সাইয়িদ মাহমুদ তসলিম :
নির্বাসিত লেখিকা ও কবি তসলিমা নাসরিন বলেছেন, যতদিন বেঁচে থাকি , আমার লড়াই ও প্রতিবাদ থাকবে ধর্মান্ধ মৌলবাদের বিরুদ্ধে। অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল সমাজের জন্য, সুস্থ সভ্য ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য, নারীর সমান অধিকারের জন্য, মানুষের স্বাধীনতার জন্য, বাকস্বাধীনতার জন্য আমি লিখে চলেছি। এটি আমরণ অব্যাহত থাকবে ।
তিনি আরো বলেন , রাষ্ট্র মানুষকে নির্বাসিত করতে পারে, কিন্তু ভাষা থেকে নির্বাসিত করতে পারে না। পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া যায়, ভিসা বন্ধ করা যায়, দরজা বন্ধ করা যায়, কিন্তু মাতৃভাষার দরজা কেউ বন্ধ করতে পারে না।
গত ২৬ জুন মেরিল্যান্ড ডিসি বই মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বিশেষ অতিথি হিসেবে এ কথা বলেন। বিশ্বজুড়ে ‘বাংলা বই ‘ এই শ্লোগানকে সামনে রেখে বাংলা কেন্দ্র ও বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব – যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় আয়োজিত ডিসি বই মেলায় প্রধান উদ্েযক্তাদের মধ্য বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কবি এ কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট দস্তগীর জাহাঙ্গীর , বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা লেখক , কলামিষ্ট বাংলাদেশী বিজ্ঞানী ডক্টর নুরনবী , মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ঈমাম , নাট্যকার লুৎফর নাহার লতা , সম্পাদক নঈম নিজাম , সাংবাদিক নেতা এবং এক্স – প্রেসমিনিস্টার শাবান মাহমুদ, কবিও ছড়াকার সন্তোষ বডূয়া , বিশিষ্ট ছড়াকার শরফুদ্দীন খালেদ , কবি ও কলাম লেখক ফকির ইলিয়াস , লেখক, গল্পকার আবু সাঈদ রতন , আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদ আহসান রাসেল, নজরুল ইসলাম বাবু এমপি, কবি ও প্রবন্ধকার শিশু সাহিত্িযক হুমাইন কবির ঢালী, কবি আনোয়ার সেলিম, কবি মিশুক সেলিম , লেখক কবি ও প্রকাশক কমরেড আসলাম এ খান , নাসরিনা মুন্না , ফোবনার প্রেসিডেন্ট জাকারিয়া চৌধুরী , গোপাল স্যানেল , মিনহাজ আহমেদ মৃদুল আহমেদ, হাফিজ প্রমুখ । তসলিমা নাসরিন আরো বলেন , যে ভাষায় এই মেলা, সেই ভাষাতেই আমি লিখি। এই ভাষাতেই আমি ভাবি, স্বপ্ন দেখি, প্রতিবাদ করি, ভালোবাসি।
অন্য কোনও ভাষায় লেখার কথা আমি ভাবতেও পারি না। বাংলা ভাষা শুধু আমার লেখার ভাষা নয়, বাংলা ভাষাই আমার আশ্রয়। বাংলা ভাষাই আমার দেশ। আমার জীবনে রাষ্ট্র বদলেছে, ভূগোল বদলেছে, ঠিকানা বদলেছে। আমার নির্বাসন জীবন শুরু হয়েছিল ইউরোপে। ইউরোপে এক দশক বাস করার পর আমি হাঁপিয়ে উঠেছিলাম। দেশে ফেরার শত চেষ্টা করেও বিফল হয়ে শেষ পর্যন্ত ভারতবর্ষে, পশ্চিমবঙ্গে, ভাষার টানে ছুটে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, বাংলা ভাষার মধ্যে, বাংলার মানুষের মধ্যে, বাংলা বইয়ের মধ্যে, বাংলা আড্ডার মধ্যে হয়তো একটু ঘর খুঁজে পাবো। পশ্চিমবঙ্গ আমার কাছে ছিল ভাষার আশ্রয়, সাহিত্যের আশ্রয়, সংস্কৃতির আশ্রয়-অনেকটা দেশের মতোই দেশ। কিন্তু সেখানেও আমাকে থাকতে দেওয়া হলো না। তবু আমি যেখানেই থাকি, আমার সংগ্রাম থেমে থাকে না। ধর্মান্ধ মৌলবাদের বিরুদ্ধে আমি প্রতিবাদী এবং সোচ্চার । কারণ লেখাই আমার শ্বাস নেওয়া। লেখাই আমার বেঁচে থাকা।প্রবাসে বসে যারা বাংলা বইমেলার আয়োজন করেন, তারা শুধু একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করছেন না। তারা এক ধরনের প্রতিরোধ করছেন। ভুলে যাওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। শিকড় হারানোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। ভাষাহীন হয়ে যাওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ। বইমেলায় ঢাকা ও নিউইয়র্কের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করে। যার মধ্যে ছিলো— অন্বয় প্রকাশ, অনন্যা, সময়, নালন্দা, বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব-যুক্তরাষ্ট্র, কালিক, বীণাপাণি বুক স্টলসহ স্থানীয় বই বিক্রেতা। বইমেলার উল্লেখযোগ্য দিক নতুন প্রজন্মের উপস্থিতি, বাংলা সংস্কৃতির প্রতি তাদের আগ্রহ ও অংশগ্রহণ। ডিসি বইমেলায় এবছর বাংলা একাডেমি পুরস্কার প্রাপ্ত বিশিষ্ট লেখক নূরজাহান বোসকে আজীবন সম্মাননা প্রদান করা হয়। দুই দিনব্যাপী এই মেলায় প্রতিদিন ছিল শিল্প-সাহিত্য ও নতুন বই নিয়ে আলোচনা, কবিতা পাঠ, আবৃত্তি এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। স্থানীয় শিল্পী ছাড়াও নিউইয়র্ক থেকে আসা আমন্ত্রিত শিল্পীরা গান গেয়ে দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করেন।




