড়ে। মা বাবার ইচ্ছে একটা ভালো ঘর মানে উচ্চশিক্ষিত পরিবারে অনিমাকে বিয়ে দেবেন।
কিছুদিন পর অনিমার সাথে পড়ে ভার্সিটির এক বন্ধু রাহাত অনিমাকে বলতে লাগলো, অনিমা একটা কথা বলবো? অনিমা হ্যাঁ বলতে পারিস। তখন সে বলতে লাগলো, তোর জন্মদিনে তোদের বাসায় আমরা বন্ধুরা অনেক বার গিয়েছি কিন্তু আবার একদিন যেতে চাই। একথা শুনে অনিমা হেসে বলতে লাগলো, এই বুঝি একটা কথা! যেতে মন চাইলেই যাবি আর আমার আম্মুর হাতের মজার মজার নাস্তা খেয়ে আসবি। অনিমা আরো বলতে লাগলো তোরা কয়জন যাবি? তখন অনিমার বন্ধু বলল আমরা চারজন যাবো। অনিমা ভেবেছে হয়তো চার বন্ধু শহরে যাবে তাই তাদের বাসায় ঘুরে আসবে।
দুদিন পর সন্ধ্যাবেলা হঠাৎ অনিমাদের কলিং বেলের শব্দে অনিমার ছোট বোন দরজা খুলে দিল। অনিমা এসে দেখতে পেলো তার বন্ধু রাহাত আর একজন বয়স্ক পুরুষ এবং একজন বয়স্ক মহিলা রাহাতের সাথে এসেছে। অনিমা দেখে ভাবলো নিশ্চয়ই রাহাতের মা বাবা-ই হবেন উনারা। অনিমা সালাম দিয়ে ভেতর আসতে বললেন। রাহাত বলতে লাগলো, আমার আম্মু আব্বু তোদের বাসায় আসতে চেয়েছে তাই নিয়ে এলাম।অনিমা হ্যাঁ অনেক ভালো করেছিস।
এরপর অনিমার মা বাবার সাথে পরিচয় পর্ব শেষে রাহাতের আম্মু অনিমার বাবাকে বলতে লাগলেন, ভাই আপনার মেয়ে অনিমাকে আমি আমার বড় ছেলের বউ করে নিয়ে যেতে চাই। আমার ছেলে ইংল্যান্ড থেকে সম্প্রতি “বার এট ল” সম্পন্ন করেছে।রাহাতের মুখে অনিমার অনেক প্রশংসা শুনে আমরা আসলাম। আপনার মেয়েকে আমাদেরও খুব পছন্দ হয়েছে।
এদিকে পাশের রুম হতে অনিমা এইসব শুনতে পেয়ে অনিমার চোখ কপালে উঠলো! আর ভাবতে লাগলো, আব্বু আম্মু রাজি হয়ে গেলে হাসিবের কি হবে??
আমার আর হাসিবের দেখা সকল রঙিন স্বপ্ন কি বিষাদ হয়ে দাঁড়াবে???
কিছুক্ষণ পর আবার কলিং বেলের শব্দে অনিমা দরজা খুলে দেখে এক সুদর্শন পুরুষ তার সামনে দাঁড়িয়ে! যিনি এতক্ষণ অনিমাদের বিল্ডিংয়ের নিচে গাড়িতে বসে ছিলেন। অনিমার আব্বু অনুমতি দেয়াতে রাহাত কল করে ভাইকে অনিমাদের বাসায় আসতে বলেছে। এতক্ষণে অনিমা পরিষ্কার বুঝতে পেরেছে রাহাত কি উদ্দেশ্যে তাদের বাসায় এসেছে। অনিমাকে দেখার পর রাহাতের ভাই রাসু খুব খুশি এবং তার মাকে কানে কানে বলতে লাগলো, মা আজকেই আংটি পরিয়ে দাও!
অনিমা এইসব দেখে একদম নীরব নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। অনিমার চোখে যেনো সবকিছু ঝাপসা দেখছে।
অনিমার বাবা মা অতিথি আপ্যায়নে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন এমনকি ডিনারের আয়োজনও করলেন। দুই পরিবারের সবাই খুব খুশি। রাহাতের আব্বু এদিকে যাওয়ার আগে বলে গেলেন, আগামী পনেরো দিনের মধ্যে ইনশআল্লাহ আমরা বিয়ের কাজ শেষ করে ফেলবো।
হাসিবের সদ্য চাকরি হয়েছে ঠিকই কিন্তু হাসিবের পরিবার চেয়ে আছে হাসিবের ইনকাম দিয়ে একটু সুন্দর করে সংসার চালাবে যাতে করে হাসিবের পরিবারের কষ্ট দূর হয়। অনিমা সারারাত একটুও ঘুমাতে পারেনি কারণ হাসিব সম্পর্কে জোর গলায় আব্বু আম্মুর কাছে কিছু বলতে পারছে না। হাসিবকে, অনিমা সবকিছু বিস্তারিত বর্ননা করতে থাকে। এইসব শুনে হাসিবের মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়েছে!! হাসিব চিৎকার করে কান্নাকাটি করতে লাগলো। কিন্তু অর্থবিত্তের কাছে প্রেম ভালোবাসা এইভাবে হার মানবে হাসিব আগে সেটা কখনো ভেবে দেখেনি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস পনেরো দিন পর খুব ধুমধামভাবে রাসুর সাথে অনিমার বিয়ে সম্পন্ন হলো। দুটো মনের কবর দিয়ে অর্থের কাছে হার মানলো ভালোবাসা।
কাজী নাজরিন : কবি ও গল্পকার, চট্টগ্রাম




