এখন সময়:রাত ১:৩২- আজ: শুক্রবার-৩রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৯শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

এখন সময়:রাত ১:৩২- আজ: শুক্রবার
৩রা জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ-১৯শে আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ-বর্ষাকাল

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা : লোভে আর পাপে ডুবতে বসা এক শহর 

মিঠুন চৌধুরী

 

মানুষের কত পাপ সয়ে বয়ে যায় নদী। বিষে নীল হতে হতে তবু টিকে থাকে। ইতিহাস জানান দেয়, নদী মরে গেলে বিলীন হয় সভ্যতাও। জনপদ তো নিতান্ত মামুলি। হাজার বছরের এই চট্টগ্রাম শহরের যাত্রা ও বহমানতা কর্ণফুলী নদীকে ঘিরে। সেই নদীকে হত্যা করতে সবকিছুই আমরা করেছি। এমনকি নদীর শিরা-উপশিরার মতো বয়ে চলা খালগুলোকেও শেষ করেছি সীমাহিন লোভে। উপভোগের বর্ষা এখন তাই আতঙ্কের অন্য নাম। নগরজীবনে বর্ষা আর ভোগান্তি এখন পরস্পরের প্রতিশব্দ। প্রকৃতির প্রতিশোধ কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে তাও আমরা বিস্মৃত হয়েছি লোভে আর আত্মবিধ্বংসী খেলায়।

চট্টগ্রাম ‘বাণিজ্যিক রাজধানী’ এই উপাধি পেয়েছে বহু বছর হল। এই শহরের সবচেয়ে বড় অভিশাপ এখন জলাবদ্ধতা। গত কয়েক দশকে এই সংকট প্রকট হয়েছে। নগরী আয়তনে বেড়েছে। জনসংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ। পরিকল্পনাহীন নগরায়ন, সীমাহীন লোভ আর নিয়ন্ত্রণহীনতার খেলায় সবসুদ্ধ ডুবতে বসেছে বাণিজ্যিক রাজধানীর স্বপ্ন।

বর্ষা মানেই বাংলার রোমান্টিকতার ঋতু। বর্ষা মানে রবীন্দ্রসঙ্গীত। বর্ষা মানে খিচুড়ি। অথচ নগর জীবনে সেই বর্ষা এক আতঙ্ক এখন। চট্টগ্রাম শহরে বর্ষা মানে খাল নালা উপচে ডুবে যাওয়া সড়ক। কোমর পানি ঠেলে সাধারণ মানুষের অফিস-আদালতে ছোটা। যাত্রাপথে নালায় পড়ে তলিয়ে যাওয়ার ভয়। এমনকি বর্ষার দিনে জলাবদ্ধ এলাকায় পানি ডিঙাতে গিয়ে বিদ্যুতায়িত হয়ে মৃত্যুও হতে পারে। আমাদের চট্টগ্রাম শহরে বর্ষা এখন তাই এক বিভীষিকার নাম।  বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে যেমন শত শত নদী বয়ে গেছে ঠিক তেমনি চট্টগ্রাম শহরের ভেতর দিয়েও বহু খাল বয়ে গেছে। শতাব্দী প্রাচীন এসব খাল ছিল শহরের পানি প্রবাহের পথ। শুধু পানি প্রবাহ নয় সঙ্গে যোগাযোগেরও উপায়। কর্ণফুলী নদী হয়ে আসা পণ্য এসব খাল দিয়েই চলে যেত শহরের নানা প্রান্তে। ষাটের দশকে চাটগাঁ শহর দেখা বর্ষীয়ান নাগরিকরা তাঁদের অভিজ্ঞতায় শহরে হাতেগোনা কয়েকটি কাঁচা বা ইট বিছানো রাস্তা আর গরুর গাড়ি চলাচলের গল্প এখনো বলেন। তখন মূলত নৌপথেই চলত পণ্য পরিবহন।

দ্ইু দশক আগে কাগজপত্রে ৭১টি খাল থাকার কথা শুনেছিলাম। তারপর সরকারি কাগজের কাটাকুটিতে সেই সংখ্যা কমে হলো ৫৭। আর জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ১০ বছর আগে যে মেগাপ্রকল্প নেয়া হল সেখানে ঠাঁই হলো ৩৬টি খালের। এভাবে দিনে দিনে সরকারি হিসেবেই কমছে খালের সংখ্যা। তাহলে বাস্তব পরিস্থিতি কী? বাস্তবে হারিয়ে গেছে বলেই হিসেবের খাতায় নাম কাটা পড়েছে এসব খালের।

কর্ণফুলী তীর ঘেঁষা বাকলিয়ায় একসময় বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে বিল ছিল। এছাড়া মহেশখালের তীরে ছিল ডাকাইত্যার বিল। হালিশহর-কাট্টলী এলাকার বিশাল অংশ ছিল নিচু ভূমি। শুধু বর্ষায় নয় জোয়ারেও সাগর এবং নদীসংলগ্ন এসব নিচু এলাকায় পানি প্রবেশ করত। আবার ভাটায় নেমে যেত। শহরের বেশির ভাগ বিল এখন ভরাট করে আবাসিক এলাকা হয়েছে। বর্জ্য আর পলিথিনের স্তর জমতে জমতে কর্ণফুলীর গভীরতা কমেছে। কমেছে নদীর প্রশস্ততাও। নদী থেকে জোয়ারের পানি খালে আসত। সেই খালের তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে কয়েক দশক আগেই।

শহরের উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম অংশ পাহাড়ি অঞ্চল। বর্ষাকালে এসব উঁচু এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি দ্রুত ঢাল বেয়ে নিচের সমতল অঞ্চলে নেমে আসে। শুধু পানি না সঙ্গে নেমে আসে পাহাড়ের মাটি এবং বিভিন্ন স্থাপনা তৈরির জন্য কাটা মাটিও। অন্যদিকে শহরের দক্ষিণ, দক্ষিণ-পশ্চিম ও উপকূলীয় অংশের বেশির ভাগ এলাকা অনেক নিচু। শহর রক্ষায় একাধিক বাঁধ কাম উঁচু সড়ক ইতোমধ্যে ঘিরে ফেলেছে সেসব নিচু এলাকাকে। ভারি বর্ষণের সময় যখন কর্ণফুলী নদীতে উচ্চ জোয়ার থাকে, তখন শহরের পানি নদীতে নামতে পারে না। বরং নদীর পানি উল্টো খাল ও নিম্নাঞ্চলের দিকে প্রবেশ করে। তাই টানা বৃষ্টি কয়েক ঘণ্টা হলেই শহরের মাঝখানে এসে জমা হয় সব পানি। আর খালগুলো সচল না থাকায় সেই পানি কোনো পথই খুঁজে পায় না। আটকে পড়া রাক্ষুসীর মতো ভয়ঙ্কর আতঙ্ক হয়ে বিরাজ করতে থাকে শহরের বুকের উপর।

এই সমস্যার পেছনে চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান ও বৈচিত্র্যময় ভূমিরূপ যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে সেটা কি নীতি নির্ধারকরা ভাবছেন? উত্তর হল- না। জলাবদ্ধতা নিরসনে যে মেগা প্রকল্প বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নেয়া হল সেটার বেলায় আমরা দেখলাম দুই সংস্থার প্রতিযোগিতা। সিটি করপোরেশন নাকি সিডিএ প্রকল্প পাবে। এই ইঁদুর দৌড়ে গিয়ে প্রকল্প অনুমোদন হয়ে গেল ঠিকই কিন্তু পূর্ণাঙ্গ প্রকল্প পরিকল্পনা করা হল না। কাজ শুরুর পর সেই পরিকল্পনা চূড়ান্ত হল। এমন অভিনব, আজগুবী আর অপেশাদার কাজ এ যুগেও হতে পারে! কিন্তু সেটাও আমরা হতে দেখলাম।

তারপর সেই প্রকল্প যখন মাঠে গড়ালো তখন খাল খুঁজতে গিয়ে দেখা দিল আরেক বিপত্তি। খাল কই সব তো ভবনের সারি। গত কয়েক বছরে ৩৬টি খাল উদ্ধার করতে গিয়ে ভাঙতে হয়েছে কয়েক হাজার স্থাপনা। একবার ভেবে দেখুক ভেঙে ফেলা এসব স্থাপনা নির্মাণে ব্যয় কত ছিল। যারা খালের জমিতে বাড়িঘর নির্মাণ করেছেন তারা কি ভেবে সেখানে বাড়ি বানালেন?বছরের পর বছর ধরে যখন খালগুলো দখল হচ্ছিল তখন সরকারি সংস্থাগুলো কোথায় ছিল? এখানেই আসে আমাদের পরিকল্পনাহীনতার বিষয়টি। খালগুলো আমরা সবাই মিলে দখল হতে দিয়েছি বা দখল করেছি। তারপর যখন জলাবদ্ধতা শুরু হল, তখন একে অন্যকে দুষেছি। সবশেষে খাল দখলকারী এসব স্থাপনা সরাতে কে কার আগে প্রকল্প পাস করাতে পারে তা নিয়ে প্রতিযোগিতায় নেমে একটা অপরিণত প্রকল্প নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছি। প্রকল্প শুরুর এক দশক পর এখন এসে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে আবার বলা হচ্ছে, বাকি ২১টি খাল উদ্ধারেও আরো প্রকল্প লাগবে। সব খাল ব্যবস্থাপনায়ও লাগবে আরেকটি প্রকল্প। অথচ এই সংস্থাটি বাড়ইপাড়া খাল নামে একটি খাল খননের প্রকল্প নিয়েছিল। যার কাজ এখনো শেষ হয়নি। এভাবে কতটা সমন্বয়হীন থাকা যায় তার এক দারুণ প্রদর্শনী চলছে মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে।

 

অথচ চট্টগ্রামের মতো সাগর, নদী, পাহাড় ও সমতল ঘেরা অনন্য এক শহরের ভৌগলিক এবং প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় শতবর্ষব্যাপী একটি পরিকল্পনা নেয়া উচিত ছিল বহু আগেই। সেই মহাপরিকল্পনা ধরেই আগানো যেত। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ নামে যে সংস্থার এসব পরিকল্পনা করার কথা তারা দশক পেরেলো একটি করে মাস্টারপ্ল্যান করতে শুরু করে। সেটি প্রণয়ন করতে করতে আরো কয়েক বছর চলে যায়। তারপর সেই পরিকল্পনা বিশাল কাগজের স্তুপ হয়ে কয়েক বছর পড়ে থাকে। তারপর শুরু হয় আরেকটি নতুন মাস্টারপ্ল্যান তৈরির তোড়জোড়।

 

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতার এই সমস্যাটির কার্যকর সমাধান ও বিশ্লেষণে আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক মডেলের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এখন হাইড্রোলজিক্যাল ও হাইড্রোলিক মডেল ব্যবহার করে বৃষ্টিপাত, পানিপ্রবাহ, জলাবদ্ধতা ও বন্যার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করা যায়। এসব মডেলের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি কোন পথে প্রবাহিত হবে, কোথায় পানি জমে থাকার আশঙ্কা বেশি এবং কোন এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা দুর্বল তা আগে থেকেই নির্ণয় করা সম্ভব। পাশাপাশি স্যাটেলাইট ইমেজ এবং ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূমির উচ্চতা, ঢাল, পানিপ্রবাহের দিক, নিম্নভূমি ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা শনাক্ত করা সম্ভব। এসব তথ্য সমন্বিতভাবে ব্যবহার করে জলাবদ্ধতার পূর্বাভাস, ঝুঁকি মানচিত্র প্রস্তুত এবং কার্যকর নগর পরিকল্পনা এখন সময়ের দাবি। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য- সবগুলো খাল পুনরুদ্ধার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা, জলাধার ও রিটেনশন পন্ড তৈরি, প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহের পথ সংরক্ষণ এবং ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন অত্যন্ত জরুরি।

 

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি গুরুতর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটও। শুধু জলাব্ধতার কারণে গত তিন দশকে কত হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে এবং কত মানুষ প্রাণ দিয়েছে সেটাও বিবেচনায় নিতে হবে। এই সংকট মোকাবেলায় একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।

শুধু নীতি আর পরিকল্পনা নিলেই হবে না বাস্তবায়নেও কঠোর হতে হবে। খাল দখলমুক্ত করা, নতুন দখল প্রতিরোধ করা এবং কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। শুধুমাত্র সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ এবং লোভ সংবরণ করে দখল বাদ দিয়ে রক্ষায় মনোযোগী হলেই এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। তা না হলে ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়া বহু নগর সভ্যতার পরিণতি বরণের জন্য প্রস্তুত হতে হবে আমাদের সবাইকে।

 

মিঠুন চৌধুরী, সংবাদকর্মী, চট্টগ্রাম

আবুল ফজল : বাঙালি মুসলমান সমাজের বিবেকের কণ্ঠস্বর

ইসরাইল খান বাংলার নবজাগরণের সার্থক উত্তর-সাধক মনস্বী আবুল ফজল ছিলেন বাঙালি মুসলমান সমাজের বিকাশের এবং বিবেকের এক অন্যতম প্রধান কারিগর। বিশ শতকে মুসলমান সমাজকে যতোগুলো

মেরিল্যান্ড ডিসি বই মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তসলিমা নাসরিন : যতদিন বেঁচে থাকি-  প্রগতিশীলের পক্ষে, ধর্মান্ধ মৌলবাদের বিপক্ষে আমার লেখা ও লড়াই চলবে

সাইয়িদ মাহমুদ তসলিম : নির্বাসিত লেখিকা ও  কবি তসলিমা নাসরিন বলেছেন, যতদিন বেঁচে থাকি , আমার লড়াই ও প্রতিবাদ থাকবে ধর্মান্ধ মৌলবাদের বিরুদ্ধে। অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল

‘কবিতার কথা’ চট্টগ্রাম আড্ডায় বক্তারা : ‘শুদ্ধতাই হোক কবিতার বুনিয়াদি রূপ’

রুহু রুহেল : ২৮ জুন ২০২৬ রবিবার সন্ধ্যায় অনাড়ম্বররূপে মুগ্ধতার কবিতা পাঠের আসর অনুষ্ঠিত হলো ‘কবিতার কথা চট্টগ্রাম আড্ডা’র ব্যানারে, মহিলা অধিদপ্তর চট্টগ্রামের উপ-পরিচালকের কার্যালয়ে।

বাংলা আমার প্রণোদনা পুরস্কার-২০২৬ পেলেন সংস্কৃতিকর্মী

চিংলামং চৌধুরী “শুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চায় বিকশিত হউক নতুন প্রজন্ম” প্রতিপাদ্যে দিনব্যাপী বর্ণিল আয়োজনে রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি-এর জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হলো বাংলা আমার উৎসব-২০২৬।

শুদ্ধ সংগীতের সুরে মুখর সীতাকুণ্ড সুরনন্দনের ১ম বার্ষিক সঙ্গীত সম্মিলন অনুষ্ঠিত

দেবাশীষ ভট্টাচার্য্য : সীতাকুণ্ডে শুদ্ধ সংগীতচর্চার এক অনন্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে সুরনন্দনের ১ম বার্ষিক শাস্ত্রীয় ও উপ-শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সম্মিলন। গত ২ জুন ২০২৬